সম্রাজ্ঞীর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু

    একদা সম্রাট তার এক বেগমের প্রতি কী যেন একটা বিশেষ কারণে অতিশয় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এখনই বাপের মুলুকে চলে যাও। তোমার মুখ দেখতে চাই না কোনওদিন।'
মহিষী কাঁদো কাঁদো হয়ে সম্রাটের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু সম্রাট অত্যন্ত কঠিন, ক্ষমা করতে মোটেই তিনি প্রস্তুত নন। মহিষীর কোনও ওজর আপত্তি সম্রাট কোনওমতেই শুনলেন না। তিনি যে আদেশ একবার দিয়েছেন সে আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই।
    অবশেষে হতাশ হয়ে বেগমসাহেবা বীরবলকে লুকিয়ে ডেকে পাঠালেন। বীরবল আসতেই তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে পরামর্শ চাইলেন কী করে এ বিপদ থেকে মানসম্মান বজায় রেখে সবদিক সামলানো যায় তার উপায় বের করতেই হবে।
    বীরবল অনেকক্ষণ ভেবে একটা মতলব ঠাওরালেন ও মতলবটা মহিষীকে বলে চলে গেলেন। মতলবটা চাপা রইল।পরদিন তার মালপত্র গুছিয়ে বাদশার কাছে বিদায় নিতে গিয়ে আকবরের সামনে দাঁড়ালেন মহিষী। তিনি পুনরায় ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, কিন্তু এবারও মিথ্যে হল অনুনয়। সম্রাটের হুকুম কোনও মতেই নড়বে না,তবে কিনা সম্রাটপত্নী তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, এই মাত্র। এর বেশি কোনও মতেই হুকুমের নড়চড় হবে না! এই হল চূড়ান্ত আদেশ। মহিষীর চোখে অশ্রু। তিনি বললেন, যাচ্ছি তবে একটি ভিক্ষা চেয়ে নিই। নিজের হাতে শরবত প্রস্তুত করেছি, যদি একটু আপনি পান করেন। হয়তো এ জীবনে আর কোনওদিন নিজের হাতে আপনাকে আর কিছু খাওয়াতে পারব না। এই আমার শেষ সাধ। কোনওদিন হয়তো আপনাকে দেখতেও পাব না। এই বলে চোখের অশ্রু মুছতে লাগলেন।
বাদশা নিঃসংকোচে শরবতটুুকু পান করলেন এবং মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গাঢ় নিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে গেলেন।
    তখনি দুখানি পালকি এসে পৌঁছল প্রাসাদের তোরণে। নিদ্রিত সম্রাটকে তোলা হল একখানিতে, অন্যখানিতে স্বয়ং রাজমহিষী। দিল্লি নগরী ছাড়িয়ে তারা চলেছেন তো চলেছেনই। 
    সকালে ঘুম ভাঙল সম্রাটের। এ তিনি কোথায়? তিনি কি নিদ্রিত না স্বপ্নাচ্ছন্ন। এ কাদের বাড়ি? রাজপ্রাসাদ তো নয়? আমি এখন কোথায় ?’ বললেন তিনি।
    রাণীকে প্রশ্ন করলেন তিনি,‘কেমন করে এখানে এলুম?
    রানী বললেন, সম্রাট, এ আপনারই হুকুমে। আপনিই বলেছিলেন, আমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে আমি সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়ি আসতে পারি। আপনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। তাই আমি আপনাকে নিয়ে এসেছি আমার সঙ্গে।’
    বাদশা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে দিনকয়েকের জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে গেলেন। রানী একদিন স্বীকার করলেন, বীরবলের কাছ থেকেই তিনি এই কৌশলটি নিয়েছেন। বললেন, “আমি সামান্য রমণী মাত্র, কী করে এমন বুদ্ধি হবে সম্রাট! আমার দোষ এবার মার্জনা করুন আপনি। শত অপরাধ থাকলেও ক্ষমা করুন।’

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য