নূরজান আর তার ছেলেরা -- কাজাখ লোককাহিনী

   কোনো এক সময়ে একজন ভাল লোক ছিল, নাম তার নূরজান। দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল সে, আর বার্ধক্যও আসে নি তার দেহে । যখন তার নিরানব্বই বছর পূর্ণ হল, সে নিজের তিন ছেলেকে কাছে ডেকে বলল :
   আমার প্রিয় ছেলেরা, সাবিত, গাবিত, হামিত! সব পরিশ্রম, দায়িত্ব, দুঃখকষ্ট নিয়ে আমার দিন শেষ হয়েছে। রাত নামছে, চোখের সামনে অন্ধকারের আবরণ : এবার আমার বিশ্রাম নেওয়া উচিত । শেষঘুমে ঢলে পড়ার আগে তোমাদের কাছে বিদায় নিতে চাই আর কিছু উপদেশ দিতে চাই তোমাদের।"
   ‘বল বাবা, আমরা মন দিয়ে শুনব’ বলল ভাই তিনজন । 
    বলে চলল নুরজান : 
   আমার মৃত্যুর পরে তোমরা পরস্পরের প্রতি ভালবাসা ও বিচারবুদ্ধি অনুসারে গরুভেড়া, জমিজমা যা কিছু আমি রেখে গেলাম ভাগ করে নিও আর এমনভাবে ঘরসংসার কোরো যেন আত্মীয় বা পর কেউ তোমাদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে না পারে । মনে রেখো, আমার মেষপালে একটা মেষশাবকও নেই আর ঘোড়ার পালে একটাও ঘোড়া নেই যাদের আমি শঠতা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে অধিকার করেছি। ভেড়ার পালকে প্রহরা দেবে নেকড়ে যেন না হামলা করে, নিজের মনকে প্রহরী দেবে মিথ্যার বিরুদ্ধে । ভাইয়ে ভাইয়ে মিলেমিশে থাকবে, বিপদে একে অন্যকে ফেলে যেও না । আর যদি কখনও প্রচণ্ডভাবে বিপদের ফাসে আটকা পড়ই কোনদিন, তবে তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় এই নাও ’ বলে নূরজান কাঁপা-কাঁপা হাতে ছেলেদের দিকে এগিয়ে দিল সোনার মোহরভরা একটি চামড়ার থলি। নাও বাছারা, এতে মোহর আছে নিরানব্বইটি, যত বছর আমি এই আকাশের নীচে বেঁচে আছি, ঠিক ততগুলি। এগুলো একটা ভাল জায়গায় লুকিয়ে রাখ আর যতদিন তোমাদের সঞ্চয়ে এককণা খাবারও থাকবে ততদিন এ অর্থ ছুঁয়ো না । যখন তোমাদের চরম দুর্দশা আসবে, কেবল তখনই এই অর্থ তোমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিও। এই অর্থে মিশে আছে আমার পরিশ্রম, ঘাম, কষ্ট আর চোখের জল, এ তোমাদের মঙ্গলের কাজেই লাগুক ।’
    বলে বৃদ্ধ মূৱঞ্জান শেষ নিঃশ্বাস ফেলল, মৃত্যু তার চোখের পাতা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিল ।
   ছেলের বাবার শেষকৃত্য করল যথাযোগ্য সম্মানসহকারে, রীতি অনুযায়ী যা যা করার সবই করল, কান্নাকাটিও করল খুব। সব থেকে বেশি কেঁদে লুটোপুটি খেতে লাগল ছোট ছেলে । যে সব লোকেরা গোটা এলাকা থেকে দেখতে এসেছিল নূরজানের শেষকৃত্য, তারা বলাবলি করতে লাগল :
   ‘নুরজানের মত এমন করে যে ছেলে মানুষ করতে পেরেছে সে পিতা ধন্য। তিনজনই চমৎকার, কিন্তু তৃতীয়জন সবচেয়ে ভাল।’
   শোকপালন শেষ হলে পরে ভাইয়েরা কোনরকম ঝগড়াঝাটি ছাড়াই সমস্ত সম্পত্তি সমান তিনভাগে ভাগ করে নিল। কেবল অনেকক্ষণ ধরে তারা একমত হতে পারছিল না মোহরের থলিটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় সেই বিষয়ে । তারা পাহাড়ের অনেক উঁচুতে উঠে একটা গুহা খুঁজে পেল, সেখানে তাদের ধন রেখে গুহার মুখটা পাথর দিয়ে এমনভাবে বন্ধ করে দিল যে, খুব বুদ্ধিমান চোরও এখানে চুরি করতে আসায় কোন উৎসাহ পাবে না।
   ভাইয়ের শপথ নিল যে, এই গোপনকথা কখনও কারুর কাছে প্রকাশ করবে না বা তাদের এই মিলিত ধনে হস্তক্ষেপ করবে না । তারপর পরম্পরকে আলিঙ্গন করে তারা বিভিন্ন পথে আলাদা আলাদাভাবে নীচে নেমে গেল ।
   দিন যায়, নূরজানের কবরের ওপর ঘাসলতাপাতা গজিয়ে উঠল । প্রথমে তিন ভাইয়ের মধ্যে বেশ ভাব, ভালবাসা ছিল, দূর দূর গ্রামের বাবামায়েরাও নিজেদের ছেলেমেয়েদের কাছে তাদেরকে আদর্শ হিসাবে তুলে ধরত। তারপর ছোট ভাইয়ের ভাব হল কতকগুলি অলস আড্ডাবাজ লোকের সঙ্গে। সে নেশা করতে লাগল, আরো নীচে নামল, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ভোজউৎসব, ঘোড়ার দৌড়ের আয়োজন করতে লাগল, ঘোড়ায় চেপে খরগোস শিকারে যায়, ভেড়ার পাল অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখে ।
   ভাইয়েরা তাকে বোঝাতে লাগল ; 
   ‘তোর হল কি ? বাবার কথাগুলো ভুলে গেলি। এখনও ফেরার পথ আছে, ভেবে দেখ । তা নাহলে শীঘ্রই একটা ছেড়া পোশাকও থাকবে না অঙ্গে ।'
   হামিত হেসেই উড়িয়ে দেয় সে কথা : 
   ‘কাল কি হবে তা কেউ বলতে পারে না।’ 
   বড় ভাইয়েরা বলল : 
   ‘তা ঠিক, তবে সেই কালকের দিনটা যে রূপেই দেখা দিক না কেন, আমাদের এই উপদেশ অনুযায়ীই কাজ করতে হবে-যতক্ষণ না অন্ধকার নামে, কাজ করে যাও’
   শেষ পর্যন্ত যা হবার তা হল । শীঘ্রই হামিত একেধারে কপর্দকহীন হয়ে পড়ল । গরুবাছুরের শেষ ক’টিও বিক্রি করে দিয়ে সে এসে ভাইদের বলল যে ডাকাতরা তার গরুবাছুরের পাল তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। দুঃখে, হতাশায় মাথা নাড়তে লাগল বড় দুই ভাই। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে বাবার বলা কথাগুলি মনে পড়ল তাদের, ভাইকে বকবকি করল না তারা, নিজেদের গরুভেড়ার থেকে তাকে দিল কিছু, যাতে সে নিজের পরিবারকে খাওয়াতে পারে । কিন্তু কিছুদিন বাদেই সেই অঞ্চলের মেষপালকদের দারুণ দুর্দিন এল ।
   গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপে সমস্ত ঘাসলতা জ্বলে গেল। গরুভেড়ার পালের খাবার কিছু  নেই। শরৎকালে প্রচণ্ড বৃষ্টি আরম্ভ হল, সময়ের আগেই দারুণ শীত পড়ল, মাটি ঢেকে গেল বরফে । গরুভেড়া মরতে লাগল ক্ষুধায় আর রোগভোগে । চতুর্দিকে মরা জন্তুর দেহ পড়ে আছে। তখনই ভাইদের মনে পড়ল লুকিয়ে রাখা মোহরের কথা ।
   গুহার কাছে এসে তারা পাথরগুলি সরিয়ে ভেতরে তাকাল । থলিটা যেখানে তারা রেখে গিয়েছিল ঠিক সে জায়গাতেই আছে, কিন্তু তার ভেতরে মোহর কমে গেছে। ভাইয়ের মোহরগুলি টুপির মধ্যে ঢালল, তিন তিনবার গুনল, কিন্তু তাতে কি? কমে যে গেছে তা জলের মত পরিষ্কার । বাবা বলেছিলেন মোহর আছে নিরানব্বইটি, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ছেষট্টিটি।
   নূরজানের ছেলেরা হতবুদ্ধি হয়ে মোহরগুলি নিয়ে বসে রইল আর আড়চোখে পরম্পরের দিকে তাকাতে লাগল ।
   সাবিত বলল : 
  "অপরিচিত কোন লোক মোহর চুরি করেছে তা হতে পারে না, তাহলে সে সব মোহরই নিয়ে যেত, একটাও পড়ে থাকত না । আমাদের কেউই মোহর চুরি করেছে। কিন্তু কে?
   শপথ করে বলছি আমি মোহর নিই নি, বলল গাবিত । 
   ‘আমিও শপথ করে বলছি নিই নি, বলল হামিত । 
   ‘তার মামে তোমরা মনে করছ আমি একাজ করেছি। রাগে চীৎকার করে উঠল সাধিত ।
   কি করে জানব, হতেও পারে। প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে বলল গাবিত। বড় ভাই মেজ ভাইয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলাটা চেপে ধরল, গুহার আধাঅন্ধকারে দুটি ছোরা বিদ্যুতের মত ঝকঝক করে উঠল ।
   হামিত চীৎকার করে বলল :
  ‘দাঁড়াও ভাইয়েরা, তোমরা কি করছ? কয়েকদিন আগে তোমরাই না আমাকে খোটা দিলে যে আমি বাবার দেওয়া উপদেশ ভুলে গিয়েছি আর নিজেরা এখন কি করছ। শোন আমার কথা, এস আমরা ঝগড়াঝাটি না করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি। যতই আমরা ঝগড়া করি না কেন রহস্য উদঘাটিত হবে না তাতে । কি করে চুরিটা হল তা ভেবে দরকার নেই। এখনও যথেষ্ট মোহর আছে, সেগুলো আমরা সমানভাবে ভাগ করে নেব বাবার আদেশ অনুযায়ী ।
   ছোরা ফেলে দিল তারা, সাবিত হাঁফাতে হাঁফাতে বলল : ‘তুই আমাদের বৃথা রক্তপাতের হাত থেকে বাঁচালি, হামিত। একটা সোনার পাহাড়ও মানুষের রক্তের সমান দামী নয় । আমরা এখন পরস্পরের প্রতি আগের সে বিশ্বাস হারিয়েছি, আর কি আমাদের মিল সম্ভব ? কেবল বাবার বন্ধু জ্ঞানী বেলতেকেই আমাদের ঝগড়ার মীমাংসা করে দিতে পারেন। চল তার কছেই যাওয়া যাক মীমাংসা করার জন্য ।’
   পাহাড় থেকে নেমে এসে তারা ঘোড়ায় চেপে রওনা দিল সেদিকে, যেখানে বেলতেকেইয়ের পরিবার শীতকাল কাটায়।
   সব থেকে দূরের আর কষ্টকর পথও একদিন শেষ হয়। চল্লিশদিন পর তারা এসে পৌছল যশস্বী বেলতেকেইয়ের গ্রামে। বৃদ্ধ বেলতেকেই বন্ধুপুত্রদের আদর-অভ্যর্থন জানালেন, সুস্বাদু আহার্য আর কুমিস আনতে আদেশ দিলেন তাদের জন্য । তারপর বললেন, কাল সকাল পর্যন্ত বিশ্রাম মাও । কাল তোমাদের বিবাদের মীমাংসা করা যাবে ।
   রাত কাটল । ভোরবেলায় বেলেতেকেই অতিথিদের প্রাতরাশ সারা হলে বললেন : সারারাত ঘুমেই নি আমি, তোমাদের সমস্যার কথাই ভাবছিলাম। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমার বন্ধু নূরজানের ছেলেদের মধ্যে কেউ এ চুরি করেছে। তোমরা যে চুরি কর নি তা তোমাদের প্রমাণ করে দিতে হবে। একটাই পথ আছে প্রমাণ করার । এখনই তোমরা যাও বাবার কবরের কাছে। মাটি খুঁড়ে বাবার গাল থেকে একটি করে দাঁড়ি ছিড়ে নিয়ে এস তিন ভাই ! এইভাবেই কেবল তোমরা আমার কাছে নিজেদের নির্দোর্ষিতা প্রমাণ করতে পারবে।’
    চিন্তিত হয়ে পড়ল ভাইয়ের । সাবিত প্রথম কথা বলল : 
   ‘আমি চুরি করি নি । কিন্তু আপনি যা বলছেন তা আমি করতে পারব না । তাতে যদি সমস্ত সন্দেহ আর চুরির অপরাধ আমার ওপর পড়ে তো পড়ুক ।
   ‘আমিও চোর নই। গাবিত বলল। কিন্তু আমিও আপনার কথামত কাজ করতে পারব না ; সে আপনি বাবার বন্ধু আর বয়সে আমাদের তিনজনের দ্বিগুণ বড় বলেও নয় ?
   আর হামিত্র বলল ;
   ভাইরা দেখি সত্যকথা প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয় পাচ্ছে। ওরা দু’জনে মিলেই চুরি করেছে নাকি ? আমিও চোর নই, সেইজন্যই এই মুহূর্তে রওনা দেব বাবার কবরের দিকে আপনার আদেশ সঠিকভাবে পালন করার জন্য। সত্যের জয় হোক!' বলে সে দরজার দিকে এগোল ।
    তখন বেলতেকেই দু’হাত বাড়িয়ে তিরস্কারের সুরে বললেন :
   দাঁড়াও, যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে না। সত্যরই জয় হয়েছে । তুমি হামিত এ চুরি করেছ, তুমি ছাড়া আর কেউ নয়। যে বাবার কবরের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারে, সে সবকিছু করতে পারে ; চুরি-ডাকাতি, নীচ প্রতারণা, কি করে তুই এই লজ্জা আর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবি?’
   হামিতের মুখ সাদা হয়ে গেল ভয়ে ; মাথা বুকে ঠেকিয়ে, চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে সে সব তিরস্কার শুনল । তারপর মুখের ওপর হাতচাপা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে আর ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল দূরে কোথায় । সেই থেকে তাকে আর দেখা যায়নি গ্রামে বা পথে-ঘাটে, কোনো লোকের মুখেও তার নাম শোনা যায় না ।
   বড় ভাই দু’জন কৃতজ্ঞতা জানাল জ্ঞানীবৃদ্ধ বেলতেকেইকে সুবিচারের জন্য, তারপর মোহর নিয়ে ফিরে গেল যে যার পরিবারের কাছে। তাদের মধ্যে আর কখনও বিবাদ হয় নি। একসঙ্গে থাকে, একসঙ্গে ছেলেমেয়ে নাতিনাতনী মানুষ করে । এইভাবেই কাটতে লাগল তাদের দিনগুলি ।

এই গল্পটির ইপাব বই আছে

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য