বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১২তম উপাখ্যান

    পরদিন দ্বাদশ পুতুল বলল, মহারাজ, আমার নাম প্রজ্ঞাবতী। আমিও বিক্রমাদিত্যের একটি গল্প বলব।
সেকালে বিক্রমাদিত্য যখন রাজ্য শাসন করতেন, উজ্জয়িনী নগরে ভদ্রসেন নামে এক বণিক ছিলেন। তাঁর অগাধ ধনসম্পদ ছিল অথচ তিনি তার টাকা পয়সা ব্যয় করতেন না ! কালক্রমে ভদ্রসেন মারা গেলেন। পিতার মৃত্যুর পর পুত্র পুরন্দর বন্ধুদের নিয়ে ভোগ বিলাসে সমস্ত উড়িয়ে দিতে লাগল।
    ধনদ নামে তার এক প্রিয় বন্ধু ছিল। সে একদিন পুরন্দরকে ডেকে বললো, ওহে পুরন্দর, তুমি বণিকপুত্র হয়ে ক্ষত্রিয়পুত্রের মত অর্থব্যয় করছ। যে কোন উপায়ে ধনসম্পদ উপার্জনই বণিকপুত্রের কর্তব্য।
    কিন্তু ধনদের এই কথা পুরন্দর কানে তুললো না। ফলে সে কিছুদিনের মধ্যেই দেউলে হয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধুরা আর তার সঙ্গে মেলামেশা করে না, তাকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেয় । তখন পুরন্দর চিন্তা করল, যতদিন আমার হাতে অর্থ ছিল ততদিন বন্ধুরা আমায় খাতির করত। এখন আমার হাতে অর্থ নেই বলে তারা আর আমার সঙ্গে মেলামেশা করছে না।
    মনে মনে এই চিন্তা করে পুরন্দর দেশের বাইরে চলে গেল। ঘুরতে ঘুরতে একদিন হিমাচলের পাদদেশে একটি নগরে উপস্থিত হল। সেই নগরের পাশে একটি বাঁশবন ছিল। পুরন্দর গ্রামের এক গৃহস্থের বাড়ির চাতালে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝ রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে শুনল বাঁশবন থেকে একটি মেয়ে- আমাকে রক্ষা করুন। এক রাক্ষস আমায় প্রহার করছে---এই বলে আর্তনাদ করছে। পুরন্দর মাঝরাতে সেখানে একা যেতে সাহস করল না !
    গ্রামবাসীরা বলল, রোজরাত্রে ঐ বাঁশবন হতে এরকম আর্তনাদ শোনা যায়। কেউ ভয়ে রাত্রে ওখানে যায় না।
পুরন্দর তখন নিজ নগরে ফিরে এসে বিক্রমাদিত্যকে সব ঘটনা বললো। রাজা এই আশ্চর্য ঘটনা শুনে কৌতুহলী হয়ে পুরন্দরের সঙ্গে সেই নগরে গেলেন ।
    তারপর রাত্রে বাঁশবন থেকে আর্তনাদ উঠলে রাজা তরোয়াল নিয়ে সেই বাঁশবনের দিকে গেলেন, সেখানে গিয়ে দেখলেন এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস একটি অনাথা মেয়েকে প্রচণ্ডভাবে মারছে আর সেই মেয়েটি আর্তনাদ করছে।
    রাজা বিক্রমাদিত্য তখন চেঁচিয়ে বললেন, ও কি! এই অনাথা মেয়েটিকে মারছ কেন?
    রাক্ষস বললো, তা দিয়ে তোমার কি দরকার? যেখানে যাচ্ছিলে সেখানে যাও, নইলে তুমিও আমার হাতে নিহত হবে।
    তখন শুরু হল দু'জনের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা তাঁর তরোয়াল দিয়ে ঐ রাক্ষসটিকে বধ করলেন। সেই মেয়েটি রাজার পায়ে কেঁদে পড়ল, হে প্ৰভু, আপনি আমায় শাপমুক্ত করলেন। আমায় অসহ্য দুঃখ থেকে আজ উদ্ধার করলেন।
    রাজা বললেন, কে তুমি? মেয়েটি বললো, এই নগরে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। আমি তাঁর স্ত্রী। আমি আমার রূপের গর্ব করে তাঁকে অশেষ দুঃখ দিতাম। মারা যাবার সময় তিনি আমায় শাপ দিলেন যে তুই যেমন সারা জীবন আমায় দুঃখ দিয়েছিস বাঁশবনে তুই তেমনি দুঃখ পাবি। তোকে রোজ রাত্রে এক বিকটাকার রাক্ষস এসে প্রহার করবে। এইভাবে আমার স্বামী আমায় শাপ দিলেন। তখন আমি এই শাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য প্রার্থনা করলাম। তিনি বললেন, যদি কোন বীরপুরুষ এখানে এসে সেই রাক্ষসকে বধ করেন, তুই তখন তাঁর চরণতলে প্ৰণাম করলেই শাপমুক্ত হবি আর আমার সব ধন-সম্পত্তি তাঁকে দিবি। এই কথা বলে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়। অতএব এখন এই ধনপূর্ণ কলসটি আপনি গ্রহণ করুন।
    রাজা সেই ধনপূর্ণ কলসটি ও মেয়েটিকে পুরন্দর বণিকের হাতে দিয়ে নিজ নগরে ফিরে এলেন। পুরুন্দর সেই মেয়েটিকে বিবাহ করে সুখে দিন কাটাতে লাগল |
    পুতুল ভোজরাজকে বললো, মহারাজ, আপনার যদি এমন সাহস ও বীরত্ব থাকে তাহলে সিংহাসনে বসুন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য