রুরুর স্বপ্নওয়ালা -- সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    লোকটার আসার শব্দ অনেকক্ষণ আগে থেকে পাওয়া যায়। ছড়ের টানে শব্দ ওঠে ওর ছোট্ট দুতারের বাজনাটা থেকে। মাথায় একটা ঝাঁকায় অনেক গুলো বাজনা। আর হাতে একটা। হাতেরটা দিয়ে ও সুর তোলে। ভারি মিষ্টি সুর। মিষ্টি হলে কি হবে সুরটায় একটা কান্না মেশানো থাকে। ঠিক কান্না পায় না, কিন্তু! কষ্ট হয়।
    রুরু একলা জানলার ধারে বসে থাকে। ওর বাবা মা দুজনেই কাজে বেরিয়ে যান। বাবা মারা কেন কাজে যান, কী করেন রুরু কিছু বুঝতে পারে না। বাবা বাড়িতে থাকলে কত মজা হয়। বাবা ওকে কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে গান গাইতে গাইতে দুলতে থাকেন। রুরু কাঁধের ওপরে দোলে। ওর হাতের কাছে কত কি জিনিস এসে যায়। আলমারির ওপর বনসাই করা গাছটা। হাজার রকমের হাতি, ফুলদানির ফুল সব। কিন্তু রুরু ওসব কিছুতেই হাত দেয় না। ওর তো একটু ভয়ও করে তাই বাবার চুল আঁকড়ে ধরে বসে থাকে। যাতে কোনওক্রমেই ও পড়ে না যায়। আর খুব ভাল লাগে। তোমরাই বল, বাবার কাঁধে চড়তে কার না ভাল লাগ ? বাবা গল্প পড়ে শোনান, গল্প বানিয়ে শোনান, কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। বাবা মানেই হইচই বাবা মানেই আনন্দ।
    কিন্তু মার কথাই বোধহয় আগে বলা উচিত ছিল। মাকে দেখলেই রুরু একদম খুশি হয়ে যায়। ওর কোন দুঃখের কথা মনে পড়ে না। সারা দুপুরটা একলা থাকার কষ্ট কোথায় উধাও হয়ে যায়। তখন শুধুই খুশির হাওয়া। তোমাদের মার কথা তো রুরু জানে না, কিন্তু রুরুর মা কখনও একদিনে রুরুকে এক নামে দুবার ডাকেন না। রুরুর কত নাম রুরু, রুরাই, রুরুসোনা, সোনামনি, ধনমনি, রুরুমনি, খোকনসোনা থেকে শুরু করে হাবলু, গুবলু, টুবলু! নামের কোন সীমা সংখ্যা নেই। আর কখনও কোন কারণ নেই, মা কোলে তুলে নিয়ে অ্যাতো অ্যাতো আদর করেন। সে সময় রুরুর খুব ভাল লাগে।
    কিন্তু সেসব তো শুধুই ছুটির দিনে। অন্যদিনে রুরু ভোরবেলা ইস্কুল যায়। বাবা পৌছে দিয়ে আসেন। ওর স্কুল যখন ছুটি হয় তখন বেরিয়ে দেখে বকুলদি দাঁড়িয়ে আছে। বকুলদি খুব সাঙ্ঘাতিক লোক। বাবাকে ছোট দেখেছে। বাবাও তার বকুলপিসির মুখের চোটে কাবু হয়ে যান। আর ছোট্ট রুরু—সে কী করে বকুলদিকে সামলাবে। বাড়িতে ফিরে আসে বকুলদির সঙ্গে। বকুলদি শক্ত করে হাত ধরে থাকে। এ ছাড়াও বকুলদিকে নিয়ে একটা অসুবিধে আছে। ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সারা  রাস্তা বকুলদি রাজ্যের মানুষকে বকতে বকতে আসে।
    বকুলদির ধারণা সবাই রুরুর পা মাড়িয়ে দিতে চায়, রুরুকে ধাক্কা দিতে চায়। সুতরাং বকুলদি সারা রাস্তা বলতে বলতে আসে—‘হ্যাঁগা ও ভালমানুষের ছেলে, ভগবান তো দুটি চক্ষু দিয়েছেন, সেগুলি দিয়ে একটু দেখলে কোন ক্ষতিটা হয় শুনি? দেখছ একটা দুধের বাচ্ছাকে নিয়ে চলেছি। বুড়োমানুষকে না হয় নাই রেয়াত করলে, দুধের বাচ্ছাটাকে একটু বাঁচিয়ে চল। এখুনি তো বাছার আমার পা মাড়াচ্ছিলে। রুরুর লজ্জা করে। বলে, বকুলদি, তুমি কেন আমনি করে বলছ?
    ব্যস, বকুলদি বলবে, চোপ। কোন কথা বলবি না। জানিস, তোর বাবাকে আমি ইস্কুল থেকে আনতাম। তোর বাপের ঠাকুর্দা আমি তাকে বাবা বলতাম, তখন বেঁচে। আমায় বলে দিয়েছিলেন সাবধানে আনবি আমার নাতিকে। তুই তোর বাবার চেয়ে সেয়ানা। সে না হয় এখন পণ্ডিত হয়েছে, তবু আমাকে কিছু বলে দেখুক না?
    বাড়ি এসে বকুলদি ওকে প্রথমে দুধ খেতে বাধ্য করে। একদিন সামান্য একটু দুধ একটা বিড়ালকে খাইয়েছিল রুরু। বকুলদি জোর করে দু-গ্লাস দুধ খাইয়েছিল সেজন্য। তারপর স্নান, তারপর খাওয়া। প্রায় বেত হাতে নিয়ে বসে থাকে বকুলদি। ‘খাও ফেল না। বলি বাবা মা তো কত খরচা করে তোমার জন্যে, তার বদলে তো শরীরটা একটু ভাল করতে পার। এই প্যাকাটি শরীর আমার দেখতে ভাল লাগে না ।
খাবার পর বকুলদি নিজে খায়। খায় তো ছাই। খাবার নিয়ে বসে মাত্র। তারপব বলে, দাদু ভাই, এবার ঘুমিয়ে পড়। বলে, নিজে শুয়ে পড়ে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই একদম ঘুমিয়ে কানা হয়ে যায়। সেই সময় রুরু গিয়ে জানলায় বসে। জানলায় বসে রুরু কত কী দেখে। পাড়ায় বোধহয় এগার বারটা কুকুর আছে। কখনও তাদের দেখা পাওয়া যায়, কখনও দেখাই যায় না। রুরু জানলা ছেড়ে বারান্দায় চলে যায়। বারান্দা থেকে অনেকটা রাস্তা দেখা যায়। বারান্দাটা লোহার নকশা কাটা জালে ঢাকা, কেউ ভেতরে আসতে পারে না, কিন্তু বাইরেটা দেখা যায়। ওখানে বসেই রুরুর সঙ্গে ওই বাজনাওয়ালার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
    রুরু একটা বাজনা কিনেছিল, কিন্তু তার থেকে কোনও সুর বার করতে পারছিল না। সে কথা বলতেই বাজনাওয়ালা বলল, ‘দাদা, এত সহজেই কি সুর বেরোবে ? তোমাকে কসরৎ করতে হবে। সুরের কান ঠিক করতে হবে। তবে তো হবে।
    রুরু একগাল হেসে ফেলল। বলল, তুমি কি পাগল ? সুর কি বাঘ না ভালুক না মানুষ যে তার কান থাকবে?
    বাজনাওযালা বলল, এটা ঠিক বলছ। এ কথাটা আমার আগে মনে হয় নি। তবে কানেই তো সুর বাজে?
   রুরু আবার বলল, তা তো বাজেই। তুমি যে দূর থেকে তোমার বাজনা বাজাতে বাজাতে আস তখন তো আমি ঠিক বুঝতে পারি।
    এবারও বাজনাওয়ালা জব্দ। সে বলল, ঠিক কথা। আমি ভুল করেছি। কী করলে আমার মাফ হবে? রুরু বলল, বাজনা শিখিয়ে দাও। বাজনাওয়ালা তখন একটা অদ্ভুত কথা বলল। বলল, আমি বাজনা শেখাতে পারি না। তবে আমার ঝুলিতে অনেক স্বপ্ন আছে, তোমাকে স্বপ্ন দেখাতে পারি।
    রুরু অবাক হয়ে গেল। বলল, তুমি স্বপ্ন দেখাতে পার? কিসের স্বপ্ন ? 
   সে উত্তর দিল, তুমি ঠিক কর। ফুলের দেশের স্বপ্ন দেখবে, না বরফের দেশের স্বপ্ন দেখবে, না যেখানে পাহাড়ে চুড়োয় মেঘ আটকে থাকে সেখানকার স্বপ্ন দেখবে।
    রুরু একটু ভেবে বলল, আমি বাবার ছোটবেলার স্বপ্ন দেখব। 
    বাজনাওয়ালা বলল, হবে হবে সব হবে। আজকে রাতে তুমি এই পাতাটা হাতে নিয়ে ঘুমোতে যেও। তারপরে দেখো কী হয়। রুরু সেদিন খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। আর অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেই যেন ঘুমিয়ে পড়ল। এই সময় শুনতে পেল বাজনাওয়ালার সেই সুরটা ভেসে আসছে। দেখল ও একটা বিশাল জলপ্রপাতের ধারে গিযে দাঁড়িয়েছে। একটা মস্ত নদী হুহু করে আছড়ে পড়ছে পাহাড়ের ওপর থেকে মাটিতে। কী সাঙঘাতিক সেই জলের তোড়। আর জল পড়ে পড়ে কত ফেনা তৈরি করছে, আর সেই জলকণার মধ্যে সূর্যরশ্মি পড়ে রামধনুতে ভরে দিয়েছে জায়গাটা। খুব শীত করছিল। হঠাৎ একজন ওর গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে দিল। রুরু ফিরে দেখল সেই বাজনাওয়ালা। ওঃ মুখে কিরকম একটা হাসি। বলল, কেমন দেখছ? রুরু বলল, খুব সুন্দর। এ জায়গাটার নাম কী ? এ নদীটার নাম কী ? বাজনাওয়ালা বলল, নদীটার নাম নায়েগ্রা। তুমি নাম শুনেছ ? রুরু বলল, মনে পড়ে না। স্বপ্নটা শেষ হয়ে গেল। তখন সকাল হয়ে গেছে।
    তারপর থেকে রুরু বসে থাকে কখন আসবে সেই বাজনাওয়ালা। কতদিন বাদে সে আসে। রুরু খুব খুশি হয়। বলে বাবাকে বলেছি আমি নায়েগ্রার কথা। বাবা বিশ্বাস করেন নি যে আমি সত্যিই দেখেছি। বাবা দেখেছেন নায়েগ্রা। খুব অবাক হয়ে গেলেন আমি এত খুঁটিনাটি খবর জানি দেখে। বাজনাওয়ালা হাসল। বলল, আজ তুমি ফুলের রাজ্যে যাবে। সেদিন সারাটা রাত ও একটা পাহাড়ের উপত্যকায় কাটাল। এত ফুল ও কখনও দেখে নি। এত প্রজাপতি ও কোনদিন দেখে নি। রুরু তার ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে দৌড়তে লাগল ফুলের বনের মধ্যে। বাজনাওয়ালা দাঁড়িয়ে রইল আর রুরুর মজা দেখতে দেখতে খুব হাসছিল। বলছিল, কী, বলেছিলাম না, এ জায়গাটা সুন্দর?
    তারপর আরও কত স্বপ্ন দেখল রুরু। বাজনাওয়ালার কথা আর তার মনেই পড়ে না। মনে হয় স্বপ্নওয়ালা। ও স্বপ্ন বিলিয়ে বেড়ায়। কোথায় না নিয়ে গেল রুরুকে। সেই যে নদীটা দেখেছিল,—ছোট্ট নদী কিন্তু ভীষণ তার স্রোত। একটা বড় পাথরের চাইকে হেলা ভরে ঠেলে নিয়ে চলেছে সেই ছোট্ট নদীটা। একদল হাতি দাঁড়িয়ে আছে নদীর ওপারে। এপারে দাঁড়িয়ে স্বপ্নওয়ালা বলল, নদীতে জল বেশিক্ষণ থাকবে না। পাহাড়ী নদীর স্বভাবই ওইরকম।
    একদিন ওরা একটা মেলায় গেল। কি বিরাট মেলা। এমন মেলা রুরু কখনও দেখেনি। কত পাঁপড় ভাজা হচ্ছে। একটা জিনিস দেখেও বুঝতেই পারল না জিনিসটা কী। স্বপ্নওয়ালা বলল, এ হল গোলাপী রেউড়ি। বিরাট বিরাট ঘূর্ণিতে চড়ছে লোকে। কত দোকান তার ঠিক ঠিকানা নেই। এক জায়গায় মেয়েরা খুব ভিড় করে আছে, সেখানে আদিবাসী গ্রাম থেকে গয়না নিয়ে এসেছে। আর-এক জায়গায় চিড়িয়াখানা আছে, কথাবলা পুতুল আছে, কী নেই ? হঠাৎ রুরু দেখল এক জায়গায় একটা ছোট্ট ছেলে কাঁদছে। চোখ মুছছে মাঝে মাঝে, আবার কাঁদছে। সবাই জিজ্ঞেস করছে, তোমার নাম কী খোকা ? কোথায় থাক ? ছেলেটা উত্তর দিচ্ছে না। এমন সময় বকুলদি ঢুকল। বকুলদির গায়ে লালপাড় শাড়ি, এক মাথা চুল। বকুলদিকে দেখে সেই ছোট্ট ছেলেটা বলল, বকুলপিসি তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বকুলদি জোরসে সেই ছোট্ট ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, সোনা মনি, আমিও তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি। রুরু ডাকল, বকুলদি ! বকুলদি ওর দিকে তাকাল কিন্তু চিনতে পারল না রুরুকে।
    স্বপ্নওয়ালা বলল, তোমার বাবার ছোটবেলা দেখলে। রুরু অবাক। ওই ছোট্ট ছেলেটা ওর বাবা? তাই কখনও হয়। স্বপ্নওয়ালা হাসল। রুরুর সঙ্গে স্বপ্নওয়ালার সেই শেষ দেখা। রুরু বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা, তুমি ছেলেবেলায় মেলায় হারিয়ে গিয়েছিলে? বাবা বললেন, কই না তো? বকুলদি ঝিমোচ্ছিল হঠাৎ টান টান হয়ে উঠল। বলল, দাদুভাই, যে কথা আমি কাউকে বলি নি, এই এতবছর বাদে তুমি তা জানলে কি করে? রুরু হেসে বলল, কেন বলব? বকুলদি যে কেন ওকে শক্ত করে ধরে রাখে ইস্কুল থেকে আসার সময় সেটা বুঝতে পারল রুরু। যেটা বুঝতে পারে নি সেটা হল কেন স্বপ্নওয়ালা চলে গেল। এখনও দুপুরে রুরু কান খাড়া করে শোনবার চেষ্টা করে স্বপ্নওয়ালার বাজনা। শুনতে পায় না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য