বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ৯ম উপাখ্যান

    পরদিন ভোজরাজ আবার সিংহাসনে বসতে গেলে নবম পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম কামকলিকা, আমার কথা শুনে তারপর সিংহাসনে বসবেন।
    বিক্রমাদিত্যের প্রধান মন্ত্রীর নাম ছিল ভট্টি, উপমন্ত্রী গোবিন্দ, সেনাপতি চন্দ্রশেখর এবং পুরোহিত ত্রিবিক্রম। ত্রিবিক্রমের পুত্রের নাম ছিল কমলাকর। তিনি পিতার দৌলতে সুখাদ্য ভোজন ও বহুমূল্য বস্ত্রে শরীরকে তোয়াজ করে মনের আনন্দে দিন কাটাতেন ।
    পিতা একদিন পুত্রকে ডেকে বললেন, পূর্বজন্মের মহাপুণ্যের ফলেই তুমি ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করেছ। সেই ব্ৰাহ্মণবংশে জন্মেও তুমি দুরাচারী হয়েছ। সব সময় বাইরে বাইরে কাটাও। কেবল মাত্র খাওয়ার সময় তোমার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ।

    এ তোমার অনুচিত কাজ হচ্ছে। তোমার এখন বিদ্যা অর্জনের সময়। এসময় যদি বিদ্যাভ্যাস না কর তবে পরে ভীষণ দুঃখে পড়বে। বিদ্যাই প্রকৃত বন্ধু। বিদ্যাই পরম দেবতা। বিদ্যা রাজাদের কাছেও পূজনীয় ! তাই বলছি পুত্র, আমি যতদিন জীবিত থাকব ততদিন তোমাকে বিদ্যাভ্যাস করতেই হবে। পিতার মুখে এই কথা শুনে কমলাকর অনুতপ্ত হলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যদি আমি সর্বগুণে ভূষিত হতে পারি তবেই পিতাকে এ মুখ দেখাব।
    এরপর কমলাকর কাশ্মীরদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সেখানে চন্দ্রমৌলি ভট্টের কাছে গিয়ে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্ৰণাম করে বললেন, প্রভু, আমি মূর্খ, আপনার যশ শুনে বিদ্যালাভের জন্য এসেছি।
    উপাধ্যায় খুশি হয়ে স্বীকৃত হলেন বিদ্যাদানে। কমলাকরও দিবারাত্র তাঁর সেবা করতে লাগলেন।
    এইভাবে গুরুসেবা করতে করতে অনেক দিন কেটে গেল। তারপর কমলাকর সর্বজ্ঞ হয়ে উপাধ্যায়ের অনুমতি নিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন।
    যেতে যেতে পথে কাঞ্চীনগরে উপস্থিত হলেন। ঐ নগরের রাজা ছিলেন নরেন্দ্রসেন! সেখানে নরমোহিনী নামে পরম সুন্দরী এক মহিলা থাকত। তার বাড়িতে রাত্রে কেউ অতিথি হলে, বিন্দ্যাচলের এক রাক্ষস এসে তার রক্ত চুষে থেত। এতেই সে বেচারার মৃত্যু ঘটত।

    কমলাকর এই অদ্ভুত গল্প শুনে নিজের বাড়ি পোঁছলেন। অনেক দিন পর তাঁকে দেখে পিতামাতা খুব খুশি হলেন।
    পরদিন পিতার সাথে রাজভবনে গেলেন রাজার সাথে দেখা করতে।
   রাজা বিক্রমাদিত্য মূল্যবান জিনিস উপহার দিয়ে তাঁকে বললেন, ওহে কমলাকর, তুমি যে দেশে গিয়েছিলে সেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু দেখে থাকলে তা বর্ণনা কর, আমার শুনতে ইচ্ছা করছে।
    কমলাকর বিনীতভাবে বললেন, রাজন, সেদেশে বলবার মত উল্লেখযোগ্য কিছু দেখি নি, তবে ফিরে আসবার পথে কাঞ্চীনগরে এক অদ্ভুত গল্প শুনলাম।
    কমলাকর তখন কাঞ্চীনগরের রাক্ষসের কথা বললেন।
     রাজা শুনে বললেন, ঐ নগরে আমরা দুজনে যাব।
    তারপর রাজা বিক্রমাদিত্য কমলাকরকে সঙ্গে নিয়ে কাঞ্চীনগরে উপস্থিত হলেন এবং নরমোহিনীর রূপে রাজাও মুগ্ধ হয়ে তার বাড়িতে অতিথি হলেন। নরমোহিনী রাজাকে বললো, হে রাজন, আজ আমার জীবন ধন্য হল। আপনার পায়ের ধূলোয় আমার এই বাড়িও ধন্য হল। আজ আপনি আমার বাড়িতে কিছু খান।
    রাজা বললেন, আমি এইমাত্র খেয়ে এসেছি।
    রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে রাক্ষস এসে উপস্থিত হল।
    রাক্ষসের পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে রাজা লুকিয়ে  রইলেন। রাক্ষস যখন উপস্থিত হল তখন বাড়িতে একটিমাত্র প্রদীপ জ্বলছিল। রাক্ষস দেখল কেবল নরমোহিনী ঘুমিয়ে রয়েছে। আর কাউকে দেখতে না পেয়ে যখন রাক্ষস ফিরে যাচ্ছিল তখন রাজা বিক্রমাদিতা অতর্কিত আক্রমণে তাকে হত্যা করলেন।
    কোলাহল শুনে নরমোহিনীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। রাক্ষসকে মৃত অবস্থায় দেখে সে বললো, রাজন, আপনার কৃপায় আজ থেকে রাক্ষসের উপদ্রব দূর হল। আপনার এই উপকারের প্রতিদান আমি কিভাবে দিতে পারি? আপনি যা আদেশ করবেন আমি তাই করব।
    রাজা বললেন, তবে এই কমলাকরকে বিয়ে করে তাকে সুখী কর।
    নরমোহিনী রাজার নির্দেশমত কমলাকরকে বিয়ে করল!
    রাজা বিক্রমাদিত্য খুশিমনে উজ্জয়িনীতে ফিরে এলেন।
    পুতুল রাজভোজকে বললো, মহারাজ, আপনার মধ্যে যদি এই মহৎগুণ থাকে সিংহাসনে বসুন।
   সেদিনও রাজা কিছু বললেন না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য