ফাটল -- মুর্তজা বশীর

   মাথার পেছনে ডান হাত রেখে, চিৎ হয়ে শুয়েছিল পিন্টু। ঘুম তার ভেঙ্গেছিল ছোট বোন রাবেয়ার বাঁশীর মত সরু গলার আওয়াজ শুনে। রোজ ভোরে এমনি বাঁশীর সুর তুলে কোরান পড়ে তার বোন। মাঝে মাঝে তার বিরক্তি ও ধরে। সকালে, কানের কাছে কোনরকম শব্দ সে বরদাস্ত করতে পারে না। শীতের আমেজ এখনো লেপের ভেতর থেকে পালিয়ে যায়নি, বরং এক উষ্ণতা এখনো ঘিরে। সারা শরীরে উইয়ের ঢিপিব মত বাসা বেঁধেছে।
    রাবেয়া বসেছিল দোর গোড়ায় । বারান্দায় রোদদ এক চিলতে পড়েছে। সেখানে ছেঁড়া মাদুব বিছিয়ে দুলে দুলে পড়ছিল রাবেয়া। সবদিনের - ই ভোবের রোদ লালটালির ছাদ বেয়ে এখানে এসে জমে থাকে। সদর রাতা থেকে কিছু ভেতরের দিকে বাসা। দুপাশে উঁচু দোতলা, তার মাঝে এই একতলায় রোদ আসতে বেলা বেশ হয়ে যায়।
    তা নাহলে আরো সকালে তাকে কোরান নিয়ে বসতে হয়। আব্বা ফযরের নামাজ পড়েই পাটিতে বসে অপেক্ষা করেন তার জন্য। সে এল তাকে কোরানের সূরা পড়ান, ভুলচুক সংশোধন করে দেন।
    কপালের ভুরু পর্যন্ত ঘোমটা টেনে রাবেয়া পড়েছিল। এই শীতে মাথায় কাপড় তেমন খারাপ লাগেনা তার, তবে গরমে বেশ অস্বস্তি মনে হলেও উপায় থাকেনা। শরীফ সাহেব কিছুতেই তাকে ফ্রক পরা দেখতে পাবেন না। বারো পেরিয়ে তেরোতে পা দিয়েছে, অমনি তিনি মেয়েকে শাড়ি পরতে বলেছেন। নইলে, চেঁচামেচির শেষ নেই। মুসলমান ঘরের মেয়ে শাড়ি ছাড়া কেমন বেআব্রু লাগে, নিজের চোখে কেমন লজ্জা এসে ভিড় করে।
    রাবেয়াকে হঠাৎ পড়ার মাঝে থামতে দেখে তিনি প্রশ্ন করেন, কি হলোরে থামলি যে? চোখ বুজে রাবেয়ার মিহি সুরের আয়াত শুনছিলেন তিনি, হঠাৎ চোখ মেললেন।
    আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে হুট করে জবাব দিতে পারল না রাবেয়া। শরীফ সাহেব ঝুঁকে রাবেয়ার ডান হাতের তর্জনী লক্ষ্য করে বললেন, পড়। ইন্নাল্লাহা বি কুল্লি শাইয়ি আলিমু। আইন জবর লাম যের ...
    ঠিক এমনি করে তিনি ইস্কুলে ইতিহাস পড়ান। ছাত্রদের সন তারিখ দিয়ে মুখস্থ করান। সেকেন্দার শাহ, তৈমুরলঙ্গের আক্রমণ, সব।
    হাই পাওয়ারের পুরু লেন্সের চশমা নাকের ডগা থেকে সরিয়ে ফেললেও নিম্প্রভ চোখ দিয়ে গড়গড় করে বলতে পারেন কোন লাইনের পর কি, কোন ঘটনার পর কোন ঘটনা। প্রথম যৌবনে তিনি সখ করে ইতিহাসের শিক্ষক হয়েছিলেন। মনে ছিল অফুরন্ত আশা, ছেলেদের ইতিহাস পড়াবেন নিজের দেশকে ভালভাবে ভালবাসতে শেখাবেন, দেশের জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মহান কাহিনী শুনিয়ে ছেলেদের দেশপ্রেম জাগাবেন। আগে হৃদয়ে পেতেন উষ্ণতা। তারপর সেই উদ্দামতা এক সময় কখন যে হারিয়ে গেছে টেরই পাননি। এখন সবকিছু মনে হয় অর্থহীন, বিবর্ণ মৃতদেহ। আপসোস হয় তার এই বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসে নিজের এমন নিবুদ্ধিতার জন্য। এখন মনে হয় সবকিছু ভুল করেছেন, জীবনে আগাগোড়াই তার মিথ্যে দিয়ে ভরা। অতীতের ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে তিনি অতীতেই রয়ে গেছেন, ভবিষৎও অতীত হয়ে গেছে।
    আব্বার জন্য তাই মায়া হয় পিন্টুর। ছোটবেলায় যে আব্বাকে সে দেখেছিল, এখন এই কৈশোরে তাকে মনে হয় অন্য কেউ। সেই প্রাণস্ফুর্তি শুকিয়ে গেছে, তার চিহ্ন কোথাও নেই। আব্বাকে দেখলে তার মনে হয় একটা শুকনো নদীর মত। দিক পাল্টিয়ে যে নদী চলে গেছে, শুধু রেখেছে তার বালির খাদ। তা না হলে আব্বা রাবেয়াকে আরো পড়াতেন, এবং তাকেও ছবি আকার ইস্কুলে ভর্তি করতেন।
   রাবেয়ার বড় ইচ্ছে ছিল ডাক্তারী পড়ার। অবশ্য এরও এক কারণ ছিল। পাশের বাড়ীর সেই যে কালো মত পাতলা মেয়েটা হেনা, যার সঙ্গে গলায় গলায় ভাব ছিল, ও মারা যাওয়াতে রাবেয়া ঠিক করল ডাক্তারী পড়ার। কতটুকুন তখন রাবেয়া, এই এগারা বারো হবে। একরকম বিনি চিকিৎসায় মরে গেল হেনা। দুটাকা ভিজিটের ডাক্তার একমাস ধরে চিকিৎসা করেও কিছু করতে পারেনি। পাঁচ টাকা ভিজিটের ডাক্তার সপ্তাহে তিনবার এসে, এক রাশ ফলমূল দুধ মাখন দিলে হয়ত বাচত!
কিন্তু তা হয়নি।
কেরাণী বাপের চোখের সামনে মেয়েটা শুকিয়ে মরে গেল। রাবেয়া কেঁদেছিল বান্ধবীর মৃত্যুতে। পিন্টু তাকে কিছুতেই থামাতে পারেনি।
   ডুকরে ডুকরে কেঁদে বুক ব্যথা করে ফেলেছিল সে। একসময় যখন বুকের ব্যথায় আর কাঁদতে পারলনা চোখ তুলে দেখল ভাইকে। বলল, ভাইয়া এমনি করে মরে গেল কেন সে ?
   এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি পিন্টু। শুধু চোখের কোণে অশ্রু এসে জমে উঠছিল। সেদিকে তাকিয়ে হয়ত জবাব খুঁজে পেয়েছিল রাবেয়া। তাই মাথায় কোকড়ানো চুল ঝাকিয়ে বলেছিল, গরীব বলে ভাল ডাক্তার আনতে পারেনি, না ভাইয়া?
    কিছুক্ষণ ইতস্তত করে জবাব রাবেয়া নিজেই দিল, আমি ডাক্তার হবো। দেখো ভাইয়া, আমি ডাক্তারী পড়বো।
    শুনে হেসেছিল পিন্টু, দুর তা কি তুই পারবি? মুরগীর জবাই দেখলে কেমন ভয় পাস তুই।
    ডাক্তারী অবশ্য আর পড়া হয়নি তার। তার পরের বছরে এইটে ওঠার পর আব্বা নাম কাটিয়ে দিলেন। চাকরীর সময় ফুরানতে আর দেরী নেই। মেয়েকে পড়ানো যেন পানিতে টাকা ফেলা মনে হলো শরীফ সাহেবের। বিয়ে হলে চলে যাবে, তাকে পড়িয়ে কি লাভ? বরং পিন্টু পডুক, ওকে পড়ালে আবার পয়সা ঘরে আসবে। ছেলে তার চাকরী করে টাকা আনবে। যে টাকা তিনি খরচ করবেন তা পাই পয়সায় ফেরৎ আসবে ঘরে।
   রাবেয়া অবশ্য খুব কেঁদেছিল। হেনা মারা যাওয়াতে যেমন করে কেঁদেছিল তেমনি। কিন্তু তার কান্নাকে কিছুতেই আমল দেননি তিনি। বরং ধমক দিয়েছেন, শাসিয়েছেন।
    কান্না কিসের শুনি? পড়ে তুই জজ ব্যারিস্টার হবি? ডাক্তার হবো। ছাই হবি। মেয়ের সেই অপলক চাহনী কিছুতেই সহ্য করতে পারেননি তিনি। সেই বােবা চাহনীতেও যেন ভাষা ফুটে রয়েছে। সে ভাষায় জ্বালা ধরে মনে। নিজের অক্ষমতায় সে জ্বালা আরো তীব্রতর হয়ে উঠে। মেয়ের সামনে থেকে পালিয়ে তবে যেন শান্তি পান।
    সেই রাবেয়াকে অবশ্য তিনি নিজেই কোরান পড়া শেখালেন। যাতে কোরানের সুমধুর বাণীতে সব গ্লানি আপসোস ভরাট হয়ে যায়। মেয়েটার গলায় মাধুর্য আছে, মেয়ে না হলে তাকে মৌলানা করতেন।
    পিন্টু কিন্তু আব্বাকে সেজন্য ক্ষমা করতে আজও পারেনি। তার মনে হয়েছে এ অন্যায়, অবিচার। বোন তার ছাত্রী ভালই ছিল, ক্লাশে ফাস্ট সেকেণ্ড হতো। তার এই পরিণাম দেখে বুক বারবার কেঁপে উঠল। শেষে কি তারও এই অবস্থা হবে ?
    ম্যাট্রিক পাশ করার পর সে আব্বাকে আভাষে ইঙ্গিতে জানিয়েছে ছবি আঁকা সে শিখবে। কিন্তু সেকথা তিনি কানে নেননি।
   শরীরটাকে ধনুকের মত বেঁকিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গল পিন্টু। বিছানার ময়লা চাদরে উবু হয়ে শুয়ে আধভেজান দরোজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল।
    উঠোনের একধারে, কলপারের পাশ ঘেঁষে ওঠা নারকেল গাছের পাতায় রোদের রেখা। দুটো শালিক। একটা বুঝি মা, তাই অন্যটা তার খয়েরী রঙের ডানা মৃদু কাঁপিয়ে হা করছিল বারবার। চিকন সরু পাতার ফাঁক গলিয়ে রোদের আদর শালিকটার বুকে পিঠে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় খয়েরী রঙের ওপর সোনালী জরির কাজ। পিন্টুর দেখতে ভাল লাগছিল সেই পালকগুলোর ওপর উজ্জ্বল ছটা। কেমন মসৃণ আর মোলায়েম ও জায়গাগুলো। রীতিমত নিজের সত্বা দিয়ে অনুভব করা যায়।
    চোখভরে চেয়ে তবুও তৃপ্তি মেলেনা। কিন্তু এমনি করেই বা কতক্ষণ শুয়ে থাকবে। আব্বা ডেকেছিলেন ভোরে নামাজ পড়তে, ইচ্ছে করে জবাব দেয়নি। উঠতে কেমন আলসেমী লেগেছে। এখন উঠতে বড্ড ভয় লাগল। দরোজা দিয়ে কলপারে যাবে তারও উপায় নেই। রাবেয়াকে নিয়ে আব্বা তার বসে।
   দোরের চৌকাঠে বাঁ পা রেখেছে শরীফ সাহেব তাকালেন। হাতের তসবীটা মাথার কাছে রেখে জিগ্যেস করলেন, তাহলে কি ঠিক করলে ?
    চুপ করে রইল পিন্টু। কিছুক্ষণ পর ইতস্তত করে জবাব দিল, বলেছিত।
   কি? ঘন আধপাকা ভুরুর নিচে, চশমার নিকেলের গোল ফ্রেমের পুরুকাঁচের ভেতর চোখ জোড়া কুঁচকে থাকে। মিনিট দুয়েক গুম ধরে থাকার পর বিস্ফোরণের মত ফেটে পড়লেন তিনি, ছবি আঁকবেন না কচু করবেন। ছবি এঁকে কি হবে ?
   শরীফ সাহেব বুঝে উঠতে পারলেন না ছবি এঁকে লাভ কি। ছোটবেলায় পিন্টু যখন কাগজে কিংবা দেয়ালে ছবি আঁকতো ভালই লাগত তার। মনে মনে ভাবতেন প্রতিভা আছে তাল ছেলের। তা না হলে নিজের থেকে এমন সুন্দর করে ছবি আঁকতে সে পারত না। আনন্দে তার বুক ভরে উঠত। নিজের সহকর্মীদের বলতেন ছেলের কথা, বলতে গর্বে তার মন উঁচু হয়ে যেত। সবাইকে বলতেন ম্যাট্রিকের পর তাকে আর্ট ইস্কুলে পড়াবেন। রং কাগজ এনে দিয়েছিলেন ছবি আঁকার জন্য। মাঝে মাঝে তার কাজ নিজে যেঁচে দেখেছেন। স্ত্রীকেও ডেকে দেখিয়েছেন। দেখিয়ে তৃপ্তি পেয়েছেন।
    কিন্তু, আজ তার মনে হয় তিনি ফের ভুল করেছেন। নিজেও ভুল করেছিলেন, পিন্টুর জীবনও ভুলে ভরে দিয়েছেন। ছবি আঁকবে যাদের ঘরে বাড়তি পয়সা রয়েছে তাদের ছেলেরা। সামান্য কটা টাকা সারা মাস ঘাম ঝরিয়ে মুখে ফেনা তুলে যা উপার্জন করেন তা এই খেয়ালের পিছনে উড়িয়ে দেবার কোন যুক্তি খুঁজে পাননা তিনি। এটা গরীবের ঘরে ঘোড়া রোগ। হ্যাঁ ঘোড়া রোগ ছাড়া এ আবার কী !
   মুহূর্ত কয়েক ইতস্তত করল পিন্টু। রাবেয়ার দিকে তাকাল। মাথা নিচু করে রাবেয়া কি যে পড়ছে শোনা যায় না স্পষ্ট করে। আব্বার দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে বলল, এতে এমন কি ক্ষতি.......
    পিন্টুর কথা শেষ করতে দিলেন না শরীফ সাহেব। চেঁচিয়ে ওঠেন, ক্ষতি কি ? হ্যাঁ বলে কি ! বলি তুই আগে পয়দা হয়েছিস, না আমি ?
    বারান্দার একপাশে লোহার রড ওপরের টালির ছাদের সঙ্গে মিশেছে। সেখানে হেলান দিয়ে দাঁড়াল পিন্টু। আব্বার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে কলপারে তাকাল।
    রোদে ভরে গেছে সামনের দোতলা বাসার দেয়াল। নারকেল গাছের পাতা রোদে বালুকণার মত জ্বলছে। শালিক পাখী দুটো নেই। কলের মুখে কাপড় জড়ানো, তা বেয়ে টিপ টিপ করে পানি পড়ছে নিচে রাখা গত রাতের হাড়িপাতিলের ওপর। এ্যালমিনিয়ামের ঢাকনীটার ওপর পানির চিন চিন শব্দ ওর মনে হলো নিজের মাথার ভেতরে যেন। আমনি করে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে পড়বে মগজের পানিগুলো। কত আশা আকাঙক্ষা বুকে অজান্তে বাসা বেঁধেছিল। তা যেন আজ ছিটে ফোঁটা হয়ে ছড়িয়ে যাবে।
    ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার ঝোঁক। কাঠ কয়লা কিংবা ছোট ছোট লাল ইটের টুকরো দিয়ে দেয়ালে কত কি নাই আঁকতো। গাছপালা নদী মানুষ ঘরবাড়ী তার কি ছাই ঠিক আছে। নাওয়া নেই খাওয়া নেই, এঁকেছে শুধু। হালকা মেঘের মত লঘু পায়ে মনের আকাশে ঘুরে বেরিয়েছে জানা অজানায়। সন্ধ্যেবেলায় বারান্দায় পড়তে বসে আকাশের নানারঙের খেলা দেখে ভাবত অমনি রং ছড়াবে সেও তার কাগজে। বাবার টেবিল থেকে লাল কালো কালির দোয়াত দিয়ে নিজের খাতায় রং ভরিয়েছে।
    কিন্তু কে জানত এই তার শেষ হবে, এমনি করে তার সমস্ত রংয়ের পরিণতি ঘটবে। আব্বার নিম্পন্দ চাহনীর সুমুখে উদ্ধতভাবে বেশীক্ষণ তাকাতে পারেনা সে। সব সাহস এক নিমেষে কপুরের মত উবে যায়। সমস্ত অনুভূতি, চিন্তা, কথা ভূমিকম্পের মত ওলটপালট হয়ে যায়।
    চেঁচামেচি শুনে ইতিমধ্যে মা তার রান্নাঘর থেকে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। জিগ্যেস করলেন, কি হয়েছে ? এত সকালে ওকে বকছ কেন ? পিন্টুকে একবার দেখে স্ত্রীকে উদ্দেশ করে চেঁচিয়ে বললেন, কি আর হবে? তোমার ছেলের মাথায় ভীমরতি ধরেছে। ছবি আঁকবে, কচু করবে।
    বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না। তসবীটা হাতে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। উঠোন থেকে আমিনা বিবি এসে দাঁড়ালেন বারান্দায়। পিন্টুর কাছে এসে বললেন, ছবি আঁকবি, হ্যাঁ বাবা একি কথা তোর ?
    এধরনের প্রশ্নে বিরক্ত ও রাগ হলো পিন্টুর। তার এধরনের না জানার ভান মেজাজকে বিগড়িয়ে দিল ওর। ভুরু কুঁচকে পাল্টা জিগ্যেস করল, বাহ্‌ আকাশ থেকে পড়লে যেন। আব্বা বলেননি আমাকে আর্ট ইস্কুলে পড়াবেন?
    পিন্টুর কথা শুনে নিবাক হয়ে গেলেন আমিনা বিবি। খানিকখন একেবারে চুপ মেরে গেলেন। রাবেয়ার মিনমিনে একটানা গলার আওয়াজ হঠাৎ ভয়ে থেমে গেল। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন শরীফ সাহেব।
    বললেন, কিরে, কি শুয়োর? পিন্টুর গালে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চড় মারলেন। বললেন, হারামজাদা মাথা কিনে নিয়েছ না ? বলেছিলাম ত বলেছিলাম।
    চড় খেয়ে কাঁদল না পিন্টু। আচমকা শুধু রডের সঙ্গে মাথায় একটা আঘাত পেল। হাত দিয়ে সে জায়গাটা ছুয়ে আব্বার দিকে তাকাল। সারা মুখ কেমন বিকৃত হয়ে গেছে তার। কপালে বলির দাগগুলো আরো খাঁজ বেঁধে গেছে। মনে হয় আরো দশ বছর যেন এরি মধ্যে বেড়ে গেছে। অবাক হয়ে গেল পিন্টু।
    শরীফ সাহেব আড়চোখে দেখলেন ছেলেকে। কি দেখছে এমন করে পিন্টু? ইচ্ছে হলো আরেকটা চড় মারেন তিনি। যাতে সে চাহনী ভেঙ্গে খান খান করে দিতে পারেন। কিছুতেই সইতে পারছিলেন না।
    পিন্টুর দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন শরীফ সাহেব। মা ছেলের মাথায় হাত বুলালেন। বললেন, খামোকা দিলে'ত আব্বাকে চটিয়ে। পিন্টু কথার জবাব দিল না। মাথা নিচু করে রইল।
    আমিনা বিবি ফের বললেন, আমাদের ছবি আঁকতে নেই বাবা ।
    না নেই। কেন নেই?
    আল্লা বেজার হন। তাছাড়া বেহেশতে যায়গা হবে না।
    হুঁ যতসব বাজে কথা। বেজার হন না ছাই হন। পিন্টুর জবাব শুনে কথা খুঁজে পেলেন না তিনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মুখটা বিশ্রীভাবে হা হয়ে পানখাওয়া কালো দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল।
    আজকালকার ছেলেদের কি ব্যারাম হয়েছে বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। মুরুববী মানে না, মুখে মুখে কথা কয়। নির্বাক হয়ে যান তিনি। এসব কথা বলা গুনাহ,শোনাও সর্বনাশ। মাথাটা বার কয়েক ডাইনে বায়ে হেলিয়ে নিজের দুগালে গোটা তিনচার চড় মেরে বলেন,তৌবা,তৌবা। তৌবা কর বাবা । এসব কথা বলতে নেই।
    তিনি ভাবতেই পারেন না মুসলমান ঘরের ছেলে কি করে মানুষের ছবি আঁকবে? অবিকল চেহারা মিলিয়ে চেহারা। এ যেন খোদার সমকক্ষ হওয়া। ভাবতেই অজানা ভয়ে শিউরিয়ে ওঠেন তিনি। চোখজোড়া আপসেই বুজে আসে।
    আমিনা বিবি কাঁদেন আর আঁচলে চোখ মুছেন। বাবা তুই এত বুদ্ধিমান, তোর মুখে একি কথা? এমন বেশরিয়তী কাফেরী কাজ করবি? আর তাছাড়া আল্লা না চন ওনার কিছু হয় তাহলেত তোকেই তোর ছোট ভাইবোনদের মানুষ করতে হবে, বল ?
    হ্যাঁ এটাই বলো এতোখন। আসল কথা এটাই। তোমরা’ত শুধু টাকা চেন, আর কি বোঝ?
    তাছাড়া চিনবে কি শুনি দিকিন? শুধু তর্কটাই'ত শিখেছিস। মুহুর্তকয়েক চুপ করে পিন্টুকে দেখেন। কেমন চোয়াড়ে চেহারা করে রয়েছে। তারও ইচ্ছে হয় ওকে মারার। হোক না কেন ছেলে তার বড় হয়েছে। মার কাছে ছেলে সবসময় ছেলেই। বড় হলেও কিছু যায় আসে না।
    ধীর গলায় বলেন, টাকা না থাকলে বাবুর তেজ এতখন কোন চুলোয় যেত, তার ইয়ত্তা আছে? চাকরী কর, তবে বুঝবি কত ধানে কত চাল। বাপের ওপর খাসত, বুঝিস না।
    তবুও গজগজ করল পিন্টু, রাবুর'ত বারোটা বাজিয়েছ, এখন আমি।
    শুনে রাগে থ মেরে গেলেন আমিনা বিবি। নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। পিন্টুর গালে সজোরে চড় কষিয়ে দিলেন।
    চিৎকার করলেন, বেয়াদব, নালায়েক। এতখন তবে দেয়ালের সাথে কথা বলছিলাম, না ? এমন ছেলের সাথে কথা বলতেও জাতমান থাকে না। ঘেন্না হয়।
    হ্যাঁ বেয়াদপইত। ঘেন্নাত হবেই। কথা না বললেও পারো। কথা আছে না, সত্যি কথা বললে বাপেও বেজার।
    ঘর থেকে তাড়া খাওয়া মোষের মত ছুটে এলেন শরীফ সাহেব।
    কি, কি, বললি ?
    পিন্টু আর দাঁড়াল না। বারান্দা থেকে নেবে সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল। সদর দরোজায় চটের তালি দেয়া দোদুল্যমান পর্দার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন শরীফ সাহেব। যেন কোন শত্ৰুকে চ্যালেঞ্জ করছেন, শুয়োরের বাচ্চা, আর যদি এ বাড়ীতে ঢুকিস তবে ঠাং ভেঙ্গে দেব।
    নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন, এ আমার ছেলে না, কক্ষনো না।
   আমিনা বিবি রাগে ক্ষোভে কেঁদে ফেললেন। রাবেয়া মাথা নিচু করে পাটির বুনুনীতে নখ খুঁটতে লাগল। চোখ জোড়ায় পানিতে ভেসে যায়। কোরানের অক্ষর ঝাপসা হয়ে ওঠে।
    সারাটা দিন ঘুরল পিন্টু। শহরের রাস্তায়, নদীর ধারে পার্কে—সব জায়গায় ঘুরেও বিরাম পেলনা। এক অস্থিরতা তাকে চঞ্চল করে তুলল। ঘর থেকে, রাগ হয়ে যখন বেরুল তখন আববা আম্মার প্রতি হয়েছিল ভীষণ অভিমান। তার সব আশা যে এমনি করে বাতাসে মিলিয়ে যাবে আদৌ কল্পনা করতে পারেনি। এখন ভাবতে গেলেই সব ভাবনা কান্না হয়ে চোখের মাঝে জড়ো হতে চায়। আবার হঠাৎ করে মত পাল্টানো সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনা। চেষ্টা করেও কোন সুরাহা পায়না। শুধু এটুকু জানে, আব্বা তার কথার নড়চড় করবেন না। ভাবতেই বুকটা ভেঙ্গে যেতে চায়। তার চেয়ে এই ভাল, আর সে মাথা ঘামাবে না। দরকার নেই। থাক। না পড়িয়ে যদি আব্বা শান্তি পান, তবে পাক।
    ঘরে যখন ফিরে এল তখন সামনের দোতলার কার্নিশে রোদ শুয়ে আছে। সূর্য ঢেকে গেছে অন্য পাশের উঁচু ছাদের আড়ালে। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে রইল পিন্টু। হাতটা পেছনে টান করার সঙ্গে সঙ্গেই কাঁধের কাছে ফেসে যাবার শব্দ পেল। একবার দেখার চেষ্টা করে ফের কাত হয়ে রইল। চোখের পাতায় যেন মাকড়সা জাল বুনেছে। ক্লাস্তি জড়ো হয়ে বাসা বাধছে। ঘুমের ঘোরে শুনল রাবেয়া ডাকল। জবাব দিতে তার মোটেই ইচ্ছে করলনা।
    রাবেয়া হাত দিয়ে মৃদু ঠেলে বলল, ভাইয়া ভাত খাবে ?
    না। জোরে একটা শ্বাস টেনে জবাব দিল পিন্টু। মুহূর্ত কয়েক দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছিল রাবেয়া। পিন্টু তার পায়ের শব্দ শুনে বলল, রাবু চা দিতে পারবি ? মাথাটা ভেঙ্গে যাচ্ছে।
    টিপে দেই ভাইয়া? ঘাড় কাত করে দরোজার সুমুখে দাঁড়ান রাবেয়াকে দেখল পিন্টু। বলল, দিবি ? না থাক। আবার পুশফিরে শুয়েরইল সে।
    শুয়ে শুয়ে মনে হলো পিন্টুর, ওর কপালে মাকড়সা হেঁটে বেড়াচ্ছে। চোখ মেলতেই দেখল রাবেয়া দাঁড়িয়ে।
    হাসল পিন্টু, কিরে?
    চা এনেছি, খাবে না ?
    উঠে বসে সবে চায়ের কাপটা হাত বাড়িয়ে নিতে শরীফ সাহেব ঘরে ঢুকলেন। আব্বাকে দেখে চমকে উঠল রাবেয়া। কাপ থেকে চা ছলকে নিজের গায়ে পড়ল। পিন্টু বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে যাবে শরীফ সাহেব কান ধরলেন।
    কিরে হারামজাদা খুব যে তেজ দেখিয়ে বেরিয়ে গেলি? জানি তেজ কমলেই কুকুরের মত আসতে হবে।
    নিম্পন্দ চোখ জোড়া আব্বার দিকে মেলে ধরল পিন্টু। বারকয়েক ঢোক গিলে বলল, আব্বা আমি ছবি আঁকা শিখবো না।
    কানটা ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। কপাল কুঁচকে পিন্টুকে বারকয়েক নিরীক্ষণ করে বললেন, মানে ?
    আপনি যা বলবেন তাই পড়বো। বলতে গিয়ে গলা ভিজে এল পিন্টুর। শরীফ সাহেব চমকে উঠলেন। কেমন ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। আবার তার মনে হলো জীবনে এবারও তিনি হেরে গেছেন। ফতুর হয়ে গেছেন একেবারে।
    শরীফ সাহেবের কান্না বুক ঠেলে উপরে কেবলি আসতে চায়। প্রাণপণে তা তিনি দমিয়ে রাখতে গিয়ে মুখটা বিকৃত করে ফেললেন।
    আব্বার মুখের দিকে নির্নিমেষ ভাবে চেয়ে থাকে পিন্টু। তারপর মাথা ঘুরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাল। কি বিশ্রী ফাটল ধরছে কোণের দিকটায়। বেশ কিছু চুণসুরকী খসে গেছে তার পাশ দিয়ে। কয়েকটা বিবর্ণ ইট বেরিয়ে সেই ফাঁক দিয়ে।
    শরীফ সাহেবের মুখের দিকে তাকাল পিন্টু। কিন্তু কিছুতেই আব্বার চেহারা সে দেখতে পেলনা। বারবার চেষ্টা করেও পারলনা। মনে হলো সে দেয়াল দেখছে।
    সেই বিবর্ণ দেয়ালে ফাটল ধরেছে।

এই গল্পটির ইপাব বই আছে

ইপাব ডাউনলোড কর : Epub

বইটি কোন ডিভাইসে পড়তে সমস্যা হলে “সাহায্য” বাটনে ক্লিক কর। সাহায্য
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য