পাগলের খেয়াল -- সুবিনয় রায়চৌধুরী

     মেঘনাদ ঘোষকে চেন তো ? ঐ যে, ও পাড়ার জলধর ঘোষের ছেলে। ছেলেবেলা থেকে বেচারার গলাখানা একেবারে মেঘের নাদেরই মতন, তাই তার ঐ নাম রাখা হয়েছে। গায়ের রঙেও মেঘের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে—যেন কাল-বৈশাখীর কালো মেঘ। বেচারার যখন ১০ বছর বয়েস তখনই তা’র বুকের ছাতি চল্লিশ ইঞ্চি, আর লম্বায় তখনই সাড়ে তিন হাতের উপর।

     আমাদের পাড়ায় সাতকড়ি মিত্তির থাকে ; তার জিমনাষ্টিকের আড্ডায় মেঘনাদ রীতিমত 'এক্সারসাইজ ক'রে চেহারাখানাকে আরো ভাল ক’রে সানিয়ে নিয়েছে । চোঁদ্দ বছর বয়সে তার ছাতি হ’লো আটচল্লিশ ইঞ্চি ; হাতের গুলি ফোলা’লে হ’তো প্রায় ৩২ ইঞ্চি । তখন সে লম্বায় ছিল সোয়া চার হাত।
     বেচার। কিন্তু পড়াশুনায় তত সুবিধা করতে পারত না। অঙ্কে বহু চেষ্টা-চরিত্র ক’রে সে একবার ৪ নম্বর পেয়েছিল—সচরাচর ০ থেকে ২ এর মধ্যে পেতো। বাংলায় সে ভাল নম্বর পেতো ; কবিতাও কিছু কিছু লিখত।
     গত বছর একদিন সাতকড়ির জিমনাষ্টিকের আড্ডায় মেঘনাদ ‘প্যারালেল বার’এর খেলা দেখাচ্ছিল। হঠাৎ কেমন ক’রে হাত পিছলে পড়ে গেল,—আর, পড় বি-তো-পড় একেবার মাথাটি নীচে রেখে । হঠাৎ ‘ড্ড—গ্‌—গ্‌ ক’রে আওয়াজ হ’লে আর সঙ্গে সঙ্গে মেঘনাদও অজ্ঞান ।
     ‘ধর—ধর'—তোল—তোল’–‘ডাক্তার ডাক্‌’—‘বরফ আন’— চারিদিকে গোলমাল সুরু হয়ে গেল। লাশখানা তো কম নয় ! চারজনে বহু কষ্টে ধরাধরি ক’রে এনে পাশের ঘরে বেঞ্চির উপর শুইয়ে দিল। দেখতে দেখতে ডাক্তারও এলেন আর নাড়ী পরীক্ষা ক’রে বললেন “অবস্থা গুরুতর !”
     যাহোক ! কোন রকমে চেষ্টা-চরিত্র ক’রে, চার পাঁচজন ভাল ডাক্তারের চিকিৎসায় মেঘনাদের তো জ্ঞান হ’লো,—কিন্তু মাথাট পরিষ্কার হ’লো না ; থেকে থেকে আবোল-তাবোল বকে ; কখনও হাসে, কখনও কাঁদে।
     দু’ মাস যায়, চার মাস যায়, মেঘনাদ আর ভালো হয় না।
     দিব্যি ঘুরে বেড়ায়, খায় দায়, কিন্তু আবোল-তাবোল বকাটা আর বন্ধ হ’লো না। হঠাৎ থেকে থেকে ছাতের সমান উঁচু লাফ গোটা কয়েক দেয়, আবার শূন্যে ঘুষিও চালায়।
     ছাতির মাপ পঞ্চাশ ইঞ্চি ; হাতের গুলি ৩৬ ইঞ্চি; লম্বায় সাড়ে চার হাত,—এমন একটি লোক পাগল হ’লে তা’কে সমীহ ক’রে চলারই কথা। আমরাও তাই সৰ্ব্বদাই তা’র থেকে তফাতে থাকতাম। সেদিন সকাল বেলা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি; হঠাৎ দেখি মেঘনাদ আসছে। একবার হেসে চোখ টিপছে, তার পরের মুহুর্তেই একটু কট্‌মট্‌ ক’রে তাকাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের তৈরী কবিতা আওড়াচ্ছেঃ–

“শীতকালে চীৎকার গীত গাই গুণ্‌ গুণ্‌; 
হাতে পেলে বেটাদের নিমেষেই করি খুন।” 

যাহাতক আমাকে দেখা, অমনি ছাতের সমান লাফ দিয়ে দারুণ হুঙ্কার ছেড়ে আমাকেই তাড়া করল। ভয়ে তো আমার আত্মারাম শুকিয়ে গেল, প্রাণের দায়ে চোঁ চোঁ দৌড় দিলাম। ছেলেবেলা থেকে দৌড়িয়ে অভ্যাস, কিন্তু সাড়ে চার হাত লম্বা লোকের পা তে কম নয় ! তা’র হাত থেকে বাঁচা বড়ই শক্ত ।
     তবুও, প্রাণের দায়ে দৌড়ানো ছাড়া তখন আর উপায় কি? ধানের ক্ষেতের জলের মধ্যে দিয়ে, আলের উপর দিয়ে, চষা ক্ষেতের উপর দিয়ে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, রাস্তা দিয়ে, খানাখন্দের মধ্যে দিয়ে—দৌড়ে চলেছি তো চলেছিই। ক্রমেই মেঘনাদ আমাকে ধরে ফেলছে।
     হঠাৎ মেঘনাদের কাকা দেখতে পেয়ে বে-পরোয়া হয়ে তার কোমরে জড়িয়ে ধরল। মেঘনাদও বিরক্ত হয়ে “আঃ” ব’লে কাকাকে দু'হাতে তুলে নিয়ে ছুড়ে একটা খড়ের গাদার উপর ফেলে দিল। ভাগ্যে খড় ছিল, নইলে সেদিনই কাকার দফা শেষ হ’তো ।

আমিও ততক্ষণে সুযোগ বুঝে অনেকটা এগিয়ে পড়েছি। কিন্তু, সে আর কতক্ষণ? মেঘনাদও গোটা দশেক দারুণ লাফে আবার অনেকটা এগিয়ে এল। আমি আড়চোখে মাঝে মাঝে পেছনে দেখছি আর প্রাণপণে দৌড়াচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, মেঘনাদও প্রাণপণে দু’হাত ছুঁড়ছে আর কি-যেন ধরতে চেষ্টা করছে।
     এইভাবে কতক্ষণ চলেছিল জানি না, কারণ তখন আমার সময়ের জ্ঞান একেবারে লোপ পেয়েছিল। সমস্ত গা বেয়ে আমার ঘাম ঝরছে, শরীর কাপঁছে, পা যেন অবশ হয়ে আসছে, মাথা ঘুরছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, কান ভাঁঁ ভোঁঁ করছে। তবুও যেন অন্যমনস্ক-ভাবে দৌড়িয়েই চলেছি।
     ক্রমে টের পেলাম, মেঘনাদের কালো ছায়া আমার পেছনেই —এই ধরল আমাকে। ডান হাতখানা শূন্যে তুলে প্রচণ্ড এক কিল যেন মারবার চেষ্টা করছে। আমার তো তখন মাথা একেবারে ঘুলিয়ে গেছে। প্রতি মূহূৰ্ত্তে মনে হচ্ছে—“এই বুঝি শেষ !”
     শেষটায় আমাকে ধরেই ফেলল ! আমি এক মুহূৰ্ত্তের জন্য চোখ বুজলাম—তখন মেঘনাদের হাতখানা আমার পিঠের উপর পড়ছে।
তারপর, ---
     আস্তে হাতখানা আমার পিঠে ছুঁইয়ে মেঘনাদ বলল, “এইবারে! 
     তুমি ‘চোর’—ধরে ফেলেছি তোমাকে!” 
     এখন ধর দেখি আমাকে ”— ব’লেই মেঘনাদ চোঁ চোঁ দৌড়ে মুহূৰ্ত্তের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেল—আমিও হাঁপ ছেড়ে বললাম, “বেজায় বেঁচে গেছি আজ!”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য