বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ৭ম উপাখ্যান

   পরের দিন ভোজরাজ আবার সিংহাসনে বসতে গেলে আর একটি পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম কুরঙ্গনয়না, রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকালে প্রজারা সুখে বাস করত। রাজ্যে দুর্জন লোক কেউ ছিল না। সকলেই পরোপকার করতে চাইত। পরের উপর অপবাদ দেওয়াকে ঘৃণা করত। সব সময় সত্য কথা বলত ; জীবের প্রতি দয়া, ঈশ্বরে ভক্তি, সকলেরই এই সব গুণ ছিল। রাজার অনুগ্রহে সকলেই সুখে বাস করত।
   সেই নগরে ধনদ নামে এক বণিক বাস করত। তার অতুল ঐশ্বর্য ছিল। কিন্তু এত ঐশ্বর্য থাকলেও ধনদের সবকিছুর উপর বিতৃষ্ণ দেখা দিল। বণিক ভাবতে লাগল, সংসার অসার। আশ্রিত বা অনাশ্রিত, বন্ধু-বান্ধব মাত্রেই বন্ধনের কারণ। তাই সবকিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করে পবিত্র ধর্মপথে চলতে হবে। শাস্ত্রেও আছে ধর্মকে রক্ষা করলে ধর্ম তাকে রক্ষা করে। সুতরাং ধৰ্মই মানুষের প্রকৃত বন্ধু এবং ধাৰ্মিক অপেক্ষা সুখী ও বিদ্যান আর কেউ হয় না। অতএব ধর্ম সংগ্রহের জন্য উপার্জিত ধন সৎপাত্রে দান করা উচিৎ। সৎপাত্রে দান করলে সেই ধন বহুগুণ হয়।
   এমনিভাবে বিচার বিবেচনা করে ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে গোদান, কন্যাদান, বিদ্যাদান, ভূমিদান ও জলদান প্রভৃতির বিধি ও মাহাত্ম্য জেনে সৎপাত্রে ঐ সমস্ত দান করতে আরম্ভ করল। এই সব করার পর তার মনে হল, আমার এই দান তখনই সফল হবে যখন দ্বারকায় গিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করব।
   মনে মনে এই কথা ভেবে বণিক দ্বারকার পথে রওনা হল। সমুদ্রতীরে গিয়ে নাবিককে ডেকে তাকে প্রচুর অর্থ দান করে ভিক্ষু, যোগী, বিদেশী, অনাথ ও দীনদরিদ্রদের সঙ্গে নৌকোয় চড়ে তাদের সঙ্গে মধুর আলাপ ও ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগল।

   একদিন সে দেখল সমুদ্রের মধ্যে একটি ছোট দ্বীপে একটি দেবমন্দির রয়েছে। তখন সেই মন্দিরে গিয়ে দেবী ভুবনেশ্বরকে পূজা করে যেই বাঁদিকে তাকিয়েছে অমনি দেখল একটি পুরুষ ও একটি নারীর মুণ্ডকাটা দেহ পড়ে আছে এবং সামনের দেওয়ালে লেখা আছে, যদি কোন পরোপকারী পুরুষ তার নিজের গলা কেটে দেবী ভুবনেশ্বরীকে উৎসর্গ করে তবেই এই পুরুষ ও নারী আবার বেঁচে উঠবে।
   দেওয়ালের লেখা পড়ে বণিক ধনদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। যাইহোক, নৌকোয় উঠে দ্বারকায় গেল এবং শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন ও পূজা করে পুনরায় নিজ নগরের দিকে যাত্রা করল।
   নগরে ফিরে গিয়ে ধনদ আত্মীয়-বন্ধুদের কৃষ্ণের প্রসাদ বিতরণ করে রাজদর্শনে গেল। রাজা তার কুশল জিজ্ঞাসা করলে বণিক সাগরের মধ্যে মন্দিরে অবস্থিত দেবীর বষিয় সব খুলে বললো।
   শুনে রাজা বিস্মিত হলেন এবং ধনদের সঙ্গে সেই স্থানে গিয়ে মন্দিরে দেবীর বাঁ পাশে থাকা ছিন্নমস্তক নর ও নারীর দেহ দুটি দেখলেন। তখন রাজা বিক্রমাদিত্য দেবীর নাম স্মরণ করে যেই নিজের গলায় খড়গ বসাতে যাবেন অমনি সেই মৃতদেহ দুটি জীবন ফিরে পেল।
   এদিকে দেবীও রাজার হাত থেকে খড়গখানা নিয়ে বললেন, আমি প্রসন্ন হয়েছি, বর চাও আমার কাছে ।
   রাজা বললেন, হে দেবী ! যদি প্রসন্ন হয়ে থাক তবে এই দু'জনকে রাজ্য দান কর।
   দেবী তথাস্তু বলে সেই দম্পপতিকে রাজ্য দান করলে রাজা ধনদের সঙ্গে নগরে ফিরে এলেন।
  পুতুল গল্পটি শেষ করে বললো, মহারাজ, আপনার এমন পরোপকার করার যদি শক্তি থাকে, তবে এই সিংহাসনে বসুন।
   ভোজরাজ সরে দাঁড়ালেন। সেদিনও তাঁর সিংহাসনে বসা হল না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য