গুণ্ডা হাতির দৌরাত্ম্য -- ইন্দুভূষণ রায়

     ১৯৭১ খৃষ্টাদ। ঠিক পয়ত্রিশ বছর পূর্বের কথা। তখন আমি উত্তর লক্ষীমপুরে থাকি। উত্তর লক্ষীমপুর উত্তর আসামের লক্ষীমপুর জেলার একটি মহকুমা। মহকুমার প্রধান সহরটির নামও উত্তর লক্ষীমপুর।
     সে সময়ে অনেকে মহকুমাটিকে ‘আসামের আন্দামান বলত। এই নামকরণের যথেষ্ট হেতুও ছিল। সারা মহকুমায় এক ইঞ্চিও রেলপথ ছিল না। দুই প্রান্তে দুটি স্টীমার স্টেশন। দুটিই সহর থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল দূরে অবস্থিত। গো শকট ছাড়া অন্য যান-বাহন ইত্যাদি ছিল না; পথের মাঝে পড়ত আবার বড় বড় নদী। সেগুলি গো-যান সহই খেয়া নৌকোতে পার হতে হত। শীতকালে নদীগুলোর ক্ষটিকের মত স্বচ্ছ নির্মল জল, শান্ত মুর্তি ও মনোহর দৃশ্য দেখে যে পথিক মোহিত হত; বর্ষায় তাদের ভয়ঙ্কর তাণ্ডব-নৃত্য দেখে সে ভীতিবিহ্বল হয়ে পড়ত।
     কিন্তু, কেবল এটিই আন্দামান আখ্যার কারণ নয়। ষ্টেশন থেকে উত্তর লক্ষীমপুর সহর পর্যন্ত পথের দু’ধারে প্রায় সৰ্ব্বত্রই বন জঙ্গল কিংবা বিস্তীর্ণ ‘ইকরা নল’ বন ছিল। তাতে বাস করত রাজ্যের নানা হিংস্র জনোয়ার। হাতি, মোষ, ভালুক ও বাঘ-এগুলি যমদূতের মত সর্বত্র ঘুরে বেড়াত। তাদের বীভৎস অত্যাচার-কাহিনী সারা আসামে ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দামান দ্বীপ যেমন 'কালাপানি ‘ ওপারে, এবং সেখানে বাস করত বহু মনুষ্য জানোয়ার, অরূপ উত্তর লক্ষীমপুর মহকুমাও আসামের এক দুর্গম নিভৃত কোণে, এবং সেখানে বাস করত বই হিংস্র বন্য জানোয়ার। এ বিষয়ে উভয়ের মধ্যে মিল ছিল, এবং এজন্যই বোধ হয় উত্তর লক্ষীমপুরকে আসামের আন্দামান নাম দেওয়া হয়েছিল।
     পনের বৎসর পরে, অর্থাৎ ১৯৮৪ খ্ৰীষ্টাব্দে আমাকে পুনরায় উত্তর-লক্ষীমপুরে যেতে হয়েছিল। তখন দেখেছি, মোটর-গাড়ী, বাস্ ইত্যাদি সেখানে বেশ চলছে, এবং রাজপথও লোকালয় থেকে বন-জঙ্গল অনেক পিছিয়ে গেছে। তথাপি মহকুমটির আন্দামান' নাম একেবারে ঘোচে নি।
     উত্তর-লক্ষীমপুর সহরটি বেশ সুন্দর। ছোট্ট সহরটি, দাফ্‌লা পাহাড়ের একেবারে কাছে। দূরে আকা পাহাড়, ধূ-ধূ দেখা যাচ্ছে। এসব পাহাড় পূর্ব হিমালয় পর্বতের পাদদেশ। শীতকালে বহু দাফলা ও আকা নানা কাজে উত্তর লক্ষীমপুরে নেমে আসে। সকলেরই বলিষ্ঠ দেহ উল্কি-চিহ্নিত। তাদের ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছেদ, ভাব-ভঙ্গিমা, নৃত্যগীত সবই বিচিত্র। দাফলদের মাথার টুপিটি দেখতে অতি সুন্দর ।
     কলকাতার এক বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী আসামের কয়েকটি পাহাড়ী জাতির নৃত্য শিক্ষার জন্য একবার উত্তর লক্ষীমপুরে গিয়ে উপস্থিত হন। এক সন্ধ্যার পর তাকে আমি একটি দাফলা গ্রামে নিয়ে যাই। বনের মধ্যে নগণ্য গ্রামটি। গ্রামবাসীরা আমার বাধ্য ছিল। শুকনো বাঁশের মশাল জ্বেলে নাচ আরম্ভ হ'ল। দর্শক বুনো জন্তু ছাড়া আমরা অল্প কয়েকজন। বাঁশের সঙ্গীতযন্ত্রের সঙ্গে নাচ চলল। নাচ আর কিছুই নয়, তালে তালে হেঁটে যাওয়া মাত্র। শিল্পী নাচ দেখে বিভোর হলেন। এসব আমার বহু দেখা ছিল, তাই আমি তখন অন্য বিষয়ে চিন্তা করছিলাম।
     নৃত্যশেষে ক্যাম্প-এ ফিরে শিল্পীকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা, নাচ দেখে আপনি ওরকম করছিলেন কেন? চমৎকার লেগেছিল, না?
     শিল্পী জবাব দিলেন, "আজ আমার বড় আনন্দ। নৃত্যকলার উৎপত্তিস্থানে আজ এসে আমি দাঁড়িয়েছি। এটা কম সৌভাগ্যের কথা নয়। কলকাতার গঙ্গায় লক্ষ লক্ষ লোক স্নান করে আনন্দ পায় বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে ক’জনার গঙ্গোত্রী দর্শনের সৌভাগ্য ঘটে? ধন্যবাদ আপনাকে।"
     আমি বললাম, “ধন্যবাদটি কালকের জন্য রেখে দিন। আজ দাফলা হিলস-এর নৃত্য দেখিয়েছি, কাল দাফল হিলস্‌ এর দামদুম' দেখাব। কলকাতায় ফিরে এ দুটির কথাই মনে থাকবে।"
     দাফলা পাহাড়ের ‘দামদুম্' এক অতি ক্ষুদ্র বিষাক্ত মাছি—মুখটা মশার মত, পেছনটা মাছির মত। কামড়ালে দংশিত স্থান চুলকায়, ফোলে, পাকে, ভোগায় অনেক দিন।
     এহেন উত্তর-লক্ষীমপুর মহকুমায় পৌছে কিছুদিন একটু সতর্কভাবে চলাফেরা করতাম। কিন্তু যাদের কর্মস্থল অরণ্যে, তাদের এভাবে বেশী দিন চলে না। তবে এটা বুঝতে পারলাম, এখানকার জানোয়ারগুলি মানুষের শক্তির পরিচয় কমই পেয়েছে। তাই, মানুষকে তারা ভয় করে কম। তাদের নানা অত্যাচার-কাহিনী কানে আসতে লাগল। ধীরে ধীরে সব সয়ে গেল। আমি উত্তর লক্ষীমপুরে স্থির হয়ে বসলাম।
     সহর থেকে ছয় মাইল দূরে ‘কদম রিজার্ভ’ নামে একটা রক্ষিত বন আছে। একদিন শোনা গেল সেখান থেকে একটা বিরাট গুণ্ডা হাতি বেরিয়ে পাশের গ্রামে ঢুকে লোকসান আরম্ভ করেছে। অত্যন্ত বদ্‌ স্বভাবের জন্য যে-সব বদ হাতিকে ‘পাল’ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের গুণ্ডা হাতি বলে।
     দিনের পর দিন গুণ্ডাটার অত্যাচার ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে। গ্রামের শস্যক্ষেত্র, গোলার ধান, কলাবাগান, ঘরদোর নষ্ট হতে লাগল। উপায়ান্তর না দেখে গ্রামবাসিগণ মহকুমাধিপতির শরণাপন্ন হ’ল।
     একদিন সন্ধ্যার সময় এক দরিদ্র গ্রাম্য রমণী শহর থেকে গ্রামে ফিরছিল। হতভাগিনী গুণ্ডাটার সম্মুখে পড়ে গেল। তার নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন আর হল না। অবলার ছিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে থানিকক্ষণ খেলা করে জানোয়ারটা স্বস্থানে চলে গেল। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় সকলে বড়ই মর্মাহত ও উত্তেজিত হ’ল। মহকুমাধিপতি গুণ্ডাটাকে অবিলম্বে মেরে ফেলবার জন্য গুর্খা সিপাই নিযুক্ত করলেন।
     হাতিটা এ খবর পেল কিনা জানি না,—সে কিছুদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে রইল। সিপাইরা রাইফেল নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে, কিন্তু গুণ্ডার দেখা নেই। লোকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে ফেলতেই এক রাতে জানোয়ার শিরোমণি একেবারে উত্তর লক্ষীমপুর শহরে এসে উপস্থিত! সংবাদ পাওয়া মাত্র শহরে হুলুস্থুল পড়ে গেল। নিমেষের মধ্যে পথঘাট জনশূন্য হ’ল—বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সাইরেন বাজলে যেমন হ’ত আর কি!
     প্রত্যেকে মনে করছে এই বুঝি গুণ্ডাটা এসে তারই ঘরের দরজা ঠেলছে। ভয়ের কারণও যথেষ্ট ছিল, কারণ সেখানকার কাঁচা বাড়ী-ঘর হাতি রুখতে পারত না। সিপাইরা খবর পেয়ে হাতীটার পেছনে লাগল। তারা রাইফেলের গুলি ছুড়লও কয়েকটা, কিন্তু সুবিধা করে উঠতে পারল না। বিরাট দেহধারী হলেও হাতি অত্যন্ত দ্রুত ছুটতে পারে। তারপর, রাতে তাকে নজরে রাখাও শক্ত—আঁধারে গায়ের রং মিশে যায়। মর্মস্থলে গুলি ভেদ না করলে হাতির বিশেষ ক্ষতিও হয় না। এসব কারণে, বিশেষতঃ মানুষের বসতির মধ্যে সিপাইদের কাজে নানা অসুবিধা হতে লাগল।
     আবার কয়েকদিন কেটে গেল। মাঝে মাঝে হাতিটা শহরে এসে খানিকক্ষণ এপাড়া ওপাড়া করে পুনরায় চলে যায়। শহরবাসিগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, সিপাইরাও সুবিধা করতে পারছিল না।
     সেদিন পূর্ণিমা তিথি। ডিসেম্বর মাসের নির্মল আকাশে পূর্ণশশী উঠে শহরটিকে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত করেছে। সেই আলোকে দাফলা পাহাড়ও অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শিশির সিক্ত গাছের পাতাগুলি ঝকঝক করছে। ছোট্ট শহরটি যেন এক স্বপ্নপুরী—কোথাও কোলাহল নেই, সর্বত্র শান্তি বিরাজমান। মধুময় রাত, শান্তিময় মনুষ্যজীবন। কনকনে শীতে অনেকেই লেপের নীচে আরামে নিদ্রামগ্ন।
     হঠাৎ সংবাদ প্রচারিত হ’ল-গুপ্ত হাতিটা পুনরায় শহরে এসে পৌছেছে। চাঁদের সৌন্দর্য, লেপের আরাম, গভীর নিদ্রা, নিমেষে মধ্যে উত্তর লক্ষীমপুর থেকে অন্তৰ্হিত হ’ল! জননী সন্তানকে বুকে চেপে ধরে বিপদবারণ নারায়ণকে প্রার্থনা জানালে। পিতা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। সকলেই নির্বাক। যাদের কাছে পাকা বাড়ী ছিল তারা সেখানে চলে গেল !
     সিপাইরা আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমন চাঁদনি রাত, এমন সুবর্ণসুযোগ আর শীঘ্র পাওয়া যাবে না। যে কোন প্রকারে দুরাত্মাকে আজ ধরাশায়ী করতেই হবে।
     হাতিটাও আজি বড় চঞ্চল। শহরে এসেই সে এপাড়া-ওপাড়া ছুটাছুটি করতে লাগল। এ কি তার আনন্দোচ্ছাস পূর্ণচন্দ্রের অনুপম রূপ কি তাকে মাতোয়ারা করেছে না, এ তার তাণ্ডব নৃত্য!
     আমাদের পাড়া শহরের আর এক প্রান্তে। হাতিটা এযাবৎ কোনদিনই এ পাড়ায় আসে নি। এজন্য অন্য পাড়ার লোকেরা হিংসা করে বলত, “ও পাড়ায় যাবে কি, ফরেষ্ট অফিস যে ওখানে। এটা যে জানোয়ারদেরই অফিস!"
     কথাটা যে অনেকটা সত্য তা অস্বীকার করা যায় না। বাস্তবিকই, হিংস্র মানুষের হাত থেকে নিরীহ বন্য পশু পক্ষীকে রক্ষা করে তো এই ফরেষ্ট অফিসেই । দুর্জয় কদম রাজও কি এ খবর রাখে ? তাই কি সে কোন দিন এ পাড়ায় আসে নি?
     রাত তখন বারোটা-নিশ্চিন্তে শুয়ে আছ ! চাকর দৌড়ে এসে আমাকে জাগিয়ে বললে, শীগ্‌গির উঠুন, হাতিটা এসে পড়েছে। আমাদের গার্ডদের ব্যারাকের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এখখুনি এদিকে আসবে "
     আমি তাড়াতাড়ি বন্দুক ও কয়েকটা টোটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যে বন্দুক ও টোটা আমার কাছে ছিল, তা দিয়ে হাতি শিকার হয় না, আওয়াজ করে ভয় দেখান যেতে পারে মাত্র। একটু এগুতেই দেখি, হাতিটা আমাদের আঙ্গিনার ঠিক বাইরে একটা কূপের পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা জন তিনেক লোক একসঙ্গে ছিলাম! সকলে চট করে আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। জ্যোৎস্নালোকে কদম রাজকে খুব জাঁকাল দেখা যাচ্ছিল। তার ভয়াবহ প্রকৃতির কথা ভুলে গিয়ে আমি একদৃষ্টি সে নিখুঁত দেহসৌষ্ঠবের দিকে চেয়ে রইলাম; মনে হ’ল, বহুক্ষণ যাবৎ দৌরাত্ম্য করে ও কয়েকটি গুলি খেয়ে গুণ্ডাটা টা কিছু হয়রাণ হয়েছে। হটাৎ সে অন্যদিকে মুখ ফিরাল। আমারও চমক ভাঙ্গল। বন্দুকের ট্রিগারটা টেনে দিলাম—টোটা ভরাই ছিল। গুড়ম করে বন্দুক গর্জে উঠল। তা’ শুনে হাতিটা সহরের বাইরে যাবার পথটা ধরে ধীরে ধীরে চলতে লাগল।
     ঠিক এই সময়ে দু'জন গুর্খা সিপাই এসে জিজ্ঞেস করলে হাতিটা কোথায়? আমি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম। তারা আর বাক্যালাপ না করে পুনরায় হাতির অনুসরণ করলে। সম্মুখেই পথের মোড়। সেটা ঘুরতেই হাতি ও সিপাইরা অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমরা আমাদের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়েই কথাবার্তা বলছিলাম। অল্পক্ষণ পরে দু'তিনবার গুলির আওয়াজ কানে এল। তার সঙ্গে সঙ্গে হাতির বিকট চীৎকার শব্দ শোনা গেল। মনে হ’ল, হাতির ইহলীলা এবার সাঙ্গ হ’ল, উত্তর লক্ষীমপুর সহরের হাড় জুড়াল। সাহস পেয়ে পড়শী দু’চারজন ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সকলেই মনে ফুর্তি। কিন্তু, তা ক্ষণিকের জন্য আর, একটু পরেই খবর পেলাম গুণ্ডাটা একজন সিপাইকে মেরে ফেলে চলে গেছে। আমরা দৌড়ে গেলাম। পথের বাঁকটা ফিরতেই একটা ছোট্ট মাঠ। দেখি, সেই মাঠের মাঝে কয়েকজন সিপাই ও গ্রাম্য শিকারী মত হয়ে কি যেন পরীক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে মিলিত হলাম। পরীক্ষার বস্তু আর কিছু নয়, একজন সিপাইর মৃতদেহ।
     মৃতদেহটা চিৎ অবস্থায় পড়ে আছে। তার ওভারকোটের বোতামগুলি খোলা । ভেতরকার সাদা সার্টের উপরে সারা বুক জুড়ে হাতির এক পদচিহ্ন স্পষ্ট অঙ্কিত রয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেল বুকের একখানা হাড়ও ভাঙ্গে নি, এবং সারা দেহ অক্ষত রয়েছে! সিপাইটির অর্ধ নির্মীলিত চোখ দুটিতে শত্রুবিনাশের দৃঢ় সংকল্প যেন তখনো বিদ্যমান। প্রথম যে দু'জন সিপাই গুণ্ডাটাকে অনুসরণ করে, ইনি তাদেরই একজন। আমি বহুদিন যাবৎ যুদ্ধফেরত, হাতি শিকারী এই মৃত সিপাইটিকে চিনতাম।
পরে জানতে পেরেছিলাম, হাতিটা উপর্যুপরি কয়েকটা গুলি খেয়ে হঠাৎ রাস্তার পাশের একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়ায়। সিপাই দুজন তা না দেখতে পেয়ে এগুতেই হাতিটা আচম্বিত প্রথমটিকে শুড় দিয়ে ধরে ফেলে। সেই অবস্থায়ও নাকি সিপাইটি গুণ্ডাটাকে গুলি করবার চেষ্টা করেছিল। দ্বিতীয়টি কোন প্রকারে নিজপ্রাণ রক্ষা করে।
     হাতিটা সিপাইকে শুড়ে জড়িয়ে বিজয়োল্লাসে মাঠের মধ্যে খানিকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করে। তারপর, তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বুকের উপর নিজের পায়ের নরম তলা রেখে বোধ হয় পরীক্ষা করে নেয় তার শক্র জীবিত না মৃত! যখন নিঃসন্দেহ হ’ল তার পরম শক্র আর ইহজগতে নেই, তখন সে বীরদৰ্পে কোন দিকে যে চলে গেল তা লক্ষ্য করবার অবস্থা সেখানে কারুর ছিল না।
     জনোয়ারটা ইচ্ছা করলেই সিপাইর মৃতদেহ পায়ের তলায় পিষে ফেলতে পারত— পা তো তার বুকের উপরেই ছিল। কিন্তু, তা সে করে নি। যে কিছুদিন পূর্বেও এক নিরপরাধ রমণীকে প্রকাশ্যে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে খেলা করেছিল, সে কেন যে তার পরম শক্রকে নিজ কবলে পেয়েও একেবারে আস্ত রেখে চলে গেল তা আমি আজ পর্যন্ত বুঝতে পারি নি। এ কি বীরের প্রতি বীর জানোয়ারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন, না নিজের খামখেয়ালী মাত্র?
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য