বিক্রম-বেতালের গল্প: সাধুর কৌটো

এক সময় ধনবর্মা ও ধীরবর্মা নামে দুই রাজা পাশাপাশি রাজত্ব করছিল দুই দেশে। দুটো দেশের মাঝখানে একটা অরণ্য ছিল। সেই অরণ্যে জ্ঞানশেখর নামে এক সাধুর কুটির ছিল। সাধু অপস্যা করত। দু দেশেরই প্রজা ঐ সাধুর কাছে আসত। নিজেদের সমস্যার কথা বলত। শুনে সাধু যে পরামর্শ দিত সেই পরামর্শ অনুসারে ওরা কাজ করত।

সে বছর বর্ষা ভালোভাবে না হওয়ায় আকালের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। দুটো দেশেরই একই অবস্থা। একদিন ধনবর্মা ও ধীরবর্মা সাধুর কাছে পরামর্শ নিতে এল। ওদের বক্তব্য শুনে সাধু জ্ঞানশেখর বলল, “দেখ বাবা, তোমাদের দুজনকেই একটা করে কৌটো দিচ্ছি। যখনই তোমরা বিপদে পড়বে কৌটা খুলে দেখবে। তোমাদের সমস্যার সমাধান তোমরা তাতে খুঁজে পাবে। তবে একটু বুদ্ধি খাটাতে হবে। খুব ছোট সমস্যার সমাধান এতে খুঁজে পাবে না। এখন আমি কিছুকালের জন্য সমাধিস্থ হব।”

এইভাবে বলে সাধু দুই রাজাকে দুটো কৌটো দিয়ে দিল। রাজারা যে যার কৌটো নিয়ে নিজের নিজের দেশে ফিরে গেল।

ধনবর্মা আকালের সময় কি করা উচিৎ সে ব্যাপারে মন্ত্রী ও ব্যবসাদারদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন সমাধান যখন খুঁজে পেলেন না তখন ঐ কৌটো খুলল। তাতে যে মূল্যবান অপূর্ব বস্তু ছিল। সেই বস্তু বিদেশে বিক্রি করে বিদেশ থেকে ধান আনিয়ে সে দেশের খাদ্যভাব মেটাল।

কিন্তু ধীরবর্মা তা  করল না। অভাব বা আকালেল হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য সে কয়েকটা কাজ হাতে নিল। সেই কাজ করে ফল না পাওয়া গেলে তখণ কৌটো খুলে দেখা যাবে ভাবল।  প্রথমেই সে চেষ্টা করল যাতে দেশের ধান দেশের বাইরে কেউ নিয়ে না যায়। ব্যবসাদারদের কাছে যত ধান ছিল সব ধান রাজা নিয়ে নিল। নিয়ে প্রজাদের মধ্যে বন্টন করে দিল। ফলে সে বছর প্রজারা না খেতে পেয়ে মরে নি।

ধীরবর্মার চেযে সেবছর ধনবর্মা তার প্রজাদের অনেক ভালো খাইয়েছিল। তাই সে বগর্বে বলল, “আমার দেশের প্রজা এই বছর সবচেয়ে ভাল খেতে পেয়েছে। আশেপাশের কোন প্রজা এত খেতে পায় নি। কোন রাজা প্রজাদের এত ধান খেতে দেয়নি।

আগামী বছর আমি প্রজাদের আরও বেশী করে খাওয়াতে চাই আরও ভাল রাখতে চাই। মন্ত্রীগণ, বলুন, কিভাবে তা সম্ভব হবে।” মন্ত্রীরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “মহারাজ, গত বছরের মত আপনি সাধু  জ্ঞানশেখরের ঐ কৌটো খুলুন।”
ধনবর্মা মন্ত্রীদের পরামর্শে সেটা খুলে দেখতে পেল একটি কাগজ তাতে শুধু লেখা আছে “জাগো, দেখ।”

এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই এক  সাধু ধনবর্মার সঙ্গে দেখা করতে এসে তাকে বলল, “মহারাজ, আমার কাছে একটি যন্ত্র আছে। ঐ যন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভে কোথায় কত সম্পদ আছে  তা জানা যাবে। আমি এই যন্ত্র দিয়ে যেখানে দেখাব সেখানে খুঁড়ে খুঁড়ে আপনি আপনার দেশে অনেক সম্পদ মাটির তলা থেকে তুলতে পারবেন। তবে যত সম্পদ উঠবে তা বিক্রি করে যত পাবেন তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে।

রাজা তৎক্ষণঅৎ রাজী হয়ে গেল। তারপর ঐ সাধুর যন্ত্রের সাহায্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁড়া শুরু হয়ে গেল। মাটির তলা থেকে অনেক সোনা, রূপা, তামা, লোহা প্রভৃতি পাওয়া গেল। বিক্রি করে অর্ধেক দাম সাধুকে রাজা দিয়ে দিল।

দেখাদেখি ধীরবর্মার মন্ত্রীরা রাজবাকে উপদেশ দিল জ্ঞানশেখরের কাছে আনা কৌটোটা খুলতে। কারন ঐ কৌটো খুলে  পাশের দেশের রাজা ধনবর্মা নিজের দেশের উন্নতি করেছে।

কিছুদিন পরে যে সাধু যন্ত্র নিয়ে ধনবর্মার দেশে গিয়েছিল সেই সাধু ধীরবর্মার কাছেও গেল। ধনবর্মাকে যেভাবে যা বলেছিল ধীরবর্মাকেও তাই বলর। তার কথা শুনে ধীরবর্মা বলল, “দেখুন, আপনি যদি আপনার যন্ত্র বিক্রি করতে চান আমি সানন্দে আপনার যন্ত্র কিনে নিতে পারি। কিন্তু আপনাকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাটি খূঁড়ে দেশের সমস্ত বের করে ্রাপনাকে তার অর্ধেক দিতে রাজী নই।”

এই ধরনের যন্ত্র আমার কাছে ছাড়া পৃথিবীতে আর কারও কাছে নেই। তাই এটা আমি বিক্রি করতে চাই না। আমার স্বার্থে আপনি রাজী হলেন না; তবে মনে রাখুন, এই যন্ত্র ছাড়া মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বিভিন্ন জায়গায় সম্পদ বের করতে আপনার পঞ্চাশ বছর লেগে যাবে। আপনার দেশ পিছিয়ে যাবে।”

কিছুকাল পরে জ্ঞানশেখর সমাধি থেকে উঠে আশেপাশের কোন দেশের কি অবস্থা জানার জন্য বেরিয়ে পড়র। ধীরবর্মা জ্ঞানশেখরকে জানাল, “নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে যতটা পেরেছি সমস্যার সমাধান করেছি। আপনার কৌটো আমি এখনও খুলিনি।”

তারপর জ্ঞানশেখর গেল ধনবর্মার কাছে। সে বলল, “দেখুন, আমি আমার প্রজাদের কত ভালো রেখেছি। যখনই প্রয়োজন বোধ করেছি কৌটা খুলেছি।” জ্ঞানশেখর ধীরবর্মার কাছ থেকে কৌটোটা ফিরিয়ে নেয়নি। কিন্তু ধনবর্মার কাছ থেকে কৌটোটা ফিরিয়ে নিল।

বেতাল এই কাহিনী শুনিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, “রাজা, জ্ঞান শেখর এক রাজার কাছে থেকে কৌটোটা ফেরত নিল অন্য রাজার কাছে থেকে নিল না। এর কারণ কি? নিশ্চয় ধীরবর্মার প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছিল। ঐ কৌটোর ক্ষমতা কি শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার প্রশ্নের জবাব জানা স্বত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।”

বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, “জ্ঞানশেখর কৌটো ফেরত নিল ধনবর্মার কাছে থেকে। কারণ ধনবর্মা সাধুর দুটো কথায় রাখলেন না। তিনি পরপর দুবার ঐ কৌটোটি খুলেছিলেন। যে সমস্যা দেখা দিল তার সমাধান করার উপায় রাজা ভাবেন নি। কৌটো খুলে সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশী ধান কিনে অপচয় করেছিলেন।
দ্বিতীয় অপরাধ করেছিলেন মাটির তলার সমস্ত সম্পদ তুলে, শেষ করে, ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য মাটির তলায় কিছুই রাখলেন না। কিন্তু ধীরবর্মা ঐ কৌটো বা যন্ত্রের উপর নির্ভর করেননি। বুদ্ধি খাটিয়ে সমাধান করেছেন। তাই সাধু তা রেখে দিল।”

রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে গেল সেই গাছে।

(কল্পিত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য