বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ১৪তম উপাখ্যান

    পরদিন সকালে চতুর্দশ পুতুল বললো, মহারাজ, আমার নাম বিদ্যাবতী, বিক্রমাদিত্য সম্বন্ধে আমার কিছু বলার আছে।
    বিক্রমাদিত্যের দেশ ভ্রমণের অভ্যাস ছিল। একবার তিনি ঠিক করলেন পৃথিবীতে কোথায় কি আশ্চর্য জিনিস আছে, কোথায় কোন তীর্থে কোন দেবতা আছেন দেখবেন। এই ভেবে তিনি যোগীর বেশে দেশ পর্যটনে বেরিয়ে পড়লেন।
    একসময় তিনি এক নগরে এসে পৌঁছলেন। সেই নগরের কাছে এক তপোবনে জগদম্বার এক বিরাট মন্দির ছিল। তার কাছে একটি নদী ছিল। রাজা নদীতে স্নান করে দেবতার প্রণাম সেরে মন্দিরে বসে সমস্ত দেখতে লাগলেন। এমন সময় এক যোগী সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।
    যোগী রাজাকে বললেন, আপনি কোথা হতে আসছেন?
    রাজা বললেন, আমি তীর্থযাত্রী, তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছি।
    যোগী বললেন, না, আপনি রাজা বিক্রমাদিত্য, একসময় আমি উজ্জয়িনীতে আপনাকে দেখেছি! তা এখানে আসার কারণ কি?
    রাজা বললেন, আমার মনোবাসনা এই যে, পৃথিবী ভ্রমণ করে কোথায় কি আশ্চর্য জিনিস আছে দেখব।
    যোগী বললেন, আপনি বিজ্ঞ হয়েও মূর্খের মত কাজ করছেন। রাজ্যে যদি বিদ্রোহ হয় তখন আপনি কি করবেন?
    —মন্ত্রীর উপর রাজ্যভার দিয়ে এসেছি।
    যোগী বললেন, রাজা, আপনি শাস্ত্রবিরুদ্ধ কাজ করেছেন। রাজ্য বা কোন অমূল্য রত্ন নিজের হাতেই রাখা উচিত। বিপদের কথা কি বলা যায়। এইভাবে রাজ্য পরিত্যাগ করে দেশভ্রমণ করা আপনার উচিৎ নয়।
    যোগীর এই কথা শুনে রাজা বললেন, দেবতারা যা বিধান করেন তা হবেই। মানুষ সর্বশক্তি দিয়ে কতটুকু করতে পারে। বজ্ৰ যাঁর অস্ত্র, দেবতারা যার সেনা, অমরপুরী যাঁর দুর্গ, আর হাতী যাঁর বাহন সেই বলসম্পন্ন ইন্দ্রও মাঝে মাঝে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসেন। অতএব দেবতারাও দৈবের হাতের পুতুল। যা হবার তা হবেই। এ বিষয়ে একটি গল্প শুনুন--
    উত্তরদেশে নদীপৰ্বতবন্ধন নামক একটি নগর আছে। সেখানে রাজশেখর নামে এক ধর্মশীল রাজা রাজত্ব করতেন। একসময় তাঁর জাতিরা একজোট হয়ে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করে তাঁর রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাঁকে নিবার্সিত করল। রাজশেখর মনের দুঃখে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে এদেশ থেকে ওদেশ ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
    একসময় রাজা স্ত্রীপুত্র সহ একটি গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন। সূর্য অন্ত গেল। সেই গাছে পাঁচটি পাখি ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে নানা কথোপকথন করতে লাগলো। একটি পাখি বললো, এই নগরের রাজা মারা গেছেন, তাঁর কোন সন্তান নেই। সুতরাং কে রাজা হবেন? .
    অপর পাখি বললো, এই গাছের নীচে যে রাজা বসে আছেন তিনিই হবেন এই রাজ্যের রাজা।
    তৃতীয় পাখি বললো, তাই হোক। সকাল হতেই পাখিরা যে যার নিজের কাজে বেরিয়ে গেল। রাজাও আহ্নিক সেরে সুর্যকে প্রণাম করে নগরের রাজপথে এলেন।

    ঐ রাজ্যের অমাত্যরা এদিকে রাজা ঠিক করার জন্য একটি হাতীকে সুন্দর সাজ পরিয়ে মালা দিয়ে পাঠিয়েছিল। হাতীটি রাজশেখরকে দেখতে পেয়ে তাঁর গলায় মালা পরিয়ে নিজের পিঠে করে রাজপুরীতে নিয়ে এল। তখন অমাত্যরা মিলিত হয়ে রাজশেখরকে সিংহাসনে বসলেন।
    একসময় তাঁর রাজ্যের বিরোধী পক্ষের রাজারা একজোট হয়ে রাজশেখরকে নির্মুল করার জন্য সেই নগরে উপস্থিত হলেন। রাজা সেই সময় রাণীর সাথে পাশা খেলছিলেন।
    রাণী বললেন, মহারাজ, আপনি পাশা খেলছেন আর এদিকে আপনার জ্ঞাতিশত্রুরা আপনাকে রাজ্যচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে।
    রাজা বললেন, রাণী, দৈব অনুকূল না হলে কিছুই হবে না। আমি যখন গাছের তলায় আশ্রয় নিয়েছিলাম তখন আমাকে যিনি এই রাজ্যের অধীশ্বর করেছেন তাঁর উপরই আমার এবং এই রাজ্যের সকল ভার দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত আছি। তিনি যা করবেন তাই হবে।
    রাজার এই কথা শুনে দৈব চিন্তা করলেন, আমিই একে রাজা করেছি, যদি এখন আমি সচেষ্ট না হই তবে এর অনিষ্ট হবে। এই চিন্তা করে দৈব ভীষণ মূর্তি ধারণ করে সমস্ত শত্রুর সামনে এসে রুখে দাঁড়ালেন। তারা পরাজিত হল।রাজশেখর মনের আনন্দে রাজ্য সুখ ভোগ করতে লাগলেন।
    বিক্রমাদিত্যের কাছ থেকে এই গল্প শুনে যোগী সন্তুষ্ট হলেন এবং রাজাকে একটি শিবলিঙ্গ দান করে আশীর্বাদ করে বললেন, এইটি চিন্তামণির মত। মনে মনে যা চিন্তা করবেন তাই পাবেন এর কাছ থেকে। প্রতিদিন ভক্তিচিত্তে এর পূজা করবেন।
    রাজা হৃষ্টচিত্তে যোগীকে প্রণাম করে সেই নগরের পথে চলেছেন এমন সময় এক ব্ৰাহ্মণ এসে রাজাকে আশীর্বাদ করে বললেন, হে রাজন, প্রতিদিন শিবলিঙ্গের পূজা না করে আমি জলগ্রহণ করি না, কিন্তু আজ তিন দিন হল আমার শিবলিঙ্গটি হারিয়ে দিয়েছে, তাই আমি তিন দিন উপবাসী। আপনার হাতের ঐ শিবলিঙ্গটি আমাকে দিলে আমার অশেষ উপকার হয়। রাজা ব্রাহ্মণকে শিবলিঙ্গটি দান করে নিজ নগরে ফিরে গেলেন।
ভোজরাজ পুতুলের কথা শুনে চুপ করে রইলেন ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য