বিক্রম-বেতালের গল্প: হেরফের

   নাছোড়বান্দা বিক্ৰমাদিত্য সেই গাছের কাছে এল । আবার গাছে উঠে শব নামাল । তাকে কাঁধে ফেলে আগের মতই পথ চলতে লাগল মৌনভাবে । কিছুক্ষণ পর শব থেকে বেতাল বলল, “মহারাজ একদিকে তোমার সংকল্প আমার কাছে যেমন অদ্ভুত ঠেকছে তেমনি অন্যদিকে এই সংকল্প হঠাৎ কবে শিথিল হয়ে যাবে ভাবছি । অমন যে বীণাবন্ত, ঈশ্বরের উপর যার অত ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল তাকেইতো চোখের সামনে দেখলাম হঠাৎ নাস্তিক হয়ে গেল ! তোমার হাঁটার পরিশ্রম লাঘব করার জন্য সেই ভক্তের নাস্তিক হবার গল্প বলছি শোন ।”

   বেতাল বলল : কলিঙ্গ দেশে বীণাবন্ত নামে এক বৈদ্য রোগীদের সেবা করত । উনি অনেক অদ্ভুত রকমের চিকিৎসা করে ধন্বন্তরি নামে অভিহিত হয়ে ছিলেন । উনি পরম শিবভক্ত ছিলেন । উনি প্রায় সব সময় শিবালয়ে থাকতেন । কী রাত্রে কী দিনে যারা ও'র সাথে দেখা করতে চাইত তারা ঐ শিব মন্দিরে গিয়ে ওকে ঠিক পেয়ে যেত ।


   বীণাবন্তের ঘরবাড়ি স্ত্রীপুত্র পরিবার যে ছিল না তা নয় । কিন্তু উনি নিজের বাড়িতে ছ-মাসে ন-মাসে যেত । সংসারের প্রতি তার কোন দিনই টান ছিলনা । একবার এক ধনী ব্যক্তিকে চিকিৎসা করে মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচিয়ে তুলল। সেই ধনী ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা বশত তার সাথে নিজের মেয়ে যশোধরার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, ওদের থাকার জন্য একটি বাড়িও তুলে দিয়েছিল ।
   স্ত্রীর প্রতি বীণাবন্তের টান যে ছিলনা তা নয় । তার সন্তানও হয়েছিল । কিন্তু বিয়ের পরও তার চরিত্রে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা দিল না । শিবালয়ে পড়ে থাকত রাতদিন । ওখানেই রুগীদের দেখত। অর্থও রোজগার হোত। কিন্তু টাকা বাড়িতে আসত না । শিব মন্দিরে গরীব শিবভক্তদের ঐ অর্থ দিয়ে দিত। মাঝে মাঝে স্ত্রী খবর পাঠাত: সংসার চালানো ষাচ্ছেনা টাকার অভাবে । তখন বীণাবস্ত হাতে যে টাকা থাকত তা পাঠিয়ে দিত ।
   যশোধরা অভিমানী ছিল । মুখে কিছু বলত না । সংসারের সব কাজ নিজের বিচার বিবেচনা করে সামলে নিত । কিন্তু কাহাতক অার একা বেচারা সামাল দিতে পারে । তাই একদিন নিজের বাড়ি যশোবন্ত নামে এক ধনীর কাছে বিক্ৰী করে দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় । সব চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হোল এত বড় যে একটা ঘটনা ঘটে গেল তাতে বীণাবন্তের মনে কোন চাঞ্চল্য ছিলনা ।
   যশোধরার কাছে যে যশোবন্ত বাড়ি কিনেছিল সে ছিল খুব নাস্তিক । কোন দেবতাকে প্রণাম না করেই সে অনেক টাকা রোজগার করেছিল । চিকিৎসার ক্ষেত্রে বীণাবন্তের হাতযশ যেমন ছিল ব্যবসার ক্ষেত্রে , যশোবন্তেরও তেমনি হাতযশ ছিল ।
যশোবন্তের দুই বউ একের পর এক মারা গেল । কোন বউএর একটাও বাচ্চা হোল না। ওর তৃতীয় বউ গর্ভবতী হোল । যশোবন্তের আনন্দের আর সীমা নেই । ওর বউ বলল, “ঈশ্বরের অশেষ করুণায় আমি মা হতে চলেছি " ওর কথা শুনে যশোবন্ত বলল, “যা ইচ্ছে ভাবতে পার, বলতে পার, আমি কিন্তু ভগবানের করুণা-টরুণা বলে মনে করিনা।" যশোবন্তের স্ত্রী নয় মাস পর এক পুত্র সন্তান প্রসব করল । কিন্তু ঐ সন্তান নড়ে না চড়ে না । ডাকে না কাঁদে না । যেন মৃত । চামড়া হাড্ডিসার দেহ । কিন্তু ওর বুকের উপর কান রেখে ভাল করে শুনলে টিপ টিপ শব্দ শোনা যায়।
   “এই বাচ্চাকে একমাত্র বীণাবন্ত ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবেনা।" বলল যশোন্তের বন্ধুরা ।


   বীণাবন্তের প্রতি যশোবন্তের একটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব ছিল । লোকটা একটা আকাট । নিজের পরিবার দেখাশোনার যার ক্ষমতা নেই সে আবার কেমনতরো মানুষ ।
   এই ধরনের মনোভাব থাকা সত্ত্বে অনেক সাধ্য সাধনার পর যে সন্তান হোল তাকে বাঁচানোর আশায় বন্ধুদের কাছে যশোবন্ত বলল, “তাহলে ওকে এখানে ডেকে পাঠানো হোক ৷”
   ওর বন্ধুরা শিবালয়ে গিয়ে বীণাবন্তকে সব বলে ওদের সাথে আসতে বলল ।
   “ঐ নাস্তিকের কাছে আমি যাব না । ও এই শিবালয়ে এসে শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে অপরাধ স্বীকার করে নিলে ওর বাচ্চার চিকিৎসা করব । তারপর যা শিবের ইচ্ছা তাই হবে।” বলল বীণাবন্ত ।
   যশোবন্ত তার বাচ্চাকে নিয়ে শিবালয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে বীপাবন্তের কাছে রেখে, শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টঙ্গে প্রণাম করে। যশোবন্ত এসব করল নিতান্তই বীণাবন্তকে খুশী করার জন্য। শিবের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বা তার প্রতি বিশ্বাস থাকার জন্য নয় ।
   বীণাবন্ত তার থলে থেকে একটা বড়ি বের করে অল্প ভিজিয়ে বাচ্চার ঠোঁটে ঘষে দিল । তৎক্ষণাৎ বাচ্চাটা নড়ে চড়ে উঠে কাঁদতে শুরু করে দিল । এই ব্যাপার দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল । ঠিক সেই মুহর্তে যশোধরা তার কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শিবালয়ে এসে, “ওগো আমাদের বাচ্চাটাকে বাঁচাও !" বলে কোলের বাচ্চাটাকে স্বামীর সামনে শুইয়ে দিল ।
   
বীণাবন্ত বাচ্চাটার নাড়ি পরীক্ষা করে বাচ্চাটার মুখে একমাত্রা ওষুধ দিল। ঐ বাচ্চাটা একবার চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণে মারা গেল ।
   বীণাবস্তু সটান শিবলিঙ্গের সামনে সাষ্টাঙ্গে পড়ে প্রণাম করে প্রার্থনা করল বাচ্চাটাকে বাঁচানোর । কিন্তু কোন ফল হোল মা !
   বীণাবন্ত তার ওষুধের পোটলা শিবলিঙ্গের মাথায় ছুড়ে কোথায় চলে গেল । আর কোনদিন মন্দিরের ত্রিসীমানায় পা রাখেনি । অনেকদিন পর শিবের বাৎসরিক উৎসবের দিনে এসে শিবের উপর দূর থেকে ঢিল ছুড়তে লাগল । সবাই ভাবল বীণাবন্ত পাগল হয়ে গেছে ।
   বেতাল এই গল্প বলে বলল, “রাজা, পরমভক্ত বীণাবন্ত বেশ তো ছিল কিন্তু হঠাৎ চরম নাস্তিক হয়ে গেল কেন ? আর চরম নাস্তিক যশোবন্ত রাতারাতি পরমভক্ত হয়ে গেল কেন ? মানুষ যে ভগবানকে বিশ্বাস করে সেটা কি শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষার্থেই ? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না বল তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।” ঐ কথা শুনে বিক্ৰমাদিত্য বলল,
   “মানুষ স্বার্থ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করেনা । যশোবন্তের সন্তান বেঁচে গেছে বলেই সে ভগবানের ভক্ত হয়েছে । ঠিক ঐ ধরনের স্বার্থের কারণেই বীণাবন্তও ভগবানের উপর বিশ্বাস রেখে ছিল । নিজের ওষুধের উপর তার কোন দিনই বিশ্বাস ছিল না । উনি বরাবর নিজের নিমিত্ত ভাবতেন । ওঁর ওষুধে কিছু হয়না । যা করেন ভগবান করেন । এত গভীর বিশ্বাসের জন্যই নিজের সন্তান মারা যাওয়াতে অমন চট করে সেই বিশ্বাস উবে গেল । চিকিৎসার ত্রুটির জন্যই যে সন্তান মারা গেছে সে কথা বীণাবন্ত ভাবতে পারেন নি। ভেবেছেন শিব মেরে ফেলেছেন । এইভাবে রুগী এবং ওষুধের মধ্যে শিবকে শিখণ্ডী রাখার ফলেই তার অত বড় চিকিৎসা করার ক্ষমতা নস্ট হয়ে পাগল হল ।
   রাজার মুখ খুলতেই বেতাল শবসহ পালিয়ে গিয়ে উঠে বসলে সেই গাছে ।
. (কল্পিত)

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য