Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

    ছোটবেলা থেকেই আনিস একটু পাগলা গোছের। সে প্রথমবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বার বছর বয়সে নিজেই ফিরে এসেছিল সপ্তাহখানেক পরে । চাচার বাড়িতে ম...

সুতোরস্তু | পর্ব-১ | -- মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    ছোটবেলা থেকেই আনিস একটু পাগলা গোছের। সে প্রথমবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বার বছর বয়সে নিজেই ফিরে এসেছিল সপ্তাহখানেক পরে । চাচার বাড়িতে মানুষ, চাচা-চাচি মিলে তখন গরুর মতো পেটালেন তাকে । আমরা ভাবলাম শিক্ষা হয়েছে, আর পালাবে না। কোথায়কী ছয় মাসের মাথায় আবার বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল, ফিরে এলে আবার চাচা-চাচি মিলে পালা করে পেটালেন তাকে ।
    মার খেয়ে আনিস বিশেষ কান্নাকাটি করত না। শরীরটা নরম করে রাখলে নাকি মার খেলে ব্যথা লাগে না। তা ছাড়া সে নাকি এক পাগলা সন্ন্যাসীর কাছ থেকে “কুফুরি কালাম” শিখে এসেছে। দুচোখ বন্ধ করে একবার সেই কুফুরি কালাম পড়ে নিলে সব যন্ত্রণা নাকি বাতাসের মতো উবে যায়। দশ টাকা দিলে আমাকে সব শিখিয়ে দেবে বলেছিল। ছেলেবেলায় পুরো দশ টাকা একসাথে কখনো জোগাড় করতে পারিনি বলে সেই অমূল্য মন্ত্র আমার আর শেখা হয় নি।
    আনিস বাড়ি থেকে পালিয়ে বিচিত্র সব জায়গায় যেত। কোন ভাঙা মন্দিরে নাঙ্গা সন্ন্যাসী থাকে, কোন পুকুরে জ্যোৎস্না রাতে পরী নেমে আসে, কোন শ্মশানে পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক থাকে। এইসব খোঁজখবর তার নখদর্পণে ছিল। কারো সাথে কথাবার্তা বেশি বলত না। আমার মনটা একটু নরম ছিল বলে চাচা-চাচি মিলে তাকে পিটিয়ে যখন আধমরা করে রাখত, আমি একটু সেবাশুশ্রুষা করতাম, সে জন্যে আমাকে মাঝে মাঝে সে একটা-দুটো মনের কথা বলত।
    সেই আনিসের সাথে আমার দেখা হল প্রায় কুড়ি বছর পরে। কমলাপুর স্টেশনে চশমা পর একজন মানুষ আমার কাছে এসে বলল, ইকবাল না ।
    আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনি? 
   আমি আনিস। মনে আছে চাচা মেরে একদিন রক্ত বের করে দিল। তুই দূর্বাচিবিয়ে লাগিয়ে দিলি।ইনফেকশান হয়ে গেল তখন—
    আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, পাগলা আনিস! 
    হ্যাঁ। আনিস ভুরু কুঁচকে বলল, দারোয়ানদের মতো গোফ রেখেছিস দেখি।
    আমি হেসে বললাম, ছাত্র পড়াতে হয়, গোফ না থাকলে চেহারায় গাম্ভীর্য আসে না। তোর কি খবর?
    দাঁড়া, বলছি। যাবি না কিন্তু খবরদার! আমি একটা কাজ সেরে আসি ।
   আমাকে দাড় করিয়ে আনিস চলে গেল। ফিরে এল একটু পরেই। এসে বলল, বিষ্যুৎবার করে গৌরীপুর থেকে এই লোকটা আসে। কতদিন থেকে ধরার চেষ্টা করছি—
    কি রকম লোক? 
    ব্ল্যাক আর্টিস্ট। শয়তানের উপাসক। আমি মাথা নেড়ে বললাম, তুই এখনো তন্ত্রমন্ত্র করে বেড়াচ্ছিস?
    কেন করব না ? চাচাও নেই যে ধরে পেটাবে! এখনই তো সময়।
    আশ্চর্য ব্যাপার! 
    আশ্চর্যের কী আছে? কাজ না থাকলে চল আমার বাসায়।
    কাজ ছিল বলে সেদিন যেতে পারিনি। পরের সপ্তাহেই গিয়েছি। আনিস হতচ্ছাড়া ধরনের মানুষ ছিল। ধারণা ছিল কোনোদিনই গুছিয়ে উঠতে পারবে না। দেখলাম বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। জহুরির কাজ করে। মূল্যবান পাথর দেখে তার মান বিচার করে । এদেশে এর কদর নেই, বিদেশ থেকে কিছু কিছু মানুষ মাঝে মাঝে তার কাছে আসে। মোট টাকা দেয় তারা-সেটাতেই তার বেশ চলে যায়।
    আনিসের বাসাটা যেরকম হবে ভেবেছিলাম গিয়ে দেখি ঠিক সেরকম। দিনে কী রকম হয় জানি না রাতে সেটা সবসময়েই আধো অন্ধকার। বেশি উজ্জ্বল বাতি নাকি আনিসের ভালো লাগে না। আনিসের সারা বাসা জুড়ে শুধু নানা আকারের আলমারি আর সেলফ। তার মাঝে নানা আকারের বোতল, বয়াম, শিশি আর বাক্স। তার ভিতরে নানারকম জিনিস। বিদঘুটে প্রাণীর ফসিল,হাড়গোড়,পাথর, প্রাচীন ব্যবহারী জিনিস, পুরনো বই, ছবি--কী নেই!
    আনিসের সাথে নানারকম কথাবার্তা হল । পুরেনো বন্ধুরা এখন কে কোথায় আছে কী করে সেটা নিয়ে কথা বলে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিলাম। চলে আসার আগে তার আজগুবি শখ নিয়ে কথা উঠল, বললাম, বাসা দেখি দুনিয়ার হাবিজাবি জিনিসে ভরে রেখেছিস ।
    আনিস হেসে বলল, ঠিকই বলেছিস! 
    কী করবি এগুলো দিয়ে ? 
    কিছু একটা করতেই হবে? এমনি রেখেছি। শখ। 
    তোর সবকিছুই আজগুবি ! আজগুবি তুই দেখিস নি—তাই এগুলোকে বলছিস আজগুবি।
   গল্পের সন্ধান পেয়ে আমি কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন, তুই দেখেছিস নাকি?
    সারা জীবন কাটিয়ে দিলাম এর পিছনে, আমি দেখব না তো কে দেখবে?
    কী দেখেছিস? 
    দেখবি ?
    দেখা। 
    আনিস উঠে গিয়ে আলমারি খুলে একটা ছোট কালো কাঠের বাক্স নিয়ে এল। আমার কাছে বসে সাবধানে বাক্স খুলে তামার একটা চৌকোন জিনিস বের করে আমার হাতে দিল। বলল, এটা দেখ। খুব সাবধান, নিচে ফেলবি না।
    কী এটা ? 
    এক তান্ত্রিক সাধু আমাকে বিশেষ স্নেহ করত। সে মরার আগে আমাকে দিয়ে গেছে।
   কিন্তু জিনিসটা কী? 
   বলতে পারিস এক রকমের তাবিজ। হাতের মাংস কেটে শরীরের ভিতর ঢুকিয়ে রেখেছিল সে। মরার আগে কেটে বের করে দিয়ে গেছে।
    শুনে ঘেন্নায় আমার শরীর একটু ঘিনখিন করে উঠল। জিনিসটা বাক্সে রেখে বললাম, কী হয় এটা দিয়ে?
    হাতের মুঠোর ভিতরে শক্ত করে চেপে ধরে বলবি—সুতোরস্তু।
    কী হবে তা হলে ? 
    বলে দেখ। 
    আমি জিনিসটা হাতে নিয়ে শক্ত করে মুঠো চেপে বললাম, কী বলব এখন?
    সুতোরস্তু। ধরে রাখবি এটা, ছড়বি না। 
    আমি ধরে রেখে বললাম, সুতোরস্তু। আর কী আশ্চর্য, মনে হল জিনিসটা যেন নড়ে উঠল হতের ভিতর!
    আনিস বলল, ধরে রাখ, ছাড়িস না। 
    কেন? কী হবে? 
    দেখবি নিজেই। 
    আমি হঠাৎ অবাক হয়ে লক্ষ করলাম মুঠোর ভিতরে জিনিসটা আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠছে!
    কিছু টের পাচ্ছিস ? 
    হ্যা। মনে হচ্ছে গরম হচ্ছে জিনিসটা মনে হচ্ছে একটু একটু নড়ছে।
    আনিস একটু হেসে বলল, আরেকবার বল সুতোরস্তু, দেখবি আরো গরম হবে।
    আমি বললাম, সুতোরস্তু। কী মনে হল, কয়েকবার বললাম কথাটি— সুতোরস্তু সুতোরস্তু সুতোরস্তু-আর সাথে সাথে মনে হল হাতের মুঠোয় আমার চাকতিটি গনগনে গরম হয়ে কিলবিল করে নড়ছে। চিৎকার করে হাত থেকে ফেলে দিলাম জিনিসটা।
    আনিস লাফিয়ে উঠে হাহা করে বলল, কী সর্বনাশ! কী সৰ্ব্বনাশ! কী করলি এটা ? কী করলি ?
    কেন, কী হয়েছে? 
    ঠিক হল না এটা। আনিস গন্ত্রীর হয়ে বলল, একেবারেই ঠিক হল না। তোকে বললাম আর একবার বলতে, তুই এতবার বললি কেন?
    কেন, কী হয়েছে?
   এটা একবার হাতের মুঠোয় নিয়ে সুতোরস্তু বলার পর নিচে রাখার একটা নিয়ম আছে। কখনো হাত থেকে ফেলে দিতে হয় না।
    কী হয় ফেলে দিলে ?
    তুই বুঝতে পারছিস না। এটা একটা সাংঘাতিক জিনিস । হাতে নিয়ে তুই যখন বলেছিস সুতোরস্তু তখন তুই একটা ব্যাপার শুরু করেছিস ।
    কী ব্যাপার?
    তোকে বোঝানো মুশকিল। আনিস খুব গম্ভীর হয়ে বলল, তান্ত্রিক সাধুরা দীর্ঘদিন সাধনা করে নানারকম অপদেবতা বশ করে । সেই সব অপদেবতারা তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তান্ত্রিকদের সাথে থাকে, তাদের আদেশ মেনে চলে। তুই সেরকম একটা অপদেবতাকে ডেকেছিস। সে আসছে। তাকে ফিরিয়ে দেয়া যেত কিন্তু তুই জিনিসটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছিস, এখন আর তাকে ফিরিয়ে দেয়া যাবে না।
    আবছা অন্ধকার, বিচিত্র সব জিনিসপত্র চারদিকে, আনিসের থমথমে গলার স্বর,আমি আরেকটু হলে তার কথা প্রায় বিশ্বাসই করে ফেলেছিলাম। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ জোরেই হেসে উঠলাম, বললাম, বলছিস এটা আলাদীনের চেরাগ ? ঘষে দিলেই দৈত্য চলে আসে?
    আনিস একটু আহত দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুই আমার কথা বিশ্বাস করলি না?
    না ।
    খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আনিস বলল, সূতোরস্তু আসবে। ইকবাল, তোর ওপর বড় বিপদ।
    সুতোরস্তু কি দৈত্যটার নাম?
    ঠাট্টা করিস না। সূতোরস্তু ঠিক নাম নয়, বলতে পারিস গোত্র। সে আসছে। তোর ওপর খুব বিপদ--
    ভালো। আমি হেসে বললাম, বিপদ-আপদ আমার ভালোই লাগে।
    আনিস একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তুই এখন থেকে আমার সাথে থাকবি ।
    তোর সাথে ?
    হ্যাঁ।
    কেন ?
    তুই জানিস না এখন কী করতে হবে। আমি জানি? সুতোরস্তু কিছু একটা নিয়ে যাবে, তুই বুঝতে পারছিস না।
    কবে আসবে সূতোরস্তু? 
    জানি না। আজো আসতে পারে, দু সপ্তাহ পরেও আসতে পারে ;
    আর যতদিন না আসছে আমার সব কাজকর্ম ফেলে তোর বাসায় থাকতে হবে?
    হ্যাঁ। আনিস, তোর বাসায় থাকতে আমার কোনোই আপত্তি নেই। আমি এসে থাকব কিছুদিন, কিন্তু এখন নয়। তুই সুতোরন্তকে আসতে দে, আমি একাই ম্যানেজ করব। ভালো করে চা নাস্তা খাইয়ে দেব।
    ইকবাল—আনিস থমথমে গলায় বলল, এটা ঠাট্টার জিনিস না। তোর আমার কথা শুনতে হবে । তোকে এখন থেকে আমার সাথে থাকতে হবে।
    সম্ভব না। আমার অনেক কাজ। 
   আনিস অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলল, তোর এখন আমার কথা শুনতেই হবে। যা যা বলি শোন। তোর কিংবা অন্য কোনো একজন মানুষের জীবন নির্ভর করছে এর উপর। আনিস যা বলল তার সারমর্ম এই পৃথিবীতে যেরকম মানুষ এবং নানারকম জীবজন্তু রয়েছে, তেমনি পরকালের জগতেও মানুষের সমজাতীয় প্রাণী এবং জন্তু-জানোয়ারের সমজাতীয় বিদেহী শক্তি রয়েছে। তান্ত্রিক সাধু বা নানারকমের সাধকেরা সাধনা করে পরজগতের এইসব প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করেন। সেইসব প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা বেশি হলে তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা যায়। নিচ জাতীয় প্রাণী হলে তাদের জোর করে বশে রাখতে হয়। সুতোরস্তু নিচ জাতীয় একটা ভয়ংকর প্রাণী। তাকে জোর করে বশ করে রাখা হয়েছে। সাধকেরা শক্তি পরীক্ষা করার জন্যে এদের বশ করে রাখেন। সুতোরস্তু নামের বিদেহী যুক্তিতর্কহীন এই প্রাণীটি অত্যন্তশক্তিশালী,তাকে ভুল করে আহ্বান করা হয়েছে। আহ্বান করা হলে তাকে আসতে হয়—তাকে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে সে একটা বিভীষিকার সৃষ্টি করে যায়। যে তান্তিক মারা গিয়েছে সে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, আর কেউ পারবে সেইরকম কোন নিশ্চয়তা নেই।
     আনিস অত্যন্ত জোর দিয়ে কথাগুলো বলেছিল বলে চুপ করে আমি শুনে গেলাম। কিন্তু তার কথা আমার ঠিক বিশ্বাস হল না। কথা শেষ হলে বললাম, ধরা যাক তোর সব কথা সত্যি। তোর সুতোরস্তু ভয়ংকর শক্তিশালী একটা বিদেহী প্রাণী। কিন্তু সে মানুষের জগতে বাস করে না, কাজেই মানুষের জগতে সে কিছুই করতে পারবে না।
    আনিস মাথা নেড়ে বলল, তোর কথা থানিকটা সত্যি, কিন্তু পুরোপুরি সত্যি নয়। সাধক মানুষেরা যেরকম তাদের জগতে যোগাযোগ করতে পারে, এরাও খানিকটা পারে। এদের যোগাযোগটা হয় ভয়ংকর। মানুষ ভয় পেয়ে যায়। ভয় পেয়ে গেলেই ওরা পুরোপুরি সর্বনাশ করতে পারে। 
    আমি বললাম, আমি ভয় পাই না। ভূতপ্রেতে আমার বিশ্বাস নেই, তাই ভয়ও নেই। বাজি ধরে আমি লাশকাটা ঘরের টেবিলে বিছানা করে ঘুমিয়েছি।
    আনিস খানিকক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, সত্যিই যদি তুই ভয় না পাস, তোকে সুতোরস্তু কিছু করতে পারবে না। মানুষ থেকে শক্তিশালী কোনো প্রাণী নেই। তবে তোকে দুটি কাজ করতে হবে।
    কী ? 
    প্রথমত আগামী দু সপ্তাহের ভিতরে যদি তুই কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ করিস, তোকে সাবধান হতে হবে।
    কী রকম ? 
    সবসময় তোর সাথে একটা জীবিত প্রাণী রাখবি।
    কেন ? এরা যখন আসে সবসময়ে কোনো একটা কিছুর প্রাণ নিয়ে যায়। চেষ্টা করে মানুষের নিতে, না পারলে অন্য কিছুর। ঘরে খাচায় একটা পাখি রাখা সবচেয়ে সহজ।
    আমি ঠাট্ট করে বললাম, আমার ঘরে অনেক মশা আছে দেয়ালে টিকটিকি---
   আনিস হাসার ভঙ্গি করে বলল, সুতোরস্তু যখন এসে হাজির হবে তুই বেশ অবাক হয়ে লক্ষ করবি আশপাশে কোনো প্রাণী থাকবে না। কীটপতঙ্গ পশুপাখি কোনো কোনো ব্যাপারে মানুষ থেকে অনেক বেশি বুঝতে পারে। আর দ্বিতীয় জিনিস যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে---
    কী? 
    হাত বাড়িয়ে দে।
   আমি ইতস্তত করে হাত বাড়িয়ে দিলাম। অনিস একটা ছোট শিশি থেকে কী যেন একটা তরল পদার্থ নিয়ে হাতের পিঠে লম্বা কী একটা দাগ দিয়ে দিল ।
    আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, এটা কী? 
    একটা কেমিক্যাল । তোর হাতের উন্টোপিঠে একটা চিহ্ন একে দিলাম। কাল, পরশু এটা স্পষ্ট হবে উল্কির মতো--তবে ভয় নেই, সারা জীবন থাকবে না। মাসখানেকের মধ্যেই মুছে যাবে।
    কী হবে এটা দিয়ে ?
    যদি কখনো কিছু দেখে খুব ভয় পাস, এই চিহ্নটা বুকের কাছে ধরবি, দেখিস, ভয় চলে যাবে। একটা শক্তি পাবি।
   আমি তাবিজ-কবজ বিশ্বাস করি না ! 
   না করিস তো ভালো, সেই জন্যে চামড়ার উপর পাকাপাকিভাবে করে দিলাম। আজ কাল হাত একটু জ্বালা করতে পারে, ইনফেকশন হবার কথা নয়। যদি হয় এন্টিবায়োটিক খেয়ে নিবি ।
    আমি ওঠার সময় বললাম, দাখ আনিস, ভূতপ্রেত আছে কি নেই সেটা নিয়ে আমি তোর সাথে তর্ক করতে চাই না। থাকলে থাকুক, আমি তাদের ছাড়াই জীবন কাটিয়ে এসেছি,বাকিটা তাদের ছাড়াই কাটিয়ে দেব।
    আনিস বলল, চমৎকার! এই হচ্ছে বাপের ব্যাটা! রিকশা করে বাসায় আসার সময় আমি পুরো ব্যাপারটা ভেবে দেখলাম। ভয়াবহ সুতোরস্তু এসে আমাকে সত্যি খুন করে রেখে যাবে কিনা সে নিয়ে আমার ভিতরে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই। যে জিনিসটা আমাকে অবাক করেছে,সেটা হচ্ছে তামার মাদুলিটা, সেটার হঠাৎ করে গরম হয়ে যাওয়াটা। এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করি? আনিস হয়তো আমাকে সম্মোহন করেছে তা হলে গরম লাগাটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারি, কিন্তু হাতের তালুতে পোড়া দাগটা? সম্মোহন করে মানুষের হাতের তালুতে গরম অনুভূতি দেয়া যেতে পারে কিন্তু পোড়াবে কেমন করে?
    ব্যাপারটা আমি ভুলেই যেতাম,কিন্তু ভুলতে পারলামনা হাতের উল্টেপিঠে আনিসের এঁকে দেয়া চিহ্নটির জন্যে। চিহ্নটি আস্তে আস্তে ফুটে উঠল। যখনই হাত দিয়ে কিছু করি, সেটা ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিযে থাকে। পরিচিত বন্ধুবান্ধবও বেশ অবাক হল, এই বয়সে হাতের পিঠে ছবি একে ঘুরে বেড়াচ্ছি দেখে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলাও সহজ নয়।
    এভাবে সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেছে। সম্ভবত সুতোরস্তু এসে ঘুরে গেছে,আমি টের পাইনি। হাতের চিহ্নটিও আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি আনিসকে বেশ জোর গলাতেই বলেছিলাম যে ভূতপ্রেত আমি বিশ্বাস করি না, তবু কয়দিন ভিতরে ভিতরে একটু সতর্কই ছিলাম। কে জানে কিছু তো আর বলা যায় না।

গল্পটির শেষ অংশ পড়তে এখানে যাও: শেষ অংশ

0 coment�rios: