দৌড়বীর -- সুচিত্রা ভট্টাচার্য

     সামনের ছোট মাঠটাকে ঘোঁত ঘোঁত করে চক্কর দিচ্ছিল ভোম্বল। একবার, দু-বার, পাঁচবার, দশবার, কুড়িবার...। আজ তাকে কামাল করতেই হবে। নইলে যে তার দৌড়বীর নামটাই বৃথা।
     হ্যাঁ, সম্প্রতি ভোম্বল দৌড়বীর আখ্যা পেয়েছে বন্ধুদের কাছ থেকে। অকারণে নয় অবশ্য। সব কাজই সে দৌড়ে দৌড়ে করে কিনা, তাই। স্কুল যাতায়াতের সময়ে সে কক্ষনো হাটে না।
দোকান-বাজার যেখানেই তাকে পাঠাও, সে ছুটেই যাবে। এমনকী স্যার যদি কখনও বোর্ডে অংক কষতে ডাকেন, তখনও ভোম্বল পড়িমরি দৌড়োয়। অংক সে কোনও সময়েই করে উঠতে পারে না। হয় যোগে ভুল, নয় গুণে গলতি। কিন্তু দৌড়ে যাওয়ার উৎসাহে তার ভাটা নেই এতটুকু। রাস্তায় কখনও সাইকেলের সঙ্গে পাল্লা টানছে, কখনও বাসের সঙ্গে এমনকী ঠেলাগাড়িকেও সে কখনও হেঁটে পেরোয় না, তার পা দু-খানা আপনা-আপনি ছুটতে শুরু করে। এমন এক দৌড়পাগলকে বন্ধুরা আর কী নামেই বা ডাকবে!
     তা বন্ধুদের দেওয়া নামের মর্যাদা রাখতেই বুঝি এবার ধুন্ধুমার ক্লাবের দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ভোম্বল। কিন্তু এমনই কপাল, কাল পরপর তিনটে ইভেন্টে সে বাতিল হয়ে গেল। একশো মিটার। দুশো মিটার। চারশো মিটার। প্রত্যেকটাতেই তিন তিনবার ফলস স্টার্ট। বন্দুকের আওয়াজ শোনার আগেই কেন যে তার পা লাইন থেকে বেরিয়ে যায় বারবার? তবে ভোম্বল মুষড়ে পড়ার ছেলে নয়, এখনও আটশো মিটার রেস বাকি, সে আজ দেখিয়ে দেবে দৌড় কাকে
বলে।
     আর তারই প্রস্তুতি চলছে সকাল থেকে। মাঠের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছেন ভোম্বলের বাবা, হাতে খেলনাবন্দুক। তিনি ক্যাপ ফাটালেই সচল হচ্ছে ভোম্বলের পা, চক্রাকারে ঘুরে এসে থামছে খানিক, আবার ক্যাপের শব্দ, আবার যাত্রা শুরু...
     গুনে গুনে ছেলেকে একশো বার চরকি খাইয়ে খেলনাবন্দুক পকেটে পুরলেন ভোম্বলের বাবা। গম্ভীর মুখে বললেন, আশা করি, আজ আর ভুলচুক হবে না?
     ভোম্বল চকঢ়ক ঘাড় নাড়ল, না বাবা?
     ‘মনে আছে কী বলেছি?”
     ‘হ্যা।’
     ‘শোনা তো?’
     ‘ট্র্যাকে দাড়িয়ে কান খাড়া রাখব।’
     ‘হুম, খেয়াল রেখো, গলায় মেডেল ঝুলিয়ে না ফিরলে আজ থেকে তোমার দৌড় বন্ধ।’
     অবশ্যই!”
     আটটা বাজে। বাড়ি ফিরে জলখাবার সারল ভোম্বল। দুটো কলা, দু-পিস টোস্ট, একটা ডিমসেদ্ধ। আজ দুধ নয়, দুধ খেলে দৌড়ের সময়ে গা গুলোতে পারে। পেটটাও একটু খালি রাখা ভালো, তাতে শরীর ঝরঝরে থাকে।
     বাবা-মাকে প্রণাম সেরে ভোম্বল বেরিয়ে পড়ল। ধুন্ধুমার ক্লাবের মাঠে পৌঁছে দেখল কাতারে কাতারে লোক, প্রতিযোগীরাও সব হাজির, স্পোর্টস প্রায় শুরুর মুখে।
     কিট্‌স ব্যাগখানা খুলে রানিং সু বার করল ভোম্বল। পরছে। সামনে হঠাৎ হেলাবটতলার রানা। কাল তিন তিনটে দৌড়ে রানা প্রথম হয়েছিল, মুখে তার বেশ গর্বিত গর্বিত ভাব।
     সরল মনে ভোম্বল জিগ্যেস করল, ‘কিছু বলবে?’
     রানা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, নাহ। শুধু তোর সাহস দেখে অবাক লাগছে।’
     ‘কেন? কী করলাম?’
     ‘কাল একটা রেসও শুরু করতে পারলি না, ফের আজ দৌড়োতে এসেছিস?’
     ‘আজ ভুল হবে না। যা প্র্যাকটিস করেছি...কান আমার সারাক্ষণ খাড়া থাকবে।’
     ‘বটে? তুই বুঝি কান দিয়ে দৌড়োস? 
    ‘উহু, পা দিয়েই ছুটি। ভোম্বলের এবার বেশ রাগ হয়ে গেল। গরগরে গলায় বলল, আর আমার পা দু-খানা তোর পায়ের চেয়ে অনেক অনেক বেশি মজবুত। আজ তোকে টের পাইয়ে ছাড়ব।’
     ‘আরে, যা। দৌড়তে গেলে আসল যেটা লাগে, সেটা হল মগজ।’ রানা টকটক করে ভোম্বলের মাথায় আঙুল ঠুকল, ‘সেই মগজটিই তো তোর ফাকা। ঘিলু নেই।’
     শুনেই চড়াং মেজাজ চড়ে গেছে ভোম্বলের। প্রায় তেড়ে উঠতে যাচ্ছিল, তার আগেই রানা ধাঁ। খানিক তফাতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প জুড়েছে রানা, আঙুল তুলে দেখাচ্ছে ভোম্বলকে, আর খ্যাকখ্যাক হাসছে। অবিকল শেয়ালের মতো।           ভোম্বল চোয়ালে চোয়াল ঘষল। নাহ, রানাকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে।
     প্রথমেই আজ আটশো মিটারের হিট। মাইকে নাম ঘোষণা চলছে প্রতিযোগীদের। ভোম্বলের গ্রুপে রানা নেই, গুমগুমে মুখে স্টার্টিং ব্লকে এসে দাঁড়াল ভোম্বল। কান দুটোকে অতি সতর্ক রেখে। গুলির আওয়াজ শোনামাত্র ছিটকে বেরোল হরিণপায়ে দৌড়, পৌঁছেছে সবার আগে।
     একটু বুঝি জুড়োল প্রাণটা। এবার সেকেন্ড হিট, এবারেও রানা নেই। ভোম্বল আবার প্রথম। শেষে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে রানার। ভেতরের জেদটাই যেন তাড়িয়ে নিয়ে চলছিল ভোম্বলকে। অনায়াসে রানাকে টপকে গেল। ফিতে যখন ছুয়েছে, রানা অন্তত পাঁচ মিটার পিছনে।
     এবার ভোম্বলের প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। ব্যঙ্গের সুরে বলল, কী রে, ‘আমার কেরামতিটা দেখলি তো?’
     সেমিফাইনালে কেউ তুরুপের তাস দেখায় নাকি! আমিও তো ফাইনালে উঠেছি, মোকাবিলা সেখানেই হবে।’
     শুরু হতে চলেছে লড়াইয়ের শেষ ধাপ। ছেচল্লিশ জন প্রতিযোগীর মধ্যে টিকে আছে মাত্র আট। মাইকে আহ্বান শুনে যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ভোম্বলের ঠিক পাশেই রানা, তার ঠোঁটে এখনও সেই বঁকা হাসি।
     যথাসময়ে বেজে উঠল বন্দুক। কান সজাগ রেখে জ্যান্ত তিরের মতো ছুটে বেরোল ভোম্বল। এক এক পাক দুশো মিটার। কী আশ্চর্য, রানাও যেন উড়ে চলেছে! প্রথম পাকে রানাই সবার আগে। ভোম্বল চোয়ালে চোয়াল চেপে গতি
দুশো মিটারে রানার বিদ্রূপটাকে স্মরণ করেই বুঝি আরও দ্রুত ছুটছে ভোম্বলের পা। অতিক্রম করে গেল রানাকে। অস্তিম রাউন্ডে দূরত্ব বাড়ছে ক্রমশ, বেড়েই চলেছে। ভোম্বলকে আর পায় কে!
     ঠিক তখনই পিছন থেকে রানার গলা, তুই তো বাতিল রে ভোম্বল! তোর জার্সিতে তো নম্বর নেই!’
     বাক্য দুটো যেন খ্যাচ করে বিধল ভোম্বলের কানে। সঙ্গে সঙ্গে পা নিশ্চল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করছে জার্সির পিঠটা। তুৎ, কী ভুলভাল বকছে রানা! এই তো নম্বর! বড় বড় করে লেখা, সেভেনটিন!
     পলক ভাবনাটুকুর মাঝেই দর্শকদের বিপুল হর্যধ্বনি। ঝমাঝম করতালি বাজছে। ভোম্বল চমকে দেখল, রানা পৌঁছে গেছে প্রান্তসীমায়। মাথা ঝুঁকিয়ে গ্রহণ করছে দর্শকদের অভিনন্দন।
     যাহ, ভোম্বল হেরে গেল!
    রাত গভীর। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল ভোম্বল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। তার নয় বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম, তা বলেই এইভাবে তাকে বোকা বানাল রানা? সেই বা কেন এত গোবর গণেশ, তিন তিনবার রেসে দৌড়েও কেন সে আক্কেল খুইয়ে জার্সিতে নম্বর আছে কি না দেখবে? নাহ, সত্যিই তার ঘিলু বলে কিছু নেই। বাবা তো সাফ সাফ বলে দিলেন, কাল থেকে ভোম্বলকে দৌড়োতে দেখলেই ঠাং খোড়া করে দেবেন। খুবই ন্যায্য কথা। এবার বন্ধুরা দৌড়বীর খেতাবটা কেড়ে নিলেই ভোম্বলের অপমানের ষোলো কলা পূর্ণ হয়। উহু, আর দৌড়োদৌড়ি নয়, এবার থেকে ধীরেসুস্থেই হাঁটবে ভোম্বল। পা দুটোকে না চালিয়ে বরং মুগজটাকে চালাবে।
     হঠাৎ টুক করে একটা শব্দ। ভোম্বলের স্নায়ু টানটান। অন্ধকারে দৃষ্টি বুলিয়ে মনে হল, কেউ যেন ঢুকেছে ঘরে।
     এত রাতে কে রে বাবা ? চোরটোর নয় তো ? 
     হ্যাঁ, চোরই। কী নিপুণ কৌশলে জানলার শিক বেঁকিয়ে ফেলেছে। ছায়ার মতো নিঃশব্দে ঘুরছে ঘরময়!
     কী করা উচিত ভোম্বলের? লাফিয়ে ধরবে চোরটাকে? কিন্তু এখনও তো কিছু চুরি করেনি! চোর বলে প্রতিপন্ন করবে কীভাবে?
     পা না খেলিয়ে মাথা খেলাচ্ছে ভোম্বল। চুপচাপ ধৈর্য ধরে দেখছে চোরের কার্যকলাপ।
    মাত্র কয়েক মিনিটেই স্বমহিমায় বিকশিত হয়েছেন চোর বাবাজীবন। খুটখাট কী যেন করল, খুলে গেছে আলমারি। পুট করে লকারটাও। টপাটপ গয়নাগুলো বের করছে না? মার গলার হার, বালা, চুড়..আরও কী কী যেন থাকে ওই কুঠুরিতে? সব নিয়ে নিল? কাঁধে একটা ঝোলাবাগ এনেছে চোরটা, ভরছে একের-পর-এক। বাবার মানিব্যাগখানা টিপেটুপে দেখল। চালান করছে ঝোলায়।
     এখন ভোম্বল উঠবে কী? বমাল ধরবে লোকটাকে? ভোম্বলের মগজ কী বলে? উহু, আর একটু অপেক্ষা করা দরকার। লোকটা তো ভোম্বলের হাতের নাগালে, দেখাই যাক না কত দূর বাড়তে পারে।
     চোরের সাহস সত্যিই তুলনাহীন। টেবিলটাকে বেঁটিয়ে সাফ করছে এবার। টাইমপিস, এ বছর জন্মদিনে পাওয়া ভোম্বলের ঘড়িখানা, বাবার পার্কার পেন, কিছুই তো বাদ দেয় না! কী কাণ্ড, ভোম্বলের জ্যামিতিবক্সটাও মেরে দিল?
আর সহ্য হল না। ভোম্বল নিঃসাড়ে বিছানা ছেড়ে নামল। বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে লোকটার ওপর। কী ধড়িবাজ
পিছলে গেল! চোখের পলক পড়ার আগেই দরজা খুলে উধাও।
     এ হেন পরিস্থিতির জন্য মোটেই তৈরি ছিল না ভোম্বল। তবে এখন তার মস্তিষ্ক ভীষণ ভাবে সক্রিয়, পরমুহুর্তে সম্বিৎ . ফিরে পেয়ে তাড়া করেছে লোকটাকে। রাস্তায় বেরিয়ে দেখল, বেশি দূর যেতে পারেনি, চোর ফুটপাথ ধরে ছুটছে।
ইচ্ছে করলেই ভোম্বল একটা শোরগোল তুলতে পারত। তার হাঁক-ডাকে নির্ঘাত জেগে যেত পাড়া-পড়ছি, লোকটাকে পাকড়াও করতে কোন মুশকিল হত না। কিন্তু পা চালু হতেই মগজ যে নিশ্চল।
     চোর ছুটছে, ভোম্বল ছুটছে। চোর ছুটছে, ভোম্বলও ছুটছে।
     কী অসম্ভব জোরে দৌড়ায় রে ভাই, কিছুতেই ভোম্বল লোকটাকে ধরতে পারছে না। চোয়ালে চোয়ালে কষে গতি বাড়াল ভোম্বল। আস্তে আস্তে ব্যবধান কমছে যেন! এ কী, আবার বেড়ে গেল না? শরীরের সমস্ত শক্তি পায়ে সংহত করে আরও গতি বাড়াচ্ছে ভোম্বল, আরও বাড়াচ্ছে...। মুঠো করা দুটো হাত দুলছে পিস্টনের মতো।

     আশ্চর্য শেষে কিনা চোরের কাছেও হেরে যাবে ভোম্বল?
     পলকের জন্য রানার মুখটা মনে পড়ল। অমনি যেন লাফিয়ে বেড়েছে গতি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভোম্বল চোরের পাশাপাশি। এবং তার পরমুহূর্তেই চোরকে পিছনে ফেলে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে ভোম্বল। জিতেছে! জিতেছে!
      মাথার ওপর দু-হাত ঝাঁকিয়ে ভোম্বল ঘুরে তাকাল। চোরটা নেই। হেরে গিয়ে লজ্জায় পালিয়েছে ব্যাটা। অনেক কিছুই নিয়ে গেল। নিক গে। জয়ের আনন্দের চেয়ে কি তার দাম বেশি!
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য