গাধার লেখাপড়া -- মোল্লা নাসিরউদ্দিন

  সেদিন মোল্লা হাজির  হয়েছেন বাদশা তৈমুরলঙের খাস-কামরায় । একথা-সেকথা, রসালাপ হবার পর বাদশ মোল্লাকে ডেকে নিয়ে গেলেন তাঁর আস্তাবলে ।
   ক'দিন আগে কেনা একটা হৃষ্টপুষ্ট গাধা দেখিয়ে বলেন—মোল্লা, কেমন দেখছো এটাকে ?
   ‘হুজুর, এমন গাধার মত গাধা জীবনেও দেখিনি। ওটা যদি উপযুক্ত লোকের হাতে পড়তো–তাহলে পড়াশোনা শিখে শিক্ষিতও হতে পারতো —মুখ ফসকে বলে ফেলে মোল্লা।
   ‘সত্যি বলছে ?—একে লেখাপড় শেখানো যাবে ? বেশ ও-ভারটা তোমার ওপরই ছেড়ে দিলাম। অবশ্য তার জন্যে তুমি দশটা করে মুদ্রা মাসোহারা পাবে। আশা করি ছ'মাস পরে এটাকে রীতিমত ‘শিক্ষিত করে আমার কাছে নিয়ে আসবে। হা, ছ'মাস সময় কিন্তু?
   নিজের মন্তব্যের জালে বেচারী মোল্লা জড়িয়ে পড়েছেন, কী আর করেন, অগত্যা গাধাটাকে নিয়ে রওনা হলেন বাড়ীর দিকে ।
   ‘হয় গাধাকে পড়া শেখানো, নয়তো প্রচণ্ড তিরস্কার, অপমান,— প্রাণভয়ে মোল্লা উঠে-পড়ে লাগেন গাধার পেছনে।
   দেখতে দেখতে ছ'মাস কেটে গেল। তার পরদিন মস্ত লম্বা একটা কেতাব বগলে নিয়ে গাধাসহ মোল্লা হাজির হলেন দরবারে। লম্বা-চওড়া পুঁথির প্রথম পাতা খুলে মোল্লা গাধাকে সম্বোধন করে বললেন—‘এবার পড়ে যাওতো বাপু !
   তৎক্ষণাৎ, অবাক কাণ্ড, গাধাটা এগিয়ে এসে জিভ দিয়ে দিব্যি প্রথম পাতা উল্টালো । তারপর দ্বিতীয় পাতা, তারপর তৃতীয় পাতা । সবাই তো খুশীতে ডগমগ ; মজা পেয়ে গেছেন বাদশাও।
   এ ভাবে কিছুক্ষণ কয়েকটা পাতা উলটিয়ে শেষে গাধাট। চীৎকার করে ডেকে ওঠে।
   বাদশা তৈমুর ভারী খুশী হয়ে মোল্লার পিঠ চাপড়ে বললেন— ‘সত্যিই তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছ মোল্লা। গাধা পাতা উল্টে পড়তে শিখেছে নিশ্চয়ই । কিন্তু মোল্লা, হঠাৎ এটা চিৎকার করলো কেন ?
   ‘হুজুর, এ যাবৎ যা দেখলেন, তা করতে আমাকে এই ছ'মাস ভয়ে-ভয়ে কাটাতে হয়েছে । আসলে কী করেছি জানেন, প্রথমদিন ওর কেতাবের প্রথম পাতার নীচে দ্বিতীয় পৃষ্ঠার ওপরে একমুঠো ঘাস রেখেছি। ঘাসের লোভে প্রথম পাতা উল্টেছে । তার পরদিন দ্বিতীয় পৃষ্ঠার নীচে তৃতীয় পৃষ্ঠার ওপরে ঘাস রেখেছি। ঘাস না রাখার জন্য লোভে-লোভে এভাবে ও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে যায়। আর, আজকে ও হঠাৎ চীৎকার করলো কেন জানেন হুজুর ?
—"কেন ? 
‘অন্যান্য দিন তো পড়ার পর ওকে বেশ করে ঘাস খাওয়াতাম, আজ এতক্ষণ পড়ার পরও ঘাস না পেয়েই চেঁচাচ্ছে!’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য