মাইথর -- হালিমা খাতুন

    সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি পাঁচিলের ধারে একটা বেড়াল বসে আছে। ভাবলাম বেড়ালটা কাদের। ‘ইয়েতি' নয়তো। ইয়েতি পাশের বাড়ীতে থাকে। বেশ আরামেই থাকে। কারণ, ওর বাবার ঐ একটা বেড়াল ছাড়া আর কিছু নেই। অনেক কাল আগে নাকি তার একটা কুকুর ছিল। সেটা হারিয়ে যাবার পর তিনি নাকি আর কুকুর পোষেননি। একটা নাকি ময়না পাখি পুষেছিলেন, সে উড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ইয়েতিকে আনার অনেকদিন আগে।
    থাকগে, সে সব কথা। তবে আমি ভাবলাম ইয়েতি যদি হয়, ওকে ডেকে ঘরে পাঠিয়ে দিই। আমি ডাকলে বোধ হয় ও আসবে। কারণ ও আমাকে চেনে। যুদ্ধের সময় ওর বাবা যখন অন্যখানে চলে যান, ও আমাদের কাছে থাকতো। ডাক দিলাম—ইয়েতি—ইয়েতি ।
    ডাক শুনেও নড়েনা দেখে কাছে গেলাম। ওমা, দেখি কি বেড়াল না। খানিকটা সাদা কাগজ আর অন্ধকার। ভাবলাম বেশ মজাতো! আমি এখন পড়ার টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজ নিলাম আর আলমারী পিছন থেকে কিছুটা অন্ধকার—এদিয়ে বেড়াল হবে কিনা ভাবতে ভাবতেই একটা সুন্দর বেড়ালছানা হয়ে, মিউ মিউ করে ডাকতে লাগল।
    বিড়াল ছানাটার একটা নাম রাখা দরকার। ভেবে মনে মনে নাম খুঁজতে লাগলাম। বেড়ালদের নামের খুব অভাব। সবখানে ‘মিনি নয়ত পুষি'। এ সব নাম আমার ভাল লাগেনা। অনেকে কুকুরের নাম রাখে টাইগার'। বিড়াল যদিও বাঘের মাসী। তাকে কেউ কখনও টাইগার নামে ডাকেনা। অন্য কি নাম রাখা যায়। ফুল বা পাখির নাম বিড়ালকে মানাবেনা। তা হলে কি ওকে হিপো’ বলে ডাকবো। না ‘গণ্ডার’ ! শেষ পর্যন্ত মাইথর বলে ডাকব ঠিক করলাম। নামটা ওর পছন্দ হল কিনা দেখবার জন্য ডেফে বললামঃ মাইথর, মাইথর, নাম পছন্দ হয়েছে ?
    মিউ মিউ করে সাড়া দিল মাইথর। কিন্তু তাকিয়ে দেখি বিড়াল নয়, সামনে একটা খরগোস দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। লাল চোখ দুটাে পানিতে চিক চিক করছে। ভাবলাম মাইথরকে দেখে ভয় পেয়েছে খরগোসটা। আর ওটা বোধ হয় নীলিমদের। কারণ ‘পিটার র‌্যাবিট’ এর গল্প পড়ার পর থেকেই নীলিম আর মিতি খরগোস কিনে দেবার বায়না ধরেছিল। আমার যদিও খরগোসের গল্প ভাল লাগে, সত্যি খরগোস ভাল লাগেনা। কারণ ওরা সব গাছ খেয়ে ফেলে আর ঘরে বন্ধ করে রাখলে ঘর নোংরা করে।
    এসব ভাবছি, এমন সময় খরগোসটা বললঃ আপনি আমাকে ‘মাইথর’ বলে ডাকছেন কেন? আমার নামতো ‘পিটার’।
    পিটার, তা বেশ। তুমি কি ‘পামকিন ইটার’ না ‘ইলেকট্রিক গীটার’?
    ওসব আমি কিছুই না। আমি শুধু এক খরগোস।
    তুমি যদি খরগোস হও, আমার বেড়াল কোথায় গেল ?
    বেড়াল তো ছিলনা। তা যাবে কোথায় ?
    বেড়াল না থাকলে, মিউ মিউ করে ডাকল যে! 
    মিউ মিউ করে যে কেউ ডাকতে পারে। আপনিও পারেন।
    তার মানে তুমি কি বলতে চাও, আমি একটা বেড়াল?
    কখনও না। আর তা হলে আমি এখানে থাকতেই পারতাম না। ওরা যা হিংসুটে । খরগোস দেখলেই ওরা কামড়াতে আসে।
    বেড়ালদের সম্পর্কে তোমার ধারণাটা খুব খারাপ।
    তা হতে পারে।
    বেশতো কথা শিখেছ। তা তোমাকে নিয়ে আমি কি করব?
    কিছু করতে হবেনা। দরজাটা খুলে দেন, আমি চলে যাই।
    তা না হয় দিলাম, কিন্তু আমার বেড়াল?
    ঐ আসছে। বলতে বলতে খরগোস উধাও হল খোলা দরজা দিয়ে। 
    একটু পরেই একটা সিগারেটের প্যাকেট চিবোতে চিবোতে ঘরে ঢুকলো কালো-সাদায় মেশানো হাওয়াই সার্ট গায়ে এক ছাগল। ভাল করে শিং গজায়নি ছাগলটার। দেখতে বেশ হরিণ হরিণ চেহারা। ছাগলদের আমি বেশ পছন্দ করি। ছোটবেলায় আমার একটা আদুরে ছাগলছানা ছিল। ওর মার অসুখের সময় আমি ওকে শিশিতে করে দুধ খাওয়াতাম। তারপর থেকে ও আমার কাছে কাছে ঘুরতো।
    আমি ওকে অনেক খেলা শিখিয়েছিলাম। এমনকি মুখ দিয়ে পেন্সিল ধরে ও শ্লেটে দাগ দিতে শিখেছিল। আর একটু বড় হলে ওকে আমার অংক শেখাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি, আমাকেই অংক আর ইংরেজী শেখাবার জন্য শহরে চালান করে দেওয়া হয়েছিল। অংকের শিংয়ের গুতো খেতে খেতে আমি আমার ছাগল ছানার কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
    ছাগলটা দেখি আমার কাছে ঘেঁসে এসে দাঁড়াল। তারপর সালাম করে বলল
    আমাকে চিনতে পারছেন?
    চেনা চেনা ঠেকছে। ভাল করে চিনতে পারছিনা। নামটা বলতো?
    আমার নাম লম্বকর্ণ। পরশুরাম আমাকে মানুষ করেছেন। ছোটবেলায় আমার মা মারা যায়। আমাকে শিশিতে করে দুধ খাওয়াতেন পরশুরাম।
     সে তো আমি।
    আমি ওতো তাই বলছি।
    তা আমার নাম তো পরশুরাম নয়!
    তাহলে আপনার নাম কালশ্যাম।
    তুমি যে কি বলছ তার মাথা মুণ্ডু নেই। আমি ওসব হতে যাব কেন ? আমি তো আমি।
    আমিও তাই বলছি। আপনি আপনিই। আর আমার ছোট বেলার মনিব।
    তা বেশ। এখন থেকে তোমার নাম মাইথর। তোমাকে দিয়ে আমি একটা চিড়িয়াখানা শুরু করব।
    আমার ইচ্ছে ছিল সার্কাসের দলে যাওয়ার। তা আপনি যখন বলেছেন,আমি চিড়িয়াখানায় চাকরী করতে পারি। তবে বাঘ, ভালুক-টালুক আনবেন না। ওরা মানে ওদের আমার বড় ভয় করে। যত পড়ালেখা শিখুকনা কেন ওরা পশুই থেকে যায়।
    লেখাপড়া তুমিও বেশ শিখেছ দেখছি। তা ঐ সিগারেটের প্যাকেট খাওয়া তোমার ছাড়তে হবে ।
    তা আমি ছেড়ে দিতে পারি। ওটা ছেড়ে পান ধরব।
    না, তা চলবেনা।
    তাহলে চীনাবাদাম খাবো।
    সে মাঝে মাঝে খাবে বৈকি।
    না রোজ আমার পাঁচ সের করে খোসা ছাড়ানো চীনাবাদাম লাগবে।
    নিজে পাইনা চীনাবাদাম খেতে আর তোমাকে পাঁচ সের করে চীনাবাদাম আমি কোথা থেকে দেব ?
    তা হলে আমি চললাম।
    কোথায় চললে ?
    পিকিং।
    সে কোথায় ?
    চীন দেশে ।
    কেন যাবে সেখানে ?
    চীনা বাদাম খেতে ।
    যেতে চাইলেই যাওয়া যাবে? পাসপোর্ট লাগবেনা ?
    লাগবে। দোকান থেকে একটা কিনে নেব।
    দোকান থেকে নেবে ? জিনিষটা কি জানো তুমি ?
    নিশ্চয়ই জানি। ফটো লাগানো থাকে। আমি আগে ফটোর দোকানে কাজ করেছি। অনেক ফটো তুলেছি তখন। আর নেগেটিভ যা খেয়েছি তখন। খুব মজা লাগে। চিবোতে ঘুম এসে যায়। আর ঘুমোলেই নেগেটিভগুলো সব ছবি হয়ে যায়।
    তা হোক। তুমি যেওনা।
    আমার যে টিকিট কাটা হয়ে গেছে।
    কাটা টিকিট দিয়ে কেমন করে যাবে ?
    যেমন করে হোক যাবই। এ দেশে থেকে কি লাভ ! ঐ যে তোমার মাইথর আসছে, দেখ সামনে তাকিয়ে।
    সত্যিই সামনে তাকিয়ে দেখি মাইথর মিটিমিটি হাসছে। কাঁধে তার একটা ক্যামেরা, বললামঃ কোথায় গিছিলি ?
    কোথাও না।
    মানে ?
    এখানেই ছিলাম।
    তাহলে পিটার র‌্যাবিট লম্বকর্ণ ওসব কে ?
    আমার তোলা ছবি।
    তোর তোলা ছবি। আর তুই কে ?
    আমি কে তাতো জানিনা।
    তা হলে তুই ব্লাকশিপ। মানে কালো ভেড়া। ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ। বেড়াল, কুকুর, ছাগল কাউকে আমার দরকার নেই। তোর গায়ে উল হবে। সেই উল দিয়ে আমি কম্বল আর সোয়েটার বানিয়ে বিক্রী করব। তারপর বড়লোক হবো।
    তুমি তো বড়লোক। তুমি তো আমার চেয়ে অনেক বড়।
    বড়লোক কি, তা তুই জানিস ?
    খুব জানি। বড়লোকরা খালি রোগা হতে চায়, কিন্তু হয়ে যায় মোটা গোলগাল ফুটবল। ওদের পেটের মধ্যেই কাপড় চোপড় রাখা যায়।
    তুই বড় বেশী কথা বলছিস ।
    তাহলে তুমি বল বেশী কথা। আমি শুনি।
    এই কথা বলে মাইথর একটা গাধা হয়ে গেল। ছবিতে ছাড়া আমি আর কোথাও গাধা দেখিনি। লোকে ওদের কেন বড় বোকা বলে, তাও জানিনা। ওরা ত শুনেছি সারাক্ষণ বোঝা বয়ে বেড়ায়। বোকামী কখন করে জানিনা। যাকগে সত্যি একটা গাধা যখন পাওয়া গেল, ওকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নেওয়া যাবে। ওকে আমি রমনা পার্কে নিয়ে যাব রোজ বিকেলে। ওর পিঠে চড়বার জন্য একটা টিকিট ছাপিয়ে নেব, চান আনা করে। ঢাকায় কেউতো গাধা দেখেনি। কাজেই সবাই গাধায় চড়তে চাইবে। তখন আমার অনেক টাকা হবে। অনেক টাকা হলে আমি একটা সার্কাস কোম্পানী খুলব। তা নাহলে একটা ছোট ন্যাশনাল পার্ক বানাবো।
    গাধারা কি খায়, দাড়িয়ে ঘুমায় না শুয়ে ঘুমায়। এসব কিছুই আমি জানিনা। কিন্তু এসব তো ওকে বলা যায় না ।
   একদিন বাজারের থলের মধ্যে আমি একটা জ্যান্ত কাঁকড়া পেযেছিলাম। সেটাকে আমি হাত ধোয়ার বেসিনের মধ্যে পানিতে রেখেছিলাম । ভেবেছিলাম কাঁকডাকে পুষবো। তখন সমস্যা হয়েছিল কাঁকডার খাবাব নিযে ! কাঁকডা কি খায় তা আমি জানতাম না। অভিধানে দেখে ও কিছু পেলাম না। বিশ্বকোয খুঁজতে খুঁজতে এক দিন লেগে গেল। কাঁকড়াটা শেষকালে মরেই গেল ।
    কয়েকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তারা হেসেছিল। পরে জেনেছি, কাকড়া মাটি খায়।
    এখন গাধাকে নিযে কি করা যায়, সেটাই ভাবছিলাম। আমাকে ভাবতে দেখে গাধা বলল—
    তা ভাবছেন কি ? আমি সব খাই । ভাত ডাল শাক-শজী সবই খাই । মিষ্টিও খাই । আখরোট, আঙ্গুর, পেস্তা, বাদাম, আপেল আম, লেবু, কমলা, আতা, বেল, ক্যবেল, ফুলকপি, বাতাবী .
    বাপবে বাপ, থামো থামো | তোমার লিষ্ট দেখি পাগল কবে দেবে। এখন বল তোমাকে রাখব কোথায়?
    কেন আপনার গ্যারাজা নেই ?
    আছে, তবে পানি পড়ে ।
    পানি আমি খেযে ফেলব ! সেজন্য ভাববেন না । শুধু আমার একটা ঘুমেব ব্যবস্থা করে দিতে হবে ।
    কি রকম ?
    গান না শুনলে আমার ঘুম আসে না। তাই পে'জ ঘুমাবার আগে আমাকে কিছু পপ গান
শোনাতে হবে।
    কে শোনাবে ?
    কেন আপনি ?
    আমি তোমাকে পপগান শোনাব ! জানো গানের জন্য আমাকে কত বাড়ীওয়ালা নোটিশ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে।
    তাহলে তো ভাল হবে । ওরকম গান শুনলেই আমার ঘুম এসে যায়।
    তোমার ঘুমতো আসবে ঠিকই, কিন্তু আমাকে যে বাসা ছেড়ে দিতে হবে।
    দেবেন।
    তা হলে আমি যাব কোথায় ?
    কেন আমার পিঠে বসে থাকবেন। তারপর যেখানে বাড়ী খালি পাওয়া যায়, আমি আপনাকে নিয়ে যাবো।
    তারপর তোমার ঘুম আর আমার গানের কি হবে ?
    হবে।
    কি হবে ?
    রেকর্ড হবে।
    রেকর্ড হবে ।
    হ্যা।
    কে করবে ?
    গ্রামোফোন কোম্পানী।
    তাহলে তো ভাল হবে।
    বেশ তাহলে উঠে পড়ুন।
    এখন?
    এখন |
    আমার যে অনেক হোম টাস্ক বাকী, কাল স্কুল।
    হোম টাস্ক করে কি হয় ! স্যার তো না দেখেই সই করে দেন।
    কে বলেছে তোমাকে ?
    আমার মা ।
    তোমার মা ?
    হ্যাঁ আমার মাকে স্যার বলেছেন, অত খাতা দেখার সময় হয়না তার।
    তাহলে কাজ দেন কেন ?
    দিতে হয়, তাই দেন।
    তুমি তো অনেক কিছু জানো।
    আরও নাচতে জানি। ছবি আঁকতে জানি। ভলিবল খেলতে পারি। ক্রিকেট, ব্যাডমিণ্টন সব পারি।
    আমি ও তো পারি। কিন্তু কারু তো খেলার সময় নেই। সবাই ব্যস্ত।
    আমিও !
    কিসের জন্য ব্যস্ত ?
    রেডিও প্রোগ্রাম। টিভি প্রোগ্রাম। এই সব।
    আমি ভেবেছিলাম অন্য কিছু। তা তোমার তো ওখানে চেনাশোনা আছে, যদি আমাকে সাথে করে নিয়ে একটু বলে দিতে তাহলে আমাকেও প্রোগ্রাম দিত ওরা। প্রোগ্রাম পেলে আমিও শিল্পী হয়ে যেতাম। তখন আর বাড়ীওয়ালারা আমাকে বের করে দিতনা বাড়ী থেকে। বরং সমীহ করে চলতো।
    তোমার তো বেশ বুদ্ধি দেখছি।
    বুদ্ধি তো ছিল, কেবল কাজে লাগাতে পারছিনা।
    লাগালেই হয়। দেখনা আমি কেমন দুটো কান লাগিয়ে নিয়েছি।
    তার মানে ?
    তার মানে আমি একটা ঘোড়া। এদেশে একটু লোকের চোখে পড়ার জন্য দুটো কান লাগিয়ে নিয়েছিলাম বুদ্ধি করে। ইচ্ছে করলে, কান দুটোকে আমি ঘোড়ার কানের মত ছোট করে ফেলতে পারি। চেহারাটাও ঘোড়ার মত করতে পারি।
    কর দেখি ।
    তা হলে এতটুকু জায়গায় হবেনা। বাইরে যেতে হবে।
    ‘চল’ বলে ওকে নিয়ে মাঠে গেলাম। 
   তাকিয়ে দেখি সাদা একটা ঘোড়া। এক কালে স্বাস্থ্য তার ভালই ছিল মনে হয়। এখন একেবারে হাড় জির জিরে পঙ্খীরাজ।
    তারপর বলল সে
    দেখছো তো আমার আসল চেহারা!
    তাই গাধা হয়ে থাকি। তা এখন আমার যেতে হবে।
    কোথায় ?
    একটা মিটিং আছে।
    মিটিংয়ে কি যাবে, থাকো এখানে !
    না গেলে হবেনা, আমি যে সভাপতি—
    এই বলে গাধা আবার গাধা হয়ে চলে গেল। তার গায়ে তখন লম্বা হাতাওয়ালা পাঞ্জাবী জামা আর পরনে ফুল প্যান্ট। চোখে তার ইংরেজী চশমা। আস্তে আস্তে সে মিলিয়ে গেল।
    সরে দাঁড়ান সরে দাঁড়ান’ ’সাবধান ‘সাবধান’ শব্দগুলো শুনে আমি তাড়াতাড়ি পাঁচিলের পা ঘেষে দাঁড়ালাম। ডোরাকাটা ছিটের জামা পরে ঢুকলো এক জেব্রা। একদম ছবির মত দেখতে। এত কাছে এতবড় জেব্রা কখনো দেখিনি। ভয় ভয় লাগলো একটু। কামড়ে দেয় অথবা লাথি কিংবা গুতো যদি দেয়। পাঁচিল বেয়ে উঠবো নাকি ।
    ভয় পাবেন না, আমি আপনাকে চিনি।
    কেমন করে ?
    ইংরেজী বইয়ে জেড এর জায়গায় আমার ছবি আছে। তার উপরে পাতলা কাগজ রেখে আপনি যখন আমাকে এঁকেছিলেন, তখন থেকে আমি আপনাকে চিনি। তারপর একবার দেখা হয়েছিল মীরপুর চিড়িয়াখানায়।
    তা বেশ এখন কোথা থেকে এলে ? কেমন করে এলে? আর যাবেই বা কোথায় ?
    এলাম অন্ধকার থেকে যাব আলোতে ।
     বেশ সুন্দর কথাতো। দাঁড়াও, আমার নোটবুকে লিখে নেব।
    আরো অনেক সুন্দর কথা আমি জানি। সে সব লিখতে গেলে আপনার খাতা ফুরিয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং মনের খাতায় লিখে নিন। সেখানে কাগজের অভাব নেই।
    আরে, এটাও তো একটা সুন্দর কথা !
    দেখেন না, আমার গায়ে আরো কত সুন্দর কথা লেখা আছে।
    তার মানে তুমি আমাকে পড়তে বলছে ?
    না পড়লে, জানবেন কেমন করে ? 
    টেলিভিশন দেখে জানৰ ।
    সেটা আবার কি জিনিস ?
   একটা বাক্স। যার গায়ের ছবিতে সব দেখা যায়।
    বুঝেছি। চকলেটের বাক্স। আমি দেখেছি চিড়িয়াখানায় অনেক বাচ্চারা চকলেটের বাক্স নিয়ে যেত। চকলেট ফুরিয়ে গেলে সেই বাক্সের মধ্যে তারা অনেক কিছু রাখে।
    কিছু বোঝনি তুমি। টেলিভিশন মোটেই চকলেটের বাক্স নয়। 
    বারে, আপনিই তো বল্লেন, যে বাক্সের গায়ে ছবি থাকে, তাকেই টেলিভিশন বলে। 
    বলেছি তাই। কিন্তু তুমি বুঝতে পারেনি। আসলে তোমরা বনে থাকো এসব শহুরে জিনিস দেখবে কোথেকে ?
    তা হোকগে। আপনি আমাকে বুঝিয়ে দেবেন না আর আমাকে বুনো বলছেন। 
    না, না, তুমি বুনো হবে কেন ? তুমি কত সুন্দর সুন্দর কথা বলো। আমি বরং তোমার গায়ের কথাগুলোর একটা ছবি তুলে নেই। দেখি মাইথর কোথায়, তার কাছে তো একটা ক্যামেরা ছিল।
    ‘মাইথর মাইথর বলে ডাক দিলাম। ‘ইয়েচ চার’ বলে মাইথর সামনে এসে দাঁড়ালে । বললামঃ লেখাপড়া কদ্দুর শিখেছ ?
     চার, বি এচ চি পাশ করেছি। 
    বেশ তোমার ক্যামেবাটা কোথায় ? 
    ক্যামেরাটা দিযে কি করবেন চার ? 
    জেব্রার গায়ের লেখাগুলোর ছবি তুলতে হবে। 
    ‘তুলা’ হয়ে গেছে, ওয়াস করতে দিয়েছি।
    ছবি আগেই কেন তুলেছ বলতো ? 
    আমি তো এম এচ চি পড়ব। তখন লাগবে যে । 
    বেশ কবেছ, তোমার বেশ বুদ্ধি আছে। এখন জেব্রার একটা থাকার ব্যবস্থা কর দেখি । 
    ব্যবস্থা তো হয়ে গেছে, ওকে তো ওয়াস করতে দেওয়া হয়েছে। 
    এই মাত্র যে এখানে ছিল। 
    ছিল। এখন নেই। 
    তা কেমন করে হয়। আমি তো মীরপুর পাঠিয়ে দেব ভেবেছি। ওর ঘরের সামনে আমার নাম লেখা থাকবে তা আর হোলনা ।
    মনটা খাবাপ হয়ে গেল । বললামঃ মাইথব, একটা গান কর। দেখলাম মাইথর কোথাও নেই। সামনে একটা সাদা কাগজ পড়ে আছে। ওদিকে নীলিম গান করছে ।
‘মানুষ বানাইয়া
    খেলছো যারে লইয়া 
সে মানুষ ও কেমনে গোনাগার।’ 

আমি যেন শুনতে পেলাম
‘বিড়াল ও বানাইয়া
খেলছো যারে লইয়া 
সে বিড়াল কেমনে অন্ধকার।’

এই গল্পটির ইপাব বই আছে

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য