ডোরাকাটা পটির রোমাঞ্চকর কাহিনী [ দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য স্পেকলড ব্যান্ড ]-১

     শার্লক হোমস মামলা হাতে নিত বেছে। উদ্ভট, অদ্ভুত, ফ্যানটাসটিক রহস্য না-হলে টাকার প্রলোভনেও আজেবাজে কেসে নাক গলাত না। ও ভালোবাসত জটিল ধাঁধার সমাধান করতে এবং ভালোবাসার টানেই দেখেছি গত আট বছরে সত্তরটি অত্যদ্ভুদ মামলার সমাধান করেছে। এর প্রতিটিতে ওর সান্নিধ্যলাভের সুযোগ আমি পেয়েছি, ওর আশ্চর্য তদন্ত পদ্ধতি লক্ষ করেছি। এইসবের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর কেস হল স্টোকমোরানের নামকরা ফ্যামিলি রয়লটদের ব্যাপারটা।
     ১৮৮৩ সালে এপ্রিল তখন সবে শুরু হয়েছে। সাতসকালে ঘুম ভেঙে গেল। অবাক হয়ে দেখলাম, আমাকে ঠেলে তুলেছে শার্লক হোমস স্বয়ং। অথচ চিরকালই বেলা পর্যন্ত ঘুমোনো ওর অভ্যেস।
     ‘ওয়াটসন,মক্কেল এসেছেন।তরুণী মক্কেল। এত সকালে যখন বাড়িসুদ্ধ সবাইকে জাগিয়েছেন, তখন বুঝতে হবে কেসটা ইন্টারেস্টিং। তোমাকে তাই না-ডেকে পারলাম না।’
     'আরে ভাই, ভালোই করেছ। এ-সুযোগ কেউ ছাড়ে।
     আশ্চর্য বিশ্লেষণী শক্তি আর যুক্তির খেলা দেখিয়ে হোমস যেভাবে রহস্য সমাধান করে, তা চিরকালই আমার কাছে একটা গভীর আনন্দের ব্যাপার। তাই চটপট সেজেগুজে নিয়ে গেলাম বসবার ঘরে। আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন একজন মহিলা। মুখটা কালো ওড়নায় ঢাকা।
     প্রসন্ন কন্ঠে হোমস বললে, ‘আমার নাম শার্লক হোমস। ইনি আমার প্রাণের বন্ধু ড. ওয়াটসন— সহযোগীও বটে। এর সামনেই সব কথা বলতে পারেন। আপনি বরং আগুনের পাশে বসুন। শীতে কাঁপছেন দেখছি।’
     ‘শীতে নয়, মি. হোমস আমি ভয়ে কঁপিছি, বলে মুখ থেকে ওড়না সরালেন মেয়েটি। দেখলাম, সত্যিই উদবেগ আতঙ্কে মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে, চোখে ভয়তরাসে চাহনি। বয়স তিরিশের নীচে। অকালে চুল পেকেছে।
     পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিচ্ছিল চাহনি বুলিয়ে নিয়ে হোমস অভয় দিয়ে বলল, ভয় কী? সব ঠিক হয়ে যাবে। সকালের ট্রেনে এলেন?
     ‘হ্যাঁ। আপনি তাহলে চেনেন আমাকে?”
    ‘না, চিনি না, তবে রিটার্ন টিকিটটা দস্তানায় গুজে রেখেছেন দেখা যাচ্ছে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন কাক-ডাকা ভোরে। এক ঘোড়ায় টানা হালকা গাড়িতে স্টেশনে পৌছেছেন। রাস্তা অনেকখানি এবং খুবই খারাপ।
     ভদ্রমহিলা হতভম্ব হয়ে গেলেন।
     মৃদু হাসল হোমস, ‘জামার সাত জায়গায় কাদা লাগিয়ে এসেছেন। এক ঘোড়ায় টানা গাড়িতে কোচোয়ানের বাঁ-পাশে বসলে তবে ওইভাবে কাদা ছিটকে লাগে গায়ে।’
     ‘ধরেছেন ঠিক। সত্যিই বাড়ি থেকে বেরিয়েছি ছ’টার আগে। মি. হোমস, এ অবস্থা বেশিদিন চললে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব আমি। আপনি আমাকে বাঁচান। এই মুহুর্তে আপনাকে টাকাকড়ি দিতে পারব না— কিন্তু দু-এক মাসের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যাবে আমার। আমার টাকা তখন আমারই হাতে আসবে। আপনার পাওনা আমি মিটিয়ে দেব।’
     ‘আপনার সমস্যাটা বলুন।'
    সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে কতকগুলো ধোয়াটে ব্যাপারের জন্যে। ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছি। একমাত্র একজনই আমাকে উচিত পরামর্শ দিতে পারেন এ-পরিস্থিতিতে— কিন্তু তিনিও খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। ভাবছেন সবটাই মনগড়া ব্যাপার— ভয় পেয়ে উলটোপালটা ভাবছি। মেয়েলি কল্পনা। আপনার কাছে ছুটে এসেছি সেই কারণেই।’
     ‘বেশ তো বলুন না।’
     ‘আমার নাম হেলেন স্টোনার। স্টোকমোরানের রয়লট ফ্যামিলির শেষ বংশধর আমার সৎ-বাবা। এককালে এ-বংশের প্রতাপ ছিল, টাকার জোর ছিল— এখন দু-শো বছরের বাড়িটা আর কয়েক একর জমি ছাড়া কিছু নেই।
     ‘আমার সৎ-বাবা এই বংশের শেষ পুরুষ। উনি ভাগ্য ফেরানোর জন্যে কলকাতায় যান, ডাক্তারি করে যথেষ্ট রোজগার করেন। তারপর একদিন রাগের মাথায় খাস চাকরকে মারতে মারতে একদম মেরে ফেলায় কোনোমতে ফাঁসির দড়ি থেকে বেঁচে যান, কিন্তু জেল খাটতে হয় অনেক দিন। জেল থেকে বেরিয়ে চলে আসেন ইংলন্ডে।
     ‘বেঙ্গল আর্টিলারির মেজর স্টোনার আমার বাবা। আমরা দুই বোন— জুলিয়া আর আমি— যমজ। উনি মারা যাওয়ার পর আমাদের বয়স যখন মাত্র দু-বছর, মা বিয়ে করে ডা. রয়লটকে। বিয়েটা হয় ভারতবর্ষে।
     ‘মায়ের যা টাকা ছিল, তা থেকে বছরে হাজার পাউন্ড আয় হত। সৎ-বাবাকে মা সব টাকাই উইল করে দিয়েছিলেন একটা শর্তে। আমাদের বিয়ের পর কিছু টাকা দুই বোনকে দিতে হবে’। ইংলন্ডে ফিরে আসার পর আট বছর আগে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে মা মারা যায়। লন্ডনে প্র্যাকটিস করবেন ভাবছিলেন সৎ-বাবা, এই ঘটনার পর তিনি আর সেসবের মধ্যে গেলেন না। স্টোকমোরানে বাপ-ঠাকুরদার ভিটেতে ফিরে এলেন।
     ‘প্রতিবেশীরা তখন খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু দু-দিন যেতে-না-যেতেই তারা সৎ-বাবার ছায়া মাড়ানোও ছেড়ে দিল। কারণ তার বদমেজাজ। বাড়ি থেকে বেরোতেন না, কারো সঙ্গে মিশতেন না। বংশের আদিপুরুষের মতো এমনিতেই রগচটা ছিলেন– অনেকদিন গরমের দেশে থাকার ফলে মেজাজ আরও তিরিক্ষে হয়ে গিয়েছিল। কয়েকটা ঝামেলা পুলিশ কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এই সেদিন গাঁয়ের কামারকে পাঁচিলের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন নদীর জলে। গায়ে তার আসুরিক শক্তি। মেলামেশা করেন যাযাবর বেদেদের সঙ্গে। নিজের কাঁটা জমিতে তাদের থাকতে দেন। নিজেও মাঝে মাঝে তাদের তাবুতে গিয়ে থাকেন— ওদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। ভারতবর্ষের জন্তুজানোয়ার পুষতে ভালোবাসেন। একটা চিতাবাঘ আর একটা বেবুন তো নিজের বাগানেই ছেড়ে রাখেন— তল্লাটের কেউই তাই আমাদের ত্রিসীমানায় আসতে চায় না। কোনো চাকরবাকরও বাড়িতে থাকতে চায় না। আমরা দুই বোন সব কাজ করেছি। জুলিয়া মারা যায় তিরিশ বছর বয়সে। আমার মতন তারও চুলে পাক ধরেছিল মৃত্যুকালে।
     বোন মারা গেছেন? 
    ‘দু-বছর আগে। বুঝতেই পারছেন, এ অবস্থায় কেউই আমরা সুখে ছিলাম না। কোথাও বেরোতে পারতাম না— মাসির কাছে যাওয়া ছাড়া। মাসি বিয়ে-থা করেনি— থাকত হ্যারোতে। সেইখানেই গিয়ে থাকতাম মাঝে মাঝে। দু-বছর আগে বড়োদিনের সময়ে সেখানেই নৌদপ্তরে এক আধা মাইনের রিটায়ার্ড মেজরের সঙ্গে জুলিয়ার বিয়ে ঠিক হয়। স্টোকমোরানে ফিরে আসার পর সৎ-বাবা বিয়ের কথা শুনলেও কোনো আপত্তি করেননি। দিন কয়েক পরেই মানে, বিয়ের ঠিক পনেরো দিন আগে, একটা লোমহর্ষক ঘটনা ঘটল। মারা গেল জুলিয়া।
     এতক্ষণ চোখ মুদে শুনছিল হোমস। এবার অর্ধনিমীলিত চোখে বললে, “সমস্ত বলবেন— কিছু বাদ দেবেন না।’
     ‘নিশ্চয় বলব। সেই ভয়ংকর রাতের কোনো কথাই এ-জীবনে আর ভুলতে পারব না।
    স্টোকমোরানের জমিদার ভবন দু-শো বছরের পুরোনো। পোড়োবাড়ির অবস্থায় পৌছেছে। একটা অংশে কোনোমতে থাকা যায়। শোবার ঘরগুলো একতলায়। একটা বারান্দার পাশে পাশাপাশি তিনটে শোবার ঘর। তিনটে ঘরেরই জানলার পাশে ঘাস-ছাওয়া লন। প্রথম ঘরটা সৎ-বাবার, দ্বিতীয়টা জুলিয়ার, তৃতীয়টা আমার। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার দরজা নেই– কিন্তু সব ঘরের দরজা আছে একই বারান্দার। বসবার ঘরটা বাড়ির মাঝের অংশে।
     ‘ভয়ংকর সেই রাতে সৎ-বাবা একটু তাড়াতাড়ি শুতে গেলেন। ঘরে গিয়ে কড়া চুরুট খেতে লাগলেন। ভারতীয় চুরুট। নিজের ঘরে বসে সেই গন্ধে তিষ্ঠোতে না-পেরে জুলিয়া এল আমার ঘরে। আসন্ন বিয়ে সম্বন্ধে একটু গল্পগুজব করার পর এগারোটা নাগাদ উঠে দাঁড়াল নিজের ঘরে যাবে বলে। তারপর বললে, ‘হেলেন, তুই কি রাতে শিস দিস?
     আমি বললাম, ‘না তো।” 
    ও বলল, কিন্তু রোজ রাতে শিসের আওয়াজ শুনছি ক-দিন। আমি ভাবলাম তুই বুঝি ঘুমিয়ে শিস দেওয়া আরম্ভ করেছিস।
     আমি বললাম, ‘দুর আমি কেন দেব। ওই পাজি বেদেগুলোর কাণ্ড নিশ্চয়। 
     ও বলল, ‘তাহলে তো তুইও শুনতে পেতিস। লন থেকে শিস দিলে তোর কানেও যাওয়া উচিত।’
    আমি বললাম, ‘তোর মতন পাতলা ঘুম তো নয় আমার। 
     ‘জুলিয়া তখন চলে গেল নিজের ঘরে। ভেতর থেকে দরজায় তালা দেওয়ার আওয়াজ পেলাম।’
     শার্লক হোমস বললে,‘রোজ রাতে দরজায় তালা দেন নাকি?’
     দিই। বাগানে চিতাবাঘ আর বেবুন ছাড়া থাকে বললাম না? দরজায় তালা না-দিলে নিশ্চিন্ত হতে পারি না।’
     ‘তারপর?’
    ঘটনাটা ঘটল সেই রাতেই। জানেন তো যমজদের আত্মা সূক্ষ্ম যোগসূত্রে বাঁধা থাকে। তাই আসন্ন দুর্ভাগ্যের সম্ভাবনায় ঘুমোতে পারছিলাম না কিছুতেই। অজানা আতঙ্কে কাঠ হয়ে ছিলাম বিছানায়। বাইরে ঝড়ের হুংকার, জানলায় বৃষ্টির ঝাপটা শুনছি আর শুনছি। আচমকা ঝড়বাদলার এই মাতামতির মধ্যেই শুনলাম নারীকণ্ঠের একটা ভয়ার্ত চিৎকার। বিষম আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠেছে আমার বোন— গলা শুনেই বুঝলাম। তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে গায়ে শাল জড়িয়ে ছুটে গেলাম করিডরে। দরজা যখন খুলছি, তখন যেন একটা চাপা শিসের শব্দ কানে ভেসে এল। ঠিক যেমনটি আমার বোন বলেছিল— অবিকল সেইরকম। তার কয়েক মুহুর্ত পরেই ঝন ঝন ঝনাৎ করে আওয়াজ কানে ভেসে এল। যেন ধাতুর কিছু পড়ে গেল। করিডর দিয়ে ছুটতে ছুটতে দেখলাম আস্তে আস্তে কবজার ওপর ঘুরে যাচ্ছে বোনের ঘরের দরজা। আতঙ্কে কাঠ হয়ে চাইলাম সেইদিকে— না-জানি কী জিনিস বেরিয়ে আসবে ঘর থেকে। বারান্দায় আলোয় কিন্তু দেখলাম, আমার বোনই বেরোচ্ছে ঘর থেকে, ভয়ে বিকট হয়ে গিয়েছে মুখ, দু-হাত সামনে বাড়িয়ে হাওয়া আঁকড়াবার চেষ্টা করছে, মাতালের মতো সারাশরীর দুলছে। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। ঠিক তখনই ওর হাটু আর ভার সইতে পারল না— লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। এমনভাবে পাকসাট খেতে লাগল যেন বিষম যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে শরীরটা। প্রথমে ভেবেছিলাম, আমাকে বুঝি চিনতেই পারছে না। তারপরেই আচমকা যন্ত্রণায় ভাঙা গলায় ভীষণ চিৎকার করে বললে, ‘হেলেন। হেলেন। ডোরাকাটা পটি। ফুটকি দাগওলা ডোরাকাটা সেই পটি। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, আঙুল তুলে ডাক্তারের ঘরের দরজাও দেখিয়েছিল— কিন্তু যন্ত্রণার নতুন তাড়সে সিটিয়ে যেতে মুখ দিয়ে কথা আর বেরোল না। আমি ছুটে গিয়ে তারস্বরে ডাকলাম সৎ-বাবাকে। ড্রেসিংগাউন গায়ে হস্তদন্ত হয়ে উনি বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। বোনের পাশে এসে যখন পৌছোলেন, তখন তার জ্ঞান নেই। তাড়াতাড়ি গলায় ব্র্যান্ডি ঢেলে দিলেন, গা থেকে ওষুধপত্তরের ব্যবস্থা করলেন— কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না— জুলিয়া আর জ্ঞান ফিরে পেল না। জীবনীশক্তি ক্ষীণ হয়ে এল একটু একটু করে— মারা গেল অজ্ঞান অবস্থাতেই। ভয়াবহভাবে শেষ হয়ে গেল আমার প্রাণপ্রিয় বোন।’
     হোমস বাধা দিয়ে বললে, ‘এক সেকেন্ড। ধাতব আওয়াজ আর শিস দেওয়ার শব্দটা ঠিক শুনেছেন তো?’
     ‘জুলিয়ার পরনে পোশাক কী ছিল?’ 
     ‘শোয়ার পোশাক। বাঁ-হাতে দেশলাই, ডান হাতে একটা পোড়া কাঠি”। 
     গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। সর্বনাশের মুহুর্তে দেশলাই জ্বালিয়ে উনি দেখেছিলেন। করোনার কী বলেন?’
     অনেক তদন্ত করেও তিনি মৃত্যুর সঠিক কারণ বার করতে পারেননি, ডা. রয়লটের বদনাম তো কম নয়। কুখ্যাত হয়ে গিয়েছেন গোটা তল্লাটে।
     আমার সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, সেকেলে খড়খড়ি আর লোহার মোটা গরাদওলা জানলাও বন্ধ ছিল ভেতর থেকে। দেওয়াল নিরেট, মেঝেও নিরেট। চওড়া চিমনির মুখ চারটে শিক দিয়ে বন্ধ। সোজা কথায়, মারা যাওয়ার সময়ে জুলিয়া একলাই ছিল। তা ছাড়া ওর শরীরে জোরজবরদস্তিরও কোনো দাগ বা চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
     ‘বিষ দেওয়া হয়েছিল কি না দেখা হয়েছে? 
     ‘ডাক্তাররা দেখেছেন– বিষ পাননি।’
     ‘সাংঘাতিক ভয়ে স্নায়ুতে চোট পেয়ে গেছে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু ভয় পেল কেন, সেইটাই বুঝতে পারছি না।
    ‘জিপসিরা কি তখন বাগানেই ছিল?’ 
    ‘সবসময়েই তো থাকে— তখনও ছিল জনাকয়েক।’ 
    ‘ডোরাকাটা ফুটকি দাগওয়ালা পটিটা কী হতে পারে? 
     ‘জিপসিরা অনেকে ওইরকম রুমাল মাথায় বাঁধে। হয়তো প্রলাপ বকেছে।’ 
     হোমসের মাথা নাড়া দেখে বুঝলাম খুশি হতে পারেনি জবাব শুনে। 
     বলল, ‘খুবই গভীর জলের ব্যাপার। যাকগে, আপনি বলে যান।’
    ‘একা একা কাটল দুটো বছর। মাসখানেক আগে আমারও বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল। সৎ-বাবা কোনো আপত্তি করেননি। দিন দুয়েক আগে বাড়ির পশ্চিম দিকে মেরামতির কাজ আরম্ভ হল, আমার শোবার ঘরের দেওয়াল ফুটো করা হল। বাধ্য হয়ে বোনের ঘরে এসে শুলাম রাতে— বোনেরই খাটে শুতে হল নিরুপায় হয়ে। আমার মানসিক অবস্থা তখন কীরকম অনুমান করে নিন। একদম ঘুমোতে পারছি না— কেবল এপাশ-ওপাশ করছি। গভীর রাতে আচমকা শুনলাম সেই শিসের শব্দ– যে-শিস শুনেছিলাম জুলিয়া মারা যাওয়ার রাতে। আঁতকে উঠে নেমে পড়লাম খাট থেকে। সারারাত জেগে কাটিয়ে দিলাম। ভোররাতে চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম— সোজা এসেছি আপনার কাছে।’
     ‘ভালোই করেছেন, বলল শার্লক হোমস, কিন্তু মিস স্টোনার, আপনি তো সব কথা খুলে বলেননি— সৎ-বাবার অনেক কীর্তিই আপনি চেপে গেছেন।”
     বলেই, হেলেন স্টোনারের কবজির ওপর থেকে জামার কাপড় সরিয়ে দিল হোমস। দেখলাম, পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট কালসিটের দাগ।
     ‘জানোয়ারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে আপনার সঙ্গে, তাই না?’
     লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল মেয়েটির। তাড়াতাড়ি কবজি ঢেকে বললে : 
    ‘গায়ে আসুরিক জোর তো— খেয়াল থাকে না।’ 
     কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তন্ময় হয়ে আগুনের দিকে চেয়ে রইল হোমস। তারপর বললে, ‘ব্যাপারটা খুবই রহস্যজনক।     হাতে সময়ও বেশি নেই। আজই আপনাদের বাড়িটা পরীক্ষা করে দেখতে চাই– কিন্তু সৎ-বাবা যেন জানতে না-পারেন। সম্ভব হবে?
     ‘হ্যাঁ হবে। উনি আজকে শহরে আসবেন জানি।’ 
    ‘তাহলে ওই কথাই রইল। বিকেল নাগাদ আমরা দুই বন্ধু আপনার বাড়ি যাচ্ছি।

পরের অংশ: ২য় অংশ
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য