নীল পদ্মরাগ [দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ব্লু কারবাঙ্কল]- ৩য় অংশ

   একটা রোগীকে দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। বেকার স্ট্রিটে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই সাড়ে ছ-টা বেজে গেল। গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে স্কচ বনেট টুপি আর কোট পরা একটা লোক থুতনি-অবধি বোতাম আটকিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ফ্যানলাইটের[††] উজ্জ্বল অর্ধবৃত্তাকার আলো এসে পড়েছে তার উপরে। দরজার কাছে আসতেই দরজা খুলে গেল। আমরা দু-জনে একসঙ্গে হোমসের ঘরে ঢুকলাম।
   হোমস চট করে আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, “আপনিই নিশ্চয় মিস্টার হেনরি বেকার। আসুন, অনুগ্রহ করে আগুনের ধারে এসে বসুন, মিস্টার বেকার। আজ খুব শীত পড়েছে, আপনার স্বাস্থ্যও এই শীতের অনুকূল বলে মনে হচ্ছে না। আহ্, ওয়াটসন। একেবারে ঠিক সময়ে এসেছো। ওই টুপিটা কী আপনার, মিস্টার বেকার?”
   “হ্যাঁ, মশাই, নিঃসন্দেহে ওটা আমারই টুপি।”
   ভদ্রলোকের চেহারা লম্বা। কাঁধটা চওড়া। মুখখানা বুদ্ধিদীপ্ত। মুখে কাঁচাপাকা ছুঁচলো দাড়ি। নাক আর গালটা ঈষৎ লাল। হাতটা সামনের দিকে বাড়াতে একটু কেঁপে উঠল। তখনই লোকটার অভ্যাস সম্পর্কে হোমসের অনুমানের কথা মনে পড়ল। লোকটার ধুলোট কালো ফ্রক-কোটটা সামনের দিকে উপর পর্যন্ত বোতাম আঁটা। কলারটা তোলা। সরু কব্জিটা কোটের হাতার ভিতর থেকে বেরিয়ে ছিল, কোনো কাফ বা শার্টের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। খুব ধীরে সুস্থে থেমে থেকে কথা বলছিলেন। খুব সন্তপর্ণে শব্দ চয়ন করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোক পণ্ডিত মানুষ; কিন্তু ভাগ্যের ফেরে অবস্থান্তরে পড়েছেন।
   হোমস বলল, “এই জিনিসগুলো দিনকয়েক ধরে আমাদের কাছে আছে। আমরা ভেবেছিলাম, আপনি আপনার ঠিকানা জানিয়ে বিজ্ঞাপন দেবেন। কিন্তু আপনি বিজ্ঞাপন দিলেন না দেখে একটু অবাকই হয়েছি।”
   লজ্জিত একটা হাসি হেসে আগন্তুক ভদ্রলোক বললেন, “এখন আর আমার আগের মতো অর্থসামর্থ্য নেই। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, যে গুন্ডাদল আমাকে আক্রমণ করেছিল, তারাই আমার টুপি আর হাঁস নিয়ে পালিয়েছে। তাই ওগুলোর ফিরে পাওয়ার বৃথা আশায় আর নিরর্থক অর্থব্যয় করার সাহস হয়নি।”
   “খুবই স্বাভাবিক। ও হ্যাঁ, হাঁস বলতে মনে পড়ল। আমরা ওটা খেয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছি।”
   ভদ্রলোক আঁতকে উঠে বললেন, “খেয়ে ফেলেছেন!”
  “হ্যাঁ, তা না করলে ওটা একেবারেই নষ্ট হয়ে যেত। তবে ওই সাইডবোর্ডের উপর আর একটা হাঁস রাখা আছে। মনে হয়, ওটা আপনার চাহিদা পূরণ করতে পারবে। জিনিসটা ওজনে প্রায় এক আর বেশ তাজা।”
মিস্টার বেকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “ও হ্যাঁ, অবশ্যই অবশ্যই।”
   “অবশ্য আমরা আপনার নিজের হাঁসটার পালক, পা, নাড়িভুড়ি ইত্যাদি রেখে দিয়েছি, যদি চান তো…”
   ভদ্রলোক এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “আমার সেই অভিযানের স্মৃতি হিসেবে সেগুলো মূল্যবান বটে। কিন্তু তাছাড়া আমার সেই পুরনো সঙ্গীর দেহাবশেষ আমার আর কী কাজে লাগবে, তা ভেবে পাচ্ছি না। না মশাই, যদি অনুমতি করেন, তাহলে আপনার সাইডবোর্ডে রাখা ওই চমৎকার হাঁসটাই নিয়ে যেতে চাই।”
   হোমস আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ কাঁধ ঝাঁকালো।
  মুখে বলল, “তবে এই নিন আপনার টুপি আর আপনার হাঁস। হ্যাঁ, ভাল কথা, আপনি আমাকে বলতে পারেন ওই আগের হাঁসটা আপনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন? হাঁস-মুরগি খাওয়াটা আমার শখ বলতে পারেন। কিন্তু এমন নধর হাঁস আমি খুব কমই দেখেছি।”
   মিস্টার বেকার উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য-পাওয়া হাঁসটা বগলদাবা করে বললেন, “অবশ্যই, মশাই। আমরা দিনের বেলা মিউজিয়ামে কাজ করি। মিউজিয়ামের কাছে আলফা ইন হল আমাদের প্রিয় আড্ডা। তার মালিকের নাম উইন্ডিগেট। ভারী ভাল লোক। তিনি একটা হাঁস ক্লাব স্থাপন করেছেন। প্রতি সপ্তাহে কয়েক পেনি করে চাঁদা দিলে আমরা বড়োদিনের সময় একটা হাঁস পাই। আমি আমার চাঁদা সময়মতো দিয়ে এসেছিলাম। বাকি সবটাই তো আপনার জানা। আপনার কাছে আমি ঋণী থেকে গেলাম, মশাই। আমার বয়স বা সম্মানের কথা ভাবলে, এই স্কচ বনেট জাতীয় টুপি আর এই আমাকে মানায় না।” যাওয়ার সময় তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে বেশ কেতাবি কায়দায় একটা অভিবাদন জানিয়ে গেলেন। বেশ মজা লাগল দেখে।
   তিনি চলে গেলে হোমস দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “এই হল মিস্টার হেনরি বেকারের গল্প। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ঘটনার কিছুই জানেন না। ওয়াটসন, তোমার কি খিদে পেয়েছে?”
   “না, কেন?”
   “তাহলে চলো, সন্ধ্যের খাবারটা একেবারে রাতেই খাওয়া যাবে; এইবেলা এই টাটকা সূত্রটার পিছু নেওয়া যাক।”
   “বেশ, তাই চলো।”
   বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। আমরা গলায় ভাল করে আলস্টার[‡‡] পরে মাফলার জড়িয়ে বের হলাম। মেঘহীন আকাশে তারা ঝিলমিল করছিল। পথের লোকেদের মুখ থেকে পিস্তলের গুলির মতো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ডকটর’স কোয়ার্টার, উইমপোল স্ট্রিট, হার্লে স্ট্রিট, উইগমোর স্ট্রিট পেরিয়ে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এসে পড়লাম। আমাদের পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আধঘণ্টার মধ্যে ব্লুমসবেরির আলফা ইনে এসে পড়লাম। হলবোর্নের দিকে যে রাস্তাটা গেছে তারই এক কোণে একটা ছোটো পাবলিক হাউস। হোমস প্রাইভেট বারের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লাল-মুখো, সাদা অ্যাপ্রন-পরিহিত মালিকের কাছে দুই গ্লাস বিয়ার অর্ডার করল।
   বলল, “তোমার বিয়ার নিশ্চয় তোমার হাঁসের মতোই ভাল।”
   লোকটা অবাক হয়ে বলল, “আমার হাঁস!”
   “হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগেই তোমার হাঁস ক্লাবের সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।”
   “ও, হ্যাঁ! এবার বুঝেছি। তবে কিনা, মশাই, ওই হাঁস ঠিক আমার নয়।”
   “তাই নাকি! তাহলে কার?”
   “কভেন্ট গার্ডেনের এক হাঁসওয়ালার কাছ থেকে ডজন দুয়েক আনিয়েছিলাম।”
   “বটে! ওখানকার কয়েকজনকে চিনি। ওগুলো ঠিক কার থেকে আনিয়েছিলে?”
   “লোকটার নাম ব্রেকিনরিজ।”
   “ও! তাকে চিনি না। আচ্ছা, এই নাও তোমার বিয়ারের দাম। তোমার ব্যবসার উন্নতি হোক। শুভরাত্রি।”
বাইরের হিমেল হাওয়ায় আবার বেরিয়ে এসে সে কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, “এবার গন্তব্য মিস্টার ব্রেকিনরিজের দোকান। বুঝে দ্যাখো, ওয়াটসন, আমরা যে লক্ষ্যে চলেছি, তার এক দিকে একটা সামান্য হাঁস। কিন্তু অন্যদিকে একটি নিরপরাধ লোক যাকে আমরা নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে তাকে সাত বছর বিনা অপরাধেই জেল খাটতে হবে। এমনও হতে পারে যে, আমরা দেখব আসলে চুরিটা সেই করেছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আমাদের হাতে এমন একটা সূত্র এসে গেছে যা পুলিশের হাতেও আসেনি। এর শেষ দেখেই ছাড়ব। চলো দক্ষিণ দিকে। তাড়াতাড়ি।”
  হলবোর্ন পেরিয়ে এনডেল স্ট্রিটে এসে পড়লাম। বসতি এলাকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে কভেন্ট গার্ডেন মার্কেটে পৌঁছালাম। সেখানে সবচেয়ে বড়ো দোকানগুলোর একটার নাম ব্রেকিনরিজের নামে। মালিকের মুখটা ঠিক ঘোড়ার মতো লম্বাটে। দু-পাশে ছাঁটা জুলপি। একটা ছেলেকে দোকানের শাটার ফেলতে সাহায্য করছিল।
   হোমস বললে, “শুভ সন্ধ্যা। বেশ শীত পড়েছে আজ রাতে।”
   বিক্রেতা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল। তারপর আমার সঙ্গীর দিকে প্রশ্নালু চোখে তাকাল।
   মার্বেলের শূন্য স্ল্যাবগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে হোম জিজ্ঞাসা করলে, “সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে দেখছি।”
   “কাল সকালে আসুন। পাঁচশো হাঁস চাইলেও দিতে পারবো।”
   “সে আমার কোনো কাজে লাগবে না।”
   “তবে ওই যে দোকানটায় গ্যাস জ্বলছে, ওটায় যান।”
   “কিন্তু আমাকে যে তোমার দোকানের কথাই বলা হয়েছে।”
   “কে বলেছে?”
   “আলফার মালিক।”
   “ও, হ্যাঁ। আমি তাকে ডজন দুয়েক পাঠিয়েছিলাম।”
   “হাঁসগুলো বেশ ছিল। তা ওগুলো পেয়েছিলে কোত্থাকে?”
   অবাক কাণ্ড। প্রশ্নটা শুনেই বিক্রেতা রাগে ফেটে পড়ল। সে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে কোমরে হাত দিয়ে যুদ্ধং দেহি ভূমিকায় দাঁড়াল। বলল, “পথে আসুন মশায়! কি চাইছেন বলুন দেখি! ঝেড়ে কাশুন।”
   “বাঁকা কথা তো কিছুই বলিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছি যে হাঁসগুলো তুমি আলফায় বিক্রি করেছিল, সেই হাঁসগুলো তুমি কার কাছ থেকে কিনেছিলে?”
   “অ! আর যদি না বলি, তাহলে কী করবে?”
  “কিছুই না। মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি, এই সামান্য কথায় তুমি এতটা উত্তেজিত হচ্ছ কেন?”
  “উত্তেজিত হব না! এমন কথা শুনলে কার মাথার ঠিক থাকে? ভাল দামে ভাল মাল বেছবো, ব্যস, লেনদেন খতম। ‘হাঁস কোথায়?’ ‘কার থেকে হাঁস কিনেছো?’ ‘ওই হাঁসের কত দাম?’ হাঁস তো নয়, যেন আর কিছু। সামান্য হাঁস নিয়ে কত কথা!”
   হোমস গা-ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল, “কি করে জানবো বলো যে, আরও পাঁচ জন ওই হাঁসের খোঁজ করছে। তবে তুমি না বললে, বাজিটা হেরে যাবো। হাঁস-মুরগির ব্যাপারে আমি নিজেকে একরকম বিশেষজ্ঞই মনে করি। আর একজনের সঙ্গে বাজি ধরেছি যে, যে হাঁসটা আজ খেলাম সেটা পাড়াগেঁয়ে হাঁস।”
   হাঁসওয়ালা খুব সংক্ষেপে রাগত গলা বলল, “অ! তবে আপনি বাজি হেরেছেন। ওটা শহুরে হাঁস।”
   “আমার দেখে তা মনে হল না।”
   “আমি বলছি তাই।”
   “মানি না।”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য