মোগলি : দ্য জঙ্গল বুক | পর্ব-৪ |

   তবু একদিন নেকড়ে-মা বলে দিয়েছিল, শেরে খানের মত প্রাণীকে বিশ্বাস করো না। সুযোগ পেলেই কিন্তু সে তোমাকে মেরে ফেলবে।
   মোগলি জানতে চেয়েছিল, আচ্ছা মা, শেরে খান কেমন প্রাণী? সে থাকে কোথায়?
  নেকড়ে-মা মোগলিকে বুকের কাছটিতে আদর করে বসিয়ে বলেছিল, শেরে খান থাকে এখান থেকে অনেক দূরে বাণগঙ্গা নদীর তীরে। তার হুঙ্কার বড় মারাত্মক-সে হল বনের বাঘ। জন্ম থেকেই তার এক পা খোঁড়া-সেই জন্য তার মা তাকে লুংড়ি বলে ডাকত। বাণগঙ্গার তীরের মানুষদের গ্রামে ঢুকে সে কেবল গরু-ছাগল মারে।
   মোগলির মনে শেরে খানের বিষয়ে খুবই কৌতুহল জেগে উঠেছিল। একদিন যখন দুজনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে --মোগলি বাঘিরার পিঠের ওপর দুদিকে দু'পা ঝুলিযে বসে থেকে তাকে জিগ্যেস করছিল, আচ্ছা বাঘিরা,শেরে খানটা কে? তুমি কি তাকে দেখেছ?

   বাঘিরা বলেছে, শেরে খান যে কে তা তোমাকে বলে দিতে হবে না-চেহারা দেখলেই তুমি তাকে চিনতে পারবে। তাকে বনের সকল প্রাণীই এড়িয়ে চলে। মানুষদের সে একদম পছন্দ করে না।
   মোগলি বলেছিল, আমি মানুষ হলেও, মানুষদের গ্রামে তো আমি থাকি না--এই জঙ্গলে নেকড়ে মায়ের কোলেই তো আমি বড় হয়েছি—তাদের শিকার খেয়েছি-জঙ্গলের আইন মেনে চলেছি--
   বাঘিরা আর বেশি কিছু বলতে চায়নি। অন্য কথা তুলে প্রসঙ্গটা পাল্টে দিয়েছিল।
   শেরে খানের ব্যাপারে সেই থেকে একটা খটকা লেগে আছে মোগলির মনে। এটুকু সে বুঝতে পেরেছিল যে, শেরে খানকে সকলেই ভয় করে চলে। আর ওই শিশু বয়সেই সে জেনে গিয়েছিল, বাঘিরা যে ঘুরে ঘুরে প্রায় প্রতিদিনই তার কাছে আসে, তার সঙ্গে নানান গল্প করে,ঘুরে বেড়ায়--সে আর কিছুই না, সে তাকে আগলে রাখে।
   চোখে চোখে রাখতে চায় যাতে সে কোন বিপদে না পড়ে।

   মোগলি জানত না, প্রথম দিন থেকেই মোগলির মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল বাঘিরা। নেকড়ে বাবা-মায়ের কাছে মানুষ হলেও সব দায়িত্বটা তারই। তাই গত দশ বছর ধরে তার কাছে ঘুরে ঘুরে না এসে পারত না সে।
   মোগলিকে হাসিমুখে খেলা করতে দেখলে আনন্দে তার বুক ভরে উঠত। মোগলিও বাঘিরা কখন আসবে যেন সেই অপেক্ষায় সময় গুণত। জঙ্গলে পশুদের সঙ্গে জীবন এভাবেই কাটছিল মোগলির-আনন্দ আর খুশির মধ্যে। কোন মানবশিশুই হয়তো তার মত এমন সুখী ও হাসিখুশি ছিল না। কিন্তু বর্ষার আকাশের মতই একদিন সহসা মোগলির জীবনে দেখা দিল দুঃখ আর বেদনার কাল মেঘ।
   জঙ্গলের নেকড়েরা দলবদ্ধ স্বাধীন প্রাণী। গোটা দল যার হুকুমে চলে সেই তাদের দলপতি বা সর্দার। দলে সর্দারের কথাই শেষ কথা। জঙ্গলের সাধারণ নিয়মের বাইরেও নেকড়ে দলের প্রত্যেককে সমাজের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।
এসব নিয়ম-কানুন ঠিক করে দলের বয়স্ক নেকড়েরা সর্দারের সঙ্গে পরামর্শ করে।

   প্রতি মাসে একদিন ভর চাঁদের রাতে ফুটফুটে জোছনায় নেকড়েদের দলীয় সভা বসে। যেই পাথুরে পাহাড়ের সমতল চুড়ায় এই সভা বসে নেকড়ের তার নাম দিয়েছে পরিষদ-পাহাড়। সেই পাহাড়ের আশপাশে পাথরের টুকরো ও বড় বড় পাথরের চাঁই ছড়ানো। সেই পাথরে পাথরে লাফিয়ে নেকড়ের চূড়ায় সভার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসে।
   সেবার পূর্ণিমার এক রাতে গোটা জঙ্গলের গাছপালা যখন বুদ হয়ে আছে জোছনার মৌতাতে, সেই সময় দেখা গেল নেকড়ের উঠে এসেছে তাদের পরিষদ পাহাড়ে।
 
নেকড়েদের সর্দার-বৃদ্ধ নিঃসঙ্গ নেকড়ে, তার নাম একেলা, গোটা দলকে সে চালায় শক্তি ও চাতুরির গুণে।
  পাহাড়ের ওপর পৌছে তার নির্দিষ্ট পাথরটার ওপর এসে বসল একেল | তার নিচে বসল নানা মাপের ও বর্ণের আরও চল্লিশ বা তারও বেশি নেকড়ে।
   একেলা উপস্থিত নেকড়েদের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, আজ আমাদের এক গুরুতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু রাম দেখছি এখনো এসে পৌছায়নি।
   বয়স্ক এক নেকড়ে বলল, পরিষদে যা আলোচনা হবার কথা, তা নিয়ে আমরা উপস্থিত সকলেই নিজেদের মতামত জানাতে পারি। সিদ্ধান্ত যা হবে সেটা পরে রামাকে জানিয়ে দিলেই হবে। নিশ্চয় সে কোন কাজে আটকা পড়েছে। তা আজ
একেলা বলল, গতকাল সন্ধ্যায় পাত-চাটা টাবাকুই এসে খুব মারাত্মক একটা খবর দিয়ে গেছে। খবরটা শোনার পর থেকে আমি খুবই অস্বস্তির মধ্যে রয়েছি।
   টাবাকুই হল ঝাঁকড়া লেজওয়ালা শেয়াল। সে সব সময়েই গা-ঢেকে চলাফেরা করে আর সকলেরই ক্ষতি করে বেড়ায়।
   জঙ্গলের নানান খবর সে চারদিকে রটিয়ে বেড়ায়-আজগুবি সব গল্প বলে। আর মানুষদের গ্রামে দিয়ে আস্তাকুঁড় থেকে চামড়ার টুকরো তুলে খায়।
    নেকড়েকুল টাবাকুইকে ছোট নজরে দেখে, তারা তাকে পাত-চাটা টাবাকুই বলে ডাকে।
   সভায় উপস্থিত নেকড়েরা একেলার মুখে টাবাকুই-এর নাম শুনে নড়েচড়ে বসল। সাগ্রহে তাকিয়ে রইল একেলার দিকে।
   একেলা বলতে লাগল, পাত-চাটা টাবাকুই আমাকে বলেছে, শেরে খান শিকারের অঞ্চল বদলে ফেলেছে। বাণগঙ্গা নদীতীরের গ্রামবাসীরা তার ওপর চটে গেছে সেই কারণে সে এখন থেকে এই পাহাড়ি জঙ্গলেই শিকার ধরবে। টাবাকুই অনেক আজগুবি গল্প বললেও, সত্যি খবরও অনেক সময় তার মুখ থেকে শোনা যায়। টাবাকুই তার শিকারের দিব্য দিয়ে বলেছে, শেরে খান নিজে তাকে শিকারের অঞ্চল পাল্টাবার কথা বলেছে। কথাটাকে আমি উড়িয়ে দিতে পারিনি। তোমরা তো জান রামা আর তার বৌ একটা মানুষের বাচ্চাকে নিজেদের বাচ্চার সঙ্গে পালন করেছে। নেকড়ের দলে মানুষ রয়েছে বুঝতে পারলে শেরে খান তাকে ছেড়ে দেবে না। দু-পেয়ে মানুষকে সে একদম পছন্দ করে না। মানুষের বাচ্চাটার জন্য নেকড়েদের গোটা দলটাই শেরে খানের শত্রু হয়ে পড়বে। এই অবস্থায় আমাদের এখন কি করা কর্তব্য সেটা ঠিক করতে হবে।
   একেলার কথা শেষ হলে বয়স্ক এক নেকড়ে পাশ থেকে বলল, বিপদ-বিপদ-সমূহ বিপদ দেখতে পাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে তার কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেল উপস্থিত নেকড়েদের মুখে মুখে। প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেকড়ে পরিষদের সভার কাজ চলল। বহু আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত স্থির হল, রামাকে জানিয়ে দিতে হবে নেকড়ে দলে মানুষের বাচ্চা রাখা চলবে না।
   রামাকে এই দুঃসংবাদটা জানাবার দায়িত্বও দলের পক্ষ থেকে দেওয়া হল দলপতি নিঃসঙ্গ নেকড়ে একেলার ওপর।
 
থালার আকারের চাঁদ আকাশের মাঝামাঝি এসে পৌছবার আগেই নেকড়ে দলের সভা ভঙ্গ হল। নেকড়েরা যে যার মত নিজেদের কাজে চলে গেল। সবার শেষে একেলা নেমে এলো পরিষদ পাহাড় থেকে!
   তারপর সোজা ছুটে এসে দাঁড়াল নেকড়ে রামার বাসার সামনে । রাম গুহার বাইরেই ঘোরাঘুরি করছিল। একেলাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল।
   একেলা বলল, পরিষদ সভায় আজ তুমি যাওনি। তাই পরিষদের একটা সিদ্ধান্তের কথা জানাবার জন্য আমাকেই আসতে হল।
   রামা বলল, পাত-চাটা টাবাকুই গিয়েছিল বুঝি?
   একেলা বলল, তুমি দেখছি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছ। তোমাকে দুঃসংবাদটা জানাবার দায়িত্ব আমার ওপরেই পড়েছে।
   রামা বলল, টাবাকুই এসে আমাকেও জানিয়ে গেছে শেরে খান বাণগঙ্গার অঞ্চল ছেড়ে আমাদের এখানে চলে এসেছে। এই চাঁদ থেকে সে এখানেই শিকার ধরবে। তা শেরে খান শিকার ধরতে আসবে তো আমাদের চিন্তিত হবার কি আছে? আমরা তো আর তাকে বাগড়া দিতে যাচ্ছি না।
   একেলা বলল, তোমার বাসায় মানুষের বাচ্চাটা না থাকলে চিন্তার কিছুই ছিল না। টাবাকুই এতদিনে খবরটা নিশ্চয় শেরে খানের কানে পৌঁছে দিয়েছে। আমার তো সন্দেহ হচ্ছে, মানুষের বাচ্চাটার লোভেই হয়তো শেরে খান এই জঙ্গলে চলে এসেছে। পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মানুষের বাচ্চাটাকে নেকড়ে দলে রাখা চলবে না। তুমি তার বাবা, এবারে তুমি যা ব্যবস্থা নেবার নাও ।
   রামা এবারে পা ভেঙ্গে বসল। বলল, মানুষের ছেলেটা এখন আমার নিজেরই ছেলে হয়ে গেছে। নেকড়েদের থেকে সে অনেক বেশি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান। ভবিষ্যতে দলটাকে সে রক্ষা করতে পারবে—এটা তো এতদিন দলের সকলেই মেনে নিয়েছিল। এখন তাকে দল-ছাড়া করবার কথা উঠছে কেন? বাচ্চাটা আমাদের সঙ্গে খেয়েছে—আমাদের সঙ্গে ঘুমিয়েছে, আমাদের জন্য শিকারকে তাড়া করেছে–জঙ্গলের বা নেকড়েদলের আইন একটাও লঙ্ঘন করেনি।
   একেলা বলল, তোমার কথা সবই সত্য রামা। কিন্তু দুঃখের কথা কি জান, টাবাকুইর কাছে খবর পেয়ে আমি বুঝতে পারছি শেরে খান মানুষের বাচ্চাটাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে।
   রামা বলল, কিন্তু আমর মানুষ ছেলে শেরে থানের তো কোন ক্ষতি করেনি। সে মানুষ হলেও বর্তমানে নেকড়ে দলের একজন সদস্য।
   একেলা বলল, তুমি তো জান রামা, শেরে খান মানুষদের খুবই ঘৃণা করে। বন্দুক কাঁধে করে মানুষরা জঙ্গলে এসে শেরে খানের খোঁজই করে বেড়ায়। সে-কারণে তোমার ছেলে মোগলি বড় হয়ে বন্দুক কাঁধে নিয়ে আর একজন বাঘ-শিকারী হয়ে উঠবে শেরে খান এটা কিছুতেই হতে দেবে না।
   মোগলির নেকড়ে-বাবা রামা বলল, কিন্তু একেলা, মোগলি তো কোনদিনই বাঘ-শিকারী হবে না। দরকার হলে মোগলি নিজে গিয়েই শেরে খানকে একথা বুঝিয়ে বলে আসবে।
   একেলা এবারে ব্যথিত গলায় বলল, তুমি তো জন রামা, বাঘ শেরে খান কারুর কোন কথা মানে না, তাই কেউ তাকে কিছু বলে বোঝাতে পারে না। শেরে খান নিজে যা ভাল বোঝে তাই করে। তাছাড়া দেখ, মোগলি থাকলে এক সময় না এক সময় তাকে নিয়ে শেরে খানের সঙ্গে নেকড়ে দলের বিবাদ বেঁধে যাবে! শেরে খানের তুলনায় নেকড়ে দল শক্তিতে খুবই দুর্বল। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও আমরা তোমার ছেলেকে বাঁচাতে পারব কি না সন্দেহ। তার চাইতে তুমি বরং মোগলকে মানুষদের গ্রামে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর। নিজের জাতের সঙ্গে সে ভালই থাকবে--বিপদের কোন ভয় থাকবে না। মোগলি বেঁচে যাবে। কিন্তু এখানে থাকলে শেরে থানের হাতে সে নির্ধাৎ মরবে।
   এ কথার পরে রামার মুখে আর কোন উত্তর জোগাল না। সে চুপ করে মাথা নিচু করে রইল।
  একেল এবার যাবার উদ্যোগ করল। শেষবারের মত বলল, তুমি যত তাড়াতাড়ি পার মোগলিকে মানুষদের গ্রামে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর । এই বলে নেকড়ে দলপতি স্থান ত্যাগ করল।

   গুহার ভেতরে নেকড়ে-মা একপাশে মোগলি আর অন্যপাশে নিজের বাচ্চাদের নিয়ে শুয়ে ছিল। গুহার বাইরের কথাবার্তা সবই তার কানে পৌছেছিল। ছড়ানো দু'পায়ের ওপর মাথা রেখে একেলার কথাগুলি শুনেও সে বাইরে বেরিয়ে আসেনি। সে বুঝতে পেরেছিল, একেলা মোগলিকে আর দলে রাখবে না। আর সে জানে দলে থেকে সর্দারের আদেশ অমান্য করার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
   দলের নেকড়েরা একজোট হয়ে তাদের সকলকে মেরে ফেলবে। অথচ তার আদরের ছেলে মোগলিকে কেবল মানুষ হওয়ার দোষে বাসা থেকে বার করে দিতে হবে এই কথাটা ভাবতে গিয়ে তার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছিল। তার দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে গুহার মেঝেতে পড়ছিল।
   রামা গুহায় ঢুকে স্থির বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ তার সঙ্গিনীর দিকে। সব কথাই যে তার কানে পৌঁছেছে তা রামা বুঝতে পারছিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য