শেয়াল আর নেকড়ে -- রাশিয়ার উপকথা

    এক ছিল বুড়ো আর এক বুড়ী। একদিন বুড়ো বুড়ীকে বলল: 
    ‘বুড়ী, কটা পিঠে করে দে। আমি ততক্ষণ ঘোড়া স্লেজে জুতে ফেলি। মাছ ধরতে যাব।’
    অনেক মাছ ধরল  ‍বুড়ো। একেবারে মাছে ভরা স্লেজ। বাড়ী ফেরার পথে হঠাৎ দেখে এক শেয়াল: পুটলির মতো গুটিয়ে রাস্তায় শুয়ে।
    স্লেজ থেকে নেমে বুড়ো গেল শেয়ালের কাছে, শেয়াল কিন্তু একটুও নড়ে না, মড়ার মত পড়ে রইল।
    “কপাল ভালো! বুড়ীর গরম কোটের কলার করা যাবে খাসা।” 
    এই ভেবে বুড়ো শেয়ালটাকে স্লেজে চাপাল, নিজে চলল আগে আগে। শেয়াল দেখল এই সুযোগ। চুপিচুপি স্লেজ থেকে একটি একটি করে মাছ ছুড়ে ফেলতে লাগল। একটার পর একটা, ফেলে আর ফেলে।
    সব মাছ ফেলা হয়ে গেল। শেয়ালও সুট করে নেমে গেল।
    বাড়ীতে পৌঁছেই বুড়ো চীৎকার করে বুড়ীকে ডাকল:
    'বোঁ, তোর কোটের কলারের জন্যে চমৎকার একটা জিনিস এনেছি!’
    বুড়ী তো স্লেজের কাছে গিয়ে দেখে—কিছুই নেই, মাছ না, কলার না, একেবারে ফাঁকা। বুড়ীর সে কী বকুনি!
    ‘ওরে আহামক, ওরে মুখপোড়া, আমাকে নিয়ে রগড় !"
    বুড়োর তখন খেয়াল হল শেয়ালটা তো তাহলে মরা ছিল না। ভারি আফশোস হল, কিন্তু কী আর করে! যা হবার সে তো হয়ে গেছে।
    এদিকে শেয়াল তো তার রাস্তার সব কটা মাছ একসঙ্গে জড় করে ভোজে বসেছে ।
    এমন সময় এক নেকড়ে এসে হাজির ।
    ‘এই যে দাদা, খেতে বসেছ দেখছি, অতিথি বরণ করো!’
    ‘আমি খাচ্ছি আমার, ভাগ নেই তোমার।’
    ‘দাও না একটা মাছ!’
    নিজে ধরে খাও গে।’
    “কিন্তু আমি যে মাছ ধরতে জানি না!’
    ‘ফুঃ ! আমি পারলে, তুমিও নিশ্চয়ই পারবে। নদীতে চলে যাও দাদা, বরফের গর্তে লেজ ঢুকিয়ে বসে বলবে: 

“এই মাছ, চেপে ধর, 
একটানে উঠে পড়! 
এই মাছ, চেপে ধর, 
একটানে উঠে পড়!” 

অমনি মাছও তোমার লেজ চেপে ধরবে। যত বসে থাকবে তত মাছ পাবে।”
    নেকড়ে চলল নদীর পাড়ে। বরফের গর্তে লেজ ঢুকিয়ে জাঁকিয়ে বসে কেবলি বলতে থাকল:

‘এই মাছ, চেপে ধর, একটানে উঠে পড়! 
এই মাছ, চেপে ধর, একটানে উঠে পড়!’

আর শেয়াল রেকড়ের চারপাশে ঘোরে আর মন্তর পড়ে:

    ‘আকাশে মিটমিটে তারা তাকিয়ে, 
নেকড়ের লেজখানা দে না জমিয়ে!”

    নেকড়ে শেয়ালকে জিজ্ঞেস করল: 
   ‘কী বিড়বিড় করছো, দাদা ? 
    ‘তোমার জন্যেই করছি, লেজে অনেক মাছ উঠবে।’ 
    এই বলে শেয়াল আবার ধুয়ো ধরল:

‘আকাশে মিটমিটে তারা তাকিয়ে, 
নেকড়ের লেজখানা দে না জমিয়ে !"

    সারা রাত অমনি বসে রইল নেকড়ে। লেজও ওর বরফে জমে গেল। ভোর নাগাদ নেকড়ে ওঠবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু লেজ আর নড়ে না। ভাবল, “দ্যাখো, কত মাছই না ধরেছি – টেনে তোলাই দায়!”
এমন সময় একটি মেয়ে নদীতে এল জল নিতে। নেকড়ে দেখেই সে চীৎকার
জুড়ল:
     ‘নেকড়ে, নেকড়ে! কে আছ, মারবে এস!’
     নেকড়ে এদিক ঘোরে, ওদিক ঘোরে, তার লেজ কিন্তু ওঠে না। মেয়েটি তখন বালতি ফেলে রেখে বাঁকটা হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মার মার নেকড়েকে, নেকড়ে মার খায় আর হাঁসফাঁস করে। করতে করতে যেই তার লেজটি খসে গেল, অমনি ভোঁ দৌড়।
    মনে মনে নেকড়ে ভাবে, “দেখাচ্ছি দাঁড়াও শেয়াল ভায়া, এর প্রতিফল পাবে!”
    শেয়াল এদিকে চুপিচুপি গিয়ে ঢুকেছিল ঐ মেয়েটির কুড়েঘরে। বারকোশে কিছ ময়দা ঠাসা ছিল। পেট পরে তা সব খেয়ে, মাথায় কিছুটা মেখে শেয়াল গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল রাস্তায়। পড়ে পড়ে কোথায়।
    নেকড়ে তাকে দেখে বলল:
    ‘শেয়াল ভায়া, বেশ মাছ ধরা শিখিয়েছিলে যা হোক! এই দেখ আমার সারা গায়ে কালশিটে পড়ে গেছে...
    শেয়াল বলল : 'আরে দাদা, তোমার লেজটা না হয় নাই রইল, মাথাটা তো আছে। কিন্তু আমার যে মাথাটা একেবারে গড়িয়ে দিয়েছে। এই দ্যাখো, পিটিয়ে পিটিয়ে ঘিলু বার করে দিয়েছে কেমন। হামাগাড়ি পর্যন্ত দিতে পারছি না।’
    নেকড়ে বলল: ‘তাই তো দেখছি ভায়া, আহা বেচারী ! আমার পিঠে চড়ো, কোথায় যাবে আমি বয়ে নিয়ে যাই।”
    শেয়াল তো তাই নেকড়ের পিঠে চেপে বসল। নেকড়ে তাকে বয়ে নিয়ে যায়। নেকড়ের পিঠে চেপে চলেছে শেয়াল, আর গুনগুনিয়ে গাইছে:
‘তাগড়া শেয়াল জাঁকিয়ে বসে 
লেজ কাটাটার পিঠে !’

    ‘গুনগুন করে কী বলছ, ভায়া ? নেকড়ে জিজ্ঞেস করল।
    শেয়াল বলল : ‘ও কিছ নয়। মন্তর পড়ছি। তোমার সব ব্যথা সেরে যাবে।’ এই বলে শেয়াল আবার গান ধরল:

‘তাগড়া শেয়াল জাঁকিয়ে বসে 
লেজ কাটাটার পিঠে !’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য