Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

   দত্তদের বাড়ীতে কালীপূজা উপলক্ষে সখের থিয়েটারের স্টেজ বাঁধা হইতেছে। ‘মেঘনাদবধ হইবে। ইতিপূর্বে পাড়াগাঁয়ে যাত্রা অনেকবার দেখিয়াছি, কিন্...

শ্রীকান্তের থিয়েটার দেখা -- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

   দত্তদের বাড়ীতে কালীপূজা উপলক্ষে সখের থিয়েটারের স্টেজ বাঁধা হইতেছে। ‘মেঘনাদবধ হইবে। ইতিপূর্বে পাড়াগাঁয়ে যাত্রা অনেকবার দেখিয়াছি, কিন্তু থিয়েটার বেশি চোখে দেখি নাই। সারাদিন আমার নাওয়া-খাওয়াও নাই, বিশ্রামও নাই। স্টেজ-বাঁধায় সাহায্য করিতে পারিয়া একেবারে কৃতাৰ্থ হইয়া গিয়াছি।
   শুধু তাই নয়। যিনি রাম সাজিবেন, স্বয়ং তিনি সেদিন আমাকে একটা দড়ি ধরিতে বলিয়াছিলেন। সুতরাং ভারি আশা করিয়াছিলাম, রাত্রে ছেলেরা যখন কানাতের ছেঁড়া দিয়া গ্রীনরুমের মধ্যে উঁকি মারিতে গিয়া লাঠির খোঁচা খাইবে, আমি তখন শ্রীরামের কৃপায় বাঁচিয়া যাইব। হয়ত বা আমাকে দেখিলে এক-আধবার ভিতরে যাইতেও দিবেন। কিন্তু হায়রে দুভাগ্য! সমস্ত দিন যে প্রাণপাত পরিশ্রম করিলাম, সন্ধ্যার পর তাহার কোন পুরস্কার পাইলাম না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রীনরুমের দ্বারের সন্নিকটে দাঁড়াইয়া রহিলাম। রামচন্দ্র কতবার আসিলেন, গেলেন, আমাকে কিন্তু চিনিতে পারিলেন না। একবার জিজ্ঞাসাও করিলেন না, আমি অমন করিয়া দাঁড়াইয়া কেন? অকৃতজ্ঞ রাম! দড়ি ধরার প্রয়োজনও কি তাঁহার একেবারেই শেষ হইয়া গেছে।
   রাত্রি দশটার পর থিয়েটারের পয়লা 'বেল’ হইয়া গেলে নিতান্ত ক্ষুন্নমনে সমস্ত ব্যাপারটার উপরেই হতশ্রদ্ধ হইয়া সুমুখে আসিয়া একটা জায়গা দখল করিয়া বসিলাম। কিন্তু অল্প কালের মধ্যেই সমস্ত অভিমান ভুলিয়া গেলাম।
   সে কি প্লে ! জীবনে অনেক প্লে দেখিয়াছি বটে, কিন্তু তেমনটি আর দেখিলাম না। মেঘনাদ স্বয়ং এক বিপর্যয় কাণ্ড । তাঁহার ছয় হাত উঁচু দেহ। পেটের ঘেরটা চার সাড়ে চার হাত। সবাই বলিত, মরিলে গরুর গাড়ি ছাড়া উপায় নাই। অনেক দিনের কথা। আমার সমস্ত ঘটনা মনে নাই। কিন্তু এটা মনে আছে, তিনি সেদিন যে বিক্রম প্রকাশ করিয়াছিলেন, আমাদের দেশের হারাণ পলসাই ভীম সাজিয়া মস্ত একটা সজিনার ডাল ঘাড়ে করিয়া দাঁত কিড়মিড় করিয়াও তেমনটি করিতে পারেতেন না।
   ড্রপসিন উঠিয়াছে।...বোধ করি বা তিনি লক্ষণই হইবেন—অল্প অল্প বীরত্ব প্রকাশ করিতেছেন। এমনি সময়ে সেই মেঘনাদ কোথা হইতে একেবারে লাফ দিয়া সুমুখে আসিয়া পড়িল। সমস্ত স্টেজটা মড়মড় করিয়া কাঁপিয়া দুলিয়া উঠিল—ফুটলাইটের গোটা পাঁচ-ছয় ল্যাম্প উল্টাইয়া নিবিয়া গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার নিজ পেট-বাঁধা জরির কোমরবন্ধটা পটাস করিয়া ছিড়িয়া পড়িল।
   একটা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। তাঁহাকে বসিয়া পড়িবার জন্য কেহ বা সভয় চীৎকারে অনুনয় করিয়া উঠিল, কেহ বা সিন ফেলিয়া দিবার জন্য চেঁচাইতে লাগিল—কিন্তু বাহাদুর মেঘনাদ! কাহারও কোন কথায় বিচলিত হইল না। বাঁ হাতের ধনুক ফেলিয়া দিয়া, পেন্টুলানের খুট চাপিয়া ধরিয়া ডান হাতের শুধু তীর দিয়াই যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
   ধন্য বীর। ধন্য বীরত্ব। অনেক অনেক যুদ্ধ দেখিয়াছি মানি, কিন্তু ধনুক নাই, বাঁ হাতের অবস্থাও যুদ্ধক্ষেত্রের অনুকুল নয়—শুধু ডান হাতে এবং শুধু তীর দিয়া ক্রমাগত যুদ্ধ কে কবে দেখিয়াছে। অবশেষে তাহাতেই জিত। বিপক্ষকে সে যাত্রা পলাইয়া আত্মরক্ষা করিতে হইল। আনন্দের সীমা নাই—মগ্ন হইয়া দেখিতেছি এবং অপরূপ লড়াইয়ের জন্য মনে মনে তাহার শতকোটি প্রশংসা করিতেছি, এমন সময় পিঠের উপর একটা আঙুলের চাপ পড়িল। মুখ ফিরাইয়া দেখি ইন্দ্র।

(শ্রীকান্ত-১ হতে গৃহীত)

0 coment�rios: