কী কান্ড! -- মৈত্রেয়ী নাগ

    ট্রেনের দুলুনিতে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ট্রেনটা থেমে যাওয়ায় জেগে গিয়ে চোখ খুলেই আঁতকে উঠলাম। সামনের অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একজোড়া সবুজ চোখ। শুধু তাই না, চোখদুটো অপলক চেয়ে আছে আমার দিকেই। আমার উল্টোদিকের বাঙ্কে যদ্দূর মনে পড়ছে কেউ ছিল না, যেমন খালি ছিল আমার ঠিক তলার বাঙ্কটাও। আমি চট করে চোখ বুজে ফেলে শুয়ে পড়ার আগের ছবিটা মনে আনার চেষ্টা করলাম। তখনও আলো নেভানো হয়নি। আমার উল্টোদিকের মাঝের বাথটায় শুয়ে একজন ভূড়িওয়ালা লম্বা লোক বেজায় নাক ডাকছিল। তার নাকের ডাক এখনও শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। তার নীচের বার্থে কুঁকড়ে শুয়েছিল একজন হাড় জিরজিরে বুড়ি। চোখ বন্ধ করে পড়েছিল কেবল, একটুও নড়ছিল না। বুড়ির উল্টোদিকের বার্থে শোওয়ার তোড়জোড় করছিলেন বাচ্চাদুটোর মা। ভদ্রমহিলার এমন শুচিবাই যে, ডান হাতে একটা রাবারে গ্লাবস পরে নিয়ে বিছানা করছিলেন সবার জন্য। বাচ্চাদুটো ওদের বাবার সঙ্গে ধারের বার্থদুটো দখল করেছিল। দু-দুটো বাঙ্ক খালি থাকা সত্ত্বেও ওরা দু’জনে মিলে ধারের ওপরের বার্থে চড়ে খুব খেলছিল। আমিও ওপরে থাকায় শুনতে পাচ্ছিলাম ওদের কুইজ কুইজ খেলার কিছু টুকরো। সব প্রশ্নই ছোটদের বই থেকে— হ্যারি পটার, হীরু ডাকাত, হযবরল সব ছিল। আমার বেশ মজা লাগছিল শুয়ে শুয়ে। কিন্তু এখন এই সবুজ চোখজোড়া নিয়ে কী করি? ট্রেন আবার চলতে লেগেছে। একবার মনে হল হয়তো ভুল দেখেছি ঘুম-চোখে। কপাল ঠুকে আবার চোখ খুললাম। সেই সবুজ অপলক দৃষ্টি। এবারে আর চোখ বোজারও সাহস হল না .. আমার মাথার ভেতর যে-পাজিটা থাকে, সে এবার বলে উঠল, কী রে, শেষে মেছোভূতের খপ্পরেই পড়লি ?
    তুই থামবি?’ ‘ধমকালাম আমি, দেখছিস বিপদে পড়েছি!’ 
    ‘তুই তো দিনের মধ্যে একশোবার বিপদে পড়িস। 
    ‘তা করবটা কী? সবাই ঘুমোচ্ছে, এখন তো আর দুম করে আলো জ্বালতে পারি না’
    ‘তোর কাছে একটা মোবাইল ফোন আছে, সেটাকে শোওয়ার সময়ও কাছছাড়া করিসনি, সেটাতে বোতাম টিপলে আলো জ্বলে, জনিস? ব্যাপারটা কি একটু বোঝার চেষ্টাও করবি না? 
    এই হল আমার মুশকিল, আমি একটুতেই ঘাবড়ে যাই, আর ওই পাজিটার মাথা সবসময় ঠান্ডা। অবশ্য তাতে আখেরে আমারই লাভ। আমি আর কথা না বাড়িয়ে আলো জ্বাললাম। যা দেখলাম, তাতে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, চট করে আলো নিভিয়ে দিলাম। আমার উল্টোদিকে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বসে রয়েছে একটা বেড়াল। মনে হল, আমার আলো জ্বালাটা সে মোটেই পছন্দ করেনি। মুখটা যেভাবে নাড়াল, তাতে কিছু শোনা না গেলেও আন্দাজ করছি খুব বিরক্তিসূচক একটা ম্যাও করল। 
    ‘বাহা বাহা কী বুদ্ধি! বেড়ালে ম্যাও করেছে, তা আবার আন্দাজ করতে হয়?’, ফের হাড়জ্বালানো টিপ্পনী। আমার এখন জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা নয়, কেননা বেড়ালটা ছাড়াও আমি আরও কিছু দেখেছি— কোনাকুনিভাবে একটা হাত বিপজ্জনকভাবে যেন এগিয়ে আসছিল বেড়ালটার মাথার দিকে, ঠিক হাত নয়, একটা দানবিক হাতের ছায়া। খুব সাংঘাতিক কিছু করতে চায় হাতটা। অন্ধকারে পড়ে রইলাম সবুজ চোখে চোখ রেখে। বেড়ালটা কি টের পেয়েছে যে, ওর বিপদ আসন্ন ?
    রীতাদির মেছোভূতের টিটকিরিটা আবার মনে পড়ে গেল। রীতাদি মানুষটা ভারি ভালো, তবে কলকাতার মেয়ে বলে আমাদের মতো মফস্বল থেকে পড়তে আসা মেয়েদের পিছনে লাগার লোভ কখনও সামলাতে পারে না। ছোটবেলার বন্ধু সুমির বিয়েতে একা একা ট্রেনে করে জলপাইগুড়ি যেতে হবে শুনে বাড়ি থেকে মাছভাজা নিয়ে এল, আমি ট্রেনে খাব বলে। আমার মাছভাজা নিয়ে ট্রেনে ওঠার কোনও ইচ্ছে ছিল না, তাই বলে উঠল আমি নাকি রাত্রিবেলা মেছোভূতের ভয়ে নিয়ে চাইছি না মাছ। এরপরে আর না করা যায় না, তবে আমি রুটিতরকারি খেয়েই শুয়ে পড়েছি, মাছভাজা তেমনই রাখা আছে ফয়েলে মোড়া বিগশপারটার মধ্যে।
    বেড়ালের দিকে চেয়ে চেয়ে আরও কতক্ষণ কাটালাম জানি না, কিন্তু পথে একটা স্টেশন পড়ায় শুধু যে ট্রেন থামল তাই না, বেশ কিছু লোক উঠে এসে আলো জ্বালিয়ে নিজেদের বসার জায়গা খুঁজতে লাগল। সেই আলোয় যা দেখা গেল, তাতে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম— হাতটা আর কিছুই নয়, শুচিবাই মায়ের গ্লাভসটা বাঙ্কে ওঠার সিঁড়ির গায়ে আটকানো ছিল, তার ছায়া। কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়, দেখা গেল বেড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে ট্রেনের ভেতর! চার-চারটে ছানা আগলে বসে রয়েছে সজাগ হয়ে। আর তাই নিয়ে সে কী উত্তেজনা! কারও শোওয়ার জায়গায় বেড়ালে ছানা দিলে গন্ডগোল হতেই পারে, কিন্তু একটা খালি তেতলার বাঙ্কে বেড়াল বা ছানা থাকলে সবার এত মতামত কীসের, কে জানে বাবা! কেউ বলে গার্ডকে ডাকো, তো কেউ বলে সবকটাকে ছুড়ে ফেলে দাও। ওদিক থেকে একটা বাচ্চা তার বাবাকে ডেকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করছিল, একটা ছানা নিয়ে নেওয়া যায় কিনা, সেটা শুনে ফেলে তার মা এপাশ থেকে ধমকে দিল জোরে।
    আধোমুমের মধ্যে এইসব আলোচনা শুনতে শুনতে একসময় এসে পড়া গেল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। ঘড়ি দেখে বুঝলাম, ট্রেন লেট করেছে ঘণ্টাখানেক। বেড়াল নিয়ে নানারকম ষড়যন্ত্র তখনও চলছে, বেড়ালটাকেও তেমনই বসে আছে আমার দিকে চেয়ে। তবে এখন তার মুখে কেমন একটা বিপন্ন ভাব। বেড়ালটা কি বাংলা বোঝে? আমার মাথার ভিতরের গলার স্বরটা একটা টিপ্পনী সামলে নিয়ে আমাকে একটা অদ্ভুত কাজ করতে বলল। তার কথা অনুযায়ী পায়ের কাছের বিগশপারটা আমাদের বাঙ্কদুটোর মাঝখানে একটু মেলে ধরলাম নামবার সময়। বেড়ালটার দিকে একটু তাকাবার অপেক্ষা, সে চট করে ছানাগুলোকে এক-এক করে আমার ব্যাগে চালান দিয়ে নিজেও ঝুপ করে ঢুকে পড়ল ব্যাগের ভিতর। আমিও কোনও কথা না বলে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। ভাবলাম, কী আর হবে, সুবিধেমতো কোথাও নামিয়ে দেব সবাইকে। আর না হলে সুমির বিয়েতে উপহার দিয়ে দেবখন ছানাসমেত বেড়াল। সুমি এমনিতে কোনও উপহার নেবে না বলে লিখেছে, আমি পীড়াপীড়ি করায় বলেছিল, বেশ মৌলিক ধরনের উপহার হলে ও নিতে পারে। পাঁচটা বেড়াল নিঃসন্দেহে মৌলিক উপহার।
    এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিকশা স্ট্যান্ডে পৌছে ব্যাগের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখি, বাচ্চাগুলো বোজা চোখেই টোচো করে মায়ের দুধ খাচ্ছে আর মা জননীটি মাছ শেষ করে মন দিয়ে কাটা চিবোচ্ছে। ফয়েলটা ছিড়ে ফাক হয়ে পাশে পড়ে আছে। মেছোভূতই বটে। এদিকে ট্রেন থেকে এত লোক নেমেছে একসঙ্গে যে, একটা রিকশাও নেই স্ট্যান্ডে। আগেও দেখেছি গরম বেশি পড়লে, যখন দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়, তখনই রিকশাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। নইলে তাদের প্যা- পো শব্দে কান তোলা হয়ে যাওয়ার জোগাড়! য়েমে নেয়ে বিরক্ত হয়ে সবে ভাবছি বেড়াল পরিবারটিকে ব্যাগসমেত বটগাছটার তলায় নামিয়ে দেব কিনা, এমন সময় একটা ধূলিধূসর টাটা সুমে আস্তে হতে হতে আমার সামনেই এসে থামল। যে ঠিকানাটার কথা গাড়ির চালক ভদ্রলোকটি জিজ্ঞেস করলেন আমায়, সেটাই সুমির বিয়ের বাড়ি, আর আমাদের বাড়িটাও সেদিকেই। আমি লজ্জা না করে বলেই বসলাম, একটু যদি লিফট পাওয়া যায়, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। ভদ্রলোক অমনি উঠে পড়তে বললেন গাড়িতে, আর আমার মাথার ভিতরের গলার স্বরটা খুশি হয়ে বলে উঠল, এই তো কেমন মানুষ হয়ে গেচিস।
    গাড়িতে ওঠার পর থেকে ভদ্রলোকই কেবল কথা বলছিলেন, পাশের মোটামতো ভদ্রমহিলার— তার গিন্নি নির্ঘাত— বোধহয় ভয়ানক সর্দি হয়েছিল। তিনি থেকে থেকেই ভীষণ শব্দ করে নাক টানছিলেন। এদিকে কথা খানিক দূর এগোতেই জানা গেল, এরা সুমির কলকাতার মাসি আর মেসো। এদের কথা আমি অনেক শুনেছি। আমি সুমির বন্ধু শুনে ভদ্রলোক তার গিন্নিকে বললেন, ‘শুনছ, সুমির বন্ধু গো! বিয়ে খেতে এসেছে। একটু কথা বলো!
    তা শুনে সুমির মাসি আর কী বলব ভাই, বোনের মেয়ের বিয়ে দেখতে গিয়ে নিজের মেয়েকে হারিয়ে বসে আছি’ বলেই ভেউভেউ করে কেঁদে উঠলেন। তাতে মেসোমশাই খুব অস্বস্তিতে পড়ে বললেন, কিছু মনে কোর না, আসলে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে যে কুকুর-বেড়াল নিয়ে ওঠা যায় না, তা জানা ছিল না আমাদের। কালকের ট্রেনে উঠে বসেছি আমাদের মিনুকে নিয়ে....’
    এই অব্দি বলতেই মাসিমা ডুকরে উঠে বললেন, শখ করে কি এমন করি? মিনুর যে ছানা হবে যে-কোনও দিন... তা গার্ড কোনও কথা শুনলে না, নড়া ধরে নামিয়ে দিল। মিনু আমার এমন লক্ষ্মী বেড়াল, চুপটি করে ব্যাগের মধ্যে বসেছিল। নেমে এসে গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখি বাগ ফাঁকা, শুধু বালিশটা পড়ে আছে, মিনু নেই!" বলেই আবার কাঁদতে লাগলেন হাউহাউ করে।
    এত কান্নাকাটির মধ্যে আমি আর বলার সুযোগ পেলাম না যে, ওঁদের গল্পের শেষটা হয়তো আমি জানি, তার আগেই বিয়েবাড়ি এসে পড়ল। এদিকে অন্যদিক দিয়ে গায়েহলুদের তত্ত্বও এসে পড়েছে। শাঁখের পুঁ, উলু-উলু আর ফোঁৎ ফোঁৎ কান্নার মধ্যে পড়ে কী করা যায় ভাবছি, এমন সময় আমার মাথার ভেতরের বাসিন্দাটি বলে উঠল, 'বলবি আর কী, করে দেখা! আমি চট করে দেখলাম বেড়াল পরিবার আরাম করে ঘুমোচ্ছে। আমনি বিগশপারটা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে কোনও কথা না বলে ব্যাগটা ধরিয়ে দিলাম মাসির হাতে।
ভাবান্তর অনেক দেখেছি। কিন্তু সেদিন সুমির মাসির চোভের জল ভেজা মুখে যেরকম রঙিন হাসি খেলে গেল, আর ভেউভেউটা যেরকম মুহুর্তে মেউ মেউ মিনু রে, তোর যে দেখি ছানা রে’ হয়ে গেল, তেমনটা আর কখনও দেখিনি।
    একটু পরে বাড়ি থেকে সেজেগুজে যখন দুপুরের খাবার খেতে হাজির হলাম বিয়েবাড়িতে, মিনুর গল্প তখন সবার মুখে। বললেন, ‘কী করে এমনটা ঘটল বলো তো? সবটাই কি কাকতাল?’
    আমি বললাম, না মেসোমশাই, অনেকটাই ফাঁকতাল। রাতের সবুজ চোখ থেকে শুরু করে ব্যাগ ফাঁক করে ইশারার গল্প—সবটাই বললাম। বিয়েতে বেড়ালছানা উপহার দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বাদ দিলাম না। শুনে মেসো বললেন, 'বেশ তো, শুধু সুমিকে কেন, তুমিও নিও। কলকাতাতেই তো থাকো এখন। তবে কিনা ছানাগুলো একটু বড় হোক আগে, তখন নিও।”
    সুমির মাসি অতশত শোনেননি। উনি বলে চলেছিলেন যে, ওনার মিনুর মতো অমন জ্ঞানবুদ্ধিওয়ালা বেড়াল আর দুটো পাওয়া যাবে না। মিনু নাকি আগে থেকেই সব বুঝতে পেরে আমার সঙ্গে চলে এসেছে। ভূমিকম্প হওয়ার আগে অনেক পশুপাখি যেমন বুঝতে পারে।
    আমি এরকম অদ্ভুত কথা শুনে অবাক হয়ে চেয়ে আছি, এমন সময় আমার মাথার ভেতরকার গুরুটি বললেন, ‘তুই আবার এখন বলে বসিস না, তাহলে অত হাউহাউ করে কাঁদছিলেন কেন গাড়িতে?’ আমি অমনি মনে মনে চোখ মটকে
বললাম, অত বোকা নাকি? হস্টেলের ইঁদুরগুলোকে জব্দ করার এমন সুযোগ আমি তক্ক করে নষ্ট করে দেব?’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য