শীতের বাসা -- রাশিয়ার উপকথা

এক ছিল বুড়ো আর বুড়ী। তাদের একটা ষাঁড়, একটা ভেড়া, একটা হাঁস, একটা মোরগ আর একটা শুয়োর।
বুড়ো একদিন বুড়ীকে বলল: ‘মোরগ  ‍পুষে কী আর লাভ হবে, বৌ? তার চেয়ে একটা পরবের দিন দেখে দিই জবাই করে!”
বুড়ী বলল, “ভাল কথা, তাই করা যাক।’
মোরগ কিন্তু শুনতে পেয়েছিল। তাই রাত হতেই মোরগ পালিয়ে গেল বনে। পরদিন সকালে বুড়ো অাঁতিপাঁতি করে সব খুঁজল। মোরগের চিহ্নও নেই।
সন্ধ্যাবেলা বুড়ো বুড়ীকে আবার বলল: দেখ বৌ, মোরগ তো পেলাম না; শয়োরটাই মারি!
বুড়ী বলল, তা শুয়োরটাই মার।’
শুয়োর শুনতে পেয়েছিল। রাত হতেই পালিয়ে গেল বনে।
বুড়ো অাঁতিপাঁতি করে সব খুজল। শুয়োরের চিহ্নও নেই।
বলল, “ভেড়াটাকেই কাটতে হবে দেখছি!’
‘তাই কাট।’
ভেড়া সব শুনে হাঁসকে বলল: 'চল আমরা দুজনেই বনে পালাই। নয়ত তোকেও কাটবে, আমাকেও কাটবে।’
ভেড়া আর হাঁস দুজনেই চলে গেল বনে। ‍বুড়ো উঠোনে এসে দেখে ভেড়াও নেই হাঁসও নেই। বুড়ো অাঁতিপাঁতি করে সব খুজল। কোথাও পেল না।
‘কী অদ্ভুত, সব ক’টা জন্তু পালিয়েছে, ষাঁড়টা কেবল বাকি। শেষ অবধি ওটাকেই কাটতে হবে!’
‘কী আর করা, তাই কাট।’
শুনে ষাঁড়ও পালিয়ে গেল বনে।
গ্রীষ্মকালে বনে থাকা তো বেশ সুবিধা। পলাতকরা বেশ আরামেই রইল। কিন্তু গ্রীষ্ম শেষ হয়ে শীত এল।
ষাঁড় গিয়ে ভেড়াকে বলল:
‘কী বল ভায়া, শীতকাল তো এসে পড়ল। কাঠের একটা বাড়ী বানাতে হয়।”
ভেড়া জবাব দিল:
‘আমার গায়েই তো পশমের কোর্তা আছে। শীতে আমার কিছুই হবে না।’
শুয়োরের কাছে গেল ষাঁড়।
‘চল শুয়োর, একটা কাঠের বাড়ী বানিয়ে ফেলি!”
শুয়োর বলল, ‘আরে ধ্যুৎ, পড়ুক না শীত কত পড়তে পারে – আমি পরোয়া করি না। মাটি খুড়ে তলায় ঢুকব; ব্যস, বাড়ী ছাড়াই বেশ চলে যাবে।’
হাঁসের কাছে গেল ষাঁড়।
‘হাঁস, ও হাঁস, চল একটা কাঠের বাড়ী বানাই!’ 
‘বাড়ীতে আমার কাজ নেই। এক ডানা পেতে শোবো, আরেক ডানায় গা ঢাকব। হাজার বরফেও ঠান্ডা লাগবে না।’
ষাঁড় গেল মোরগের কাছে। 
‘আয় একটা কাঠের বাড়ী বানাই!’ 
বাড়ীতে কী হবে, ফার গাছের তলায় বসেই শীতটা বেশ কেটে যাবে।’ 
ষাঁড় দেখল, গতিক খারাপ, নিজের পথ তার নিজেকেই দেখতে হয়। 
‘তোদের ইচ্ছে না থাকে তো বেশ, আমি নিজেই ঘর তুলব।’ 
ষাঁড় একাই কাঠ দিয়ে বাড়ী বানাল। চুল্লী জেলে আগুন পোহায়,আরাম করে।
সে বছর ভয়ানক শীত পড়ল। শীতে শরীর জমে যায়। ভেড়া খুটখুট করে ঘোরে, কিন্তু শরীর আর কিছুতেই গরম হয় না। শেষ পর্যন্ত গেল ষাঁড়ের কাছে।
‘ব্যা!.. ব্যা!.. দরজা খোল, ঘরে ঢুকি!’ 
‘না হে বাপু, সেটি হচ্ছে না, যখন তোকে সাহায্য করতে বলেছিলাম তখন বলেছিলি, গায়ে পশমের কোর্তা আছে, শীতকে পরোয়া করিস না।’
‘ঢুকতে দে বলছি! নয়ত ঢুমেরে দরজা ভেঙ্গে ফেলব, তাহলে তুইও ঠাণ্ডায় জমে যাবি।’
বলল, “বেশ, ভেতরেই আয়।’ 
ভেড়াটা ঘরে ঢুকে চুল্লীর সামনে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ল। 
একটু পরেই দৌড়তে দৌড়তে শুয়োর এসে হাজির।
'ঘোঁত! ঘোঁত! ও ষাঁড়, ঘরে গিয়ে একটু গরম হয়ে নিই।”
‘ না হে বাপু, সেটি হচ্ছে না, যখন তোকে ঘর তুলতে ডেকেছিলাম তখন বলেছিলি, যতই শীত পড়ুক না, মাটি খুড়ে তলায় ঢুকবি।’
'ঢুকতে দে বলছি! নয়ত কোণগুলো সব খড়ে খড়ে বাড়ীটি তোর ধুলিসাৎ করে ছাড়ব।"
ষাঁড় ভাবে আর ভাবে: "বাড়ীটা দেখছি ধুলিসাৎ করে দেবে!” 
বলল, “তা ভেতরেই আয়।’
শুয়োর দৌড়ে ঢুকে সোজা মাটির নীচের গুদামঘরে গিয়ে আরাম করে জাঁকিয়ে বসল।
তারপর এল হাঁস। 
প্যাক, প্যাক, প্যাঁক! ষাঁড়, ও ষাঁড়, ঘরে ঢুকে একটু গরম হয়ে নিই!’ 
‘না হে বাপু, ঢুকতে দেব না! তোর দু’দুটো ডানা। একটায় পেতে শো, একটায় গা ঢাকা দে। বাড়ী ছাড়াই তোর বেশ চলে যাবে।’
'ঢুকতে না দিলে কাঠের ফাঁকে ফাঁকে যে শেওলা আছে সব টেনে ফেলে দেব। ফুটো দিয়ে হুহু করে তখন শীত ঢুকবে!’
ষাঁড় ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত হাঁসকেও ঢুকতে দিল। হাঁসটা ঘরে ঢুকে গিয়ে বসল দাঁড়ে।
   একটু পরেই মোরগ এল ধেয়ে । ‘কোঁকর-কোঁ! ও ষাঁড়, দরজা খোল, ঢুকতে দে!’ 
‘না  ‍খুলব না, যা না ফার গাছের তলায় তোর কোটরে।’ 
'ঢুকতে দে বলছি! নয়ত চালের ওপর চেপে ঠুকরে ঠুকরে গর্ত করে দেব। হুহু করে শীত ঢুকবে তখন।’
    মোরগকেও ঢুকতে দিল ষাঁড়। মোরগটা উড়ে গিয়ে বসল একটা কড়িকাঠের ওপর।
রইল ওরা একসঙ্গেই। পাঁচটিতে মিলে দিন কাটায়। নেকড়ে আর ভালুকের কানে গেল সে কথা। বলে:
‘চল, আমরা গিয়ে সব কটাকে খেয়ে ফেলি, তারপর আমরাই থাকব ঐ ঘরটায়।’
এই বলে রওনা হল। নেকড়ে ভালুককে বলল:
‘তোর গায়ে জোর অনেক, তুই আগে ঢোক।” 
‘না রে, আমি বড়ো ঢিলেঢালা, তুই চটপটে, বরঞ্চ তুইই আগে ঢোক।”
নেকড়েই ঢুকল বাড়ীর মধ্যে। ঢোকা মাত্রই ষাঁড়টা দুই শিঙের মধ্যে তাকে আটকে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরল। ভেড়াটা দৌড়ে এসে ঢু মারে – দমাস, দমাস! আর মাটির নীচের গদামঘর থেকে শুয়োরটা হাঁকে:

‘ছুরিতে কুড়ুলে শান পড়ে,
জ্যান্ত খাব নেকড়েরে!’

হাঁস এসে চিমটি লাগায় নেকড়ের গায়ে, আর মোরগটা দাঁড়ে নেচে নেচে চ্যাঁচায়:

‘সে আবার কী, রাখ ইয়ার্কি, 
এইখানে দে আমায়, 
ছুড়িও হেথা, দড়িও হেথা ... 
ঝুলিয়ে করি জবাই!’

হাঁকডাক শুনে ভালুক একেবারে চম্পট। নেকড়ে এদিকে ফোঁসে, ওদিকে ফোঁসে, কোনো রকমে শিং ফসকে পালিয়ে বাঁচে। ভালুককে গিয়ে বলে:
‘বাবাঃ, যা বিপদে পড়েছিলাম! খুব জোর বেঁচে গেছি! পিটিয়ে প্রায় মেরেই ফেলেছিল.. কালো কোট পড়া একটা লোক আমায় মস্ত সাঁড়াশি দিয়ে ঠেসে ধরে দেওয়ালের সঙ্গে। তারপর ছাই রঙের কোট পরা বেঁটে একটা লোক এসে কুড়লের ভোঁতা দিক দিয়ে কী পিটুনি পিটলে। তারপর এল সাদা কোট পরা আরো বেটে একটা লোক। এসেই সাঁড়াশি দিয়ে চিমটি কাটতে লেগে গেল। আর দলের সবচেয়ে ক্ষুদেটা টকটকে লাল জামা পরে কড়িকাঠের ওপর চ্যাঁচাতে লাগল:

‘সে আবার কী, রাখ ইয়ার্কি, 
এইখানে দে আমায়, 
ছুরিও হেথা, দড়িও হেথা ... 
ঝুলিয়ে করি জবাই!”

আর তলকুঠরি থেকে কে যেন হাঁক দিলে:

‘ছরিতে কুড়লে শান পড়ে, 
জ্যান্ত খাব নেকড়েরে!’

তারপর থেকে নেকড়ে আর ভালুক কাঠের বাড়ীর ত্রিসীমানায় যায়নি। আর ষাঁড়, ভেড়া, শুয়োর, হাঁস আর মোরগ বাস করে বাড়ীটায়, মনে আনন্দে দিন কাটায়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য