মোনা ডাকাত -- শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

     মোনা ডাকাতের নাম শোনেনি এ রকম লোক আমাদের ও অঞ্চলে নেই বললেই হয়। ইয়া লম্বা চওড়া জোয়ান। টাঙ্গির মতন গোঁফ। মাথায় একমাথা বাবরি-কাটা কোঁকড়ানো চুল। শোনা যায় নাকি গায়ের জোর তার অসাধারণ।
     তার এই গায়ের জোর নিয়ে কত গল্প, কত কাহিনী যে লোকের মুখে শুনতে পাওয়া যায় তার আর অন্ত নেই। মোনা নাকি, একবার একটি হাতি মেরেছিল, বন্দুকের গুলি তার কিছুই করতে পারে না, চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়া, তিনতলা চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফান—এসব ত তার কাছে ছেলেখেলা !
     থাকবার মধ্যে গ্রামের একটেরে মোনার একখানা কুঁড়েঘর ছাড়া আর কিছু নেই। মোনা নিজেই কতবার বলেছে, চুরি-ডাকাতি করা টাকা-পয়সা থাকে না বাবু। কেমন করে সে কোনদিক দিয়ে যে উড়ে যায় নিজেই বুঝতে পারি না।
     লোকে বলে, বুঝতেই যদি পারিস তাহলে চুরি করিস কেন? 
     মোনা একটুখানি হেসে জবাব দেয়, থাকতে পারি না বাবু। স্বভাব যায় না মলে।
     সংসারে তার নিজের বলতে একদিন সবই ছিল। এখন মাত্ৰ পাঁচ ছ বছরের ফুটফুটে সুন্দর একটি নাতনি ছাড়া আর কেউ নেই।
     স্ত্রী-পুত্র তার কেমন করে গেল তারও একটা গল্প আছে। সত্য মিথ্যা জানি না, লোকে যা বলে তাই বলছি।
    আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড সোজা চলে গেছে। এই গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডই ছিল মোনার শিকারের জায়গা। রাত্রির অন্ধকারে শহর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যারা যাওয়া-আসা করত মোনার হাতে তারা নিস্তার পেত না। কত রকম কত নিরীহ যাত্রী যে মোনার হাতে প্রাণ দিয়েছে তার আর ইয়ত্তা নেই। না চাইতেই মোনার হাতে টাকাকড়ি জিনিসপত্র যারা তুলে দিত তাদের সে কিছু বলত না, কিন্তু জোর জবরদস্তি করলেই মুস্কিল! মাথার উপর প্রচণ্ড এক লাঠির আঘাতেই তাকে সে শেষ করে দিত। মৃতদেহ কোনদিন বা রাস্তার উপরেই পড়ে থাকত, কোনদিন বা রানি-সায়রের পাঁকে দিত পুঁতে।
     এর জন্যে পুলিস যে মোনাকে ধরেনি তা নয়। কতবার সে জেল খেটেছে কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পেয়েই যে-কে সেই!
প্রায় হস্তাখানেক ধরে মোনার একবার কোন শিকারই মেলেনি। মনের অবস্থা ভারি খারাপ। সন্ধ্যায় সেদিন প্রচুর মদ খেয়ে প্রকাণ্ড একটা লাঠি হাতে নিয়ে শিকারের সন্ধানে রানি-সায়রের একটা গাছের তলায় মোনা দাঁড়িয়েছিল। অন্ধকারে হন হন করে একটা লোক এগিয়ে আসছে দেখে মোনা ছুটে গিয়ে মারলে তার মাথায় এক লাঠি!
     লাঠি খেয়ে লোকটা ঘুরে পড়ল। বললে, বাবা, আমি। 
     আমি কেরে ব্যাটা! আমি-টামি শুনছি না বাবা, আজ সাতদিন চুপ করে বসে আছি, দে তোর সঙ্গে কী আছে দে!
     বলেই মোনা হাত পাতলো। কিন্তু এ কী! লোকটা আর কথাও কয় না, নড়েও না! বোধহয় এক লাঠিতেই শেষ হয়ে গেছে। অন্ধকারে সে তার গায়ে হাত দিয়ে দেখলে, গায়ে জামা নেই, হাতেও কিছু নেই। টাকাকড়ি হয়তো ট্যাকে গোজা আছে ভেবে কোমরের কাপড়টা ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখলে, ছ’টি মাত্র পয়সা। তাই তা-ই। পয়সা ছটা নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। বললে, এবারে বাঁচতে পারিস ত বেঁচে ওঠ বাবা, আমার কোন আপত্তি নেই।
     শিকারের সন্ধানে সে আরও কিছুক্ষণ রইল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেদিন আর ওই ছটা পয়সার বেশি সে পেলে না, মনের দুঃখে বাড়ি ফিরে এল। পরের দিন সকালে গ্রামের মধ্যে এক হুলুস্থূল কাণ্ড। মোনা ডাকাতের ছেলে মাধবের মৃতদেহ রানি-সায়রের পাড়ে আছে। গ্রামের ছেলে-বুড়ো সেখানে ভিড় করে গিয়ে দাঁড়াল, থানা থেকে পুলিশ এল, কনস্টেবল এল, চৌকিদার এল। কথাটা মোনার কানে যেতেই সে একবার চমকে উঠল। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে কী যেন ভেবে সে ছুটল রানি-সায়রের দিকে। চোখ দিয়ে তখন তার দরদর করে জল গড়াচ্ছে। গিয়ে দেখলে, মৃতদেহটাকে জড়িয়ে ধরে তার স্ত্রী তখন চিৎকার করে কাঁদছে আর বুক চাপড়াচ্ছে। বৌ কাঁদছে মাটিতে শুয়ে আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাধবের দশ বছরের মেয়ে রানি আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে।
     সর্বনাশ! সবাই জানে রাস্তার ধারে রাত-বিরেতে ঠেঙ্গিয়ে মানুষ মারে মোনা ডাকাত। আজ সেই তার ছেলেকে কে মারলে কে জানে! মোনাই যে তাকে মেরেছে সে কেউ ভাবতেও পারলাঁ না। হোক না ডাকাত, তাই বলে নিজের ছেলেকে কেউ মারতে পারে নাকি?
     অনেকে বলতে লাগল, এমনিই হয়। কত লোকের কত ছেলেকে সে মেরেছে, তার ছেলে মরবে না ত কে মরবে! ভগবান আছেন ঠিক।
     পুলিশ লাস নিয়ে চলে গেল। কে যে তাকে মেরেছে তার আর কোন কিনারা হল না।
     এই নিয়ে গ্রামের মধ্যে দিন পনেরো খুব আন্দোলন চলল। যেখানে সেখানে যার তার মুখে শুধু এই কথা ছাড়া যেন আর কথা নেই।
     তারপরেই সব চুপচাপ। এমন দিনে মোনার বাড়িতে আর এক বিপদ। ছেলেকে নিজের হাতে খুন করে পর্যন্ত মোনা যেন কেমন গুম হয়ে গিয়েছিল। কারও সঙ্গে ভালো করে কথা বলত না, কাজ-কর্ম তার একদম বন্ধ, বাড়িতে নিত্য অভাব যেন তার লেগেই রইল।
     স্ত্রী তার ঝগড়া করতে লাগল, যেমন কর্ম তেমনি ফল। এত অধৰ্ম সইবে কেন?
     মোনা চুপ করে রইল, একটি কথারও জবাব দিলে না। তারপর মোনা একদিন কিছুতেই আর থাকতে পারলে না। সত্যি কথাটা এখনও সে কাউকে বলেনি। হঠাৎ সেদিন সন্ধ্যায় তার মনে হল কথাটা না বললে এবার সে হয়ত ভেতরে গুমরে গুমরে মরেই যাবে। তাই সে তার স্ত্রীকে বলে ফেললে, দ্যাখো, মাধবকে সেদিন আমি মেরে ফেলেছি।
     স্ত্রী তার মুখের পানে হা করে চেয়ে রইল, তুমি? কেন? 
    অন্ধকারে চিনতে পারিনি। নেশার ঝোকে— কথাটা সে আর শেষ করতে পারলে না। শুয়ে শুয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
     মোনা ডাকাতকে এমন করে কাঁদতে তার স্ত্রী কোনদিন দেখেনি। পরের দিন সকালে দেখা গেল, রান্নাঘরে গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে মোনার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।
     স্ত্রী গেল, পুত্র গেল, রইল বিধবা বৌ আর নাতনি। বিধবা বৌ তার অনেকদিন থেকে জ্বরে ভুগছিল। এমনি মজা, শাশুড়ি মরার মাসখানেক পেরোতে না পেরোতেই বিধবা বৌটাও তার মরে গেল।
     বাকি রইল শুধু তার নাতনি রানি! লুকিয়ে লুকিয়ে লোক বলতে লাগল, এবার ওটাও যাবে। মোনারও কেমন যেন মনে হল বিধাতার অভিশাপ! পাপীকে ভগবান বুঝি এমনি করেই শাস্তি দেন।
     রানি বড় সুন্দরী মেয়ে। মোনার বাড়িতে মেয়েটাকে মোটেই মানায় না— এত সুন্দরী!
     সারা গ্রামের মধ্যে তার মত রূপসী আর আছে কিনা সন্দেহ। সাদা ধপধপ করছে তার গায়ের রং। যেন দুধে-আলতায় গোলা। কালো কালো চুলের গোছ তার সারা পিঠটাকে ঢেকে দেয়। মুখের পানে তাকালে আর সহজে চোখ ফেরানো যায় না। দশ বছরের মেয়ে এমনি বাড়ন্ত গড়ন, মনে হয় যেন এরই মধ্যে সে কৈশোর অতিক্রম করেছে।
     এখন এই মেয়েটাই হল একমাত্র অবলম্বন। চব্বিশ ঘণ্টা ডাকে, দিদি ! রানি কাছে এসে দাঁড়ায়, বলে, কি বলছ দাদু?      মোনা বলে, কিছু বলিনি দিদি। কি করছ তাই জিগ্যেস করছি। 
    রান্না করছি দাদু। অম্বলটা হয়ে গেলেই তোমাকে খেতে দেব। 
     মানুষ মারার ব্যবসা মোনা এখন একদম ছেড়ে দিয়েছে। ছেড়ে দিয়েছে শুধু এই মেয়েটার জন্যে।
     নিতান্ত যখন অভাব পড়ে, এতদিনের অভ্যেস, এক একবার তার মনে হয়—জয় মা-কালী বলে কিছু রোজগার করে আনি! কিন্তু লাঠিটা হাতে নিয়েই আবার নামিয়ে রাখে। মনে হয় ভগবান যদি তাকে আবার শাস্তি দেন! যদি এই মেয়েটাও মরে যায়।
     আগে সে জেল-কয়েদকে মোটেই ভয় করত না। কতদিন কত ব্যাপারে তার জেল হয়ে গেছে। হাসতে হাসতে জেলে গিয়ে ঢুকেছে, আবার মেয়াদ ফুরোতেই বুকের ছাতি ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এসেছে।
     এখন মনে হয় জেলে যাওয়া তার কোনমতেই চলতে পারে না। সে যদি জেলে যায়, এই মেয়েটা পথে দাঁড়াবে। একে দেখবার আর কেউ নেই। দুবেলা দুমুঠো খাবার অভাবে হয়ত মরেই যাবে।
     রানিকে মোনা সুখে রাখতে চায়। সংসারের কাউকেই ত সে সুখে রাখতে পারেনি। একরত্তি এই মেয়েটাকেও যদি সে সুখে রাখতে না পারে ত বৃথাই তার জীবন! বৃথাই সে পুরুষ হয়ে জন্মেছে।
     মোনা দিন কতক দূরের একটা শহরে গিয়ে ভিক্ষে করতে আরম্ভ করলে।
     কিন্তু দিন কয়েক পরে দেখলে, ভিক্ষে তাকে আর কেউ দিতে চায় না। কেউ বা মুখ ফিরিয়ে চলে যায়, কেউ বা বলে, দিব্যি শরীর রয়েছে, খেটে খাওগে বাবা। মোনা কি যে করবে বুঝতে পারে না। কায়স্থের ছেলে লেখাপড়াও শেখেনি যে কাজকর্ম করবে।
     গ্রামের জমিদার বৃদ্ধ অজয় চৌধুরী মস্ত বড়লোক। এক একবার ভাবে, জমিদারকে গিয়ে ধরিগে! আবার ভাবে, এককালে এই জমিদারকে সে গ্রাহ্যও করেনি। কতবার তার আদেশ অমান্য করেছে, এমন কী যখন সে জোয়ান ছিল, এই পৃথিবীটাকে সে অন্য চোখে দেখত, তখন সে তাকে একটু আধটু অপমানও করেছে। সেই লজ্জায় এখন সে তার কাছে যেতেও পারে না।
     কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে তাকে একদিন হলোই। জমিদারবাবু বাইরের ঘরে বসে ছিলেন, মোনা তার লাঠিটা মাটিতে নামিয়ে তার পায়ের কাছে ঢিপ করে একটি প্রণাম করলে।
      অজয় চৌধুরী মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, কিরে? মোনা কী মনে করে? 
     মোনা বললে, বাবু একটা চাকরি-বাকরি দিন। 
     কেন ? ডাকাতি করগে যা না। .
     মোনার চোখ দুটো ছল ছল করে এল, বললে, আর লজ্জা কেন দিচ্ছেন কর্তা।
     খানিক চুপ করে থেকে জমিদারবাবু বললেন, চাকরি করবি? বেশ, তবে কাল থেকে আমার চাপরাশির কাজ কর!
    মোনা হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে এল। বাড়িতে ঢুকেই ডাকলে, দিদি। 
    রানি ধীরে ধীরে কাছে এসে দাঁড়াল। মোনা বললে, কাল থেকে জমিদার বাড়িতে চাকরি করব দিদি! এবার আর তোর ভাবনা নেই। ভালো ভালো শাড়ি এনে দেবো...তুই যা চাইবি দিদি, তাই এনে দেব | -
     আমার কিছুই চাই না দাদু, বলে রানি চলে যাচ্ছিল, মোনা বলল, চলে যাচ্ছিস কেন ভাই, শোন! কিছু চাইনে? ভালো একটি বর যদি এনে দিই..
     যাঃ-ও ! লজ্জায় এবার সে সত্যিই চলে গেল। দুই নাতনি-ঠাকুরদার পরমানন্দে দিন কাটছিল। মোনার সংসারে আর তেমন অভাব নেই। মাইনে যা পায় তাই দিয়ে দু’জনের বেশ চলে যায়।
     জয়নগরের একটা বাঁধের দখল নিয়ে দুই জমিদারে বাঁধল একটা মামলা। এক তরফে আমাদের অজয় চৌধুরী, আর এক তরফে জয়নগরের জমিদার। বাঁধে জোর করে মাছ ধরিয়ে দখল নিতে হবে।
     অজয় চৌধুরী মোনাকে ডেকে বললেন, মোনা পারবি? 
     জমিদারবাবুকে প্রণাম করে লাঠিগাছটা তুলে নিয়ে মোনা উঠে দাঁড়াল।
     তারপর জনকতক জেলে সঙ্গে নিয়ে মোনা একাই গেল পুকুরের দখল নিতে।
     প্রকাণ্ড বড় বড় পাঁচটা মাছ নিয়ে মোনা ফিরে এল। জমিদার খুশি হয়ে তার দিকে তাকাতেই দেখলেন, তার কাপড়ে কাচা রক্তের দাগ, লাঠিটা রক্তে রাঙা হয়ে গেছে, একি! খুন-খারাপি হয়ে গেছে নাকি?
     হাসতে হাসতে মোনা বললে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা এমন ত হয়েই থাকে বাবু। বেশি কিছু হয়নি, একটা ছোড়া মনে হল যেন পড়ে গেছে!
     পড়ে গেছে কিরে? 
     একটা ছোড়া এসেছিল আমার মাথায় লাঠি চালাতে। জনপঞ্চাশেক এসেছিল বাবু, তা কেউ এগোল না। শুধু ওই একটা ফাজিল ছোড়া বলে কিনা—রেখে দে তোর মোনা ডাকাত, বুড়ো হয়েছিস এখন আর তোর—আর বেশি কিছু বলতে দিইনি বাবু।
     অজয় চৌধুরী জিগ্যেস করলেন, খুন করে ফেললি ? 
    মোনা বললে, আজ্ঞে না, খুন আমি আর করব না প্রতিজ্ঞা করেছি। মাথায় মারিনি, খুন ঠিক হবে না, তবে হাত দুটো হয়ত গেছে।
     চৌধুরী বললেন, তা বেশ করেছিস। যা কাপড়টা বদলে হাত পা ধুয়ে ফেল !
     কিন্তু তার পরের দিন বাধল এক মহা গণ্ডগোল! পুলিশ এল মোনাকে ধরে নিয়ে যেতে।
     চৌধুরীমশাই অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু মোনা ডাকাত এ অঞ্চলে বিখ্যাত লোক। গ্রামের অধিকাংশ লোকই তাকে চিনে ফেলেছে। পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে নিয়ে গেল বটে, কিন্তু অজয় চৌধুরী জামিন দিয়ে সেইদিনই তাকে ছাড়িয়ে আনলেন।
     মামলা চলতে লাগল। অজয় চৌধুরী চেষ্টার ক্রটি করলেন না, টাকাও বিস্তর খরচ করলেন। কিন্তু মোনাকে তো খালাস কিছুতেই করে আনতে পারলেন না। মোনার একমাস জেল হয়ে গেল।
     মোনা ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল। একমাস মাত্র জেল, তারই জন্যে মোনা আজ কিনা ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। অবাক কাণ্ড এ রকম জেল তার কত হয়েছে। কোনদিন কেউ তাকে কাঁদতে দেখেনি।
     সবাই বলতে লাগল, চিরদিন কি আর কারও সমান যায় রে বাবা। বুড়ো হয়েছে, আর কী সে জেলের কষ্ট সইতে পারে। 
     কিন্তু হায়, কেউ তার মনের কথা বুঝলে না। জেলের জন্যে সে কাঁদেনি, কেঁদেছে রানির জন্যে। কাঁদতে কাঁদতে সে জেলে গিয়ে ঢুকল।
     একমাস মাত্র তিরিশটি দিন। দেখতে দেখতে কেটে গেল। মোনা গ্রামে ফিরে এল। পাগলের মত ছুটতে ছুটতে সে তার বাড়ির দরজায় এসে ডাকলে, দিদি। দিদিমণি ! আমি এসেছি।
     কিন্তু এ কী! কারও সাড়া না পেয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে, দরজায় তালা বন্ধ। বাড়িতে কেউ নেই, রানি গেল কোথায় ?
     মোনা তখনি জমিদারের বাড়ির দিকে ছুটল। অজয় চৌধুরী বাইরের ঘরে একলা বসেছিলেন, উন্মাদের মত মোনা তার পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পড়ল, আমার দিদিমণি কোথায় গেল বাবু?
     দিদিমণি? চৌধুরমশাই হাসতে লাগলেন, বললেন, সে পালিয়েছে।
     পালিয়েছে কী? মোনা তাঁর মুখের পানে হাঁ করে তাকিয়ে বললে, হাসছেন যে ? 
     দাঁড়া আসছি। বোস একটু ঠাণ্ডা হ। চৌধুরীমশাই বাড়ির ভিতর উঠে গেলেন।
     মোনা হতভম্বের মত বসে রইল। ভাল করে কিছুই বুঝতে পারলেন না। খানিক পরেই জমিদারমশাই-এর বদলে সেখানে এসে দাঁড়ালো রানি। রানিকে দেখে মোনা চিৎকার করে উঠল, দিদি !
     রানিও তার কাছে ছুটে এল, বললে, দাদু তুমি এসেছ? আমার জন্যে সেখানে খুব ভাবছিলে বুঝি?
     পরস্পর মুখের পানে তাকিয়ে কেঁদে ভাসালো। তারপর কান্না থামলে তাদের যে কত কথা ।
     মোনা দেখলে রানি এখানে বেশ সুখে আছে। কেনই বা থাকবে না। একে জমিদারের বাড়ি, তার উপর ভালো করে দু’বেলা খেতে পায়। ভালো ভালো শাড়ি পরে গয়না পরে—রানি সেজেছে ঠিক রানির মত।
      মোনা তার দিকে তাকিয়ে আর যেন চোখ ফেরাতে পারে না। 
     রানি বললে, চল দাদু, এবার আমরা যাই। 
     মোনার যেন ধ্যান ভাঙল। বললে, কোথায় যাবি ভাই ? 
     রানি বললে, আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়িতে? কেন দিদি, এখানে ত বেশ সুখে আছিস। 
    রানি কিন্তু জিদ ধরে বসল তা হোক দাদু, আমি তোমার কাছে থাকব। 
     আমার কাছে? মোনা একটু হেসে বললে, আমার কাছে দু’বেলা পেটভরে যে খেতেও পাস না দিদি ?
     রানি বললে, না দাদু, তা হোক তুমি চল। 
     মোনা কী করবে কিছু বুঝতে পারলে না। খানিক চুপ করে কি যেন ভেবে বললে, এক গ্লাস জল আনত ভাই। ভারি পিপাসা পেয়েছে।
     রানি ছুটল বাড়ির ভেতর থেকে জল আনবার জন্যে। বেশিক্ষণ যায় নি। জলের গ্লাস হাতে নিয়ে রানি ফিরে এল। এসে দেখে দাদু নেই।
     দাদু! দাদু! কিন্তু কোথায় দাদু? 
    বর্ষাকাল। চারিদিক অন্ধকার, বাইরে তখন ঝমঝম করে বাদল নেমেছে। এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় সে গেল? গ্লাস হাতে নিয়ে দরজার কাছে অনেকক্ষণ রানি দাঁড়িয়ে রইল। মোনা তবু ফিরল না। গ্লাসটা নামিয়ে রানি একলা সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
     ছোট্ট মেয়ে। কেন যে দাদু তার চলে গেল কিছু বুঝতে পারলে না। 
     কেন যে গেল, কি কষ্টে যে গেল, তা একমাত্র তার দাদুই জানলে আর জানলেন অন্তর্যামী।
     বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগল। কিন্তু তবু কিছুতেই সে ফিরতে পারলে না। ফিরতে পারলে না এই ভেবে, সে সাক্ষাৎ অমঙ্গল, সংসারের কোন মানুষই শুধু তার জন্যে সুখী হয়নি। তার কাছে থাকলে হয়ত তার রানিরও কষ্টের আর অবধি থাকবে না। তার চেয়ে মূর্তিমান অভিশাপ যে, তার দূরে সরে যাওয়াই ভালো।
     রানির স্থান রাজার বাড়িতে—ডাকাতের বাড়িতে নয়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য