বিনুর জলপনা -- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

     বিনোদ যখন সেকেন্ড ক্লাস থেকে ফার্স্ট ক্লাসে উঠল, কখন তার স্কুলের হেডমাস্টার মহাশয় তোকে নিজের ঘরে যেকে পাঠিয়ে বললেন,‘বিনু, এখন থেকে তোমাকে স্কুলের মাইনে দিতে হবে; না দিলে নাম কাটা যাবে।’
     বিনুর মুখ শুকিয়ে গেল। সে ভারি গরিবের ছেলে; মইনে দিয়ে স্কুলে পড়বার তার ক্ষমতা নেই। এতদিন সে বিনা বেতনেই পড়েছে। কিন্তু আজ হঠাৎ এ কী হল? সে ক্ষীণস্বরে বললে, কিন্তু স্যার, আমি তো বেশ ভালো করেই পাশ করেছি।’
     হেডমাস্টার মহাশয় দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ‘সে আমি জানি বিনু; তুমি ভালো ছেলে। আমার যদি কোনো হাত থাকত তা হলে আমি তোমায় জলপানি দিতাম—কিন্তু—’বলে তিনি আবার মাথা নাড়লেন।
     বিনু ধরা ধরা গলায় বললে, আমি কি কোনো দোষ করেছি, স্যার?
     মাস্টারমহাশয় বিনুর পিঠে হাত রেখে বললেন, না, তুমি কোনো দোষ করেনি। কিন্তু তোমার বাবা—’ এই পর্যন্ত বলে কথাটা পালটে নিয়ে বললেন, ‘এর ভেতর অনেক কথা আছে, তুমি ছেলেমানুষ, সব বুঝবে না। আমি বলি তুমি এক কাজ করো। জমিদার ভূপতিবাবু হচ্ছেন স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট, তুমি তাকে গিয়ে ধরো। তিনি যদি হুকুম দেন তা হলে আর কোনো গোল থাকবে না।’
     বিনু আস্তে আস্তে বাইরে এসে দাঁড়াল। দশখানা গ্রামের মধ্যে এই একটি হাই স্কুল। বিনুর কত আগ্রহ, কত উৎসাহ ছিল, এখন থেকে জলপানি পেয়ে যদি পাশ করতে পারে তাহলে কলকাতায় গিয়ে কলেজে পড়বে। বি.এ., এম.এ পাশ করে আবার গ্রামে ফিরে আসবে। কিন্তু এখন? কলেজে পড়া তো দূরের কথা, স্কুলের মাইনে জোগাবে সে কোথা থাকে? তার বাবা অন্যধরনের লোক। বিনু লেখাপড়া ছেড়ে দিলেই বোধ হয় তিনি বেশি খুশি হন। তিনি কেবল দুনিয়ার লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে বেড়াতে ভালোবাসেন। বিনু নিজের আগ্রহেই এতদূর পর্যন্ত পড়তে পেরেছে—বাবাকে পড়ার খরচ দিতে হলে কোনকালে স্কুল ছেড়ে দিতে হত।
     রাস্তায় যেতে যেতে সে ভাবতে লাগল, জমিদার ভূপতিবাবু বেশ ভালো লোক—খুব দয়ালু আর ধাৰ্মিক। তিনি কি তার এই সামান্য প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন না? তার এত টাকা আছে—তা থেকে কয়েকটি টাকা তিনি মাসে মাসে বিনুকে দেবেন না? ভূপতিবাবুর দয়ার ওপরেই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে— ভাবতে ভাবতে বিনুর চোখ দিয়ে জল পড়ল।
     জমিদারবাড়িতে গিয়ে সে দেখলে, ভূপতিবাবু বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে তামাক খাচ্ছেন। সে বিনীতভাবে নমস্কার করে দাঁড়াতেই জমিদারবাবু তার দিতে ফিরে বললেন, ‘কী চাও?’
     বিনু সংকুচিতভাবে থেমে থেমে নিজের বক্তব্য বললে। নিজের দারিদ্র্যের কথা প্রকাশ করতে তার ভারি লজ্জা করতে লাগল—কিন্তু তবু সে সব কথা বললে। লেখাপড়ার দিকে তার এত আগ্রহ যে সেজন্য সে আগুনে ঝাপ দিতেও দ্বিধা করত না।
     সমস্ত শুনে জমিদার ভূপতিবাবু বললেন, হু’। তুমি হারাণ হালদারের ছেলে না ?”
     ক্ষীণস্বরে বিনু বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ।’
     জমিদার তখন চড়া সুরে বললেন,‘ছেলের স্কুলের মাইনে দিতে পারে না?”
     বিনু চুপ করে রইল।
     জমিদার তখন চড়া সুরে বললেন, ‘ছেলের স্কুলের মাইনে যে দিতে পারে না, সে জমিদারের সঙ্গে মামলা করতে আসে কোন সাহসে?’
     একথার বিনু কী উত্তর দেবে? সে ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের মধ্যে কান্না গুমরে উঠতে লাগল।
     জমিদারবাবু ফটকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, যাও। এখানে কিছু হবে না।’
     গ্রামের পূর্বদিকে তিন-চার মাইল জায়গা জুড়ে জঙ্গল। আগে বোধ হয় ওই জায়গাটায় কোনো বড় শহর ছিল। তারপর ভূমিকম্প বা ওইরকম কোনো কারণে নগর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এখনও জঙ্গলে ঢুকলে বড় বড় বাড়ির ইট পাথর স্তুপীকৃত হয়ে আছে দেখা যায়। সেইসব ভাঙা ইমারতের ফাটলে ফাটলে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বট অশ্বথ আরও কতরকম গাছ গজিয়েছে। কেবল একটি পাথরের কালীমন্দির এই ভগ্নস্তুপের মধ্যে অটুট আছে—এমনকী তার লোহার ভারী দরজাটা পর্যন্ত নষ্ট হয়নি। কিন্তু দিনের বেলায় এখানে অন্ধকার হয়ে থাকে—জঙ্গলের ঘন পাতা আর ডালপালা ভেদ করে সূর্যের আলো ঢুকতে পারে না। গ্রামের লোকেরা সহজে এ জঙ্গলে ঢুকতে চাইত না; তবে মেয়েরা কখনো মানতের পুজো দেবার জন্যে কালীমন্দিরে যেত—কিন্তু সন্ধে হবার আগেই আবার গ্রামে ফিরে আসত। সন্ধ্যের পর এ জঙ্গলে ঢোকবার কারও সাহস ছিল না।
     এই জঙ্গলটি ছিল বিনুর বেড়াবার জায়গা। দিনের বেলা একটু অবকাশ পেলেই সে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ত। বনের মাঝখানে কালীমন্দিরের কাছেই একটা প্রকাণ্ড উচু অশ্বখ গাছ ছিল। তার মাথা অন্যসব গাছের মাথা ছাড়িয়ে গ্রাম থেকে দেখা যেত। এই গাছটি ছিল বিনুর বৈঠকখানা। ছুটির দিনে সে বই পকেটে করে সেই গাছে গিয়ে উঠত। গাছের প্রায় মগডালের কাছে সে দড়ি দিয়ে একটি দোলনা বানিয়েছিল। তাইতে আরাম করে বসে সে বই পড়ত— ঘুম পেলে ঘুমিয়েও নিত। তার এই গোপন আস্তানাটির কথা কেউ জানত না। সেদিন বিকেলবেলা জমিদারবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিনু বাড়ি গেল না। পা দুটো তার অজান্তেই তাকে বনের দিকে টেনে নিয়ে চলল। জমিদারবাবুর কড়া কথাগুলো তার প্রাণে বিঁধেছিল; কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিচ্ছিল তাকে এই চিন্তা যে সে আর পড়তে পাবে না। কোথায় পাবে সে টাকা ? বাবাকে বলতে গেলে তিনি বলবেন, ঢের ল্যাখাপড়া হয়েছে; এবার আদালতের মুহুরির কাজ শেখো। কাল থেকে আমার সঙ্গে সদরে বেরোতে হবে। বাবার সঙ্গে মোকদ্দমার কাগজ বগলে করে সদরে যেতে হবে, ভাবতেই বিনুর চোখ জলে ভরে উঠল।
     ঘনঘন চোখের জল মুছতে মুছতে যখন সে তার প্রিয় গাছটির তলায় গিয়ে দাঁড়াল তখন সন্ধে হতে আর দেরি নেই—গাছের নীচে অন্ধকার জমাট বেঁধে এসেছে। কিন্তু তবু বাড়ি ফিরে যেতে আজ তার মন সরল না। সে গাছে উঠে দোলনার ওপর চুপ করে বসে ভাবতে লাগল। গাছের মগডালে তখনও বেশ আলো আছে; সেখান থেকে জমিদারবাবুর উঁচু পাকা বাড়িটা স্পষ্ট দেখা  যাচ্ছে।
     ভেবে ভেবে বিনু কোনো কুলকিনারা পেল না। জমিদারবাবুর ওপর বিনু রাগ করতে পারেনি, শুধু নিজের ব্যর্থ জীবনের কথাই সে ভাবছিল। ক্রমে রাত্রি ঘনিয়ে এল। পাখিরা যে যার বাসায় রাত্রির মতো আশ্রয় নিলে। তখন সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে গাছ থেকে নামতে আরম্ভ করলে।
     যখন সে গাছের প্রায় গুড়ির কাছ পর্যন্ত নেমেছে তখন হঠাৎ মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে সে থমকে দাঁড়াল।
নীচের অন্ধকারে হাড়ির মতো গলায় কে বললে, ‘গঙ্গারাম বাতি জ্বালা। কিছুক্ষণ পরে একটা ধোয়াটে কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলল। বিনু ছিল মাটি থেকে প্রায় পনেরো হাত উঁচুতে, সে ঘন পাতার আড়াল থেকে গলা বাড়িয়ে দেখলে দু-জন ভীষণ কালো আর ষণ্ডা লোক ঠিক তার নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মাথায় ঝাকড়া চুল, পরনে হাঁটু পর্যন্ত কাপড়, হাতে সড়কি লাঠি। তাদের মধ্যে যে লোকটা সবচেয়ে জোয়ান আর কালো, তার কোমরে তলোয়ার বাঁধা। তাদের চেহারা দেখেই বিনু বুঝলে—এরা ডাকাত, ওই তলোয়ার-বাঁধা লোকটা এদের সর্দার।
     গাছের ওপর একজন লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ দেখছে, এ যদি ডাকাতরা জানতে পারত, তাহলে বিনুর প্রাণের আর কোন আশা থাকত না, তখনই তাকে কেটে তারা মাটিতে পুঁতে ফেলত। তাই বিনুর বুকের ভেতর যদিও ধড়াস ধড়াস করছিল, তবু সে মাটির পুতুলের মতো নিশ্চল হয়ে বসে রইল— একটু নড়লে চড়লে পাছে শব্দ হয়।
     ডাকাতের দল লণ্ঠন ঘিরে বসল। সর্দার বললে, “আমি সব খবর নিয়েছি। দেউড়িতে দুজন খোট্টা দারোয়ান থাকে; কিন্তু খিড়কির দরজায় কেউ পাহারা দেয় না—বুঝেছিস ?
     একজন ডাকাত জিজ্ঞেস করলে, ‘গয়নাগাটি কোথায় থাকে?’
     সর্দার বললে, ‘দোতলার একটা ঘরে। ঘরটা আমি বাইরে থেকে চিনে রেখেছি। গঙ্গারাম, তামাক সাজা।”
     গঙ্গারাম বোধ হয় ডাকাতের দলে নুতন ভর্তি হয়েছে—লোকটা ওদের মধ্যে সবচেয়ে রোগা, তার কোমর থেকে একটি ছোট্ট ডাবা হুকো ঝুলছিল, সে সেটা খুলে নিয়ে তামাক সাজতে বসল, কিন্তু সর্দার, শুনেছি জমিদারের বন্দুক আছে। যদি—’
     সর্দার বিদ্রুপ করে বললে, “তোর ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেছে? এত প্রাণের ভয় যার সে ডাকাতের দলে ভিড়েছে কেন? তুই যা, ছাগল চরাগে।’
     অন্য ডাকাতগুলো হেসে উঠল। গঙ্গারাম মুখে সাহস দেখিয়ে বললে, ভয় আমি কাউকে করি না। কিন্তু যদি তারা বন্দুক চালায় তখন কী করবে? মালও হাতছাড়া হবে, মাঝ থেকে প্রাণটা যাবে।’
     সর্দার তখন বললে, “সে বন্দোবস্ত কি আমি না করেই এসেছি রে! এই দেখ, যে ঘরে জমিদারের বন্দুক পিস্তল সে ঘরের চাবি চুরি করে এনেছি। দুদিন যে তার বাড়িতে বাসন মেজেছি সে কি আর সাধে?
     এই শুনে ডাকাতরা ভারি উৎসাহিত হয়ে উঠল বললে, ‘সাবাস সর্দার! তোমার সঙ্গে কাজ করে সুখ আছে। আমাদের সর্দার হবার উপযুক্ত লোক তুমি।
     সর্দার আরাম করে তামাক টানতে টানতে বললে, ‘এই কাজটা যদি মা কালীর দয়ায় ভালোয় ভালোয় উতরে যায়, তাহলে কম করে পঞ্চাশ হাজার টাকার মাল লোটা যাবে—বুঝেছিস? আখেরে আমাদের আর খেটে খেতে হবে না?
     বিনু ডালে বসে বসে তাদের সব কথা শুনতে পাচ্ছিল। তারা যে কার বাড়িতে ডাকাতি করবার মতলব আঁটছে তা বুঝতে তার বাকি ছিল না। তার ইচ্ছে হল, কোনোমতে ছুটে গিয়ে যদি খবরটা জমিদারবাবুকে দেওয়া যায় তাহলে এখনও ডাকাতদের ধরা যেতে পারে। কিন্তু গাছ থেকে নামবার তো উপায় নেই। ঠিক নীচেই ডাকাতগুলো বসে আছে।
     ক্রমে রাত্রি গভীর হতে লাগল। বিনুর মা নিশ্চয় তার জন্যে ভাবছেন। হয়তো চারদিকে খোঁজ খোঁজ পড়ে গেছে। কিন্তু বিনুর এই আস্তানাটির কথা তো কেউ জানে না, কাজেই এদিকে কেউ খুঁজতে আসবে না। আহা! যদি আসত তা হলে কী ভালোই হত ! ডাকাতগুলোও সেই সঙ্গে ধরা পড়ে যেত। গাছের ডালে নিঃসাড়ে বসে বসে বিনুর হাত-পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেল। কিন্তু তবু ডাকাতদের নড়বার নাম নেই—তারা বসেই আছে। বসে বসে গল্প করছে আর তামাক খাচ্ছে।
     শেষে যখন রাত্রি দুপুর হতে আর দেরি নেই, তখন সর্দার হুঁকো রেখে উঠে দাঁড়াল। কোমরে তলোয়ার কষে বললে, “জোয়ান সব, এবার চলো সময় হয়েছে। গঙ্গারাম, তুমি এই গাছতলায় লণ্ঠন নিয়ে বসে থাক। এ জঙ্গলটা ভারি বিশ্রী, পথ হারিয়ে যাবার ভয় আছে। কাজ সেরে ফিরে এসে আমি ‘কুক’ দেব, তখন তুই লণ্ঠন নাড়বি—তা হলে আমরা বুঝতে পারব তুই কোথায় আছিস। এই গাছতলায় ফিরে এসে আমরা মাল ভাগ-বাটোয়ারা করব, বুঝলি?’
     গঙ্গারাম ভয় পেয়ে বললে, “আমি একলা থাকব? কিন্তু যদি—তার গলা কাঁপতে লাগল।
     সর্দার তাকে ধমক দিয়ে বলল, ভয় কীসের ? বাঘ-ভালুকে তোকে খেয়ে ফেলবে না, এ বনে শেয়াল ছাড়া আর কোনো জানোয়ার নেই।’
     গঙ্গারাম বললে, “বাঘ ভালুক নয়, কিন্তু যদি—যদি তেনারা, রাত্তিরে যাদের নাম করতে নেই—’
     সর্দার হো হো করে হেসে উঠে বললে, ‘ও—ভূত। তা যদি ভূতের ভয় করে, রাম নাম করিস।”
     তারপর ‘জয় মা কালী’ বলে ডাকাতের দল অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। গঙ্গারাম লণ্ঠনটি দুই হাঁটুর মধ্যে নিয়ে উপুর হয়ে বসে রইল আর ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
     হঠাৎ গুরুতর বিপদে পড়লে অনেকের বুদ্ধি লোপ হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ আছে, বিপদ যত ঘিরে ধরে তাদের বুদ্ধিও তত পরিষ্কার হয়। ডাকাতরা যখন গঙ্গারামকে রেখে চলে গেল, তখন বিনুর মাথায় একটা চমৎকার মতলব খেলে গেল। কী করে ডাকাতদের জব্দ করা যেতে পারে, তার প্ল্যান সে চোখের সামনে পরিষ্কার দেখতে পেলে।
     ডাকাতরা চলে যাবার পর আধ ঘণ্টা কেটে গেল। তখন বিনু গাছের ওপর একটু নড়েচড়ে বসল। খড়খড় শব্দ শুনেই গঙ্গারাম সভয়ে একবার ওপর দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগল, ‘রাম রাম রাম রাম—’
     এমনিভাবে দশ মিনিট রাম নাম জপ করবার পর গঙ্গারাম যেই থেমেছে, অমনি পাতাসুদ্ধ অশ্বখ গাছের একটি ডাল তার সুমুখে পড়ল।
     গঙ্গারাম আঁতকে উঠে আরও জোরে রাম নাম করতে লাগল। আর চমকে চমকে চারদিকে তাকাতে লাগল।
     বিনু দেখলে, গঙ্গারামের অবস্থা শোচনীয় হয়ে এসেছে, সে তখন নাকি সুরে গাছের ওপর থেকে বললে—‘কোঁ—’
     গঙ্গারাম আর থাকতে পারলে না, বাবা গো চলে চিৎকার করে লম্বা লম্বা পা ফেলে দৌড় মারলে। এ জঙ্গলের মধ্যে সে যে আর আসবে না তাতে কোনো সন্দেহ রইল না।
     বিনু তখন হাত পা ছড়িয়ে শরীরটাকে ঠিক করে নিলে, কিন্তু গাছ থেকে নামল না। প্রায় দুঘণ্টা কেটে যাবার পর বিনু দূর থেকে সর্দারের কুক শুনতে পেলে— একটা অনৈসর্গিক দীর্ঘ হুংকার। বিনু তৈরি হয়েই ছিল, চট করে নেমে এল। নিজের ধুতির পাড় আগেই ছিড়ে রেখেছিল, তাইতে লণ্ঠনের হাতলটা বেঁধে গাছের একটা নিচু ডালে ঝুলিয়ে দিলে। তারপর লণ্ঠনটাকে বেশ একটা দোলা দিয়ে তাড়াতাড়ি একটা ঘন ঝোপের মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে রইল।
     খানিক পরে ডাকাতের দল এসে পৌছুল। সর্দারের পিঠে একটা সাদা কাপড়ের পোটলা। আনন্দে তাদের চোখ বাঘের চোখের মতো জুলছে।
     লণ্ঠনটা গাছ থেকে ঝুলছে দেখে সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, “এ কী, গঙ্গারাম কোথায় ?
     সর্দার বললে, নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও গেছে। লণ্ঠনটা এখনও দুলছে দেখছ না?’
     তখন সকলে গঙ্গারামের জন্যে অপেক্ষা করতে বসল। অনেকক্ষণ কেটে গেল; কিন্তু গঙ্গারামের দেখা নেই। সকলে ব্যস্ত হয়ে উঠতে লাগল, তারা লুটের মাল ভাগ করে নিয়ে সরে পড়তে চায়—কারণ ভোর হলে আর এ জঙ্গলে থাকা নিরাপদ হবে না। সর্দার অধীর হয়ে বললে, তাই তো। গঙ্গারামটা গেল কোথায়?”
     সে মুখের মধ্যে আঙুল পুরে একরকম লম্বা শিস দিল; তারপর কান খাড়া করে বসে রইল; কিন্তু গঙ্গারামের শিস শুনতে পেলে না।
     শেষে অধৈর্য হয়ে একজন ডাকাত বলে উঠল, “সর্দার, গঙ্গারামের জন্যে বসে থেকে কাজ নেই, এদিকে ভোর হয়ে আসছে। এসো, আমরা পাঁচজনে ভাগাভাগি করে নিয়ে যে যার সরে পড়ি।
     ওসব দাগাবাজি চলবে না। মা কালীর পা ছুয়ে এ কাজে নেমেছি, দিব্যি গেলেছি কখনো স্যাঙাতের সঙ্গে দাগাবাজি করব না। মাল চুলচিরে সাত ভাগ হবে। দুভাগ আমি নেব, বাকি পাঁচ ভাগ তোমরা পাঁচজনে নেবে। গঙ্গারাম এ কাজে যখন আমাদের সঙ্গে আছে, তখন তাকেও তার বখরা দিতে হবে।
     একজন বললে, “সে তো ভালো কথা। কিন্তু গঙ্গারাম যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে তা হলে কী হবে?’ -
     খুঁজি গিয়ে। আধ ঘণ্টার মধ্যে যদি তাকে খুঁজে পাওয়া না যায়, তখন আমরা আবার এখানে ফিরে আসব। তারপর আমরা কজনেই মাল বখরা করে নেব। কী বলো?“
     ডাকাতরা সবাই সায় দিলে। সর্দার তখন বললে, “এই পোটলা এখানে এই আলোর তলায় রইল। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কেউ এতে হাত দেবে না। যদি কেউ হাত দাও—তা হলে— বলে প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার তাকালে। সেই ভয়ংকর দৃষ্টির মানে বুঝতে কারও কষ্ট হল না।
     তারপর পাঁচজন পাঁচদিকে বেরিয়ে গেল। বিনু যখন দেখলে তারা অনেক দূরে চলে গেছে তখন সে পা টিপে টিপে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর পুটলিটা কাঁধে করে কাঠবেড়ালির মতো গাছে উঠতে আরম্ভ করল। দশ মিনিটের মধ্যে পুটলি নিজের দোলার মধ্যে লুকিয়ে রেখে বিনু আবার নীচে নেমে এল। যাক, লুঠের মাল তো হস্তগত হয়েছে, এবার ডাকাতদের ধরা চাই।
     আধ ঘণ্টা শেষ হতে আর দেরি নেই, এখনই ডাকাতের দল ফিরে আসবে। বিনু অন্ধকারে ছায়ার মতো কালীমন্দিরের দিকে মিলিয়ে গেল।
     ডাকাতরা সবাই প্রায় একসঙ্গেই ফিরে এল। দেখলে বেঁচেকা নেই। সর্দার গর্জন করে উঠল, “বোঁচকা কোথায় গেল?’
     কারও মুখে কথা নেই। সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। সকলের চোখেই সন্দেহের ছায়া। এ ভাবছে ও নিয়েছে, ও ভাবছে এ নিয়েছে।
     সর্দার তলোয়ার বার করে ভীষণস্বরে বললে, ‘কে সরিয়েছ এখনও বলো, নইলে আজ সকলের মাথা এখানে কেটে রেখে যাব।’
     ডাকাতরাও সড়কি ছোরা বাগিয়ে দাঁড়াল। একজন বললে, “সর্দার, এ তোমার কাজ। তুমিই মাল এখানে রেখে গঙ্গারামকে খুঁজতে যাবার ফন্দি বার করেছিলে।’
     সর্দার বললে, ‘ওরে মুর্খু, আমি নিলে কি আর ফিরে আসতুম? এ তোদের কারও কাজ।”
     ডাকাতদের মধ্যে লড়াই বাঁধে আর কী, এমন সময় তাদের মধ্যে একজন চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘বুঝেছি—বুঝেছি—এ গঙ্গারামের কাজ।”
     সকলে অস্ত্র নামাল। সর্দার একটু ভেবে বললে, তা হতে পারে। গঙ্গারাম হয়তো কাছেই লুকিয়ে ছিল, আমাদের ডাকাডাকিতে ইচ্ছে করেই সাড়া দেয়নি। তারপর যেই আমরা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছি অমনি—। উঃ! গঙ্গারামটা কী নেমকহারাম!’
     ঠিক এইসময় ঠুং করে কালীমন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেই থেমে গেল, যেন অসাবধানে বেজে ওঠার পর কে ঘণ্টাটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।
     ডাকাতরা উত্তেজিতভাবে পরস্পর মুখের পানে তাকাতে লাগল। তারপর সর্দার চাপা গলায় বললে, ‘গঙ্গারাম! কালীমন্দিরে লুকিয়েছে! তোমরা সকলে আস্তে আস্তে আমার পেছনে এসো।’
     ডাকাতরা হাতের অস্ত্র বাগিয়ে ধরে ব্যাধের মতো নিঃশব্দে মন্দিরের দিকে চলল ।
     বিনু মন্দিরের চাতালের আড়ালে হাঁটু গেড়ে লুকিয়ে বসে ছিল, যখন দেখলে পাঁচটা অন্ধকার মূর্তি পা টিপে টিপে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে গেল, তখন সে বিদ্যুতের মতো এসে প্রাণপণ জোরে মন্দিরের লোহার দরজাটা টেনে কড়াৎ করে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দিলে।
     তারপর সেই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে উঠি কি পড়ি করে সে গ্রামের দিকে ছুটতে আরম্ভ করল। কাটায় হাত পা ছড়ে গেল, কাপড় ছিঁড়ে গেল, কিন্তু সেদিকে দৃষ্টিপাতও করলে না। গ্রামের সীমানায় যখন এসে পৌছুল তখন পুব আকাশে একটুখানি দিনের আলো দেখা দিয়েছে।
     বেলা দশটার সময় জমিদার ভূপতিবাবুর বৈঠকখানায় মস্ত সভা বসেছিল। গাঁসুদ্ধ লোক সেখানে হাজির ছিলেন। এমনকি বিনুর বাবা হারাণ হালদারও বাদ পড়েননি।
     ডাকাতেরা গতরাত্রে যে সমস্ত জিনিস লুঠে নিয়ে গিয়েছিল সেই সবই পাওয়া গেছে; পুটলির মধ্যেই ছিল। ডাকাতদের কালীমন্দির থেকে বার করে পুলিশ থানায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। উপস্থিত সবাই বসে বিনুর গল্প শুনছিল—কী করে সে ডাকাত ধরলে। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, কারও মুখে একটি কথা নেই।
     বিনুর গল্প শেষ হবার পর খানিকক্ষণ বৈঠকখানা নীরব হয়ে রইল। তারপর জমিদার ভূপতিবাবু কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘বাবা, তুমি আজ যে সাহস আর বুদ্ধি দেখিয়েছ, গল্পের বইয়েও সেরকম পড়া যায় না। আর আমার যে উপকার করেছ তা তো জীবনে ভোলবার নয়। কাল আমি তোমার প্রতি বড় অবিচার করেছিলুম, তোমার বাবার ওপর রাগ করে তোমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলুম। ভগবান তাই আমাকে ভালোরকম শিক্ষা দিয়েছেন। তোমার বাবা আমার সঙ্গে যত ইচ্ছে মামলা করুন, কিন্তু আজ থেকে তোমার সমস্ত লেখাপড়ার ভার আমি নিলুম। তুমি যতদিন পড়বে—বি.এ., এম.এ. পাশ করে যদি তুমি বিলেতে যেতে চাও, সে খরচও আমি জোগাব। তোমার মতো রত্ন যদি পয়সার অভাবে পড়াশুনো করতে না পায় তা হলে আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য। আশীৰ্বাদ করি, তুমি বিদ্বান হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করো।’
জমিদারবাবুর কথা শুনে সকলে আনন্দধ্বনি করে উঠলেন। বিনু কৃতজ্ঞতাভরা বুকে তার পায়ের ধুলো মাথায় নিলে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য