বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ২০তম উপাখ্যান

    আবার ভোজরাজ সিংহাসনে বসতে গেলে আর একটি পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম মন্মথসঞ্জীবনী। আগে আমার এই গল্পটি শুনুন, তারপর সিংহাসনে বসবেন।
    রাজা বিক্রমাদিত্য বছরে ছয় মাস রাজত্ব করতেন আর ছয় মাস দেশভ্রমণ করতেন।
   একবার দেশভ্রমণে বের হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পদ্মালয় নামে এক নগরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে এক উদ্যানে জলপূর্ণ একটি সরোবর দেখে সেই সরোবর থেকে জল পান করলেন। তারপর একটি গাছের নীচে বিশ্রাম করতে বসলেন।
    ঐ সময় আরো কয়েকজন বিদেশী তৃষ্ণার্ত হয়ে ঐ সরোবরে জল পান করে ঐ গাছের নীচে বসে পরস্পর কথোপকথন করতে লাগল।
    তারা সকলেই স্বীকার করল, অনেক দেশ পরিভ্রমণ করেছি কিন্তু কোন মহাপুরুষের দর্শনলাভ আজও হল না ।
    একজন বললো, মহাপুরুষ দর্শন আমাদের ভাগ্যে ঘটবে কি করে? তাঁরা যেখানে থাকেন সে স্থান মানুষের অগম্য। পথ অতি দুৰ্গম, পথে বিঘ্নও অনেক।
    রাজা এই কথা শুনে বললেন, ওহে বিদেশী, এ কথা কেন বলছ, তোমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারলাম না। মানুষ যদি পৌরুষ এবং সাহসের সঙ্গে কাজ করে তাহলে কোন কাজই দুঃসাধ্য থাকে না। শাস্ত্রও বলেছে, মানুষ সাহস করলে বাঞ্ছিত দু'প্রাপ্য বস্তুও লাভ করতে পারে, কিন্তু যারা অলস প্রকৃতির তাদের তা কখনও লাভ হয় না; আকাশ থেকে কখনও কখনও জল পাওয়া যায় কিন্তু পাতাল থেকে জল আসবেই।
    রাজার এই কথা শুনে সেই বিদেশী বললো, আপনি কি করতে মনস্থ করেছেন বলুন ?
    রাজা বললেন, এখান থেকে দ্বাদশ যোজন পথ অতিক্রম করতে পারলে মহারণ্যে পৌঁছান যাবে। সেখানে বিরাট এক পর্বত দেখা যাবে- সেখানে বাস করেন যোগীশ্রেষ্ঠ ত্রিকালনাথ। তাঁকে দর্শন করলে তিনি সমস্ত বাঞ্ছিত বস্তু দান করেন। আমি সেখানেই যাচ্ছি।
    বিদেশী বললো, আমরাও আপনার সঙ্গী হব। অনুমতি করুন।
    রাজা বললেন, আপত্তির কোন কারণ নেই। এরপর তারা রাজার সঙ্গে চলতে চলতে দুর্গম অরণ্যপথ দেখে বললো, সেই পর্বত আর কত দুরে? রাজা বললেন, এখান থেকে আট যোজন দূরে সেই পর্বত। পথ খুবই দুৰ্গম, তবু আমরা সেখানে যাবই। ছয় যোজন পথ অতিক্রম করার পর দেখল অতি ভয়ঙ্কর এক সাপ পথ অবরোধ করে পড়ে আছে। তার মুখ থেকে আগুনের মত বিষ বের হচ্ছে। সেই ভয়ঙ্কর সাপ দেখে ভয়ে সকলেই পালিয়ে গেল! রাজা কিন্তু ভয় না পেয়ে এগিয়ে চললেন। সাপটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন। তারপর যোগী ত্রিকালনাথকে দর্শন করে প্রণাম নিবেদন করলেন। যোগীরাজকে দর্শনমাত্র রাজা বিষমুক্ত হয়ে আগের মত সুস্থ হলেন।
    যোগীবর মৃদু হেসে বললেন, মানুষের অগম্য বিপদসঙ্কল এই স্থান, তুমি এত কষ্ট স্বীকার করে এখানে এসেছ কেন?
    রাজা বললেন, প্রভু, আমি আপনাকে দর্শন করতে এসেছি।
    যোগী বললেন, তোমার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে।
    রাজা বললেন, আমার কোন কষ্টই হয় নি বরং আপনাকে দর্শন করে আমার সকল পাপ দূর হল। আমি আজ ধন্য ।
    যোগীরাজ সন্তুষ্ট হয়ে রাজকে একটি ঘুঁটি, একটি ডাণ্ড ও একখানি কাঁথা দিয়ে বললেন, হে রাজন, এই ঘুঁটি দিয়ে মাটিতে যতগুলি দাগ টানা যায় একদিনে তত যোজন পথ যাওয়া যাবে। এই ভাণ্ডাটি ডান হাতে নিয়ে মৃত সৈন্যের গায়ে স্পর্শ করলেই সে জীবিত হয়ে উঠবে। আর বা হাত দিয়ে স্পর্শ করলে বিপক্ষের সৈন্য বিনাশ হয়ে যাবে। আর এই কাঁথাখানির কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়।
    রাজা ঐ তিনটি মহামূল্যবান জিনিস নিয়ে যোগীবরকে প্রণাম করে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
    পথে দেখলেন এক রাজপুত্র আগুন জ্বালার জন্য কাঠ সংগ্রহ করছে। রাজা জানতে চাইলেন, এ তুমি কি করছ?
    আমার রাজ্য কেড়ে নিয়েছে। আমি আজ সব হারিয়ে দরিদ্রজীবন যাপন করছি, এ আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে; তাই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরবো।
    রাজা তাকে নিরস্ত করে যোগীর কাছে পাওয়া সেই ঘুঁটি, ডাণ্ডা ও কাঁথাখানি তাকে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন এই তিনটি জিনিসের কি কি গুণ।
    রাজকুমার অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে রাজাকে প্ৰণাম করে সেস্থান ত্যাগ করে চলে গেল। রাজা বিক্রমাদিত্যও তাঁর রাজধানী উজ্জয়িনীতে ফিরলেন।
    পুতুল ভোজরাজকে বললো, রাজন, আপনার মধ্যে কি এই উদারতাগুণ আছে?
    রাজা যথারীতি মৌন হয়ে রইলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য