চল্লিশটা গাঁজাখুরি গল্প -- কাজাখ লোককাহিনী

   এক লোভী ও নিষ্ঠুর খান ছিল ।
  যুদ্ধঅভিযান, ভোজউৎসব, শিকার, উদ্দাম খেলাধূলা সবেতেই তার বিরক্তি ধরে গেল। তখন সে এক অদ্ভুত বার্তা দিয়ে দূর দূরাস্তরে লোক পাঠাল ।
   ‘খানকে যে চল্লিশটা গাঁজাখুরি গল্প বলতে পারবে একটুও না থেমে আর একটাও সত্যি কথা না বলে, সে থলিভর্তি মোহর পাবে। কিন্তু যে গল্প বলতে বলতে একটুও থামবে বা একটাও সত্যি কথা বলবে তাকে অন্ধকার কারাকক্ষে নিক্ষেপ করা হবে, অনাহারে মৃত্যু হবে তার।
   লোকে বলে সোনার জন্য সৎ ও ধাৰ্মিক লোকও ন্যায়ের পথ ত্যাগ করে । দলে দলে কবি, গল্পকার, হাস্যরসপ্রিয় লোক আসতে লাগল খানের তাবুর দিকে । কিন্তু তাদের কেউই খানকে খুশী করতে পারল না ; হাজার হাজার লোক স্থান পেল অন্ধকার কারাকক্ষে । শেষ পর্যন্ত খানকে গাজাখুরি গল্প শোনাবার লোক আর কেউ রইল না !
   নিজের বিশ্রামাগারে খান বিবিধ অলঙ্করণে অলকৃত পালঙ্কে শুয়েছিল মুখ অন্ধকার করে। তার চারদিকে দাঁড়িয়ে থাকা উজীররা একটু নড়তে চড়তেও ভয় পাচ্ছিল। ভৃত্যের সোনার থালায় বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য খাদ্যপানীয় সাজিয়ে নিয়ে এসে দূরে দাঁড়িয়ে থাকছিল।
   খান ইঙ্গিতে আহার্য ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলছিল আর মাঝে মাঝে চারপাশে এমন তাকাচ্ছিল যে, হাত-পা ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল সবার।
   এমন সময় খানের সুন্দর, সাজান ইয়ুরতার কাছে এসে হাজির হল একটি হাসিখুশী ছেলে । ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকপরা, খালি পা, রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা, হাতে একটা ছেড়া থলি ।
   এখানে তুই ঘোরাঘুরি করছিস কেন? কি চাই? প্রহরীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর ।
   ‘আমি খানকে চল্লিশটা গাজাখুরি গল্প শোনাতে এসেছি, চটপটে উত্তর দিল ছেলেটি।
   জীবনে অনেক রক্ত দেখেছে এই প্রহরীরা, তাদেরও মায়া হল ছেলেটির জন্য । 
   ‘সময় থাকতে পালা বলছি! তোকে ছাড়াই কারাগার ভর্তি হয়ে গেছে! নাকি বাঁচতে ইচ্ছে নেই তোর?’
   'ছ' দিন মা মরে বাঁচার থেকে একদিন ভাল করে বাঁচা ভাল । প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল ভিখারী ছেলেটি ।
   ‘খানকে তুই ভয় পাস না ? অবাক হয়ে প্রহরীর জিজ্ঞাসা করল তাকে ।
    যে সাহসী তাকে ডাইনীবুড়িও ছোঁয় না ! হাসিমুখে উত্তর দিল ছেলেটি । 
   প্রহরীরা তাকে থানের ইয়ুরতার মধ্যে নিয়ে গেল। 
   ছেড়া টুপিপরা, কালো কালো পায়ে ডিঙি মেরে চলা এই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রাগে খানের ঠোঁট কেঁপে উঠল ।
   এই ছেড়াকানি পরে আমার সামনে আসার পাহস হয় তোর । তোকে নখে টিপে মেরে ফেলব আমি!'
   উত্তেজিত হবেন না হুজুর, ভিখারী ছেলেটি খানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল। তাড়াহুড়ো করলে কোন কাজই ভালভাবে শেষ করা যায় না। তার থেকে আমার আষাঢ়ে গল্প শুনে মোহরের থলিটা দিয়ে দিতে হুকুম দেন যদি তো ভালই হবে।’
   প্রচণ্ড রাগে থান বালিশে হেলান দিয়ে বসে হিসহিস করে বলল: 
   ‘বল তাহলে । শুনছি আমি। ' 
   আরম্ভ করল ছেলেটি: ‘আমার জন্মাবার বছর সাতেক আগে আমি আমার বারো নম্বর নাতির ঘোড়ার পাল চরাতাম।
   'একদিন গভীর রাতে ঘোড়ার পালকে জল খাওয়াতে নিয়ে গেলাম আমি। সূর্যের রোদে উজ্জ্বল চারদিক, আর এত গরম যে পাখির ডানা থেকে ধোঁয়া উঠছিল আর তাদের লেজগুলো জ্বলছিল। তাই যখন আমি দেখলাম যে হ্রদের জল একেধারে নীচে পর্যন্ত জমে গেছে তখন একটুও আশ্চর্য হলাম না ।
   'কুড়ল দিয়ে বরফটা ভাঙব ভাবলাম। কিন্তু প্রথমবার আঘাত করতেই কুড়লটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল, বরফ কিন্তু একচুলও নড়ল না ! কি করি এখন, ভাবলাম আমি ! হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল!
   কাঁধ থেকে মাথাটা খুলে নিয়ে ঘাড়টা শক্ত করে ধরে কপাল দিয়ে ঠুকতে লাগলাম বরফের উপর । কিছুক্ষণ পরে একটা গর্ত খুঁড়তে পারলাম শেষ পর্যন্ত । আর এমন বড় যে কড়ে আঙুলটা ভালভাবেই ঢুকে যায় সেখানে । সে গর্তটা থেকেই তো আমার পালের হাজারটা ঘোড়া প্রাণভরে জল খেল ।
   ‘জল খেয়ে ঘোড়ারা বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে লাগল, ঘাস ছিড়তে লাগল। আর আমি ঘোড়ার পালের দিকে পিছন ফিরে বসে ঘোড়াগুলোকে গুণতে লাগলাম সব ক’টা অক্ষত আছে কিনা! দেখি–একটা ঘোড়া কম পড়ছে, কোথায় গেল সেটা?
   'ঘোড়া ধরবার জন্য ফাঁস লাগান লাঠিটা বালির মধ্যে গুজে দিয়ে তার ওপরে উঠে চারদিক দেখতে লাগলাম ঘোড়াটাকে দেখা যায় কিনা।
    ‘না, কিছুই দেখা যাচ্ছে না।’
    ‘লাঠিটার আগায় ছুরি গুঁজে দিয়ে আরো উপরে উঠলাম, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম ন!’
   ‘এমন সময় মনে পড়ল ছোটবেলা থেকেই আমার ছুঁচ চিবানোর স্বভাব । দাঁতের ফাঁক থেকে একটা ছুঁচ বার করে ছুরির হাতলে ফুটিয়ে দিলাম—যা হয় হবে, আরো উপরে উঠলাম ।
   ‘কষ্টে উপরে উঠেছি একদিন কি একমাস ধরে, কিন্তু যেই ছুঁচের গর্তের মধা দিয়ে তাকলাম অমনি হারিয়ে যাওয়া ঘোড়াটাকে দেখতে পেলাম। ভয়ঙ্কর সমুদ্রের মাঝে একটা পাহাড় মাথা তুলেছে, কাঁটার মত ছুঁচাল তার চূড়াটা, সেই পাহাড়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার ঘোড়াটা আর তার বাচ্চাটা পাহাড়ের চারদিকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে।
   ‘বেশীক্ষণ চিন্তাভাবনা না করে লাঠিটার ওপর চড়ে বসলাম, আর ছুরিটাকে দাঁড় করে বাইতে লাগলাম। এইভাবে চললাম সমুদ্র দিয়ে। চলছি তো চলছিই কিন্তু জায়গা ছেড়ে একটুও নড়তে পারছি না। তখন আমি ছুরির ধারাল অংশটার ওপর বসলাম আর লাঠিটা দিয়ে সমুদ্রের তলে চাপ দিয়ে সেই ধাক্কায় এগিয়ে চললাম, পর মূহুর্তেই পৌছে গেলাম সেই পাহাড়টার কাছে। লাঠিটা ওদিকে লোহার মত ডুবে গেল সমুদ্রে।
   'লাঠিটা ছাড়া ঘোড়াটাকে ধরব কি করে? বালি পাক দিয়ে দিয়ে একটা ফাঁসদড়ি তৈরী করলাম, সেটাকে ঘোড়ার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে পেছন দিকে মুখ করে ঘোড়ায় উঠে বসলাম, নিজের সামনে ঘোড়ার বাচ্চাটাকে শুইয়ে দিয়ে ফিরে চললাম সমুদ্র বেয়ে ।
   ‘অর্ধেক পথ পেরিয়ে আসার পরে ঘোড়াটা হঠাৎ ঢেউয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে ডুবে যেতে লাগল ।
   ‘ভাবলাম, ওহ সেই প্রবাদবাক্যটাই সত্যি হতে চলেছে ‘যদি অভাগার নিমন্ত্রণ হয় ভোজে তো সেই দিনই সে অসুখে পড়ে। আমি কিন্তু দিশা না হারিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম বাচ্চা ঘোড়াটার পিঠে আর বড় ঘোড়াটাকে টেনে তুলে নিয়ে ঘোড়া ছোটালাম । 
   ‘তীরে পৌছে ঘোড়াটাকে সবে একটা গাছে বেঁধেছি, হঠাৎ গাছের ডাল থেকে আমার পায়ের কাছে লাফিয়ে পড়ল একটা খরগোস । খরগোসটার পেছনে তাড়া করলাম আমি। খরগোসটা বা দিকে দৌড়ল আর আমি দৌড়লাম ডান দিকে,
   ‘ছুটতে ছুটতেই তীর নিয়ে ছুঁড়তে থাকি, তীরের ধারাল ফলাটা গিয়ে লাগল খরগোসের নাকে, কিন্তু ফসকে পড়ে গিয়ে তীরটা আবার ফিরে এল আমার হাতে ।
   ‘তখন আমি তীরের ভোঁতা দিকটা সামনের দিক করে ছুঁড়লাম। একদিন বাদে তীরটা খরগোসটার কাছে পৌছে তাকে একটা পাথরে বিঁধে ফেলল ।
   ‘খরগোসটার ছাল ছাড়িয়ে, তার চর্বিটা জড়ো করতে লাগলাম আর ঘুঁটে কুড়াতে লাগলাম জামার কেঁচড়ে, আগুন জ্বালাব বলে।
   ‘এমন সময়-- অারে ও কি? আমার ঘোড়াটা হঠাৎ চিঁহি করে ড়েকে উঠে ছটফট করতে লাগল আর ঘড়ঘড় করে আওয়াজ বেরোতে লাগল তার মুখ দিয়ে, উপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ ঘোড়াটা ।
   প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি, তারপর বুঝলাম ঘোড়াটাকে আমি গাছের সঙ্গে বাঁধিনি, বেঁধেছি রাজহাঁসের গলায়।
   "ঘুঁটেগুলো মাটিতে ফেলে দিয়ে প্রাণপন দৌড় দিলাম বেচারী ঘোড়াটাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য । ঘুঁটেগুলো ওদিকে হিসহিস করতে করতে ডানা বাঁকিয়ে একেবারে মেঘের ওপরে উড়ে চলে গেল। বুঝলাম, কোঁচড় ভরে আমি তুলেছিলাম বটের আর ভারুই পাখি!
   আগুন জ্বালাবার মত কোন জ্বালানি না থাকলেও শেষ পর্যন্ত আগুন জ্বালালাম আমি। একটা নতুন আমার কড়াইতে খরগোসের চর্বিটা রেখে আগুনে বসালাম আমি । দেখি—নতুন কড়াইটা থেকে চর্বি পড়ে যাচ্ছে, কড়াইটার গা ভেদ করে এমনভাবে চর্বি পড়ছে যে শীগগিরি আর কিছুই থাকবে না ওটাতে । বাধ্য হয়ে ফুটো কড়াইটাতেই চর্বিটা ঢাললাম। তখন অবশ্যই চর্বি আর এক ফোটাও পড়ল না। মনে আছে আমার দশটা গরুর মশক ভরে নিয়েছিলাম সেই গলান চর্বিতে ।
   ভাবলাম চৰ্বি ঘষে আমার জুতোগুলো চকচকে করে নেব। কিন্তু একটা জুতোতে মাথাতেই সব চর্বি শেষ হয়ে গেল, অন্যটার জন্য আর রইল না।
   ‘রাতের বেলায় কড়াইয়ের নিচে বসে তন্দ্রায় ঢলে পড়লাম । আধ-ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ শুনি হৈ-চৈ! ঝগড়াঝাঁটি। ভয়ে লাফিয়ে উঠে দেখি আমার দুই জুতো মারপিট বাঁধিয়ে দিয়েছে। চর্বি-না-মাখানাঁ জুতোটা অন্যটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্দয়ভাবে মারছে আর বলছে :
   লোভী, আর কখনও লোভ করবি? আমার জন্যে একটুখানি চর্বিও রেখে দিতে পারলি না?”
   ‘ওদের ঝগড়া থামাতে লাগলাম আমি:
   'ছেড়ে দে ওকে, হিংসুটে। একেবারে ক্ষেপে উঠেছে! কথায় বলে: দুজন বুদ্ধিমান লোকের দেখা হলে—দু'জনেরই লাভ হয়, আর দু'জন বোকার দেখা হলে-চোখ কানা হয় তাদের।"
   ‘কষ্টে তাদের শান্ত করলাম। জুতোগুলোকে পাশে রাখলাম—একটাকে বাঁপাশে, অন্যটাকে ডানপাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।
   সকালে ঘুম ভেঙে দেখি চৰ্বি-না-মাখানো জুতোটা নেই, কথা শুনল না, রাগ করে চলে গেছে। অন্য জুতোটা দু'পায়ে পরে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া জুতোটাকে খুঁজতে বেরোলাম ।
   দিন যায়, বছর যায়—খুঁজেই বেড়াই অন্য জুতোটাকে । খুঁজতে খুঁজতে একটা প্রামে এসে পৌছলাম । গাদা গাদা লোক এসে জমায়েত হয়েছে সে গ্রামে ; আরো আসছে; কেউ ষাঁড়ের পিঠে, কেউ গুবরে পোকায় চড়ে, কেউ বা সজারুর পিঠে, কেউ ঢোঁড়া সাপে, কেউ পাহাড়ী ছাগল, কেউ বা সারসে চেপে ।
   'ভোজউৎসব আরম্ভ হচ্ছে ।"
   ‘কিসের ভোজউৎসব?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি ।
   ‘উৎসব নয়, শোকপালন হচ্ছে ।’
   ‘কার জন্য?’
   জমিদারের ছেলের । বছর সাতেক আগে সে ছাগলের পাল নিয়ে চরাতে গিয়ে আর ফিরে আসে নি, কেউ তার খবর কিছু জানে না।
   এমন সময় ভূত্যেরা থালায় করে মাংস নিয়ে আসতে লাগল। সেই ভৃত্যদের মধ্যে-– আরে এযে দেখি আমার পালিয়ে যাওয়া জুতোটা ।
   আনন্দে চীৎকার করে উঠলাম । আমার গলা শুনে ফিরে তাকাল সে, এমন হকচকিয়ে গেল যে আর একটু হলে থালাটা পড়ে যেত হাত থেকে ।
   ‘পালিয়ে যাওয়ার জন্য তার কপালে মার জুটবে এই ভয়ে সে আমার সামনে একটার পর একটা থালা সাজিয়ে দিতে লাগল আর বলতে লাগল :
   ‘তুমি আমাকে খরগোসের চর্বি দিতে পারলে না একটুও, আমার কিন্তু তোমাকে সবকিছু দিয়ে দিতেও একটুও কষ্ট হবে না।’
   গাদা পাদা খাবার এনে রাখতে লাগল সামনে।
   ‘খুশী হলাম খুব- নিজের জন্য আর সব আত্মীয়স্বজনের জন্যে এমন করে পেটভরে খেতে আর কবে পাব! দু'হাত ভরে মাংস নিয়ে বিরাট একটা হাঁ করতে যাব এমন সময় মনে পড়ল, আরে আমার মুখ কেন গোটা মাথাটাই তো নেই-মাথাটাকে ভুলে ফেলে এসেছি হ্রদে জমা বরফের মধ্যে গর্তটার কাছে...
   জুতোগুলোকে বললাম ; ‘লক্ষী সোনা, যাও ছুটে গিয়ে আমার মাথাটা নিয়ে এসো, না বলে না... তোমাদের এ উপকার আমি মনে রাখব।’
   ‘জুতোগুলো চলে গেল আমার মাথা আনতে আর আমি বসে বসে অপেক্ষা করছি। আমি বসে আছি এদিকে অন্যদের মুখের বিরাম নেই। সব মাংস থালাবটিসুদ্ধ খেয়ে নিল তারা, এককণাও পড়ে রইল না আমার জন্য । যার ভাগ্য খারাপ বিষ্টিহীন দিনেও সে ভিজে গোবর হয়ে যাবে
   মাথাটা ঠিকঠাক করে নেওয়ামাত্রই হঠাৎ আকাশে মেঘ ভিড় করে এল আর খরমুজ পড়া আরম্ভ হল আকাশ থেকে । একটা খরমুজ কাটব ভাবলাম, বিঁধিয়েও দিলাম ছুরিটা, কিন্তু ছুরিটা খরমুজের মধ্যে পড়ে গেল কিছু বোঝার আগেই।
   ‘ছুরিটা খুঁজে বার করবই, তার জন্যে যদি নিজের পেটের মধ্যেও ঢুকতে হয় সেও ভি আচ্ছা’, বললাম আমি ।
   ‘কোমরবন্ধনীটা খুলে নিয়ে তার প্রান্তটা ধরে মাথা নীচুদিকে করে ঝাঁপ দিলাম খরমুজের মধ্যে ।
   'খুঁজতে খুঁজতে বেশ কয়েকদিন কাটল, জুতো, কোট সবকিছুই ছিড়ে খুঁড়ে গেল, ছুরিটা কিন্তু আর খুঁজে পাই না কিছুতেই ‘
   'হঠাৎ একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম একদিন । 
  ‘কি করছিস এখানে?' জিজ্ঞেস করল লোকটি । 
   ‘ছুরি খুঁজছি।’ 
   ‘পাঁঠা তুই একটা, গাছপাঁঠা! চীৎকার করে উঠল লোকটা। 'মাথায় কিসু নেই! ছুরি খুঁজছে। এখানে সাতবছর ধরে আমি খুঁজছি আমার ছাগলের পাল, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না, আর...’
    সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম এ হল সেই জমিদারের ছেলে যার শোকপালন হতে দেখেছি আমি ।
   ‘শুধু শুধু ঝগড়া বাধাচ্ছ কেন? ছাগল খোজা ছেড়ে শোকার্ত বাবামার কাছে ফিরে গেলেই তো পার ।’ বললাম আমি।
   ‘ছাগলের ছেয়ে আমার বাবা মা বেশী হল তোর কাছে!’ বলে সে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুঠি করে ধরল আমার দাঁড়ি।
   আমাদের ধস্তাধস্তিতে খরমুজটা নড়ে উঠল তারপর গড়িয়ে চলল মাটির ওপর দিয়ে । গড়াতে গড়াতে গিয়ে উঠল এক উঁচু পাহাড়ের ওপর, পাহাড়টার একেবারে চূড়োয় উঠে ফেটে দু’টুকরো হয়ে গেল খরমুজটা ।
   জমিদারের ছেলে পাহাড় থেকে কোথায় গিয়ে পড়ল দেখতে পেলাম না । আমি দুম করে গিয়ে পড়লাম সেই হ্রদের কাছে যেখানে আমার ঘোড়ার পাল রেখে গিয়েছিলাম। এমন জোরে পড়লাম যে মাটিটা বসে গেল খানিক! আমার কিন্তু একটুও লাগল মা । হঠাৎ ভীষণ তেষ্টা পেয়ে গেল ! বোধহয় খাওয়ানদাওয়ানের ঐ চর্বিওলা মাংসটার জন্য, যেটা শেষ পর্যন্ত আমার আর খাওয়া হয়ে ওঠে নি ।
   ‘বরফজমা হ্রদের গর্তের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে জল খেতে লাগলাম। গোটা হ্রদের জলই খেয়ে ফেললাম কিন্তু তেষ্টা মিটল না। উঠবার চেষ্টা করি কিছুতেই পারি না । প্রথমটায় বুঝতে পারলাম না কি ব্যাপার, আসলে ব্যাপারটা খুবই সহজ— যখন আমি জল খাচ্ছিলাম তখন আমার গোঁফে এসে আটকে গেছে ষাটটা বুনে হাঁস আর সত্তরটা পাতিহাস ।
   ‘এতগুলো পাখি নিয়ে আমার কি হবে? ভাবলাম আমি । 
   ‘সব পাখি গুলোকে জামার নীচে রেখে দিলাম, পরে সেগুলোকে পরিণত করলাম একটা সারসপাখিতে । আর হুজুর, ঐ সারসটা উটের থেকে অনেক লম্বা হলেও ঘাড় একটুও না মুইয়ে কুয়োর জল পান করে......’
   ‘ঐ কুয়োটা তাহলে একেবারেই অগভীর!’ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল খান। গল্পের একেবারে শেষেও অন্তত ছেলেটির বলায় বাধা দেবার চেষ্টা করতে লাগল সে।’
   ‘হতে পারে কুয়োটা অগভীর, কিন্তু ভোরবেলায় তার ভেতরে একটা পাথর ছুড়ে ফেললে পাথরটা জলে গিয়ে পড়ে কেবলমাত্র রাত্রিবেলায় । একটুও না ভেবে উত্তর দিলল ছেলেটি ।
   ‘তার মানে সে সময়ে দিন ছোট ছিল!’ লাফিয়ে উঠে বলল খান। 
   ‘হ্যাঁ, দিনগুলোকে ছোটই বলতে হবে যদি ভেড়ার পাল স্তেপের এক প্রান্ত থেকে অার এক প্রান্তে পৌছে যায় এমন এক দিনের মধ্যেই, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর তৈরি ছেলেটির ।
   খানের মুখচোখের চেহারা বদলে গেল, ঠোঁট কামড়াল সে । আর ভিখারী ছেলেটা এই বলে শেষ করল, আপনার ইচ্ছামত আপনাকে চল্লিশটা গাঞ্জাখুরি গল্প শোনালাম, হুজুর। এবার আমার পরিশ্রমিক দিয়ে দিন আপনার প্রতিশ্রুতিমত । আরো অর্থব্যয় করতে যদি কষ্ট না হয় আপনার, আরো চল্লিশটা গাঁজাখুরি গল্প বলতে পারি এখুনি ।
   কথার থেকেই তো কথার উৎপত্তি যেমন ভালকাজের থেকেই আরো ভাল কাজের উদ্ভব।’
   রাগে কাঁপতে কাঁপতে থান মাথা নাড়িয়ে উজীরদের ইঙ্গিত করল, উজীরারা বস্তায় মোহর ভরতে লাগল । বস্তাটা যত ফুলে উঠতে লাগল, লোভে থানের মন ততই জ্বলতে লাগল ;
   বস্তাটা প্রায় ভর্তি হয়ে এসেছে এমন সময় ভিখারী ছেলেট নোংরা হাত তুলে বললঃ
   ‘হুজুর, আমার মোহর চাই না! তুমিই রাখ সে মোহর । তার বদলে তুমি আমার একটা অনুরোধ রাখ, তোমার কারাগারে বন্দী হয়ে যারা কষ্ট পাচ্ছে তাদের মুক্তি দাও।’
   এই কথা শুনে পাগলের মত চীৎকার করে উঠে খান ঝাঁপিয়ে পড়ল মোহরের বস্তাটার ওপর ঠিক যেমন শকুনি ঝাঁপিয়ে পড়ে মরা জন্তুর মৃতদেহের ওপর । সারা শরীর দিয়ে চাপা দিয়ে ফেলল বস্তাটাকে ।
   উজীররা বুঝল খান কোনটা চান । চাবি ঝনাৎ ঝনৎ করতে করতে তারা কারাগারের দরজাগুলি খুলে দিতে লাপল।
   সব কারাকক্ষই শূন্য হয়ে গেল, চল্লিশটা গাঁজাখুরি গল্প বলা সেই গরীব ছেলেটাও কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল ।
   এদিকে খানকে কিন্তু নড়ান গেল না সেই বস্তাটার ওপর থেকে । তিন দিন বাদে সেই অবস্থায়ই খান মারা গেল ।

এই গল্পটির ইপাব বই আছে

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য