ডোরাকাটা পটির রোমাঞ্চকর কাহিনী [ দি অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য স্পেকলড ব্যান্ড ]-৩

    সেই উৎকণ্ঠা, সেই উদবেগ, সেই প্রতীক্ষা জীবনে আমি ভুলব না। রাত তিনটের ঘণ্টা বেজে যাওয়ার পর আচমকা ভেন্টিলেটরে যেন আলোর ঝিলিক দেখলাম। সেইসঙ্গে নাকে ভেসে এল পোড়া তেল আর ধাতু তেতে ওঠার গন্ধ। অর্থাৎ চোরা লণ্ঠন জ্বলছে পাশের ঘরে। হাটাচলার মৃদু শব্দও কানে ভেসে এল। তারপর আধঘণ্টা আর কোনো শব্দ নেই পোড়া গন্ধটা কিন্তু বেড়েই চলেছে। এর ঠিক পরেই একটা নতুন শব্দ শুনলাম।
    সোঁ-সোঁ করে একনাগাড়ে যেন স্টিম বেরিয়ে যাচ্ছে কেটলি থেকে। শব্দটা কানে যেতেই হোমস বিছানা থেকে ছিটকে ফস করে দেশলাই ঘষে সপাং সপাং করে বেত হাকিয়ে চলল দড়িটার ওপর।
    সেইসঙ্গে চেঁচাতে লাগল আতঙ্ক বিহ্বল কণ্ঠে, ‘ওয়াটসন! দেখেছ? ওয়াটসন ! দেখেছ?’ 
    কী দেখব আমি? হঠাৎ আলো জ্বালানোয় চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল— কিন্তু একটা চাপা শিসের শব্দ ভেসে এসেছিল কানে। তারপরেই ওইভাবে পাগলের মতো বেত মারা। দেখেছিলাম শুধু হোমসের মুখের চেহারা। আতঙ্কে’, ঘৃণায়, বিভীষিকায় পাণ্ডুরবর্ণ সে-মুখ যেন চেনাই যায় না।
    মার বন্ধ করে ভেন্টিলেটরের দিকে চেয়েছিল হোমস। আচমকা নিশীথ রাতের নৈঃশব্দ খান খান করে জাগ্রত হল একটা অতি ভয়াবহ আর্ত চিৎকার— জীবনে এমন রক্ত জমানো মরণ হাহাকার আমি শুনিনি। ক্রমশ পর্দা চড়তে লাগল চিৎকারের— আতীব্র যন্ত্রণা নিঃসীম আতঙ্ক আর অপরিসীম ক্রোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সব শেষের বুকফাটা চিৎকারটার মধ্যে। লোমহর্ষক সেই চিৎকার শুনে নাকি গাঁয়ের সবাই বিছানায় উঠে বসেছিল— গাঁয়ের বাইরেও অনেকের ঘুম ছুটে গিয়েছিল। অবর্ণনীয় সেই চিৎকার সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অবশ করে তুলল আমাদের চিত্ত— ফ্যালফ্যাল করে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমি আর হোমস। আস্তে আস্তে প্রতিধ্বনির শেষ রেশ মিলিয়ে গেল দূর হতে দূরে— আবার টুঁটি টেপা নৈঃশব্দ্য চেপে বসল নিশীথ রাতের বুকে।
    বললাম রুদ্ধশ্বাসে, “এ আবার কী?’ 
    ‘সবশেষ। পিস্তল নাও, চলো ডা. রয়লটের ঘরে।’
    গম্ভীর মুখে বাতি জ্বালল হোমস। করিডরে বেরিয়ে দু-বার ধাক্কা মারল দরজায়— সাড়া এল না। তখন হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ঢুকল ভেতরে— ঠিক পেছনে উদ্যত পিস্তল হাতে আমি।
    দেখলাম এক অসাধারণ দৃশ্য। দেখলাম, টেবিলের ওপর জ্বলছে একটা আঁধার লণ্ঠন— শাটারটা অর্ধেক খোলা। তির্যক রশ্মিরেখা গিয়ে পড়ছে পাল্লা সিন্দুকের ওপর। টেবিলের পাশেই চেয়ারে বসে ডা. গ্রাইমসবি রয়লট। পরনে ধূসর লম্বা ড্রেসিং-গাউন, নগ্ন গোড়ালি দেখা যাচ্ছে তলার দিকে, পায়ে লাল তুর্কি চটি। বিকেল বেলা ফাঁসওলা যে-চাবুকটা দেখে অবাক হয়েছিলাম, কোলের ওপর রয়েছে সেই চাবুকখানি। চিবুক ওপরে তোলা, ভয়াবহ আড়ষ্ট চাহনি নিবদ্ধ কড়িকাঠের দিকে, কপাল ঘিরে একটা অদ্ভুত হলদে পটি। ছিট-ছিট বাদামি দাগ দেওয়া ডোরাকাটা পটি! খুব আঁট করে যেন মাথায় বেড় দিয়ে রয়েছে বিচিত্র সেই পটি। আমরা ঘরে ঢুকলাম, ডাক্তার কিন্তু নড়লেন না, কথাও বললেন না।
    ‘ডোরাকাটা পটি? ফুটকি দাগ দেওয়া ডোরাকাটা সেই পটি! ফিসফিস করে বললে হোমস। এক পা এগিয়েছিলাম আমি। অমনি নড়ে উঠল মাথার আশ্চর্য পাগড়ি। সরসর করে খুলতে লাগল বেড় এবং চুলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল চেপটা রুইতনের মতো একটা মাথা— ঘাড় মোটা গা-ঘিনঘিনে একটা সরীসৃপ।
    চেঁচিয়ে উঠল হোমস, ‘অ্যাডার সাপ। বাদায় থাকে! ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিষধর সরীসৃপ! ছোবল মারার দশ সেকেন্ডের মধ্যে অক্কা পেয়েছে ডাক্তার। নিজের ফাঁদেই শেষ পর্যন্ত পড়তে হয় কুচক্রকে— অন্যের বুকে ছুরি মারতে গেলে সে-ছুরি নিজের বুকে বেঁধে। যাক, এখন ডেরায় পাঠানো যাক সরীসৃপ মহাপ্রভুকে। তারপর মিস স্টোনারকে নিরাপদ জায়গায় পৌছে দিয়ে খবর দেব পুলিশকে।
    ঝট করে ডাক্তারের কোল থেকে ফাঁস দেওয়া চাবুক তুলে নিয়ে হোমস অ্যাডারের গলায় ফাঁস আটকে টেনে নিয়ে গেল সিন্দুকের মধ্যে— বন্ধ করে দিল পাল্লা।
    পরের দিন বাড়ি ফেরার পথে হোমস যা বললে তা এই : 'ভায়া ওয়াটসন, জিপসি আর পটির কথা শুনে গোড়া থেকেই ভুল ধারণা করেছিলাম— শুধু একটা ব্যাপার ছাড়া। ওই ভেন্টিলেটরটা চোখ খুলে দেয় আমার। জানলা দিয়ে কিছুই ঢোকা যখন সম্ভব নয়, তখন বুঝলাম ঘুলঘুলির ফুটাে দিয়ে এমন কিছুই বেরিয়ে আসে, বিছানা পর্যন্ত যাকে নামবার জন্যে ঝোলানো হয়েছে দড়িটা। ভারতবর্ষের ভয়ানক জীবজন্তু পোষার শখ আছে শুনে সন্দেহ ঘনীভূত হল। রাসায়নিক পরীক্ষায় ধরা যায় না এমন বিষ যদি শরীরে ঢোকানো যায়,  মৃত্যুর কারণ ধরা পড়বে না। ছোবল দেওয়ার ছোট্ট দুটো ফুটোও অনেকের নজর এড়িয়ে যাবে। শিস দেওয়া হত সাপটকে ডেকে নেওয়ার জন্যে– দুধের লোভও দেখানো হত— কিন্তু ঘুমের ঘোরে সাপের ল্যাজে পা দিলে কামড় তো একদিন খেতেই হবে।
    এই সিদ্ধান্ত মাথায় নিয়ে ঢুকলাম ডাক্তারের ঘরে। চেয়ার পরীক্ষা করলাম— দেখলাম ডাক্তার তাতে উঠে দাঁড়ায়। নইলে তো ভেন্টিলেটরের নাগাল ধরা যাবে না। ফাঁসওলা চাবুক, লোহার সিন্দুক আর দুধ দেখে কোনো সন্দেহই আর রইল না। ঝন-ঝন-ঝনাৎ আওয়াজটা আসলে লোহার সিন্দুকের ডালা বন্ধ করার আওয়াজ-- সরীসৃপকে সিন্দুকে চালান করে সিন্দুক বন্ধ করেছিল ডাক্তার। সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনেই বেত মেরে ভাগিয়ে দিলাম যার কাছ থেকে এসেছে— তারই কাছে। মার খেয়ে সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই ছোবল মেরেছে। সুতরাং লোকে বলবে আমিই হয়তো ডা গ্রাইমসবি রয়লটের মৃত্যুর কারণ। তাতে আমার বিবেক কোনোদিন কাতর হবে না।

পুরো গল্পটির ইপাব ডাউনলোড করও

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য