সাহসী গাধা -- কাজাখ লোককাহিনী

    বোঝা টেনে টেনে বিরক্তি ধরে গেল গাধার। একদিন সে তার বন্ধু উটকে বললঃ ‘আরে উটভায়া, বোঝা টেনে টেনে আর পারি না যে, গোটা পিঠে তো কড়া পড়ে গেছে! চল মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে যাই আমরা, দুজনে মিলে স্বাধীনভাবে থাকব যেমন খুশী।’
    উট একটু চুপ করে ভেবে বলল: ‘আমাদের মালিক লোক ভাল না, সেকথা ঠিক। খেতে দেয় না ভাল করে, খাটায় প্রচণ্ড । পালাতে পারলে আমিও বাঁচি, কিন্তু পালাব কি করে?
    গাধার উত্তরও তৈরী । বলল : 
    ‘আমি সব ভেবে রেখেছি, চিন্তা কোরো না। কাল মালিক আমাদের পিঠে নুন চাপিয়ে শহরে নিয়ে যাবে। প্রথমে আমরা বেশ বাধ্য হয়েই চলতে থাকব, তারপরে যেই পাহাড়ে উঠব অমনি পড়ে যাব, আর ভান করব যেন একেবারে নির্জীব হয়ে পড়েছি। মালিক আমাদের গালাগালি করবে, লাঠি দিয়ে খোচাবে আমরা কিন্তু নড়ব না। ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে যখন বাড়ী ফিরে যাবে সাহায্যের জন্য লোক ডাকতে তখনই আমাদের মুক্তি-যেদিকে চাও দৌড় লগাও, কেবল হোঁচট খেয়ে না পড়লেই হল ।
    খুশীতে নেচে উঠল উট : দারুণ ফন্দি করেছ, চমৎকার! তুমি যেমন বললে ঠিক তেমনই করব আমরা।
   সকাল হল। মালিক তাদের পিঠে নুনবোঝাই বস্তা চাপিয়ে নিয়ে চলল শহরে। অর্ধেক পথ তারা পেরিয়ে গেল বরাবরের মত। উট প্রথমে, তারপরে গাধা আর সব শেষে লাঠিহাতে মালিক। কিন্তু যেই পাহাড়ে উঠল তারা, অমনি গাধা আর উট দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল আর ভান করতে লাগল যেন একেবারেই নির্জীব হয়ে পড়েছে তারা, উঠে দাঁড়াবারও শক্তি নেই ।
    মালিক গালিগালাজ করতে লাগল : 
   ‘তবেরে কুঁড়ের বাদশার এখনি ওঠ বলছি, না হলে লাঠিপেট খাবি!’ তারা কানেও নিচ্ছে না, শুয়ে আছে যেন কিছু শুনতে পাচ্ছে না। প্রচণ্ড রেগে গিয়ে মালিক তাদের পিঠে মারতে লাগল লাঠির বাড়ি । উটটাকে মারল উনচল্লিশ বার-নড়ে না, যেই মেরেছে চল্লিশবার অমনি হাউমাউ করতে করতে উঠে দাঁড়াল উট ।
    ‘কেমন রে, আরো আগেই উঠে দাঁড়ান উচিত ছিল!' বলে মালিক এবার গাধাটাকে নিয়ে পড়ল । চল্লিশবার মারল গাধাটাকে—একটু টুঁ আওয়াজও করল না, পঞ্চাশবার মারল--একটু কাঁপলও না, ষাটবার মারল–গাধাট যেমন শুয়েছিল তেমনি শুয়ে রইল।
    মালিক বুঝল ব্যাপার ভাল না, গাধটি মরতে বসেছে। এত বড় ক্ষতি, কিন্তু কি আর করা।
   গাধার পিঠ থেকে বোঝাটা খুলে নিয়ে উটের পিঠে চাপিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলল। ঐ বোঝা নিয়ে পা টেনে টেনে কোনরকমে চলছে উট, আর গাধাকে গাল দিচ্ছে : শয়তান গাধা, তোর জন্যই এমন মার খেতে হল, দ্বিগুণ বোঝা বইছি। গাধাটা ওদিকে অপেক্ষা করতে লাগল যতক্ষণ না মালিক উটকে নিয়ে পাহাড়ের আড়ালে চলে যায় । তারপর উঠে কোনদিকে না তাকিয়ে দে দৌড়।
    তিনদিন ধরে দৌড়াল সে। তিনটি পাহাড়, তিনটি উপত্যকা পেরিয়ে অবশেষে এক স্রোতস্বিনী নদীর তীরবর্তী বিস্তৃত উপত্যকায় এসে পৌঁছাল।
    উপত্যকাটা পছন্দ হল গাধার, সেখানেই রয়ে গেল সে ; সেই উপত্যকাটার অধীশ্বর ছিল শক্তিশালী এক বাঘ ।
   একদিন বাঘ ভাবল নিজের রাজ্য দেখতে যাবে। সকালবেলায় পথে বেরিয়ে দুপুরবেলায় সে গাধার কাছে পৌছাল ।
   গাধাটা ওদিকে নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠে, লেজ নাড়ছে, ঘাস খাচ্ছে । বাঘ ভাবল, "এ আবার কি জন্তুঃ আগে কখনো দেখি নি তো ' আর গাধা বাঘকে দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেল, ভাবল, এবার আমার দফা রফা । মনে মনে স্থির করল, বাঁচার কোন চেষ্টা না করেই শুধু শুধু মরার কোন অর্থ হয় না । এই ভয়ঙ্কর জানোয়ারটাকে আমার বীরত্বই বরং একটু দেখানো যাক '
    লেজ তুলে, কান নাড়িয়ে মুখ ব্যাদান করে গাধা গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে এমন জোরে ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ করে ডেকে উঠল, বাঘ চোখে অন্ধকার দেখল । পিছনে ফিরেই টানা দৌড়। সর্বশক্তি দিয়ে দোঁড়চ্ছে ভয়ে পিছনদিকে দেখছে না পর্যন্ত ।
পথে নেকড়ের সঙ্গে দেখা: 
    ‘কি দেখে ভয় পেলে, মহারাজ?’ 
   ‘ভয় পেলাম একটা জন্তু দেখে, তার থেকে ভয়ঙ্কর জন্তু আর হতে পারে না । কানের বদলে দুটাে ডানা, মুখের হাঁ অন্তহীন বিশাল আর এমন ডাকে যে পৃথিবী কেঁপে ওঠে, আকাশ দপ দপ করে ওঠে।”
    ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, নেকড়ে বলল, ‘গাধাকে দেখ নি তো তুমি? হ্যাঁ হ্যাঁ, গাধাই হবে। ঠিক আছে, কাল তুমি আর আমি ওকে ফাঁসদড়ি লাগিয়ে মেরে ফেলব।’
    পরের দিন নেকড়ে একটা ফাঁসদড়ি যোগাড় করল । দড়িটার একপ্রান্ত বাঘের গলায় জড়িয়ে দিল, অপরপ্রাস্ত নিজের গলায় জড়াল। এইভাবে তারা উপত্যকার দিকে রওনা দিল ।
    নেকড়ে চলেছে আগে আগে, বাঘ পিছনে— পিছিয়ে পড়ছে কেবলই ।
   গাধা দূর থেকেই তাদের দেখতে পেয়ে আবার আরম্ভ করল: লেজ উচিয়ে, মুখ হাঁ করে আগের থেকেও জোরে ডেকে উঠল ।
    তখন বাঘ নেকড়েকে বলল : আরে ভাই, তুমি দেখছি আমাকে নিয়ে চলেছ ঐ দানবটাকে খাওয়াতে!’ এমন জোরে বাঘ টান দিল উল্টে দিকে যে নেকড়ের মুন্ডু ছিড়ে পড়ার উপক্রম।
    গুহায় ফিরেও বাঘ অনেকক্ষণ ধরে হাঁফাতে লাগল। এমন সময় একটা ছাতারে পাখি উড়ে এল তার কাছে, কিচমিচ করল । ফরফর করে ওড়াউড়ি করল, বাঘকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল সবকিছু। তারপর বলল:
    দাঁড়াও আমি উড়ে গিয়ে দেখে আসছি কি জন্তু ওটা, কি করছে। সবকিছু দেখে এসে তোমায় জানাব।’
    উড়ে গেল ছাতারে পাখি উপত্যকায় । 
    গাধাটা দূর থেকেই তাকে দেখতে পেয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল পা ছড়িয়ে দিয়ে, যেন মরে গেছে ।
  ছাতারে পাখি নিচে তাকিয়ে দেখে খুশী হল: ভয়ঙ্কর জন্তুটা মরেছে তাহলে! গাঁধার দেহের ওপর নেমে এল সে, চলাফেরা করতে লাগল, তার দেহের ওপর দিয়ে এদিক ওদিক চলতে লাগল। তার ভাবতে লাগল বাঘকে কিভাবে নিজের বীরত্ব নিয়ে গল্প বানিয়ে বলা যায় যে সেই জন্তুটাকে মেরেছে। হঠাৎ, পোড়া কপাল তার, একটা কামিনীদান চোখে পড়ল, ঠোঁটে তুলে নিতে যাবে দানাটা এমন সময় পা ফসকে পড়ে মাথাটা তার পড়ল গিয়ে গাধার দুই হাঁটুর মাঝে।
    গাধাটাও অমনি বেঁচে উঠল। দুই হাঁটুর মাঝখানে পাখিটাকে শক্ত করে চেপে ধরে খুব করে লেজের ঝাপটা মারতে লাগল। এমন মারতে লাগল যে পাখিটার পালক উড়ে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে ; তারপর খুর দিয়ে এমন এক লাথি মারল যে পাখিটা ছিটকে গিয়ে পড়ল একেবারে উপত্যকার শেষ প্রান্তে। শুয়ে রইল খানিকক্ষণ, তারপর জ্ঞান ফিরে পেয়ে কোনরকমে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে উড়ে ফিরে চলল।
      দূর থেকেই চেচিয়ে বাঘকে বলল: 
    ‘এখান থেকে পালাও, যতক্ষণ প্রাণে বেঁচে আছ জানোয়ারটা আমাকে চিরকালের মত পঙ্গু করে দিয়েছে। দেখো তোমার কপালেও যেন এমনটি না হয়।
    আরো ভয় পেয়ে গেল বাঘ। নিজের জিনিসপত্র নিয়ে অন্য দেশে চলে গেল । সাহসী গাধটি আজও সেই উপত্যকায় বাস করে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য