ডাকাতে বামুন -- খগেন্দ্রনাথ মিত্র

     মুকুন্দপুরের রেল-স্টেশন থেকে বকুলডাঙা পাক্কা সাড়ে চার ক্রোশ। মাঝে হাড়ভাঙা বিল। পথটা গেছে বিলের উত্তর ধার দিয়ে। সে সময় ঐ দিকটা জুড়ে ছিল একটা প্রকাণ্ড শরবন। লোকে সন্ধ্যার পর একা সে-পথে চলত না।
     সেদিন গোবিন্দ চক্রবর্তী মশায় চলেছেন বকুলডাঙায় তার এক শিষ্য গোবৰ্দ্ধন দাসের বাড়ী। আগে থেকে খবর-পত্র দেন নি। সেজন্য স্টেশনে গাড়ী বা লোকজনের ব্যবস্থা ছিল না। ট্রেন থেকে নেমে চক্রবর্তী মশায় দু’একজন সঙ্গী বা গাড়ী খুঁজলেন। প্রথমটি ত পাওয়া গেলই না, দ্বিতীয়টিও যা একখানা পেলেন, তার গাড়োয়ান সোজাসুজি জানিয়ে দিলে—‘ওদিকে যেতে পারব না বাবু।
     তখনও বেলা ছিল। চক্রবর্তীমশায় ভাবলেন, সাড়ে চার ক্রোশ পথ আর এমন কি? তার ওপর জায়গাটাও নিতান্ত অচেনা নয়, হেঁটেই পথটা কাবার ক’রে দেবেন। সেজন্য আর কালবিলম্ব না ক’রে সাদা ক্যাম্বিসের ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে ‘শ্রীদুর্গা’ বলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
     আষাঢ় মাস। আকাশে মেঘ ছিলই। পোয়াটেক পথ পার না হতেই পুবদিক থেকে আরও একরাশ মেঘ এসে সব ঢেকে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামল। চক্রবর্তীমশায় ছাতাটা খুলে মাথায় দিলেন। বৃষ্টির ধরন দেখে তার মনে হ’ল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ধ’রে যাবে। কিন্তু ক্রোশ দেড়েক গিয়েও ধরল না, বরং বেশ চেপে এল। সেই সঙ্গে এমন অন্ধকার করে এল যে, মনে হতে লাগল— সন্ধ্যা লেগেছে।
     একে জল-কাদাভরা কাঁচা পথ, তার ওপর এ-রকম বৃষ্টি। চক্রবর্তীমশায় কিছু বিব্রত হয়ে পড়লেন। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলেন, যদি কোথাও একখানা আটচালা বা একটা বড় গাছও থাকে, যার নীচে গিয়ে খানিক দাঁড়াতে পারেন। জল-কাদায় সাদা ক্যাম্বিসের জুতোজোড়াকে আর জুতো ব’লে চেনা যায় না। বৃষ্টির ছাটে ব্যাগটা, পরনের কাপড়, গলার সিল্কের চাদরখানা, এমন কি পৈতাগাছাটি পর্যন্ত ভিজে জাব হয়ে গেছে। এর ওপর আরও দুটি উপসর্গ আছে —বাতাসের ঝাপটা ও বিদ্যুতের ঝিলিক। ছাতার কাপড় চুইয়ে এবং বাটের ওপরদিক থেকেও জল গড়িয়ে হাত ও কনুই ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু কোন আশ্রয়ই তার চোখে পড়ল না। অগত্যা ছাট আড়াল দেবার জন্যে ছাতাটা একটু কাত্ ক’রে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন। এইভাবে কতদূর যে গেছেন, তার হিসেব নেই হঠাৎ একটা সোঁ-সো শব্দে মাথা তুলে দেখেন, সামনে জঙ্গল। অন্ধকার তখন আর একটু ঘন ও ভারী হয়ে এসেছে। সেজন্যে জঙ্গলটা যে ঠিক কিসের তা প্রথমটা ঠাহর হল না। আরও কয়েক পা গিয়ে বুঝলেন, হাড়ভাঙা বিলের উত্তরে শরবনের মুখে পৌছেছেন। এবার তাকে ঐ বন ভেঙে যেতে হবে। একে বর্ষার অন্ধকার সন্ধ্যা; তার ওপর চক্রবর্তীমশায় বনটার মধ্যে গিয়ে ঢুকতেই তার মনে হ’ল, মাথা-সমান উঁচু শরগাছগুলো যেন পথের দু’পাশ থেকে তাকে ধরবার জন্যে সরু সরু আঙ্গুল বাড়িয়ে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বনের মাথায় পিট্‌পিট্‌ ক’রে জোনাকী জ্বলছিল, তলায় ব্যাঙ ও ঝিঁঝিঁগুলো পাল্লা দিয়ে চীৎকার জুড়ে দিয়েছে। ঐ সামান্য আলোর ফোটাগুলো ও ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর ডাকও তার ভাল লাগল না।
     তিনি একপাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথের মাঝখানে সরে আসতেই দেখেন সামনে একটা ছায়ামূর্তি। মূর্তিটা দেখেই তিনি প্রথমটা চমকে উঠলেন; কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—‘কে যায়?
     মূর্তিটা কোন উত্তর না দিয়ে নীরবে চক্রবর্তীমশায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। সেই সময় তিনি বিদ্যুতের আলোয় দেখলেন, লোকটার গায়ের রঙ কালো, মাথায় বাবরি, শরীর বলিষ্ঠ, লম্বায় সে তার মত হবে। হাতে লাঠি বা কোন অস্ত্র নেই, কেবল মাথায় একটা ছাতা রয়েছে। সে একটু রুক্ষস্বরে জিজ্ঞাসা করলে—
     “যাওয়া হবে কোথায় ?”
     চট্‌ ক’রে চক্রবর্তীমশায়ের মনে পড়ে গেল, জায়গাটা ভাল নয়। সত্য কথাটা একটু গোপন ক’রে তিনি বললেন—‘পুবে। তুই আমাদের ফট্‌কে না?
     —“কোন ফট্‌কে? 
   —“ঐ যে আমাদের—সেই যে—ওরে শোন, আমার পিছনে দুখানা গরুর গাড়ী আসছে। একজন চৌকীদার, চাকরবাকররা সব তাইতে আছে। আমি রশি দুই পথ থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছি—
     লোকটার মুখ দেখতে না পেলেও চক্রবর্তীমশায়ের মনে হ’ল সে হাসতে হাসতে বললে—‘পেন্নাম হই ঠাকুরমশায়! যাক, এগিয়ে এসে ভালই করেছেন। আপনার ব্যাগটা আমার হাতে দিন—’
     —না বাপু। এতে আমার পুজোর কাপড়, গঙ্গাজল আছে। তুই যাচ্ছিস্ কোথায়?”
     —‘আজ্ঞে, এসেছি আপনাকেই নিতে—’ 
     —তার দরকার নেই বাপু তুই বরং এগিয়ে গাড়ী দুখানা ধর—’ 
     —‘গাড়ী গড়িয়ে-মড়িয়ে ঠিক আসবে, ঠাকুর। পথটা খারাপ, আপনিই এগোতে পারবেন না—’
     চক্রবর্তীমশায় ঢোক গিলে বললেন—‘একটা আলো নেই রে ফটিক? 
     —‘এই জঙ্গলে আলো কোথায় পাওয়া যাবে? আলো পাবেন গাঁয়ে। চলুন, আবার বুঝি জল আসে—’
     —তবে আমার আগে আগে চল—” 
     —আপনি বেরাহ্মণ মানুষ। আপনার আগে আগে হাঁটতে পারব না ঠাকুর।” বলে লোকটা চক্রবর্তীমশায়ের পিছনের দিকে সরে গেল।
     চক্রবর্তীমশায় দেখলেন আর নিস্তার নেই; বললেন—তবে পিছনেই আয়। কিন্তু গাড়ী দুখানার একটু খোঁজ—’
     —‘গাড়ী ঠিক আসবে, ঠাকুরমশায়—’ 
     দু’জনে চলেছেন। কারও মুখে কথা নেই। বৃষ্টিটা একটু আগে ধ’রে গিয়েছিল। কিন্তু পথের কাদা ক্রমেই বাড়ছে। তার ওপর আঠাল মাটি। চক্রবর্তীমশায়ের পা এক একবার পিছলে যায়। তিনি টাল সামলাবার জন্য ছাতাটাকে মুড়ে লাঠির মত করে নিলেন। আরও কিছুদূর গিয়ে তিনি সেই লোকটাকে বললেন—হাঁ বাপু ফটিক—
     —কি বলছেন বাবাঠাকুর? 
     —বিলটা এখান থেকে কতদূর? 
     —ঐ যে বাঁ-ধারে। ওখানে মানুষ জন কিছুই নেই— 
     —আমি তা বলছি নে— 
     তাঁর কথা শেষ না হতেই দূরে বার কয়েক ‘কোক’ পাখী ডেকে উঠল।
     শরবনেও কোক পাখী থাকে, সাপ ধরে খায় এবং রাতের বেলায় ডাকে— এ কথা চক্রবর্তীমশায় জানেন। তবুও তার বুকটা ছাৎ করে উঠল। তার পিছনেও একটা পাখী বার দুই ডেকে উঠল—‘কুক, কুক। তারপরই সব চুপ। কেবল ব্যাঙ ও ঝিঁঝিঁ ডাকছে, শরবনের মধ্যে বাতাসের শব্দ হচ্ছে—সোঁ-ও— ও-ও! চক্রবর্তীমশায়ের মনে হ’ল, ওটা যেন মেয়েছেলের কান্না। তিনি ভাবলেন, “কি অশুভ লগ্নে আজ যাত্রা করেছিলাম। এই শরবনে অপঘাতে প্রাণ নষ্ট হবে?’ আরও কিছুদূর গিয়ে বা ধার থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল কানে; চক্রবর্তীমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—ফিটিক, ডাহুক-ডাহুকীর ডাক শোনা যায় না?
     ফটিক বলে উঠল—‘জঙ্গলে কত কি থাকে। ঐ ত বায়ে বিলের ধারে শ্মশান—ঐ আলো দেখা যায়—’
    চক্রবর্তীমশায়ের বাঁ ধারে তাকিয়ে দেখলেন, সত্যই জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় একটু আলো দেখা যায়। তার মন হঠাৎ ভয় ও ভরসায় দোল খেতে লাগল। একবার ভাবলেন, ওদিকপানে ছুটু দেন। নিশ্চয়ই কেউ ওখানে শবদাহ করছে! আবার মনে হ’ল, তার বদলে যদি ওখানে কোন কাপালিক থাকে, তবে তাকেই বলি দিয়ে সে সিদ্ধিলাভ করবে।
     এমন সময় ফটিক বললে—‘বাবাঠাকুর, বাঁয়ের পথ ধর—’ 
     ঠিক তখনই ডানধার থেকে কয়েকটা শিয়াল বড় করুণ স্বরে ডেকে উঠল। ঐ যে আবার সেই শব্দটা। ও যে বাঘের ডাকের মত বোধ হয়। চক্রবর্তীমশায়ের তালু শুকিয়ে এল; তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন—ফটিক, ওটা বড়শিয়ালের ডাক নয় ?”
     —‘হ্যাঁ। কেঁদো ডাকছে। পা চালিয়ে চলুন।’ 
     —“কোন দিকে?’ 
     —‘বাঁয়ে—’ 
     —‘ওদিকে ত বাপু, শ্মশান। শব্দটাও যে ঐ দিক থেকেই আসছে।’ 
     —তাতে আপনার ভয় কি? কেঁদোয় খেলে আমাকেই খাবে—’ 
     —তুমি সঙ্গে আছ যখন, তখন ভয় কিছু নয়। তবে ওদিকের পথটা ঘুর হবে না?’ .
     —‘ঐখানেই ত পথটা শেষ হয়েছে—’ 
     —বলিস কিরে? তবে কি— 
     —‘হ্যা গো ঠাকুর, কেঁদোর আড্ডায় এসেছ। এখন ভাল মানুষের মত চল। না হ’লে টুটি কেটে ফেলব—’ বলে ফটিক কাপড়ের ভেতর থেকে একখানা রাম-দা বার করে চক্রবর্তীমশায়ের নাকের সামনে ধরলে।
     চক্রবর্তমশায় আর কিছু বললেন না, বাঁ-ধারের পথ ধরে চুপচাপ চলতে লাগলেন। কয়েক পা যেতেই তার সামনে আর একটা ছায়া-মূর্তি এসে দাঁড়াল কিন্তু সে তাদের দুজনের কাউকেই কিছু বললে না, যেমন ছায়ার মত এসেছিল, তেমনি ছায়ার মত চলতে লাগল।
     পথটা এবার খুব আঁকা-বাঁকা ও পিছল। চক্রবর্তীমশায় বড় কষ্টে সোজা হয়ে চলেছেন। কিন্তু বেশিদূর তাকে কষ্টভোগ করতে হল না; আন্দাজ মিনিটদশেক চলে একেবারে বিলের ধারে পৌছলেন।
     ফটিক বললে—“ডাইনে— 
     চক্রবর্তমশায় ডাইনে ঘুরে গজ পাঁচ-ছয় যেতেই একটা উৎকট গন্ধ তার নাকে এল। গন্ধটাকে নাক থেকে বার করে দেবার জন্যে তিনি বার কয়েক ফোস ফোস করে নিশ্বাস ফেলে সামনের জঙ্গলটা পার হয়েই দেখেন— একখানা খড়ের চালা, তার কোন দিকে বেড়া নেই, মাঝখানে একটি কালীমূর্তি। মূর্তির দু-পাশে বড় বড় মশাল—প্রচুর ধোঁয়া ছেড়ে জ্বলছে। সেই আগুনের চারধারে বনের নানারকম পতঙ্গ ঝাঁক বেঁধে উড়তে উড়তে হঠাৎ পুড়ে মরছে। মূর্তির সামনে আট-দশ জন বলিষ্ঠ লোক দাঁড়িয়ে, বসে গাজা টানছে। তাদের কারও পাশে, কারও হাতে রাম-দা, সড়কী ও লাঠি। মশালের কম্পিত আলোয় তাদের ছায়াগুলো কালীমূর্তির সামনে ভূতের মত নৃত্য করছে।
     লোকগুলো পিছন ফিরে বসেছিল। তিনজনে ঘরখানার ছেচ তলাতে গিয়ে দাঁড়াতেই ফটিক বললে—‘কেঁদো, শিকার—’
     চক্রবর্তীমশায় তখন ঠাকুর-প্রণাম করছেন। প্রণাম সেরে মাথা তুলে দেখেন, সামনে স্বয়ং কেঁদো। তার গায়ের রঙ কালো, শরীর বলিষ্ঠ ও লম্বা, মাথায় বাবরি, মুখের দু’পাশে গালপাট্টা, গোঁফ জোড়া বড়; পরনে লাল কাপড়। তার চোখ দুটো সাপের চোখের মত স্থির ও চকচকে এবং গাঁজার নেশায় লাল হয়ে উঠেছে। চক্রবর্তীমশায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভাঙা-গলায় বললে—
     ‘এদিকে কোথায় এসেছিস?’
     চক্রবর্তমশায় কেঁদো কথার জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—“তুই বুঝি শরবনটা আগলাস?
     —‘কেবল আগলাই না, এ বন দিয়ে যা যায় তাই ধরে খাই। কেঁদোর নাম শুনেছিস্?’
     —‘এখন ত চোখেই দেখছি। কিন্তু আমি বলছি, আর বেশিদিন তোকে এমনিভাবে খেতে হবে না—’
     চারধার থেকে সকলে সঙ্গে সঙ্গে হুমকি দিলে—‘খবরদার!” কেঁদোরও চোখ দুটো ধিকি-ধিকি জুলতে লাগল।
     চক্রবর্তমশায় বললেন—“তুই মায়ের পূজারীকে খাবি বলছিস। তুই বাগদী না?’
     —“তুই কি?’
     চক্রবর্তমশায় পৈতাগাছাটি চার আঙ্গুলে তুলে ধীরে বললেন—‘এই দেখ।
     আমি ষট্‌চক্ৰে সাধনা করি। যোগিনীসিদ্ধ হয়েছি। আমি গণনা জানি—
     কেঁদোর চোখের আগুন ধীরে নিভে এল। চক্রবর্তীমশায় কালী-মুর্তির দিকে তাকিয়ে বললেন—‘মায়ের পুজো করে কে?
     কেঁদো বললে—“আমি নিজে— 
       —‘হুঁ। সেইজন্যে মায়ের কৃপা পাস না। এ বছরে কটা শিকার ধরেছিস্? 
      —“আমি দশ বছর ধরে মাকে পুজো করছি জানিস? 
      —‘এই ক'বছরে কটা হাড়-মাংসওয়ালা শিকার খেয়েছিস? 
      —‘আজ খাব—পেট ভরে—. 
      —‘কাকে ? কোথায়? · 
     —“সে তোর দরকার কি? তোর কাছে কি আছে? 
     সে-কথার জবাব না দিয়ে, হঠাৎ চক্রবর্তীমশায় গম্ভীর গলায় চীৎকার ক’রে উঠলেন--"মা-—মা—মা—’
     শব্দটা দমকা বাতাসে শরবনের ওপর দিয়ে, বিলের কূল দিয়ে, জলের ওপরে ওপরে ভেসে গেল। সেই সময় একবার বিদ্যুৎ চমকাল, তার একটু পরেই গুরু গুরু মেঘ ডেকে উঠল।
       চক্রবর্তীমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—‘মায়ের পুজো হয়েছে? 
     কেঁদো বললে—‘না—’ 
     —“আজ তোর হয়ে আমি পুজো করব। পুজোর শেষে ঐ আসনেই আমার গলায় খাড়া বসিয়ে সেই রক্ত কপালে মেখে শিকার ধরতে যাস। আর আমার মুণ্ডটা মায়ের পায়ে ফেলে দিস্—
কেঁদো একবার সকলের মুখের দিকে তাকালে তারাও পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
     চক্রবর্তীমশায় বললেন—এটা শ্মশান না? চারটে মড়ার মাথা সংগ্রহ করতে পরিস? তা দিয়ে আসন করব। জয় মা বরাভয়দায়িনী, বিপদবারিণী, দস্যুনাশিনী—’
     কেঁদো বললে—‘এ শ্মশানে কেউ আসে না—’ 
    —’হুঁ। তবে ভূম্যাসনে বসেই পুজো করব। হাত-পা ধোবার জল দে। নৈবেদ্য কোথায়? ফুল চন্দন কৈ? বলির যোগাড় আছে ত?’
     —‘বলি ?’ 
     —হাঁ। মায়ের পুজোর জন্য রক্ত চাই—কাঁচা, গরম রক্ত না হলে মায়ের তৃপ্তি হবে না—
     কেঁদো বললে—“মেঘা, একটা পাঠা নিয়ে আয়—’ 
     চক্রবর্তমশায় বললেন—‘ঘোর কালো রঙের পাঠা; ঐ যে এক ঝুড়ি রক্তজবা রয়েছে দেখছি। চন্দনাদি কৈ? হুঁ কোন উপচার নেই অথচ বেটারা পুজো করে। জল দে। না, ও জল হবে না—’
     সেখান থেকে ক্রোশ দেড়েক উত্তরে মোহরকোটা গা। মেঘা তৎক্ষণাৎ ‘রণপা’ চড়ে বলির পাঁঠা আনতে সেদিকে ছুটল।
     কেঁদোর চোখে-মুখে সন্দেহ ফুটে উঠল; বললে—“ঠাকুরমশায়, তুমি বিলের ধারে যেয়ো না, ঐ চাটায়ে বস।.ওরে বনমালী, দু কলসী জল নিয়ে আয়—
     চক্রবর্তীমশায় ছাতা ও ব্যাগটা মাটিতে রেখে জুতো জোড়া খুলে চটায়ের ওপর বসে গলা থেকে সিল্কের চাদর নিয়ে কোলের ওপর রেখে একটু হেসে বললেন—ঐ বিল সাঁতরে পার হওয়া সহজ নয় রে কেঁদো—’
     বনমালী অর্থাৎ চক্রবর্তীমশায়ের ফটিক তৎক্ষণাৎ কলসী দুটোর জল ফেলে দিয়ে বিল থেকে জল নিয়ে এল।
     চক্রবর্তীমশায় হাত, পা ও মুখ ধুয়ে ব্যাগ থেকে গামছা, তসরের ধুতি ও গঙ্গাজলের শিশিটা বার করে হাত-পা মুছে, ধুতিখানা পরে, ব্যাগ থেকে পনেরটি টাকা ও ভরিটাক সোনা বার করে কেঁদোর দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন–রাখ—’
কেঁদো তার সামনে হাত পাত্‌লে।
     চক্রবর্তীমশায় তার হাতের ওপর আলগোচে সেগুলো ফেলে দিয়ে শিশি থেকে গঙ্গাজল নিয়ে মাথায় ছিটিয়ে পুজোয় বসলেন।
     লোকগুলো চক্রবর্তীমশায়েরও পিছনে বসল কেবল খাঁড়া হাতে দাঁড়িয়ে রইল কেঁদো। অন্ধকার রাত, ঝুপ-ঝুপ ক’রে বৃষ্টি হচ্ছে; লোকগুলোর চেহারা রুক্ষ ও কালো, চক্রবর্তীমশায়েরও গায়ের রঙ ঘোর কালো, সামনে আভরণহীন কালীমূর্তি। মশাল দুটিও ছায়া নিয়ে প্রতিমার সামনে নাচাচ্ছে। চক্রবর্তীমশায় উঁচু ও ভারী গলায় মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। মন্ত্রের শব্দ ও ধ্বনি, শরবনের কান্না, বিলের ছল-ছলাৎ শব্দ একসঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, ডাকাতের দল মুগ্ধ হয়ে গেল। গত দশবছরের মধ্যে তাদের পুজো এমন জমেনি। মূর্তির পা দুখানা রক্তজবায় ক্রমে ঢেকে গেল।
     হঠাৎ চক্রবর্তীমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—‘কেঁদো, মা বলছে, আজ রাতে কোথায় কাকে খাবার ইচ্ছা করেছিস্?’
     কেঁদো এক পা এগিয়ে গিয়ে হাত জোড় ক’রে ভক্তি-গদ-গদ কণ্ঠে বললে— বকুলডাঙার গোবৰ্দ্ধন দাসকে—’
     —‘কাকে?’
     —“বকুলডাঙার গোবৰ্দ্ধন দাসকে—’
     চক্রবর্তমশায় ধ্যানস্থ হলেন। কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে তাকিয়ে বললেন— শিগগির বলি আন লগ্ন ব’য়ে যায়—’
     কেঁদো ক্ষেপে গেল—‘হারামজাদা মেঘাটা এখনও ফিরল না। আজ ওর কলজে ছিড়ে খাব। এই ভোঁতা, হাক দে–
     ভোঁতা তৎক্ষণাৎ মুখের দু’পাশে হাত দিয়ে দু’বার বাঘের মত হাঁক দিলে। বহুদূর থেকে তার উত্তর ফিরে এল। তার খানিকক্ষণ পরেই এল রণপা চড়ে মেঘা। তার ঘাড়ে একটা কালো রঙের ছোট পাঠা ক্ষীণ গলায় ডাকছে— ম্যা—অ্যা—অ্যা, ম্যা—অ্যা—।’ পাঠাটার পা চারখানা একসঙ্গে মেঘার গলার নীচে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা।
     কেঁদো বললে—“ঠাকুর, বলি এসেছে— 
    চক্রবর্তমশায় বললেন—‘চান করা।’ 
    কেঁদো পাঠাটাকে চান করালে। মাটির খুরিতে তেলসিঁদুর ছিল। চক্রবর্তমশায় পাঠাটার কপালে তেলসিঁদুর পরিয়ে মন্ত্র পড়লেন। মালা নেই; তার মাথায় একটা জবা ফুল দিয়ে বললেন—হাড়কাঠে ফেল—”
     জগা পাঠাটার সামনের পা দুখানা পিঠমোড়া ক’রে পিছনের পা দুখানা ধরে তার গলাটা হাড়কাঠে ফেললে। -
     চক্রবর্তমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—‘কে কাটবে কেঁদো? তুই ? তোরা সকলে আমার সঙ্গে সঙ্গে তালি বাজা, নৃত্য কর। এই নে কানে দুটাে ক’রে ফুল গোঁজ--’
       সেই সময় দূর থেকে শিয়ালের দল উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করে ঘোষণা করলে—রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর কাটল।
     সকলে দুটাে ক’রে জবা কানে গুজলে। চক্রবর্তীমশায় বললেন—‘এখন বাজা—’ তিনি বসে বসে তালি দিতে লাগলেন। আর সকলে সেই তালে তালে প্রতিমার সামনে নাচতে শুরু করলে—‘ধপ ধপ’ আর তালি বাজাতে লাগলে —“চটাক, চটাক্‌, চটাক্‌, চটাক।’
     সেই তাণ্ডব শব্দের মাঝে বলি হ’য়ে গেল। চক্রবর্তীমশায় পাঁঠার ছিন্ন মাথাটি প্রতিমার পায়ের কাছে রেখে প্রণাম ক’রে সকলকে বললেন—‘প্রণাম কর—’
     সকলে প্ৰণাম করলে। চক্রবর্তীমশায় তাদের কপালে সিঁদুর ও রক্তের ফোটা দিয়ে নিজের কপাল জুড়ে রক্ত মাখলেন। তারপর কেঁদোর হাত থেকে রক্তমাখা খাঁড়াখানা নিয়ে বললেন— তোর আজকের যাত্রা সফল হবে। আমার দক্ষিণে দে—’
     কেঁদো ট্যাক থেকে চক্রবর্তীমশায়ের টাকা পনেরটি ও সোনাটুকু বার ক’রে তাঁর হাতে দিতে দিতে বললে—‘এই ধর, এ আমারই সম্পত্তিতে—’
     —বটে। আচ্ছা চল আমি তোদের আগে আগে যাব।’ 
     চক্রবর্তীমশায়ের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ কাছেই একটা তীক্ষ বাঁশীর শব্দ শোনা গেল। 
     মেঘা সচকিত হয়ে বলে উঠল—‘পুলিশ! 
     চক্রবর্তীমশায় দেখলেন, চারধারে লাল-পাগড়ির বেড়া; তাদের হাতে বন্দুক ও মশাল। চক্রবর্তীমশায় হাতের খাঁড়া ফেলে দিয়ে হাত জোর করে দাঁড়ালেন। তার দু'চোখ দিয়ে জল পড়ছে। একজন কনস্টেবল তাকে হাতকড়ি পরিয়ে খাড়াখানা তুলে নিয়ে হাক দিলে—‘আরে সর্দার পাকড় গিয়া—’
     চারধারে তখন চীৎকার ও ছুটাছুটি চলছে; বিলের জলে শব্দ হ’ল ঝপাস্, সেই সঙ্গে বন্দুকেরও আওয়াজ হ’ল—‘দুম দুম’। তারপরই সব চুপ।
     চক্রবর্তীমশায় এতক্ষণ একরকম জ্ঞান হারিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটা কনস্টেবলের গুঁতোয় তাঁর চমক ভাঙ্গল। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, সামনে দারোগাসাহেব।
     তার পাশে কেঁদো, ভোঁতা, মেঘা আরও জন তিনেক। বাকী ক’জন বনে গা ঢাকা দিয়েছে। সকলেরই হাতে হাতকড়ি ও কোমরে দড়ি। দারোগাসাহেব বলে উঠলেন—‘কেঁদো বেটা কৈ?’ 
     ই-বা—’ ব’লে একজন কনস্টেবল চক্রবর্তীমশায়ের পিঠে আবার একটা গুতো দিলে।
     দারোগাসাহেব তার মুখের দিকে একটু ভাল ক’রে তাকিয়েই বলে উঠলেন—‘এ কি! গুরুদেব! এ কি ব্যাপার?
     চক্রবর্তীমশায়ও এবার দারোগাসাহেবকে চিনতে পারলেন, দারোগাসাহেব যে তার শিষ্য গোবর্ধনের জামাতা। তিনি ভারী গলায় বললেন— বাবা’ সমূহ বিপদে পড়েছি। এতক্ষণ ডাকাতের হাতে ছিলাম, মায়ের প্রসাদে বেটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তোমার শ্বশুর-বাড়ী পালাবার ফিকির করেছিলাম। ও বেটা আজ তারই সর্বনাশ করতে যাচ্ছিল। এবার পড়লাম তোমাদের হাতে। আর আমার নিস্তার নেই—
     দারোগাসাহেব একটু হেসে নিজের হাতে চক্রবর্তীমশায় হাতকড়া ও কোমরের দড়ি খুলে দিয়ে পায়ের ধুলো নিলেন; তারপর বললেন—‘এখানে কি ক’রে এসে পড়লেন, বলুন ত?’
     চক্রবর্তীমশায় আদ্যন্ত সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করে বললেন—বাবা, মা মঙ্গলময়ী তোমার মঙ্গল করুন।”
     দারোগা সাহেব বললেন—আপনার কৃপাতেই বেটাকে ধরা গেল। আমাদের আসতে কিছু দেরী হয়ে গেছে। চলুন, গরুর গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে; আমি ঘোড়ায় যাব—’
     সেখানে মালপত্র যা পাওয়া গেল, সব তুলে নিয়ে সকলে বকুলডাঙার দিকে রওনা হ’ল।
     এই ঘটনার দিন কয়েক পরে আরও দু’জন ডাকাত ধরা পড়ল, কিন্তু বাকী তিনজনকে আর পাওয়া গেল না।
     তারপর তাদের যথারীতি বিচার হ’ল। বিচারে ডাকাতদের হ’ল কঠোর শাস্তি। আর কেঁদোকে ধরবার জন্যে যে পুরস্কার ঘোষিত হয়েছিল, চক্রবর্তীমশায় পেলেন তার অর্ধেক।
     এটা অনেক দিন আগেকার ঘটনা। তারপর দুপুরুষ কেটে গেছে। হাড়ভাঙা বিলের উত্তরে সে শরবন আর নেই; এখন সেখান দিয়ে একটা পাকা সড়ক চলে গেছে। চক্রবর্তীমশায়ও বহুকাল গত হয়েছেন। কিন্তু তার বংশধরদের লোকে আজও বলে --‘ডাকাতে বামুন’।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য