বুদ্ধির জোর -- নেপাল নাগ

    উত্তরদেশের একটি গ্রামে বীরসিংহ ও জানপ্রকাশ নামে দুজন যুবক ছিল। ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু স্বভাবে ওরা ছিল পরস্পরের বিপরীত। জ্ঞানপ্রকাশ ছিল রোগা, দুর্বল কিন্তু তার বুদ্ধি ছিল তীক্ষ। আর বীরসিংহ ছিল শক্তিশালী, সাহসী আর তড়িঘড়ি করে কাজ করা লোক। ওর বুদ্ধি ছিল কম। দুজনেই গরীব পরিবারের।
    দুই বন্ধুতে একবার দূরের গ্রামে রওনা হোল। মাঝ পথে বীরসিংহের খিদে পেল। দূরে একটি গ্রাম দেখতে পেল। সেখানে গিয়ে কাউকে খেতে দিতে বলব বলল বীরসিংহ।
    "আমার অত খিদে নেই। গ্রাম দেখে মনে হচ্ছে এখানে গরীব মানুষই বেশি আছে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ কারো বাড়ি যেতে ভাল লাগে না। আর
    তা ছাড়া আমরা দুজনে গেলে খেতে পাব কিনা সন্দেহ। তুমি আগে গিয়ে খেয়ে এসো। তারপর দেখা যাবে:' বলল জ্ঞানপ্রকাশ ।
    আসল ব্যাপার হোল যা-তা ব্যবহার করে বীরসিংহ সবার সাথে ঝগড়া করে। আর খিদে পেলে ওর কোন জ্ঞান থাকেনা। বুদ্ধি খেলেনা। একথা জ্ঞানপ্রকাশ ভালভাবেই জানত। ওর সাথে গেলে ভাত তো দূরের কথা জলও খেতে পাবেনা। সেই জনাই বীরসিংহকে একাই যেতে বলল গ্রামে।
    গাঁয়ে ঢুকেই এক চাষীকে দেখতে পেল বসে খাচ্ছে। ক্ষেতে যাওয়ার আগে খেতে বসেছে। বীরসিংহ হঠাৎ তার বাড়িতে ঢুকে বলল, “আমার খিদে পেয়েছে, আমাকেও খেতে দাও।" জোর করে যেন দাবি করছে সে ।
    চাষী আর চাষীর বউ লোকটার চোটপাট দেখেতো অবাক !
    “হাঁ করে দেখছ কি ? তোমাদেরই বলছি। তাড়াতাড়ি খেতে দাও।” বীরসিংহ দুমদাম করে বলল। এমন ভাবে বলল যেন ওদের কাছে তার বলার অধিকার আছে।
    “তোমার এতো মেজাজ কিসের? তোমাকে আমরা খেতে দেব কেন? তুমি কি আমাদের আত্মীয়? যাও,ভাগ এখান থেকে ” বলল চাষী ।
    “খেতে দেবে কিনা জানতে চাই। আমার হাতের লাঠিটা দেখছো তো !" বলল বীরসিংহ।
    ওরা দুজনে এই ধরনের কথা বলাবলি করছে এমন সময় চাষীর বউ খিড়কীর দরজা দিয়ে পাড়ায় বেরিয়ে দশ বারোজনকে ডেকে অানল ।
    বীরসিংহ লাঠি মারার কথা বলতে না বলতে তার পিঠেই কয়েকটা লাঠির ঘা পড়ল। বীরসিংহ আর্তনাদ করতে করতে ছুটছে তো ছুটছে। শেষে জ্ঞানপ্রকাশের কাছে পৌছে গেল। ওর অবস্থা দেখে ওর কাছে সব কথা শুনে সে বীরসিংহকে বলল, “তুমি ঘন্টাখানেক এই গাছের নিচে বস। আমি এক ঘন্টার মধ্যে খাবার আনব। তুমিও খাবে আমিও খাব।”
    এবারে জ্ঞানপ্রকাশ সেই কিষাণের বাড়ি গেল। বীরসিহংকে তাড়াবার পর তখনও সে-ব্যাপারে আলোচনা করছিল গ্রামের লোকেরা, এমন সময় জ্ঞানপ্রকাশ গিয়ে খাবার দিতে বলে।
    কিষাণ রেগে গিয়ে বলে, “খাবার দাবার কিছু হবেনা । যাও, না হলে লাঠি খেতে হবে।”
    “আমি খেতে চাই ঠিক কিন্তু তাই বলে লাঠি খেতে চাই না ।”
    তার কথা শুনে সবাই হাসলো। জ্ঞানপ্রকাশ আবার বলল, “আমি শুনেছি, এই গ্রামের লোক খুব বনেদী, যাক সে কথা, আপনার হাড়ি আর জল দিলে আমি আপনাদের জন্য চমৎকার এক খাবার রান্না করে খাওয়াতে পারব।"
    গ্রামের লোকের মনে কৌতুহল জাগল। জ্ঞানপ্রকাশ কিষাণের কাছ থেকে হাঁড়ি আর জল পেল। একটা গাছের নিচে তিনটি ইট বসিয়ে উনুন বানালো। এদিক ওদিক থেকে কটা কাঠ কুড়িয়ে উনুন ধরালো। উনুনের উপর জলভর্তি হাড়ি বসিয়ে পকেট থেকে একটি পাথরের টুকরো বের করে সেই হাঁড়িতে ফেলল। ওর এই কাণ্ডকারখানা সবাই দেখলো । কিছুক্ষণ পর ঐ হাড়ির গরম জল কয়েক ফোটা মুখে দিয়ে সুস্বাদু কোন কিছু খাবার মত ভঙ্গি করল। বলল, “চমৎকার হয়েছে, এতে দু একটা আলু পড়লে অারও স্বাদ হোত।”
    এরপর ওখানে যারা জমেছিল তাদের মধ্যে থেকে একজন দু তিনটি আলু আনল। ঐ আলু হাঁড়িতে দিয়ে কিছুক্ষণ
পরে সেই জল চেখে জ্ঞানপ্রকাশ বলল, “বা ! চমৎকার হয়েছে ! এতে যদি দু মুঠো চাল পড়তে তাহলে আরও জমতো!" এক এক করে চাল, তার-তরকারি সবই কেউ না কেউ এনে দিল।
গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই জ্ঞানপ্রকাশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সব শেষে আবার ঐ রান্না করা জিনিস মুখে দিয়ে জ্ঞানপ্রকাশ বলল, “এ-হে-হে, মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। নুন পড়ল না।” তৎক্ষণাৎ একজন ছুটে গিয়ে নুন আনল। তারপর গাছের পাতা পেড়ে জ্ঞানপ্রকাশ ঐ পাত্র নিয়ে বীরসিংহ যেখানে বসে ছিল সেখানে গেল। তার সাথে সাথে কিছু বাচ্চারাও গেল!
দুই বন্ধুতে পাতায় ঐ খাবার বেড়ে পেট পুরে খেল। বাকি যা ছিল তা ঐ বাচ্চাদের খেতে দিয়ে ঐ হাড়িটা মেজে ঐ কিষাণকে দিয়ে দিতে বলল।
তারপর ওরা দুজনে নিজেদের পথে পা বাড়াল ।

শিক্ষা: যদি মাথায় বুদ্ধি থাকে তবে কৌশলে কাজ হাশিল করা যায়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য