বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ৩১তম উপাখ্যান

    পরদিন রসবতী নামে আর একটি পুতুল বললো, রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকালে একদিন এক সন্ন্যাসী রাজার হাতে একটি ফল দিয়ে আশীবাণী উচ্চারণ করে বললেন, রাজন, আমি অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা চতুৰ্দ্দশীতে মহাশ্মশানে হোম করব। আমার ইচ্ছা আপনি হোন আমার উত্তরসাধক। সেই শ্মশানের অনতিদূরের একটি শিরীষ গাছে এক বেতাল বাস করে। আপনি অতিসন্তপর্ণে তাকে নিয়ে আসবেন।
     রাজা কথা দিলেন।
    তারপর নির্দিষ্ট দিনে রাজা বিক্রমাদিত্য সেখানে উপস্থিত হলেন। তাঁকে সেই গাছটি দেখিয়ে দিলে রাজা বেতালকে কাঁধে নিয়ে যখন নীরবে আসছিলেন তখন বেতাল বললো, হে রাজন, পথশ্ৰম দূর করতে আপনি একটা গল্প বলুন।
রাজা কিন্তু সন্ন্যসীর কথামত মৌনই রয়ে গেলেন।
    বেতাল বললো, আপনি মৌনভঙ্গের ভয়ে কথা বলছেন না বুঝতে পারছি। বেশ, তবে আমিই গল্প বলি, তবে আমার গল্প বলা শেষ হলেও যদি আপনি মৌনভঙ্গ না করেন তবে আপনার মস্তক শতচ্ছিন্ন হবে।
    এই কথা বলে বেতাল গল্প বলতে আরম্ভ করলো।
    হিমালয়ের দক্ষিণ দিকে বিন্ধ্যবতী নামে এক সুন্দর নগরী আছে। সেখানকার রাজার নাম সুবিচারক। তাঁর পুত্রের নাম ময়সেন। একদিন ময়সেন শিকার করতে বেরিয়ে একটি হরিণকে দেখতে পেয়ে তাকে অনুসরণ করে এক গভীর বনে প্রবেশ করলেন। যা হোক, একটা পথ খুঁজে পেয়ে যখন একাকী চলছিলেন তখন একটা নদী দেখলেন। সেই নদীর
তীরে এক ব্রাহ্মণের দেখা পেলেন।
    রাজপুত্র ময়সেন তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, আমি তৃষ্ণার্ত, আমার ঘোড়াটি একটু ধরুন, আমি জল পান করব।
   ব্রাহ্মণ বললেন, কে হে তুমি? আমি কি তোমার চাকর যে তোমার ঘোড়াটি ধরব আর তুমি জল পান করবে? আব্দার তো তোমার মন্দ নয়!
    ব্রাহ্মণের এই কথা শুনে রাজপুত্র ভীষণ রেগে গিয়ে তাঁকে চাবুকের বাড়ি মারলেন।
    ব্ৰাহ্মণ কাঁদতে কাঁদতে রাজার কাছে গিয়ে সব কথা বললেন।
    রাজা পুত্রের এই অন্যায় আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে পুত্রকে নির্বাসনদণ্ড দিলেন।
    মন্ত্রী রাজাকে বললেন, রাজপুত্র সুখে মানুষ হয়েছে, তাঁকে এই গুরুদণ্ড দেবেন না।
    রাজা বললেন, মন্ত্রী, এই দণ্ডই ঠিক হয়েছে। ব্রাহ্মণকে চাবুক মারার এটাই উচিত শান্তি। ব্রাহ্মণকে পূজা করা শাস্ত্রবিধি। আমার আদেশ, রাজপুত্র যে হাতে ব্ৰাহ্মণকে চাবুক মেরেছে সেই হাতখানা কেটে ফেল।
    মন্ত্রী রাজি না হলে রাজা নিজেই পুত্রের হাতখানা কাটতে উদ্যত হলে সেই ব্রাহ্মণ উপস্থিত হয়ে বললেন, হে রাজন, রাজপুত্র ভুল করে এই কাজ করে ফেলেছে, আর কখনও এমন করবে না। আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি তাকে এবারের মত ক্ষমা করুন। আপনার বিচারে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। ব্রাহ্মণের কথায় রাজা তাঁর পুত্রকে ক্ষমা করলেন। ব্রাহ্মণও যথাস্থানে ফিরে গেলেন। গল্প শেষ করে বেতাল বললো, রাজা এবং ব্রাহ্মণ —এই দু'জনের মধ্যে কে গুণে শ্রেষ্ঠ বলুন? রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, রাজাই গুণে শ্রেষ্ঠ।
    রাজার মৌনভঙ্গ হওয়ায় বেতাল পুনরায় শিরীষ কাছে ফিরে গেল। রাজাও আবার সেই শিরীষ গাছে উঠে বেতালকে নামিয়ে তাকে কাঁধে নিয়ে চলতে আরম্ভ করলেন।
    তখন বেতাল আর একটি গল্প বলতে আরম্ভ করল। এই ভাবে বেতাল পচিশটি গল্প রাজাকে বলেছিল।
    রাজা বিক্রমাদিত্য প্রত্যেকটি গল্পেরই সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন। এতে বেতাল রাজার সূক্ষ্মবুদ্ধি দেখে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বললো, হে রাজন, এই সন্ন্যাসী আপনাকে বধ করতে চায়। আমি আপনাকে যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। আপনি যখন আমাকে সেই  সন্ন্যাসীর কাচে নিয়ে যাবেন তখনই সন্ন্যাসী বলবে আপনি পথশ্রমে ক্লান্ত, এই অগ্নিকুণ্ড প্রদক্ষিণ করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে নিজের নগরে ফিরে যান।
    সন্ন্যাসী এই কথা বললে আপনি যেই সাষ্টাঙ্গ প্ৰণামের জন্য মাথা নত করবেন তখনই সে খড়া দিয়ে আপনাকে বধ করবে। তারপর আপনার মাংস দিয়ে হোম করবে। এই কাজটি করলেই অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি লাভ হবে তার।
     রাজা বললেন, এখন আমার কি কর্তব্য? 
   বেতাল বললো, সন্ন্যাসী যখন আপনাকে সাষ্টাঙ্গ প্ৰণাম করতে বলবে তখন আপনি বলবেন-আমি রাজা, সকলে আমাকেই প্রণাম করে, আমি কাউকে প্রণাম করি না তাই জানি না কিভাবে প্রণাম করতে হয়। আপনি আমাকে দেখিয়ে দিন। দেখাবার জন্য যেই সন্ন্যাসী মাথা নত করবে তখনি আপনি তার শিরশেছদ করবেন। তাহলে অষ্টসিদ্ধি লাভ আপনারই হবে।
    বেতালের পরামর্শমত রাজা তাই করলেন।
    বেতাল বললো, হে রাজন, আমি আপনার প্রতি প্রসন্ন হয়েছি - বর প্রার্থনা করুন।
    রাজা বললেন, আমার প্রতি যদি প্রসন্ন হয়েছ তবে প্রতিশ্রুতি দাও, আমি যখনই তোমাকে ডাকব তখনই আমার সামনে উপস্থিত হবে।
    বেশ, তাই হবে' বললে বেতাল সে স্থান ত্যাগ করলে রাজাও তাঁর নগরীতে ফিরে গেলেন।
    পুতুল বললো, মহারাজ, আপনার কি এমন সাহস আর ধৈর্য আছে?
    ভোজরাজ মাথা নীচু করলেন ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য