ধনী ও দরিদ্র -- কাজাখ লোককাহিনী

নীল পাখি
    অনেকদিন আগে দুই ভাই ছিল। ছোট ভাইয়ের কোনো ছেলেপিলে ছিল না, বিরাট ব্যবসা তার, বেশ প্রাচুর্যের মধ্যেই থাকত। বড় ভাই দীনজীবন যাপন করত, তার জীবনের একটাই আনন্দ তার দুই ছেলে-হাসেন আর হুসেন।
    গ্রীষ্মকালে ফলে যেই পাক ধরত, হাসেন আর হুসেন ফল তুলতে যেত আর তাদের মা সেই ফল বাজারে নিয়ে গিয়ে বেচত। এভাবেই তাদের পরিবারের খাওয়া পরা চলত।
    একদিন দুপুরবেলায় চারদিক যখন নিস্তব্ধ, সূর্য ঠিক মাথার ওপর, রোদের তেজে চোখে এমন ধাঁধা লাগে যে নদীর জল বইছে কি বইছে না বোঝা যায় না, এমন সময় হাসেন আর হুসেন নদীর পাড়ের ঝোঁপঝাড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের পায়ের কাছ থেকে উড়ে বেরিয়ে গেল এক অপূর্ব সুন্দর নীল পাখি। তারা ভাল করে দেখে ওঠার আগেই পাখিটা অনেক উঁচুতে উড়ে চলে গিয়ে তারপর মিলিয়ে গেল। তখন হাসেন আর হুসেন পাখিটার বাসা খুঁজতে লাগল, খুঁজে পেলও বাসাটা। দেখে বাসায় রয়েছে ডিম কয়েকটা। প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গিয়েছিল তাদের তাই ডিমগুলো দেখে খুশী হল তারা। কিন্তু ভীষণ ছোট ডিমগুলো। তাই হাসেন হুসেন ভাবল, এগুলো খেলে পরে কিছু কাজই হবে না। তার থেকে বড়োলোক চাচার কাছে নিয়ে যাই। বাড়িতে না গিয়ে তারা গেল সোজা চাচার কাছে, ডিমগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল সেগুলো চাচা কিনবে কিনা।
    ‘কোথায় পেলে এগুলো?’ জিজ্ঞেস করল চাচা। মাঠে, আমরা যেখানে কালোজাম কুড়োচ্ছিলাম, সেখানে। দুই ভাই বলল । চাচা ডিমগুলো নিয়ে একশো রুবল দিল তাদের হাতে, তার তো অবাক । চাচা বলল:
    ‘যদি তোরা পাখিটাকে ধরতে পারিস তো আরো দুশ' রুবল দেব তোদের। চাচার নীল পাখিটার দরকার কেন, তা হাসেন হুসেন বুঝল না, কিন্তু তারা চিস্তাভাবনা না করে পাখি ধরার জাল নিয়ে চলল সেই জায়গায় যেখানে তারা পাখিটাকে দেখেছিল। পাখিটার বাসার ওপর জালটাকে বিছিয়ে দিয়ে নিজেরা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে রইল।
    একটু পরেই উড়ে এল পাখিটা, চারদিক তাকিয়ে বাসায় নামল যেই অমনি জালে আটকা পড়ল৷ অপূর্ব সুন্দর পাখিটাকে দেখে ছেলেদুটির খুব মায়া লাগলেও সেটাকে চাচার কাছে নিয়ে গেল তারা। অমন যে কিপটে চাচা এবারে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দিল দু’শো রুবল, চিনি আর জামাকাপড় (পাখিটার বেশ দাম আছে তার কাছে দেখা গেল)। দুই ভাই সে সব নিয়ে বাড়ী গেল। কিন্তু তাদের পরিবারে সুখ টিকল না।

নীল পাখির হৃৎপিন্ড 
    হাসান হুসেন বা তাদের বাবা কেউই জানল না যে চাচা পাখিটাকে বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে, কেটে তার স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলল:
    ‘সন্ধ্যাবেলায় ফিরব আমি, এটাকে রান্না করে রেখো আমার জন্যে। দেখো, এই মাংসের একটা টুকরোও কাউকে দিও না যেন। কেমন? '
তার স্ত্রী ভাবল, এটুকু মাংসতে কি হবে, একটা গোটা ভেড়া খেয়ে নেয় কর্তা যেখানে? কিন্তু কোন প্রতিবাদ না করে পাখিটার পালক ছড়িয়ে টুকরো করে কেটে কড়াইতে চাপিয়ে জল দিয়ে আগুনে বসলে। আর নিজে পাশের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে গল্পে জমে গেল ।
    এমন সময় হাসেন আর হুসেন কৌতুহলবশত চাচার বাড়িতে গেল পাখিটাকে নিয়ে চাচা কি করল দেখার জন্য। ঘরে ঢুকে দেখে সেখানে কেউ নেই। উনুনে বসান কড়াই থেকে ঘন ধোয়া উঠছে !
    'আমাদের পাখিটা সেদ্ধ হচ্ছে নাকি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা কয়ল হাসেন। ‘হৰে হয়ত’, হুসেনও সমান বিস্মিত । কড়াইটার ঢাকনা খুলে তারা দেখল যে সেই পাখিটা রান্না হচ্ছে । ‘আয়, পাখিটার মাংস কেমন একটু চেখে দেখি, বলল হাসেন। ‘নিশ্চয়ই চেখে দেখব, বলল হুসেন । হাতায় করে তারা পাখিটার হৃৎপিণ্ডটা তুলে নিয়ে আধাআধি করে খেল দু’জনে, তারপর চলে গেল ।
    চাচার স্ত্রী এদিকে ঘরে ফিরে হাতা দিয়ে মাংসটা নাড়তে গিয়ে দেখে হৃৎপিণ্ডটা নেই। কর্তার কাছে বকুনি খেতে হবে এখন এমন করে গল্পে জমে যাবার কি দরকার ছিল? নিজের ওপর রাগ হল তার।
   কিন্তু শুধু কথায় তো আর চিড়ে ভিজবে না। বাইরে বেরিয়ে উঠোনে মোরগটাকে ধরে, কেটে তার হৃৎপিন্ডটা নিয়ে কড়াইতে ফেলে দিল, তবে স্বস্তি হল তার।
    সন্ধ্যাবেলায় কর্তা বাড়ি ফিরল। মাংস খুব ভাল রান্না হয়েছে। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে কর্তা চোখ টিপে হেসে স্ত্রীকে বলল : 'এবার, গিন্নী, খোদা আমাদের সৌভাগ্য দিয়েছেন! সকালবেলায় ঘুম ভেঙে আমরা বালিশের নীচে মোহর পাব ?
    গিন্নী চুপ করে রইল । - সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা পেথে বালিশের নীচে কিছু নেই । গোটা বিছানাটা উল্টে হাটকেও কিছু পেল না।
    বনের মধ্যে হাসেন আর হুসেন সকালে ঘুম ভেঙে উঠে বালিশের নীচে একটা করে থলিভরা মোহর দেখে ভীষণ অবাক হল। তাদের বাবামাও তা দেখে কম অবাক হল না। তাদের বাবা জীবনে এই প্রথম এত মোহর দেখে ভয় পেয়ে গেল, দৌড়ল ভাইয়ের কাছে পরামর্শ চাইবার জন্য ।
    'হায়, হায়, ভাই রে, এ আমার কি হল? সকালে আমার ছেলেদের বালিশের নীচে থেকে এক থলি করে মোহর পাওয়া গেছে। এ ভাল না মন্দ বুঝছি না।"
    ধনী ভাইয়ের চোখ হিংসায় জ্বলে উঠল। ভ্ৰ কুঁচকে মুখ নামিয়ে ভীষণ স্বরে বলল; খারাপ, খুবই খারাপ জিন ভর করেছে নিশ্চয়! মোল্লার সঙ্গে কথা বলেছিলাম একবার, তিনি বলেছিলেন—‘অশুভ জিন মানুষের ক্ষতি করে! এই অশুভ জিনকে দূর করতে হবে। ছেলেদের দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে মেয়ে ফেল, ওরা বেঁচে থাকলে তোমার জীবনে ভাল কিছু হবে না। আর মোহরগুলো আমায় দিয়ে দাও।
    মুখ অন্ধকার করে হাসেন হুসেনের বাবা বাড়ি ফিরল। অনেক ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত স্থির করল, না, নিজের ছেলেদের মেরে ফেলতে আমি পারব না। অনেক দূরে বনের মধ্যে ওদের রেখে দিয়ে আসব যাতে আমি ওদের কথা শুনতে না পাই ।
    পরের দিন সকালবেলায় প্রতিবেশীর ঘোড়ার গাড়ীটা চেয়ে নিয়ে ছেলেদের তাতে বসিয়ে বলল : ‘এখন আমি তোমাদের নিয়ে যাব এমন এক জায়গায় যেখানে অনেক অনেক ফল আছে। সন্ধ্যাবেলায় নিতে আসব তোমাদের ততক্ষণে যেন তোমরা জমি কুড়িয়ে একবস্তা ভরতে পার।"
    অনেক পথ পেরিয়ে এক গভীর বনের কাছে এসে পৌছল তারা ; বড় বড় গাছগুলির গুড়িগুলোর মাঝে ঝোপ গজিয়ে উঠেছে, হাসেন হুসেন সেই ঝোপের মধ্যে অনেক জাম ফল আছে দেখতে পেল।
    বেশ, তোমরা এখান থাক তাহলে, ফল তোল। আর কোন কথা বেরুল না তাদের বাবার গলা দিয়ে, পিছন ফিরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে এগিয়ে গেল ঘোড়ার দিকে। বাড়ি ফিরে মোহরগুলো নিয়ে ভাইকে দিয়ে এল, এইভাবে অশুভ জিনের হাত থেকে রেহাই পেল সে।
    অনেকক্ষণ ধরে জাম কুড়ালো হাসেন আর হুসেন, বস্তা ভর্তি করে ফেলল। তারপর বসে বিশ্রাম করতে লাগল, বাবা আসার অপেক্ষা করতে লাগল। বাবা কিন্তু এলো না। বনেই রাতটা কাটাতে হল তাদের দু'জনকে ।
    ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে দেখে তাদের মাথার নীচে আবার এক থলি করে মোহর। মোহর ছুলোও না তারা। বনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল তারা যেদিকে দুচোখ যায়। পথে তাদের দেখা হল ঘোড়ায় চড়া এক বৃদ্ধ শিকারীর সঙ্গে ।
    সালাম দাদু দুভাই বলল একসঙ্গেই। 
    সালাম, বাছারা কোথা থেকে আসছ তোমরা আর যাচ্ছই বা কোথায় ? 
   ‘কোথা থেকে আসছি জানি না, বনটা তো বিশাল, আর যাচ্ছি পথে প্রথম যে লোকের সঙ্গে দেখা হবে তার কাছেই। তার যদি ছেলে না থাকে আমরা তার ছেলে হয়ে থাকব।'
    ‘আমার ছেলে-মেয়ে নেই, আমার ছেলে হবে তোমরা । যাবে আমার সঙ্গে? 
   'যাব! রাজী হল দু’ভাই। তাদের দুজনকে ঘোড়ার ওপর বসিয়ে দিয়ে বুড়ো বলল, “আমার ঘরের কাছে ঠিক তোমাদের পৌছিয়ে দেবে ঘোড়াটা ”
    ভাই দু’জন বুড়োকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, দাদু, যেখানে আমরা ঘুমিয়েছি রাত্রে সেখানে দুই থলি সোনার মোহর আছে।’
    ...হাসেন হুসেন বুড়ো শিকারীর কাছে রইল অনেকদিন, সেখানকার জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেল, তীর ছোড়া শিখল, অভিজ্ঞ, সাহসী শিকারী হয়ে উঠল  গরীব বুড়োও সেই অঞ্চলের সবচেয়ে ধনীতে পরিণত হল।
    হাসেন হুসেন যখন বড় হয়ে উঠল, তাদের বালিশের নীচে মোহর পাওয়া যায় না আর একদিন তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পুরনো দিনের কথা মনে করতে লাগল ।
    হাসেন বলল জানিস হুসেন, কথায় বলে, কুকুর যেখানেই ঘুরে বেড়াক না কেন, ঘুরেফিরে আসবে ঠিক সেখানেই যেখানে সে কখনো মাংস পেয়েছে, আর মানুষের মন টানে সব সময়ই সেইদিকে যেখানে তার জন্ম হয়েছে " চল, বাবা-মার খোঁজে বেরিয়ে পড়ি ।
    'আমার ভাইয়ের ইচ্ছা আর আমার ইচ্ছা—অভিন্ন । তুই যেখানে যাবি, আমিও সেখানে যাব। চল রওনা দেওয়া যাক ’ বলল হুসেন ।
    বুড়োর কাছে বিদায় নিতে গেল তারা। বুড়ো শিকারীর মায়া হল তাদের জন্য, বলল : 'একপাল গরু উপহার দিতে পারতাম তোমাদের কিন্তু তোমাদের দেখছি কিছুই দরকার নেই। যাত্রা শুভ হোক আর সাফল্য কামনা করি তোমাদের।
    তাদের দু’জনকে দুটো ভাল ঘোড়া দিল বুড়ো, রওনা হয়ে গেল দু'ভাই।

সাতমাথাওয়ালা সাপ 
    একমাস ধরে পথ চলে তারা এমন একটা জায়গায় এসে পৌছাল যেখানে রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে ।
    ‘এখানে আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাবে’ বলল হাসেন, তুই যাবি ডানদিকে আর আমি বাঁদিকে '
    ‘তাই হোক, হুসেন বলল, এখানেই আমরা এসে মিলিত হব ফেরার পথে।' 
    সেই জায়গাটায় কাঠের হাতলওয়ালা একটা ছুরি তারা মাটিতে পুঁতে দিল । 
    ‘আমাদের মধ্যে কে বেঁচে আছে বা মরে গেছে দেখিয়ে দেবে এই ছুরিটা, বলল হাসেন। যদি আমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তাহলে তার পথের দিকে ছুরির হাতলের যে আধখানা আছে তা পুড়ে যাবে '
    পরস্পরের কাছে বিদায় নিয়ে দুভাই দুদিকে রওনা দিল। হুসেন তার নিজের পথ ধরে যেতে থাকুক, হাসেন কোথায় গিয়ে পৌছায় এখন দেখা যাক ।
    কয়েকটা ঝোপঝাড় পেরিয়ে হাসেন যখন খোলা মাঠে পড়ল, দেখল তার সামনে এক বিরাট শহর ।
  শহরের যত কাছে এগিয়ে যাচ্ছিল হাসেন তত্তই অবাক হচ্ছিল। চারদিকে দেখা যাচ্ছে কালো পতাকা উড়ছে, বাড়িগুলো কালো কাপড় দিয়ে মোড়া ।
    শহরে এ শোকপালন কি জন্য? প্রথম যে বুড়ীর দেখা পেল তাকেই জিজ্ঞেস করল ।
  তুমি এ শহরের লোক নও দেখছি, বলল বুড়ী, যদি শুনতে চাও তো বলি, আমাদের শহরে দেখা দিয়েছে এক সাতমাথাওয়ালা রাক্ষস সাপ। প্রতিদিন তার খাওয়া চাই একটি মেয়ে আর একটা খরগোস। আজ রাজার মেয়েকে থাবার পালা এসেছে। রাজা চারদিকে ঘোষণা করেছেন যে সপটাকে মেরে রাজকন্যাকে বাঁচাতে পারবে তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবেন। কেবল শহরে তেমন কোন সাহসী লোককে পাওয়া যায় নি। তাই রাজা আদেশ দিয়েছেন চারদিকে কালো পতাকা টাঙিয়ে দিতে।'
    হাসেন সোজা রওনা দিল রাজার কাছে। রাজার সঙ্গে দেখা হল না। রাজার বিশ্রামকক্ষের পাশে একটা ঘরে দেখল একটা খরগোস বাধা রয়েছে আর এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। কালে চুলের বেনীটা তার উজবেকিস্তানের রেশমের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, তার চোখের দৃষ্টি সূর্যরশ্মির মতই ধাঁধা লাগায় চোখে। হাসেনকে দেখে কেঁপে উঠল রাজকন্যা।
'ভয় পেও না, হাসেন তাকে আশ্বাস দিল। আমি তোমায় রক্ষা করব সাপের কবল থেকে। কিন্তু তার প্রতিদানে তুমি আমায় কি দেবে ?
    যদি তুমি আমাকে রক্ষা করতে পার তবে তোমার স্ত্রী হব আমি। হাসেন একটু চিন্তা করে বলল: ‘আমি অনেক দূর থেকে আসছি, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। শুয়ে একটু ঘুমিয়ে নেব আমি, যখন সাপ আসবে ডেকে দিও আমায়।’
    হাসেন গভীর ঘুমে ডুবে গেছে, এমন সময় হঠাৎ ধূপ-ধাপ, দুম-দাম আরম্ভ হল আর দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল। দরজায় সাপটার প্রথমে একটা মাথা, তারপর আর একটা, তারপর আরো একটা মাথা দেখে রাজকন্যার বুক ভয়ে হিম হয়ে গেল ।
    হাসেন ওদিকে গভীর ঘুমে মগ্ন। মেয়েটির চীৎকারেও তার ঘুম ভাঙন না। সাপট এদিকে এগিয়ে আসছে ক্রমশ । রাজকন্যা হাসেনের ওপর ঝুঁকে পড়ে কাঁদতে লাগল। তার চোখের জলের উষ্ণ ফোঁটা হাসেনের মুখের ওপর পড়ে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
    চোখ মেলে হাসেন দেথে সামনেই সাপটা। কোমরে লাগান খাপ থেকে ভারী তরোয়ালটা তুলে এক কোপেই সাপটার সাতটা মাথা কেটে ফেলল ।
    রাজকন্যা নিজের আঙুল থেকে একটা সোনার আংটি খুলে তাকে দিল। হাসেন চলে গেল প্রাসাদ ছেড়ে।
   এমন সময় উজীর হঠাৎ দরজার মধ্যে উঁকি মেরে দেখে রাজকন্যা বেঁচে আছে আর সাপটা মুণ্ডুকাটা অবস্থায় পড়ে আছে। অবাক হল সে, কিন্তু তারপরেই তার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল, রাজার কাছে তার বীরত্ব প্রমাণ করার একটা সুযোগ এসেছে। রাজকন্যাকে দেখা না দিয়ে সে সোজা গিয়ে রাজাকে জানাল এই অপ্রত্যাশিত আনন্দের খবর !
    ‘আমি নিজের হাতে সাপকে মেরে রাজকন্যার জীবন রক্ষা করেছি।’ বলল উজীর । 'এবার আপনার প্রতিশ্রুতি রাখুন মহারাজ, রাজকন্যার সঙ্গে আমার বিয়ে দিন।'
    ‘তাই হবে!’ বলল রাজা। সাদা পতাকা টাঙাতে, বাড়িগুলো সাদা কাপড় দিয়ে সাজাতে আদেশ দিল রাজা, যাতে জনগণ জানতে পারে যে সাতমাথাওয়ালা রাক্ষসটাকে বধ করা হয়েছে আর রাজকুমারী জীবিত আছে। তারপর রাজা উজীরের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবার কথা ঘোষণা করুল !
    হাসেন শুনল উজীর কেমন দম্ভ করে বলছে সাপটকে মারার কথা। উজীরের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলল :
ও ভীরু আর মিথ্যাবাদী সাপট ও মারে নি, মেরেছি আমি, কি করে ও নিজের কথার সত্যতা প্রমাণ করবেঃ
    হাসেনের দিকে ফিরে তাকাল সবাই, ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগল তাকে। তুই-ই বা কি করে প্রমাণ করবি? অবহেলার ভাবে বলল উজীর। 
     ‘প্রমান আছে আমার।" বলে পকেট থেকে আংটিটা বের করে সবাইকে দেখাল সে।
    ‘আংটিটা ও চুরি করেছে রাজকুমারীর হাত থেকে! হিংস্রভাবে বলল উজীর। 
    ‘যদি তুমি সাপটকে মেরেই থাক, তার মানে, তুমি ওটার মরদেহটা তুলে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিতে পার। হাসেন বলল।
    উজীর সাপটকে তুলতে যত চেষ্টাই করুক না কেন এমনকি একটু নড়াতেও পারল না, আর হাসেন খুব সহজেই সাপটকে তুলে নিয়ে জানল গলিয়ে বাইরে ফেলে দিল। এমন সময় রাজা ডেকে পাঠিয়েছিল বলে রাজকন্যও বেরিয়ে এল, বলল:
    'এই তরুণ বীরই আমার জীবন রক্ষা করেছে, আমি নিজে ওকে ওই আংটিটা দিয়েছি।’
    উজীড়কে তাড়িয়ে দিয়ে রাজা হাসেনের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন। রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকের মধ্যে থাকতে থাকতে কিছুদিনের মধ্যেই হাফিয়ে উঠল হাসেন, তাই প্রায়ই সে শিকারে বেরিয়ে যেতে লাগল। একদিন দুপুরবেলায় সে নদীর তীর ধরে যাচ্ছিল ঘোড়ায় চড়ে। শিকারী কুকুরটাও ছুটছে তার সঙ্গে। নদীর তীরে ঝোপের গাছ থেকে ডাল কেটে নিয়ে হাসেন ঘোড়াকে চালাবার জন্য একটা লাঠি তৈরি করল। হঠাৎ হাওয়া উঠল । বরফ পড়া আরম্ভ হল, শীত করতে লাগল ভীষণ। হাসেন একটা জায়গা খুঁজতে লাগল যেখানে হাওয়া আর বরফের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, একটু গরম করে নেওয়া যায় শরীরটাকে। মাঠের মাঝখানে মস্ত বড় একটা দেবদারু গাছ দেখতে পেল। নরম বরফে ঢেকে গিয়ে গাছটা দেখাচ্ছে যেন তাবুর মত। সেই গাছের নীচে ঘোড়া আর কুকুরকে রেখে হাসেন গাছের শুকনো ডাল ভেঙে আগুন জ্বলিয়ে হাতপা গরম করতে লাগল। এমন সময় সে দেখল গাছের ওপর ডালপালার মধ্যে বসে কাঁদছে এক বুড়ী, এমন করুণভাবে কাঁদছে যেন তুষারঝড়ের শনশন আওয়াজ।
    'কাদছ কেন ? জিজ্ঞেস করল হাসেন। শীতে জমে গেছ নাকি? নেমে এসে আগুনের কাছে বস, শরীর গরম করে নাও।
   বুড়ী বলল, আমি নামতে তো পারি, কিন্তু কুকুরটাকে ভয় করছে। তোর ঐ লাঠিটা দে!'
   হাসেন বুড়ীর দিকে এগিয়ে দিল লাঠিটা, সেটার জাদুশক্তির কথা জানত না সে। লাঠিটা ঘোড়া, কুকুর আর হাসেনের মাথার ওপর নাড়াল-তারা তিনজনে তিনটি পাথরে পরিণত হয়ে সেই গাছের নীচেই পড়ে রইল ।

ভাইয়ের খোঁজে
    এবার হুসেনের কি হল দেখা যাক। ভাইয়ের থেকে আলাদা হয়ে যাবার পরে সে এক বড় শহরে রাজা হয়ে সেখানেই বাস করছিল।
যেদিন হাসেন পাথরে পরিণত হয় সেদিনই হুসেনের মনটা খারাপ লাগল, ভাইয়ের খোঁজে যাবে ভাবল সে; ঘোড়া সাজিয়ে রওনা দিল। শেষ পর্যন্ত যেখানে তাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল সেখানে এসে পৌছাল সে। ছুরিটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে, ছুরির হাতলের যেদিকটা হুসেনের পথের দিকে নির্দিষ্ট ছিল সে অংশটা ঠিকই আছে, আর অপর অংশটা পুড়ে গেছে। হুসেন বুঝল হাসেন মরে গেছে। কেঁদে ফেলল সে, জীবন্ত না হোক তার মৃতদেহটাকেই খুঁজতে যাব, স্থির করলো।
     হাসেন যে শহরে থাকত সেখানে এসে উপস্থিত হল হুসেন। তাকে সসম্মানে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রাসাদে তার সাথে দেখা হলো এক যুবতীর সঙ্গে, জানতে পারলে এ হলো তার ভাইয়ের স্ত্রী। হাসেনের মৃত্যুর পর উজীর শহরে ফিরে এসেছে। এখন হুসেনকে সে এমন আন্তরিক আপ্যায়ন জানালো যে হুসেনের মনে কেমন সন্দেহ হলো। কি একটা গোলমাল আছে, ভাবলো সে। উজীরের হাতেই কি ভাইয়ের প্রাণ গেল নাকি? সারারাত ধরে ভাবলো সে, সকালবেলায় ভাইয়ের স্ত্রীর কাছে শুনল যে সে শিকারে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তাকে খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়ল হুসেন । হাসেনের মতো হুসেনও তুষার ঝড়ের পাল্লায় পড়ল। যে দেবদারু গাছটা তার ভাইয়ের আশ্রয়স্থল আর সমাধি হয়েছিল সেটাই হুসেনকেও আশ্রয় দিল। শরীর গরম করার জন্য সেও আগুন জ্বালাল তারপর গাছের ডালপালার মধ্যে বসে থাকা বুড়ীকে দেখে ভাইয়ের মত তারও মায়া হল।
    গাছ থেকে নেমে এস বুড়ীমা, শরীর গরম করে নাও, বলল সে। ‘নেমে আসতে তো পারি, কিন্তু কুকুরটাকে ভয় করছে। বলল বুড়ী, ‘দাঁড়া, এই লাঠি দিয়ে ওকে একটু ভয় দেখাই ?
    হুসেন বুড়ীর দিকে তাকাল, বুকের মধ্যে কি যেন একটা ধাক্কা দিল তাযর। বুড়ীকে তার জাদু লাঠিটা মাড়াতে দিল না সে। যে পাথরটার ওপর সে বসেছিল তার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীরধনুক বাগিয়ে ধরে বলল :
    ‘নাম শীগগির, নাহলে এখুনি তীর বিধবে তোর গায়ে! বুড়ী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাছ থেকে মেমে এল। 'আমার মনে হচ্ছে তুই জানিস কোথায় আমার ভাই। বল শীগগির, মেরে ফেলব নাহলে। '
    যে পাথরটার ওপর তুই বসেছিলি ওটাই তোর ভাই, বলল বুড়ী। উজীর আদেশ দিয়েছিল তোর ভাইকে ভুলিয়ে এখানে নিয়ে এসে মেরে ফেলতে! তোর ভাইকে আমি ফিরিয়ে দেব, ছেড়ে দে আমাকে। গাছের ডালপালার মাঝে লুকানো লাঠিটা নিয়ে পাথরটার ওপর নাড়িয়ে দে।
    তাই করল হুসেন-এক মুহূর্তে যে পাথরটার ওপর সে বসেছিল সেটা হাসেন হয়ে গেল। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই মিলনে দু’ভাইয়ের যে কি আনন্দ হল তা বলে বোঝাল যায় না।

ধরে ফেরা
হুসেন, বেশ কিছুদিন রইল হাসেনের কাছে তারপর একদিন ভাইকে বলল : 'হাসেন, বুড়ো শিকারীর কাছে থাকার সময় তুই আমাকে যে প্রবাদবাক্যটা বলেছিলি তা তোকে মনে করিয়ে দিই- কুকুর খোঁজে সেই জায়গাটা যেখানে পেট ভরে খেতে পায় আর মানুষ খোঁজে সেই জায়গাট যেখানে তার জন্ম হয়েছে। এবার আমাদের বাবা-মায়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়া উচিত নয় কি?’
    'যদিও তুই প্রবাদবাক্যটা ঠিক বলতে পারিস নি, তবুও আমি রাজী। বাবা-মা বেঁচে আছে। দেখতে চাইলে আর দেরী করা উচিত নয় আমাদের।
    যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। প্রথম যে সওদাগরের দলটার দেখা পেল তাদের সঙ্গেই রওনা দিল হাসেন আর হুসেন । তারপর উৎসবের দিনে তাদের শহরের মেলায় এসে পৌছল তারা। সেখানে তাদের ধনী ব্যবসাদার চাচাকে দেখতে পেল তারা, মেলায় ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র দেখছে। মাল বয়ে নিয়ে আসা বড় সওদাগর দলটার কাছেও এগিয়ে গেল ; ভাইয়ের ছেলেদের চিনতে পারল না সে, আর যখন তারা নিজেদের পরিচয় দিল তখন সে তোষামোদ করতে লাগল তাদের।
    আমাদের বাবামা কোথায়? একসঙ্গে প্রশ্ন করুল দুভাই।
    শহরেই আছে। কিন্তু সে বুড়োবুড়ীকে নিয়ে কি আর হবে তোমাদের। চোখেও দেখে না তারা। তোমরা তো এখন বেশ ধনী হয়ে উঠেছ দেখছি, বলল চাচা।
    হাসেম হুসেন সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল বাবামার কথা। লোকেরা তাদের দেখিয়ে দিল একট জীর্ণ, প্রায় ভেঙে পড়া কুটীর। কোনো জানলা নেই কুটীরটিতে, অন্ধকারে কিছু বোঝা যায় না কে আছে ভেতরে। হাসেন-হুসেন আগুন জ্বালিয়ে দেখল তাদের অন্ধ বুড়ো বাবা-মা নোংরা ছেড়া জামাকাপড় পরে বসে আছে।
    “বাবা! মা! তোমাদের কি হয়েছে? চীৎকার করে বলল হাসেম হুসেন। তাদের গলার স্বর শুনে মা'র চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল । বাবা আনন্দে উত্তেজনায় হাত নাড়িয়ে বলল: এখনও পৃথিবীতে এমন কেউ আছে নাকি যার আমাকে প্রয়োজন? আমার যে ছেলেরা অনেকদিন আগেই মারা গেছে তারা ফিয়ে এল নাকি?
    হাসেন হুসেন সব বলল বাবা-মাকে— কোথায় ছিল এতদিন, কি দেখেছে আর শেষ পর্যন্ত কেমন করে বাবা-মাকে খুঁজে পেল ইত্যাদি।
    ‘তুমি আমাদের বনে ছেড়ে এসেছিলে কেন? মোহরগুলোর লোভে নাকি?’ হাসেন জিজ্ঞেস করল বাবাকে ।
    তখন তুমি আমাদের বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এলে না কেন? তাহলে তুমি আরো অনেক বেশী মোহর পেতে হুসেনও বাবাকে খোঁটা দিতে ছাড়ল না।
    ‘রাগ কোরো না আমার ওপর, বাছারা’ কেঁদে বলল বুড়ো। তোমাদের চাচা বলল যে আল্লাহর ইচ্ছা আমি যেন মোহরগুলো ভাইকে দিয়ে দিই আর তোমাদের মেরে ফেলি কারণ তোমাদের ওপর জিন ভর করেছে। তোমাদের না দেখতে পাওয়ার দুঃখ আমরাও ভোগ করেছি; আর দেখছই তো কেমন আছি আমরা। তোমাদের বড়লোক চাচা মোটেই দেখে নি আমাদের। কিন্তু সব থেকে যে বড় শাস্তি পেলাম তা হল তোমাদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না!"
    চুপ করে গেল বুড়ো !
    হাসেন হুসেন তখুনি কুটীর থেকে মেলায় গেল, চাচাকে খুঁজে বার করে কূয়োর মধ্যে ফেলে দিল ।
    মেলা থেকে বাড়ীতে ফিরে হাসেন হুসেন দেখে তাদের বাবা-মা দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে, চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে তারা, ছেলেদের দেখে দেখে আর আশ মিটছে না তাদের। খুব অবাক হল দুভাই প্রথমটায়, তারপর আন্দাজ করল, এও হল সেই জাদুলাঠিরই কাজ ।

এই গল্পটির ইপাব বই আছে

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য