বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১১তম উপাখ্যান

    পরদিন ভোজরাজ সিংহাসনে বসতে গেলে একাদশ পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম বিদ্যাধরী, আমার কথা আগে শুনুন, তারপর সিংহাসনে বসুন।
    বিক্রমাদিত্যের রাজত্বে কোথাও কোন অন্যায় কাজ হত না। মন্দ লোকেরা সাজা পেত এবং সৎ লোকেরা রাজার কাছ থেকে পুরস্কার পেত। '
    একবার বিক্রমাদিত্যের রাজ্য ভ্রমনের ইচ্ছা হল। তিনি রাজ্যভার মন্ত্রীর উপর দিয়ে যোগীর বেশে বেরিয়ে পড়লেন। যেখানে কিছু আশ্চর্য জিনিস দেখেন সেখানে কিছুদিন থেকে যান।
    এমনিভাবে তিনি বেড়াচ্ছেন। একবার পথ চলতে চলতে বনের মধ্যে সূর্য অস্ত গেল। কাছেকোলে কোন বাড়ি বা গুহা না দেখে রাজা একটা গাছের নীচে অংশ্রয় নিলেন।
    সেই গাছে চিরঞ্জীব নামে এক বৃদ্ধ পাখি বাস করত। তার পুত্র-পৌত্রেরা প্রতিদিন দেশের নানা স্থানে গিয়ে নিজেরা খেয়ে সন্ধেবেলায় চিরঞ্জাবের জন্য প্রত্যেকে একটি করে ফল এনে দিত। চিরঞ্জীব সেই ফল খেয়ে সুখে জীবনধারণ
করত।
    সেইদিন রাতে চিরঞ্জাব তার পুত্র-পৌত্রের দেওয়া ফল খেয়ে তাদের জিজ্ঞেস করল, বাছারা, তোমরা এই যে নানা স্থানে ঘুরে বেড়াও কোথাও কিছু আশ্চর্য জিনিস দেখেছ কি?
    একটি পাখি বললো, আমি আজ যদিও আশ্চর্য কিছু দেখি নি, তবুও আমার মন আজ খুব খারাপ।
    চিরঞ্জাব বললো, কি জন্য তোমার এই দুঃখ?
   পাখিটি বলল, তাহলে শুনুন। উত্তরদেশে একটি পাহাড় আছে। তার পাশেই পলাশ নগর। সেই পাহাড়ে বাস করত এক রাক্ষস, সে প্রতিদিন পলাশ নগরে আসতো এবং সামনে যাকে দেখত তাকেই ধরে নিয়ে গিয়ে সেই পাহাড়ে বসে খেত। একদিন নগরের সকলে মিলিত হয়ে রাক্ষসকে বললো, হে বকাসুর, তুমি যাকে পাও তাকেই এমনভাবে খেও না, আমরা তোমার খাবারের জন্য রোজ একজনকে পাঠিয়ে দেব ; তুমি তাকেই খেও।
     রাক্ষস সেই প্রস্তাব শুনে রাজি হল।
তারপর পর্যায়ক্রমে প্রতিদিন রাক্ষসের আহারের জন্য এক এক বাড়ি হতে এক এক জনকে পাঠান হতে লাগল। এইভাবে বহুদিন কেটে গেছে।
    কাল যে ব্রাহ্মণের পালা, সে আমার পূর্বজন্মে বন্ধু ছিল। তার একটিমাত্র ছেলে। ছেলেকে দিলে বংশনাশ হয়। নিজে গেলে স্ত্রী বিধবা হয়, আর স্ত্রী গেলে বাড়ি খালি হয়ে যায়। তাদের এই দুঃখে আমি দুঃখিত হয়েছি।
    রাজা বিক্রমাদিত্য গাছতলায় বসে পাখিদের এই সব কথা শুনলেন। তিনি আর দেরী না করে পলাশ নগরের দিকে রওনা হলেন ।
    সেখানে পৌঁছে সেই ব্রাহ্মণের সঙ্গে দেখা করে তাকে অভয় দিয়ে সকালবেলা স্নান করে সেই বধ্যশিলার উপর গিয়ে হাসিমুখে বসলেন।
    রাক্ষস এসে হাসিমুখে বধ্যশিলার উপর একজনকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বললে, মৃত্যুকে তুমি ভয় পাও না ? এই শিলায় যে বসে আমার আসার আগেই সে মরে থাকে, তুমি কে?' 
    রাজা বললেন, তা দিয়ে তোমার কী হবে? আমি আমার এই শরীর পরের জন্য দান করছি, তুমি তোমার কাজ কর।
    রাক্ষস চিন্তা করল, আহা, লোকটা সাধু পুরুষ, এ নিজের জীবন পরের জন্য ত্যাগ করছে, একে মারলে পাপ হবে।
    মনে মনে এই কথা চিন্তা করে সে রাজাকে বললো, তুমি পরের জন্য এই শরীর দান করছ, তুমি পূণ্যবান। তোমায় মারলে পাপ হবে। আমি তোমার উপর প্রসন্ন হয়েছি। বর চাও।
    রাজা বললেন, হে রাক্ষস, তুমি যদি আমার উপর প্রসন্ন হয়ে থাক তবে আজ থেকে মানুষ বধ করা বন্ধ কর। তোমার কাছে যেমন নিজের প্রাণ প্রিয়, সকলের কাছেও তেমনি নিজের প্রাণ প্রিয়। নিজের প্রাণের মত অন্যের প্রাণও রক্ষা করা উচিত।
    রাক্ষস সেদিন হতে মানুষ বধ করা বন্ধ করল, রাজাও নিজের রাজধানীতে ফিরে এলো।
    গল্প শেষ করে পুতুলটি ভোজরাজকে বললো, মহারাজ, আপনার যদি এমন পরোপকারিতা গুণ থাকে তবে আপনি সিংহাসনে বসুন ।
    ভোজরাজ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য