ডাকাতের গল্প -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

     গুপ্তিপাড়ার বিশ্বম্ভরবাবু পাল্কী চ’ড়ে চলেচেন সপ্তগ্রামে। ফাল্গুন মাস। কিন্তু এখনো খুব ঠাণ্ডা। কিছু আগে প্রায় সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হয়ে গেছে। বিশ্বম্ভরবাবুর গায়ে এক মোটা কম্বল। পাল্কীর সঙ্গে চলেচে তাঁর শম্ভু চাকর, হাতে এক লম্বা লাঠি। পাল্কীর ছাদে ওষুধের বাক্স, দড়ি দিয়ে বাঁধা। শম্ভুর গায়ে অদ্ভুত জোর। একবার কুম্ভীরার জঙ্গলে তাকে ভল্লুকে ধরেছিলো। সঙ্গে বন্দুক ছিল না, শুদ্ধ কেবল লাঠি নিয়ে ভল্লুকের সঙ্গে তার যুদ্ধ হলো।
শম্ভুর হাতের লাঠি খেয়ে ভল্লুকের মেরুদণ্ড গেল ভেঙ্গে। আর তার উত্থানশক্তি রইলো না। আর একবার শম্ভু বিশ্বম্ভরবাবুর সঙ্গে গিয়েছিল স্বর্ণগঞ্জে। সেখানে পদ্মানদীর চরে রান্না চড়াতে হবে। তখন গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন পদ্মার ধারে ছোটো ছোটো ঝাউগাছের জঙ্গল। উনান ধরানো চাই। দা নিয়ে শম্ভু ঝাউডাল কেটে আঁটি বাধলো। অসহ্য রৌদ্র। বড়ো তৃষ্ণা পেয়েছে। নদীতে শম্ভু জল খেতে গেল। এমন সময় দেখলে,একটা বাছুরকে ধরেছে কুমীরে। শম্ভু এক লম্ফে জলে পড়ে কুমীরের পিঠে চ’ড়ে বসল। দা দিয়ে তার গলায় পোঁচ দিতে লাগল। জল লাল হয়ে উঠল রক্তে। কুমীর যন্ত্রণায় বাছুরকে দিল ছেড়ে। শম্ভু সাঁতার দিয়ে ডাঙায় উঠে এলো। বিশ্বম্ভরবাবু ডাক্তার। রোগী দেখতে চলেছেন বহুদূরে। সেখানে ইষ্টিমার ঘাটের ইস্টেশন্-মাস্টার মধু বিশ্বাস, তাঁর ছোটো ছেলের অম্লশূল, বড়ো কষ্ট পাচ্ছে।
      বিষ্ণুপুরের পশ্চিম ধারের মাঠ প্রকাণ্ড। সেখানে যখন পাল্কী এল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাখাল গোরু নিয়ে চলেচে গোষ্ঠে ফিরে। বিশ্বম্ভরবাবু তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে বাপু, সপ্তগ্রাম কত দূরে বলতে পারো?"
      রাখাল বললে, “আজ্ঞে, সে তো সাত ক্রোশ হবে। আজ সেখানে যাবেন না। পথে ভীষ্মহাটের মাঠ, তার কাছে শ্মশান। সেখানে ডাকাতের ভয়।”
      ডাক্তার বললেন, “বাবা, রোগী কষ্ট পাচ্ছে, আমাকে যেতেই হবে।” তিল্পুনি খালের ধারে যখন পাল্কী এল, রাত্রি তখন দশটা। বাঁধন আল্‌গা হয়ে পাল্কীর ছাদ থেকে ডাক্তারের বাক্সটা গেল পড়ে। ক্যাস্টর অয়েলের শিশি ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল। বাক্সটা তো ফের শক্ত ক’রে বাঁধলে। কিন্তু আবার বিপদ। খাল পেরিয়ে আন্দাজ দু-ক্রোশ পথ গেছে এমন সময় মড়্‌ মড়্‌ ক’ড়ে ডাণ্ডা গেল ভেঙে, পাল্কীটা পড়ল মাটিতে। পাল্কী হালকা কাঠের তৈরী; বিশ্বম্ভরবাবুর দেহটি স্থূল।
      আর উপায় নাই, এইখানেই রাত্রি কাটাতে হবে। ডাক্তারবাবু ঘাসের উপর কম্বল পাতলেন, লণ্ঠনটি রাখলেন কাছে। শম্ভুকে নিয়ে গল্প করতে লাগলেন।
      এমন সময় বেহারাদের সর্দার বুদ্ধু এসে বললে, “ঐ-যে কারা আসছে, ওরা ডাকাত সন্দেহ নেই।”
      বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, “ভয় কী, তোরা তো সবাই আছিস।”
      বুদ্ধু বললে,”বল্গু পালিয়েছে,পল্লুকেও দেখছি নে। বক্সি লুকিয়েছে ঐ ঝোপের মধ্যে। ভয়ে বিষ্ণুর হাত-পা আড়ষ্ট।”
      শুনে ডাক্তার ভয়ে কম্পিত। ডাকলেন,”শম্ভু!”
      শম্ভু বললে, “আজ্ঞে!”
      ডাক্তার বললেন, “এখন উপায় কী?”
      শম্ভু বললে,”ভয় নেই, আমি আছি।”
      ডাক্তার বললেন, “ওরা-যে পাঁচ জন।”
      শম্ভু বললে, “আমি-যে শম্ভু।”
      এই ব’লে উঠে দাঁড়িয়ে একলম্ফ দিলে,গর্জন ক’রে বললে, “খবরদার!”
      ডাকাতরা অট্টহাস্য ক’রে এগিয়ে আসতে লাগল।
      তখন শম্ভু পাল্কীর সেই ভাঙা ডাণ্ডাখানা তুলে নিয়ে ওদের দিকে ছুঁড়ে মারলে। তারি এক ঘায়ে তিন জন একসঙ্গে প’ড়ে গেল। তার পরে শম্ভু লাঠি ঘুরিয়ে যেই ওদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো বাকি দুজনে দিল দৌড়।
      তখন ডাক্তারবাবু ডাকলেন,”শম্ভু!”
      শম্ভু বললে, “আজ্ঞে!”
      বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, “এইবার বাক্সটা বের করো।”
      শম্ভু বললে, “কেন, বাক্স নিয়ে কী হবে?
      ডাক্তার বললেন, ঐ তিনটে লোকের ডাক্তারী করা চাই। ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে হবে।”
      রাত্রি তখন অল্পই বাকী। বিশ্বম্ভরবাবু আর শম্ভু দুজনে মিলে তিন জনের শুশ্রূষা করলেন।
      সকাল হয়েছে। ছিন্ন মেঘের মধ্যে দিয়ে সূর্য্যের রশ্মি ফেটে পড়ছে। একে একে সব বেহারা ফিরে আসে। বল্গু এল, পল্লু এল, বক্সির হাত ধরে এল বিষ্ণু, তখনো তার হৃৎপিণ্ড কম্পমান।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য