বিক্রম-বেতালের গল্প: ঋণ মুক্তি

   মহান্তিপুরে গোপাল নামে এক গরিব লোক নিরুপায় হয়ে ভিক্ষে করে দিন কাটাত। লোকটা এমন হতভাগা যে একবেলা খেতে পেলে তিন বেলা উপোস করতে বাধ্য হত।
একদিন রামানন্দ নামে এক দৈবজ্ঞ পন্ডিত শিষ্যদের নিয়ে কা্শী যাওয়ার পথে মহান্তিপুরে পৌছল। অতবড় পন্ডিতকে নিজেদের গাঁয়ে পেয়ে প্রত্যেকে তাকে সুখ-দুঃখের কথা বলল এবং কভিাবে যে তারা নিজেদের সীমাহীন দুঃখ দূর করবে তা জানতে চাইল।
   পাড়ার সবাই যখন ঐ পন্ডিতের কাছে তখন গোপাল আর স্থির থাকতে পারল না। সেও গিয়ে নিজের খেতে না পাওয়ার, দুঃখের দিনগুলোর কথা সবিস্তারে পন্ডিতকে জানাল। সব কথা জানানোর পরে এক প্রতিকার কি ভাবে হবে তাও গোপাল জানতে চাইল।


   “জীবনে তোমার দুঃখ দারিদ্র দূর হবে না।” রামানন্দ পন্ডিত বলল।
   “প্রভু, তাহলে আমাকে বলে দিন কিভাবে আমি মুক্তি পেতে পারি।”
   পাশের শহরে রামসাহা, ভীমসাহা ও সোমনাথ সাহা নামে তিনজন ব্যবসায়ী আছে। এই তিনজন তোমার কাছে ঋণী। প্রত্যেকের কাছ থেকে তুমি একটি করে স্বর্ণমুদ্রা পাবে। এই ঋণ ওরা শোধ করার পরে তোমার মৃত্যু হতে পারে।” রামানন্দ পন্ডিত বলল।
   গোপাল রামানন্দ পন্ডিতের কথা শুনে তাকে প্রণাম করে চলে গেল পাশের শহরে। গিয়ে ঐ তিনজনের সঙ্গে দেখা করল। গোপাল প্রত্যেককে একটা করে স্বর্ণমুদ্রা দিতে বলল। ওরা আর কথা না বাড়িয়ে প্রত্যেকে গোপালকে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিল।

   গোপাল ঐ তিনটি সোনার মুদ্রা খরচ করে গরিবদের খাইয়ে দিয়ে ভাবল,“সত্যি আজ আমি মুক্তি পাব। আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে সে কি বলব। যে কোন মুহূর্তে আমার মুত্যু হতে পারে। বনে গিয়ে মরাই ভাল। কারণ বনে মরে গেলে যেকোন জন্তু জানোয়ার মহানন্দে পেটপুরে আমাকে খাবে।
   সে গভীর বনে গেল। দুদিন ধরে সেখানেই পড়ে রইল। দুদিনেও তার মৃত্যু না হওয়ায় সে অবাক হল। বনের বাঘ সিংহ এসে তাকে খেল না। অতবড় পন্ডিতের কথা কেন যে ফলছে না তা সে ভেবে পেল না। সে টলতে টলতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে একটি গর্তে পড়ে গেল।
   “যাক, স্বয়ং ভগবান তাহলে আমার জন্য একটা গর্ত খুঁড়ে রেখেছেন। আর দেরী নেই, এই গর্তেই আমার মৃত্যু হবে।”
ভাবতে ভাবতে গোপাল এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তার চোখে পড়ল চকচকে একটা জিনিস। হাতে তুলে নিয়ে গোপাল বুঝতে পারল ওটা সোনা। তারপর সে যত তুলল সোনা পেল। যত সোনা পারল তুলে গোপাল বাড়ি ফিরল। সেই সোনা দিয়ে চাল যাল নুন তেল কিনে সে গরিবদের খাওয়াতে লাগল। গোপাল কোত্থেকে যে অত সোনা পেল তা সে কাউকে জানাল না, কেউ তাকে সে প্রশ্নও করল না।


   মোট কথা পন্ডিতের কথা ফলেনি। অত সোনা পেয়েও সে অহঙ্কারী হয়নি, সে গরিবেদের সঙ্গে ছিল, তাদেরই জন্য সোনা খরচ করতে লাগল।
   বেতাল এই কাহিনী শুনিয়ে বলল, “রাজা, গোপাল মরল না কেন? অতবড় পন্ডিতের কথার কি কোন দাম নেই? একেবারে মিথ্যে হয়ে গেল অতবড় পন্ডিতের কথা? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি জবাব না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে যাবে।”
   জবাবে রাজা বিক্রামদিত্য বললেন, ‘রামানন্দ পন্ডিতের কথা মিথ্যে হয়নি। কারণ গোপাল ঐ তিনজন ব্যবসায়ীর কাছে যা পেয়েছিল তার অনেকগুলো গরিবদের দিয়ে ওদের ঋণী করে রাখল। যে তিনটি সোনার মুদ্রা পেয়েছিল সেগুলো খরচ করে সে যদি নিজের পেট পূরণ করত হয়ত তার মৃত্যু হত। কিন্তু সে দান করত বলেই যেভাবে যা ঘটার ছিল তা ঘটেনি। মৃত্যুর পরে ওর দেহ যাতে জন্তুরা খায় তার জন্য সে বনে গেল। নিজের নিঃশেষে অন্যের স্বার্থে লাগানোর এই ইচ্ছার জন্যই সে গর্তে পেল এত সোনা। ফলে তার ঋণীদের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল।”
   রাজার এই ভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবসহ আর ফিরে গেল সেই গাছে।


(কল্পিত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য