বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১৮তম উপাখ্যান

    পরদিন রাজা সিংহাসনে বসতে গেলে বিলাসরসিকা নামে একটি পুতুল বললো, আপনার যদি রাজা বিক্রমাদিত্যের মত গুণ থাকে তবে সিংহাসনে বসুন। তার আগে আমার এই গল্পটি শুনুন।
মণিপুরে গোবিন্দশর্মা নামে এক পণ্ডিত ব্ৰাহ্মণ বাস করতেন। তিনি যখন তাঁর নিজের পুত্রকে নীতিশাস্ত্র উপদেশ দেন তখন আমিও তা শুনেছিলাম। সেই উপদেশ কি তাই আপনাকে এখন বলব
    যাঁরা বুদ্ধিমান তাঁরা কখনও দুর্জনের সংসর্গে থাকে না ! যদি থাকে তবে একের পর এক অনর্থের সৃষ্টি হয়। সর্বদা সজ্জনের সংসৰ্গই শ্রেয়। সাধুসঙ্গ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আনন্দ আর কিছুতেই পাওয়া যায় না। কারো সঙ্গে শক্রতা করতে নেই। পরের মনে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। বিনা কারণে ভৃত্যদের তিরস্কার করা ঠিক নয়। গুরুতর দোষ না দেখলে কাউকে ত্যাগ করতে নেই। শত্রুর কাছেও হিত কথা বলবে। দান ও অধ্যয়ন ভিন্ন সময় নষ্ট করতে নেই। পিতামাতার সেবা করা অবশ্য কর্তব্য ।
    রাজা বিক্রমাদিত্য এই সব নিয়ম মেনে চলতেন। একদিন এক বিদেশী পর্যটক সভায় এলে রাজা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি তো অনেক দেশ ঘুরেছেন, ঘুরতে ঘুরতে আশ্চর্য জিনিস কি দেখেছেন?
    পর্যটক বললেন, এক আশচর্য জিনিস দেখেছি। উদয়াচলে সূর্যদেবের এক মন্দির আছে। সেখান গিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। সেই গঙ্গাতীরে পাপবিনাশন নামে একটি শিবমন্দির আছে। সেইখানে গঙ্গাপ্রবাহ হতে প্রতিদিন একটি করে সোনার থাম ওঠে। সেই থামের উপর নবরত্নখচিত একটি সিংহাসন আছে। সেই থাম ক্রমশ উঁচু হতে হতে সূর্যের কাছে গিয়ে পৌঁছায়, তারপর দিনের শেষে আবার গঙ্গায় ডুবে যায়। প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
    রাজা কৌতুহল দমন করতে না পেরে আর দেরী না করে সেই পর্যটককে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন।
    সকালে সূর্যোদয় হলে দেখা গেল গঙ্গাপ্রবাহ থেকে একটি সোনার থাম উঠল এবং তার উপর একটি রত্নসিংহাসন। রাজা বিক্রমাদিত এই সিংহাসনের উপর নিজে বসলেন। সেটিও দেখতে দেখতে সূর্যের দিকে উঠতে শুরু করল। তিনি যখন সূর্যের কাছে উপস্থিত হলেন তখন সূর্যকিরণের তেজে তাঁর দেহ মাংসপিণ্ডে পরিণত হল। সেই অবস্থাতেই তিনি সূর্যকে প্রণাম করে বললেন, জগতের একমাত্র চক্ষুকে, সৃষ্টি-বিনাশহেতুকে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাই।
    তখন সূর্যদেব অমৃত ছিটিয়ে রাজাকে বাঁচিয়ে তুলে বললেন, হে রাজন, তুমি খুব সাহসী পুরুষ, প্রাণের মায়া ছেড়ে এখানে উপস্থিত হয়েছ, আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছি, বর চাও। 
    রাজা বললেন, মুনিদেরও অগম্য আপনার এই স্থানে প্রবেশ করতে পেরেছি, আমার মত ভাগ্যবান আর কে আছে। আপনার অনুগ্রহে আমার কিছুরই অভাব নেই।
    এই কথা শুনে সূর্যদেব খুব সন্তুষ্ট হয়ে রাজাকে তাঁর নিজের কানের কুণ্ডল দুটি দান করে বললেন, রাজন, এই কুণ্ডল দুটির বিশেষত্ব হচ্ছে, এ থেকে প্রতিদিন একভার সোনা পাবে।
    রাজা কুণ্ডল দুটি নিয়ে সূর্যকে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেমনি উজ্জয়িনীর দিকে যাত্রা করলেন অমনি এক ব্রাহ্মণ তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, আমি দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করে যা সংগ্ৰহ করি তাতে বাড়ির সকলের পেট ভরে না !
    ব্ৰাহ্মণের কথা শুনে রাজা কুগুল দুটি তাঁকে দিয়ে বললেন, হে ব্ৰাহ্মণ, এই কুণ্ডল দুটি প্রতিদিন আপনাকে একভার করে সোনা দেবে।
    এই কথা শুনে ব্রাহ্মণ রাজার প্রশংসা করতে করতে সে স্থান ত্যাগ করলেন । রাজাও উজ্জয়িনীতে ফিরে এলেন।
পুতুলটি বললো, হে রাজন, আপনার যদি এমন গুণ ও ত্যাগব্ৰত থাকে তবে সিংহাসনে বসুন। 
    রাজা এর কোন উত্তর দিতে পারলেন না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য