চাঁদ-পাহাড়ের মানুষখেকো -- সুধীন্দ্রনাথ রাহা

     অরণ্যের নামে ভয় পায় শহরের মানুষ! হিংস্ৰ শ্বাপদের ভিড় সেখানে। দেখলেই মানুষকে গপ করে গিলে ফেলে তারা, কিংবা মাড়িয়ে দেয় পায়ের তলায়। ওরে বাপ! নাঃ, অরণ্যকে দূর থেকে সেলাম দেওয়াই নিরাপদ।
     আসলে কিন্তু অরণ্যকে এতখানি ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। শ্বাপদ ওখানে আছে, কেউ তা অস্বীকার করে না। কিন্তু, বললে অনেকে বিশ্বাসই করবে না, অধিকাংশ শ্বাপদই নিবিরোধী। মানুষকে তারা ঘটাতে চায় না। একটা সহজাত আতঙ্ক ওদের আছে মানুষের সম্বন্ধে। দেখলেই অন্য দিকে সরে যেতে চায়, সম্ভব হলে।

     ব্যতিক্রম হলো দুটি মহাজন্তু। হাতি আর ভালুক। সব হাতি নয়, একঘেঁড়ে গুণ্ডা হাতি বা সবৎসা হস্তিনী। তবে ভালুকেরা অল্পবিস্তর সবাই রগচটা। একটা মানুষ যদি একা পড়ল ভারতীয় ভালুকের সামনে, সে-ভালুক প্রথম দর্শনেই চটে লাল হয়ে যাবে। অত্যন্ত সামান্য কারণে রেগে যায় চোখে দেখে ঝাপসা, কানে শোনে কম, গন্ধ শুকে শত্ৰু-মিত্র বিচারের শক্তিও নেই। এ-অবস্থায় সকলের উপরেই ওর বদ্ধমূল সন্দেহ থাকাটা বোধ হয় অস্বাভাবিক নয়। মানুষ দেখলেই ও খাড়া হয়ে ওঠে পিছনের পায়ে ভর দিয়ে, সম্মুখের দুই পা-কে প্রসারিত বাহুবৎ বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে আসে আগস্তুককে আলিঙ্গন করতে !
     এই দুই জন্তু হলো জাতবৈরী মানুষের। বাঘ-এ পর্যায়ে পড়ে না সাধারণত। বেশিরভাগ বাঘই মানুষকে এড়িয়ে চলতে চায়। তার নজর থাকে তৃণভোজী জন্তুদের উপরে, নরমাংস তার স্বাভাবিক খাদ্যে নয়। কিন্তু দৈবাৎ মানুষখেকো হয়ে যায় এক একটা বাঘ। তখন সে হয়ে ওঠে একটা দারুণ বিভীষিকা। একটা মাত্র নরখাদক বাঘের উৎপাতে এক একটা জনপদ উজাড় হয়ে গিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।
     মহীশূর অঞ্চলের বাবা-বুদান পাহাড়ে এমনি এক নরখাদকের প্রচন্ড অত্যাচার চলেছিল দীর্ঘকাল ধরে, এই শতাব্দীরই মাঝামাঝি এক সময়ে। স্থানীয় জানোয়ার নয় বাঘটা; বহু দূরে ভদ্রানদীর দুই কূল জুড়ে যে-বিরাট অরণ্য আছে, ওর জন্মভূমি সেখানেই। বাঘটা যখন সবে সাবালক হয়ে উঠেছে, রেল কোম্পানীর হুকুমে নদীতে দেওয়া হলো একটা বাঁধ। নদীর জলে অরণ্য তলিয়ে গেল; কত জন্তুর যে সলিলসমাধি হলো লেখাজোখা নেই তার। পালিয়ে গেল অবশ্য বিস্তর, আর অল্প কিছু বৃহৎ জানোয়ার আটক পড়ে গেল একটা উঁচু ভূখণ্ডে, যার চারদিকেই তখন থই থই করছে ভদ্রার জল। 
বন্দী বাঘ খায় কী? সেই দ্বীপ-কারাগারে তার সহবন্দী ছিল কিছু হাতি, কিছু বুনো মোষ এবং তারই স্বজাতি আরও কিছু বাঘ। হাতি বা মোষ মারবার মতো তাগদ তার দেহে তখনও আসেনি, সে তাহলে খায় কী? নিরুপায় হয়ে সে মানুষ খেতে শিখল একদিন। রেল কোম্পানীর শ্রমিক তো অহরহই এদিকে ওদিক ঘুরছে ফিরছে নিজেদের কাজে! তাদের ধর এত সোজা বাঘ দেখলেই তারা টেনে ছুট দেয়, লড়াই দেবার কথা স্বপ্নেও ভাবে না। তখন পিছনে তাড়া করে ঘাড়ে একটি থাবা বসিয়ে দিলেই, ব্যস, থতম। অন্য কোনো জন্তুই এত সহজবধ্য নয়।
     আবার অন্য কোনো জন্তুর মাংসও নয় এমন সুস্বাদু। যে বাঘ একবার নরমাংসের স্বাদ পেয়েছে, মানুষ দুষ্প্রাপ্য না হলে সে আর কখনো চেষ্টা করবে না অন্য জন্তু ধরতে। 
     ভদ্রতীরের এই বাঘ পাকাপাকি রকম মানুষখেকো হয়ে উঠল ক্রমে। তার অত্যাচারে কুলিরা পালাতে লাগল বাঁধের কাজ ফেলে রেখে। কাজই বন্ধ হওয়ার যোগাড়। তখন রেল কোম্পানীই চেষ্টা করে শিকারী আনিয়ে ফেললেন ওকে শেষ করবার জন্য, দুই চারবার কানের কাছ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যাবার পরে বাঘ বিবেচনা করল-এ অঞ্চলে বাস করা আর নিরাপদ নয়। সে গা তুলে দক্ষিণ মুখে হাঁটল। বাঁধের জল তখন নেমে গিয়েছে জঙ্গল থেকে, জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে সে দক্ষিণমুখোই চলতে থাকল বেশ কিছুদিন। এইভাবে একদিন সে পৌছে গেল বাবা-বুদান পাহাড়ে।
     জায়গাটা তার খুবই পছন্দ হয়ে গেল। পাহাড়-জঙ্গল, নদী-নালা। মানুষ আছে, তবে সংখ্যায় কম, বাঘের পক্ষে সেইটেই ভাল। বেশি থাকলে তারা দলবদ্ধ হয়ে বাঘকে তাড়াবার চেষ্টা করতে পারে। খুব কম থাকলে বাঘের ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে। মানুষ আছে, তবে কম, এইরকম জায়গাই পছন্দ মানুষ-থেকোদের।
     বাবা-বুদানের মাথায় আর গায়ে কফি-বাগিচা সারি সারি। বাগিচার মজুর মজুরানী ছাড়া অন্য কেউ আনাগোনা করে না তাতে। বিরাট হাতার এক-একটা অংশ ভয়াবহ রকম নির্জন। সেইরকম একটা নির্জন অংশে একদিন কাজ করতে গেল এক দল লাম্বানি মজুরানী। লাম্বানিরাই আদিবাসী এই পাহাড়ে-জঙ্গলে ভরা অঞ্চলের।
     মজুরনীরা সারাদিন কফিগাছের কচি পাতা তুলে যে-যার ঝুড়ি ভর্তি করল। সন্ধ্যায় ফিরে গেল সবাই। বাগিচার অফিসে পাতা জমা দিয়ে যে-যার বাড়ি চলে গেল আঁধার ঘনিয়ে আসার আগেই। সবাই গেল, গেল না একমাত্র পুত্তাম্মা নামে এক সদ্যোবিবাহিতা যুবতী।
     ভোর হতেই পুত্তাম্মার স্বামী রামাইয়া বেরিয়ে পড়ল, প্রথমেই গেল কফি-বাগিচায়। বাগিচায় কর্মচারীরা যা বলল, তাতে তো রামাইয়া হতভম্ব। পুত্তাম্মা কাল সন্ধ্যায় অফিসে আসেনি, কফিপাতা জমা দেয়নি, পয়সাকড়িও নেয়নি। রাত্রে আর খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়নি মেয়েটার সম্বন্ধে। এইবার কর্মচারীরা খোঁজ নেবার ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন, এমন সময়ে রামাইয়াও এসে গেল। এসেই গেল যখন, ভালই হলো। সবাই মিলেই করা যাক খোঁজ, দেখা যাক মেয়েটা গেল কোথায় ।
     খোঁজ খোঁজ! আগের দিন সুমিত্তাম্মা নামে একটি মেয়ে ঠিক তার পাশে দাড়িয়েই পাতা তুলেছিল অনেকক্ষণ। কাজ করতে করতে গল্পগুজবও করেছিল ঢের। তারপর সুমিত্তাম্মা চলে গেল একদিকে, পুত্তাম্মা অন্যদিকে। সে প্রায় ছুটির সময়ের কাছাকাছি। 
     "ঐ! ঐদিক পানে গিয়েছিল গো, পুত্তাম্মা ঐদিক পানে গিয়েছিল”-বাগিচার একটা নিভৃত কোণের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সুমিত্তাম্মা।
     সেইদিকে গিয়ে দেখা গেল একটা কফিগাছের কিছু ডালপালা ভাঙা, অনেক কচিপাতা থ্যাৎলানো এবং শুকনে মাটিতে একটা এমন একটানা দাগ, যা দেখে বোঝা যায় যে কেউ হিচড়ে টেনে নিয়ে গিয়েছে কোনো একটা ভারী জিনিসকে।
     সর্বনাশ! সেই দাগের মাঝে মাঝে শুকনো রক্তের ধারাও একটা। এ কী ব্যাপার! এ কী ব্যাপার! রামাইয়া হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। অনেকদূর! অনেকদূর প্রায় আধ মাইল চ'লে গেল খোজারুরা, সেই হ্যাচঁড়ানো-দাগ অনুসরণ করে। তারপরে, যা তারা খুঁজছিল, তার নিশানা পাওয়া গেল পাহাড়ের গায়ে একটা সরু চাতালের নিচে। একটা গর্ত-মতম জায়গায় অনেক রক্ত। তার মধ্যে পড়ে আছে পুত্তাম্মার মাথা, হাত আর পা । টুকরো টুকরো রক্তমাখা হাড়ও। নিকটেই নরম মাটিতে বড় বড় থাবার দাগ। যারা চেনে, তার বলল, "এ দাগ তো বাঘের থাবায়!"
     সেই মাথা আর হাত-পা কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পুত্তাম্মার সৎকার করল রামাইয়া। বাঘে খেয়েছে পুত্তাম্মাকে। বাঘে!
     বাঘ এসেছে বাবা-বুদানে। মানুষখেকো বাঘ। হুশিয়ার হুশিয়ার হুশিয়ার। 
     আ-র হুশিয়ার ঠিক তিন দিনের দিন অন্য এক বাগিচায়, মারা পড়ল রাতের চৌকিদার একজন। লণ্ঠন আর লাঠি হাতে করে সারা বাগিচায় টহল দিয়ে বেড়ায় একদল চৌকিদার প্রতি রাত্রে। এ-লোকটা সেদিন পাহারা দিচ্ছিল ম্যানেজারের বাংলো সংলগ্ন ফুলবাগানের পিছনে। এ-লোকটা চেঁচিয়ে ছিল বাঘের মুখে পড়ে। লোকজন ছুটেও গিয়েছিল লাঠিসোটা নিয়ে। কিন্তু অকুস্থানে পৌছে খানিকটা রক্ত, আর লাঠি লণ্ঠন ছাড়া তারা আর কিছুই দেখতে পায়নি।
     চৌকিদারেরও মাথা আর হাত-পা পরদিন পাওয়া গেল আধ মাইলটাক তফাতে । নির্জন গিরিসামুতে।
     কী জানি কেন, মানুষ ধরবার পরে তার ঐ অঙ্গগুলো কোনো মানুষখেকো বাঘই খায় না কখনো !
     তারপর থেকে ধারাবাহিক চলতেই থাকল বাঘরাজার মনুষ্য মৃগয়া। হেন হপ্তা যায় না, যাতে দু’টো অন্তত মানুষ না যায় ঐ যমের মুখে। সব বাঘিচার সব কাজ বন্ধ হয়ে গেল, কারণ কোনো মজুরই আর বাবা-বুদানে উঠতে সাহস পায় না ; ও তো সাক্ষাৎ যমদ্বার হয়ে উঠেছে। যারা যাবে, তাদের মধ্যে কে যে ফিরবে, আর কে যে ফিরবে না, তা কেউই বলতে পারে ন!!
     কাজ বন্ধ হলো। মালিকদের টনক নড়ে উঠল। কুলিরা বাঘের পেটে যাচ্ছে, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। কিন্তু বাঘের পেটে যাওয়াতে যদি আপত্তি থাকে কুলিদের, তা হলে তো সে-বাঘকে আর সহ্য করা চলে না। সমদৰ্শিতার একটা সীমা আছে। বাঘ না তাড়ালে যদি ফুলি না আসে, তাহলে তো ব্যবসার খাতিরে তাড়াতেই হয় বাঘকে।
     মালিকদের আহ্বানে পেশাদার শিকারী এল জনাকতক। বাঘ দেখতে পাক বা না পাক, তারা গুড়ম-গাড়াম বন্দুকবাজি করল দিনে রাত্রে কিছুদিন ধরে, বাবা-বুদানের বাঘরাজা এবার বিবেচনা কযরল-দিনকতকের জন্য স্থান পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। জায়গাটা গরম করে তুলেছে ঐ শিকারীগুলো।
     ব্যস, তারপর থেকে কফি-বাগিচাগুলোতে আর আলাগোনা নেই বাঘের। কার্জকম আবার আরম্ভ হলো। শিকারীরা বিজয়গর্বে চলে গেল অন্য অঞ্চলে কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য।
     বাঘ কিন্তু মরেনি। সে যে ভয়ানক রকম বেঁচে আছে, তার প্রমাণ অচিরেই গেল পাওয়া। হোগরেহালি থেকে খবর এলো, এক বেচার চাষীকে খেয়ে ফেলেছে বাঘটা। সন্ধ্যার আগে সব চাষী যখন গায়ে ফিরে এলো মাঠ থেকে, সে তখনো তার হারানো গরু খুঁজে বেড়াচ্ছে এদিকে ওদিকে। গরুটা নিজে নিজেই ঘরে ফিরল খানিক বাদে, কিন্তু গরুর মালিক আর ফিরল না। তাকে পাওয়া গেল পরের দিন দুপুর নাগাদ মাধক বাঁধের সদর রাস্তা থেকে অল্প দূরে মাঠের ভিতর। ধড়টা নেই, মাথাটা গড়াচ্ছে, চারখানা হাত-পা রক্তমাখা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এধারে ওধারে, সেই পুরোনো কাহিনী ।
     শিকারীদের বন্দুকবাজিতে তিতিবিরক্ত হয়ে মুনষখেকো দিনকতক হাওয়া বদল করেছিল বটে, কিন্তু নতুন জায়গাটা, কী-জানি-কেন, তার তত পছন্দ হয়নি। হয়ত সেখানে মানুষ সহজলভ্য ছিল না।
     নতুন জায়গা যখন অপছন্দ হলো, বাঘরাজা তখন ভাবল—বাবা-বুদানে একবার চুপিচুপি যাওয়া যাক আবার, দেখে আসা যাক সেখানকার হালচাল। বাবা-বুদানে উঠবার মুখেই পাহাড়তলিতে এই গ্রামে হোগরেহালি। এ-অঞ্চলের প্যাটেলেও একজন আছে এখানে ; নাম তার মুদালিয়ার গিরি ।
     এখন হোগরেহলি থেকে বাবা-বুদানে ওঠার মুখেই সেই ভাগ্যহীন চাষীকে সে দেখতে পেলে মাঠের এক নিভৃতে অংশে—ব্যস, আর তার বাবা বুদানে ওঠার আবশ্যক কী তক্ষুণি?
     অদূরে ঐ বাবা-বুদানের আকাশচুম্বী চূড়া। আধাআধি চড়াই উঠলেই পাওয়া যাচ্ছে বাঁয়ের দিকটা একটা মাখা পাহাড়। বুদানের থেকে প্রায় সমকোণ রচনা করে ওটা বেরিয়ে গিয়েছে পশ্চিমপানে, প্রায় পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত। আকারটা এর অর্ধচন্দ্রের মতো। তারই দরুন গোড়ায় এর নাম হয়েছিল আধচাঁদের পাহাড়। এখন সংক্ষেপীকরণের প্রয়োজনে আধ' শব্দটুকু বাদ পড়ে গিয়েছে জনসাধারণের জবান থেকে নামটা দাঁড়িয়েছে সোজাসুজি চাঁদের পাহাড়।
     চাঁদের পাহাড়ের আকার অর্ধচন্দ্রের মতো, তা তো বলেছি। ওর নিচে হোগরেহলি গ্রাম। ওর কোলে এক দুর্গম, ঝোপঝাড়ের জন্য ততটা নয়, যতটা নদীনালার শুকনো খাত আর পাহাড় থেকে ধসে-পড়া বিরাট বিরাট শিলাস্তুপের জন্য। পায়ে পায়ে বাঁধা, পায়ে পায়ে বিপত্তির আশঙ্কা । হোগরেহালির কানাচে হলেও এই অরণ্যে প্রানান্তের প্রবেশ করে না গ্রামবাসীরা। হোগরা নামে এই নিষিদ্ধ এলাকার।
     এই হোগরাতেই এবার স্থায়ী রাজপাট প্রতিষ্ঠা করল আমাদের বাঘরাজ। এখানে তার সন্ধানে আসবে, কে এমন দুঃসাহসী আছে হোগরেহালিতে? পক্ষান্তরে নিজে বাঘরাজ, যখন খুশি, রাত্রিবেলায়, তিন লাফে গিয়ে হানা দিতে পারবে গ্রামের ভিতর, যাকে সমুখে পাবে, মুখে করে নিয়ে আবার তিন লাফে ফিরে আসবে তার গুহায়। ভারী মজায় আছে বাঘ। ওদিকে বাঙ্গালোরে বসে প্রবীণ শিকারী এ্যান্ডারসন একখানা চিঠি পেলেন হঠাৎ৷ খামখানা হাতে-হাতে ঘুরে ঘুরে একদম নোংরা হয়ে গিয়েছে, তার উপরে ছাপ আছে বিরুর ডাকঘরের। চাঁদের পাহাড় এলাকর ডাকঘর বল, রেল স্টেশন স্বল, সব ঐ বিরুরে ।
     চিঠিটা কানাড়ী ভাষায় লেখা। কে তা পড়ে শোনালে এ্যান্ডারসনকে? অনেক চেষ্টায় থানার এক কনস্টেবলকে পাওয়া গেল, কানাড়ীই না কি মাতৃভাষা তার। সে অনেক কষ্টে পাঠোদ্ধার করল চিঠির। অতি জঘন্য হস্তাক্ষর। তো চিঠি লিখছে হেগেৱেহালির প্যাটেল মুদালিয়ার। লোকটা পূর্ব পরিচিত এ্যান্ডারসনের। শিকারের সূত্রেই অবশ্য। বহু বৎসর আগে হোগরে অরন্যে একবার গিয়েছিলেন উনি, মুদালিয়ার তখন অনেক খাতির করেছিল ওঁর ।
     মুদালিয়ার লিখছে, মানুষখেকো এক বিকট বাঘ এসে হোগরেহালি অঞ্চলটাকেই উৎছন্ন করতে বসেছে। ডজমনে ডজনে মানুষ চলে গিয়েছে তার পেটে। মানুষ ছাড়া অন্য কিছুই রোচে না বাঘরাজের মুখে। এখন এ্যান্ডারসনই ভরসা ; পত্রপাঠ বাঘটাকে না মেরে দিলে হোগরেহলি শ্মশান হয়ে যাবে।
     এখন এ্যান্ডারসন হলেন শিকারী। বাঘের নামে তিনি উসফুস করে উঠলেন।
     তারপরে তার উপযুক্ত পুত্র ডোনাল্ডের অসীম উৎসাহ শিকারে, হাতও তার খুব পাকা, গুলি কখনও ফস্কায় না । খানিকট আলাপ-আলোচনার পর, পরদিন প্রাতরাশের পরই গাড়িখানা বার করে পিতাপুত্র বেরিয়ে পড়লেন হোগরেহালির উদ্দেশ্যে। একশো চল্লিশ মাইল রাস্তা। পৌছে গেলেন বেলা দু'টোয়।
     দিনটা কাটল বাঘের বিবরণ নানা জনের কাছে শুনতে শুনতে। তার আড্ডা ঐ হোগরে অরণ্যে। ওখানে গিয়ে তাকে পাকড়াতে না পারলে তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো অাশাই নেই। গ্রামে সে হানা দেবে কবে বা কখন, তা আগে থাকতে জানা যাবে কেমন করে?
     ঠিক কথা। দরকার যদি হয়, ঢুকতেই হবে হোগরের অরণ্যে। তবে সেটা কাল দিনের বেলার জন্য মুলতুবি থাকুক, আজ এই জোছনা রাত্রিটা গাড়ি নিয়ে খানিকটা ঘুরে আসা যাক বিরুর সড়কে। শখের বেড়ানো ছাড়া অন্য কিছু না।
     গাড়ি নিয়ে পিতাপুত্র চলে গেলেন বিরুর। হোগরেহালি থেকে ও পর্যন্ত বেশ ভাল রাস্তাই আছে। বিরুরের কাছাকাছি একটা পুলের ধারে গাড়ি থেকে নেমে ওঁরা পায়দলে রওনা দিলেন মাধক হ্রদের দিকে। দক্ষিণ পশ্চিমে যেতে হবে কোণাকুণি। রাস্তা বলে কিছুই নেই। তবে একটা খাল চলে গিয়েছে বিরুর থেকে মাধক হ্রদ পর্যন্ত, সেই খালের কাঁধার উপর দিয়ে কায়ক্লেশের হাঁটাও যেতে পারে। মাইল বারো রাস্তা মোটে। ফুটফুটে জোছনায় পথ চলতে বেশ ভালই লাগছিল এ্যান্ডারসনদের।
     মাধক হ্রদটা প্রাকৃতিক হ্রদ নয়, মানুষের সৃষ্টি। মাধক নামে একটা নদী বরাবরই আছে। তার ভিতরে উঁচু বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য জল ধরে রাখা কৃষিক্ষেত্রে সেচ দেওয়ার জন্য। খালের ধার থেকে চড়াই পথ উঠে গিয়েছে বাঁধের মাথা পর্যন্ত। এ্যান্ডারসনের চড়াই বেয়ে উঠে সেই বাঁধের মাথাতেই বসে পড়লেন বিশ্রামের জন্য। রাত তখন প্রায় দুপুর।
     কী তীব্র আর্তনাদ। নিশীথ রাতের স্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল সেই আর্তনাদে। মানুষেরই কষ্ঠ। মরণেরই আর্তনাদ। মানুষখেকো আবার যেন ধরল কাকে।
     কিন্তু এ্যান্ডারসন তো শুনেছিলেন-হ্রদের ধারে কাছে জন মনিষ্যি নেই, থাকে না কোনদিন। তবে বাঘ কাকে ধরল!
পরে জানা গিয়েছিল, লোকটা হোগরেহালিরই লোক। ওর কুষ্ঠ হয়েছিল। সংক্রমণের ভয়ে গ্রামের লোক ওকে তাড়িয়ে দেয় গ্রাম থেকে। সে গিয়ে আশ্রয় নেয় মাধক বাঁধের উপরে। ওখানে একটা ঘর আছে সেবা-বিভাগের পরিদর্শকদের সাময়িক অবস্থানের জন্য। ঘরটা সচরাচর বন্ধই থাকে। এ্যান্ডারসনের বাঁধের মাথায় ওঠার সময় সেই বন্ধ ঘরের সামনে দিয়েই এসেছিলেন। তার পিছনের খোলা বারান্দায় যে একটা কুষ্ঠরোগী ঘুমিয়ে আছে, তা তারা জানবেন কেমন করে?
     একটা কথা মনে হলো এ্যান্ডারসনের। বাঘ আবশ্যই এখানে আসছিল এ্যান্ডারসনদেরই পিছু নিয়ে নিয়ে। দু'জন বন্দুকধারীকে হঠাৎ আক্রমণ করতে সাহস পাচ্ছিল না, প্রতীক্ষায় ছিল সুযোগের।
     কিন্তু অনুসরণ করে আসতে আসতে পথের মাঝে কুষ্ঠরোগটিকে সে যখন দেখতে পেলো, সে নিবৃত হল অনুসরণ থেকে। তার খেতে-পাওয়া নিয়ে কথা। অন্য একটা মানুষকে যখন থাবা বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে, তখন সশস্ত্র লোকেদের উপর হামলা করতে সে যাবে কেন? তাতে তো নিজেরও বিপদের ঝুঁকি আছে একটা!
     সে কুষ্ঠরোগীটাকে তুলে নিয়ে নেমে গেল বাঁধ থেকে, নানাপথ ঘুরে প্রবেশ করল হোগরে অরণ্যে। খাওয়ার জন্য নিরিবিলি জায়গা চাই তো!
     ওদিকে এ্যান্ডারসনেরা তার পিছু নিয়েছেন। রক্তের ছড়া দিতে দিতে গিয়েছে কুষ্ঠরোগীটা। জোরালো টর্চ দুজনেরই হাতে। সেই ছড়া দেখে দেখে ঠিক চলেছেন বাঘের পিছনে। বাঁধ থেকে নেমে আবার সেই খাল। খালের উপরে চলে গিয়েছে বাঘ! মাঝে মাঝে এক এক জায়গায় রক্তের পাথার একেবারে। ঐখানে শিকারকে মাটিতে রেখে বাঘ হয়ত বিশ্রাম নিয়েছিল একটু৷ অথবা এক জায়গার কামড় ছেড়ে দিয়ে নতুন কোনো অঙ্গে দাঁত বসিয়েছিল।
     থালের বাঁয়ে একটা শুকনো নালা। বর্ষার দিনে অরণ্যের জল এই নালা দিয়ে এসে খালে পড়ে। এখন দিনে এইটেই অরণ্যপুরীতে প্রবেশের সিংহদ্বার। বাঘ নেমে গিয়েছে এই শুকনো নালায়। রক্তের ছড়া রয়েছে এখানেও।
     চল এইবার নালার ভিতর দিয়ে শুকনো থাত এই নালার। তবে হেঁটে আরাম নেই। উপর থেকে গড়িয়ে-পড়া ছোট বড় অসংখ্য পাথরে খাত একেবারে আকীর্ণ, মাঝে মাঝে মস্ত মস্ত চাঙ্গড়ও আছে এক একটা।
     এমনি একটা চাঙ্গড় পড়ে আছে একেবারে খাতের মাঝখানটা জুড়ে। বাঘ ঐ চাঙ্গড়েরই পিছনে নেই তো? ঐখানেই তো সে শুরু করে দেয়নি তার ভোজ? আরও সাবধানে, সপ্তপর্ণে যেতে হবে এবার। দাড়াও! দেখে নিই চারিধার। নালার থাত বারো ফুটের মতো চওড়া ! দু'টো পাড় এত উঁচু যে খাতে দাঁড়িয়ে কোনো পাড়ের উপরেই কিছুই দেখা যায় না। বাঘ যদি ঐ দু'টো পাড়ের কোনো একটাতে উঠে বসে থাকে, তাহলে সেখান থেকে একটি লাফে একজনকে ঘায়েল করতে পারে এক্ষুণি। শিকারীরা তো উপরের অবস্থা কিছুই ঠাহর পাচ্ছে না! প্রাণ হাতে করে যাওয়া যাকে বলে, এ তাই !
     তবু চল। সাবধানে চল। তারপর ভাগ্যে যদি থাকে মরণ--- 
     এ্যান্ডারসনরে পায়ে কী যেন বাঁধল একটা ! পায়ে লেগে কী একটা গড়িয়ে গেল। গোলপানা কী যেন। পাথর নয়। পাথর হলে শব্দ হত ঠক করে। এটা হয়েছে ধপ। নরম কিছু।
     টর্চ ফেলে জিনিসটা দেখলেন এ্যাণ্ডারসন। সঙ্গে সঙ্গে দুই পা পিছিয়ে এলেন। একটু মুণ্ড। মানুষের মাথা। তাজা মাথা। গঙ্গা দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে এখনও। শিকারের গলাটা কামড়ে ফেলেছে বাঘ। এমনটা কোনো বাঘ তো করে না কখনো। এ-বাঘ এমনটা করতে গেল কেন ?
     আছে কি ? চাঙ্গড়ের ওধারে বাঘ আছে কি এখনো? অতি সপ্তপর্ণে, টর্চ এবং রাইফেল উদ্যত রেখে চাঙ্গড়ের একটা কোণ থেকে ওপিঠে উঁকি দিল ডোনাল্ড। নাঃ, নেই বাঘ। ভোজ শেষ করে সে চলে গিয়েছে। পড়ে আছে শুধু হাত-পাগুলো আর পড়ে আছে বুকের খানিকটা। তবু আছে যখন কিছু কিঞ্চিৎ মাংস, তারই লোভে লোভে কাল আবার এখানে ফিরে আসতেও পারে বাঘ। কী এখন করবেন শিকারীরা? ফিরে যাবেন গাড়িতে? ফিরে যাবেন হোগরেহালিতে? তারপরে আবার আসবেন কাল সন্ধ্যায়? ওঁরা এসে পৌছোবার আগেই যদি বাঘ এসে, খেয়ে দেয়ে চলে যায়? তাহলে কি আর ওর পাত্তা পাওয়া যাবে?
     আশা করা যায় না সেটা। তার চেয়ে এখানেই অপেক্ষা করা ভাল। যতক্ষণ সে না আসে, ততক্ষণই অপেক্ষা করতে হবে। তাতে যদি পুরো একটা দিনও লেগে যায়, কী আর করা যাবে? লাগুক একটা দিন।
     একটা দিন পুরোই লাগল। ভোর হলো বিপজ্জনক, রাত্রি। সূর্য উঠল। বেলা বাড়তে লাগল। নালার খাতে বালিও গরম হতে লাগল। দুপুর নাগাদ মাথার উপরে আগুন-রোদ ওঁদেৱ, সারা অঙ্গে আগুনের হলকা লাগছে চারদিক থেকে। না আহার, না তেষ্টার জল। ঘাম ঝরছে দরদর করে। ঠায় বসে আছেন পিতাপুত্র চাঙ্গড়ের আড়ালে পিঠে পিঠ মিলিয়ে। 
     শকুন নামল ঝাঁকে ঝাকে, পিঁপড়ে এলো লাখে লাখে। বাঘের ভুক্তবশেষ প্রত্যঙ্গগুলোকে হাড্ডিসার সাদা করে রেখে গেল তারা । তবু শিকারীদের আশা, বাঘ আসবে মাংসের লোভে। বাঘ তো জানে না যে চোরের ধন বাটপাড়ে নিয়েছে!
     বাঘ এল, প্রায় সন্ধ্যার সময়। অভিজ্ঞ শিকারী, বাঘ এসে পৌছবার অনেক আগে থেকেই টের পেয়ে গেলেন যে আসছে বনের রাজা, আসছে সে ভয়ঙ্কর। একটা শম্বর ডেকে উঠল আ-ই-উ-উ! একটা কোয়েল ঝঙ্কার দিয়ে উঠল কো-কো-কো-এল। সারা অরণ্যকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে ওরা। এসেছে যম। দেখ, কাকে নিয়ে যায় !
     শিকারীরা সব শুনছেন, সব বুঝতে পারছেন। প্রস্তুত আছে তারা। কিন্তু সাবধান হওয়ার কোনো উপায় নেই। তারা নালার খাতে। বাঘ যদি থাত ধরেই আসে, তবেই বাঁচোয়া। যদি সে নালার পাড় ধরে আসে, ওপর থেকে সে দেখবেই শিকারীদের। দেখে যদি, হয় নিঃশব্দে ফিরে যাবে, নয় তো লাফিয়ে পড়ে একজনকে গ্রাস করবে। ভাগ্যের উপর নির্ভর।
     ভাগ্য কিন্তু প্রসন্না ছিল। পাড় দিয়েই এলো বটে বাঘ, কিন্তু ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছিল বলে সে শিকারীদের হঠাৎ দেখতে পেলো না। শিকারীরা কিন্তু নিচে থেকে দেখলেন যে পাড়ের উপর একটা ঝোঁপ নড়ে চড়ে উঠছে এক একবার। তৎক্ষণাৎ গুলি ছুড়লেন দু’জনে, বাঘকে না দেখেই। সেই শব্দভেদী গুলিই লেগে গেল বাঘের গায়ে। সে প্রলয় গর্জন করে লাফিয়ে পড়ল নালার ভিতরে। ছুটে আসার শক্তি ছিল না, তবু এগিয়ে আসতে লাগল আক্রমণ করবার জন্য।
     আবার গুলি, দুটো রাইফেল থেকেই। চাঁদ পাহাড়ের মানুষখেকো এবার যে পড়ল, আর উঠল না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য