বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ২৮তম উপাখ্যান

    পরদিন শশীকলা নামে আর একটি পুতুল বললো, শুনুন মহারাজ, পৃথিবী পরিক্রমা করতে বেরিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্য এক নগরে এসে উপস্থিত হলেন। সেই নগরের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে এক নদী। সেই নদীর তীরে নানা ফুল ও ফলে শোভিত এক বন ছিল। সেই বনের মধ্যে ছিল অতি মনোরম এক দেবমন্দির। রাজা সেই নদীতে স্নান করে দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে মন্দিরে বসলেন।
    এই সময় চারজন বিদেশী এসে রাজার কাছে বসল। রাজা তাদের কুশল জিজ্ঞাসা করে পরিচয় জানতে চাইলেন।
    একজন বললো, আমরা অপূর্ব এক দেশ থেকে আসছি।
    রাজা বললেন, সেই অপূর্ব দেশে কি কি দ্রষ্টব্য জিনিস আছে?
    সে বললে, সেই দেশে বেতালপুরী নামে একটি নগর আছে। সেখানে শোণিতপ্রিয়া নামে এক দেবতা আছেন। সেখানকার রাজা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের যাতে কোন অমঙ্গল না হয় তার জন্য প্রতি বৎসর একজন পুরুষকে সেই দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেয়। সেই নির্দিষ্ট দিনে যদি কোন বিদেশী সেই নগরে উপস্থিত হন তবে তাঁকেই দেবতার কাছে বলি দেওয়া হয়। আমরাও সেইরকম দিনে সেই নগরে ভুলক্রমে গিয়ে পড়ি। সেখানকার অধিবাসীরা আমাদের ধরতে এলেই আমরা কোনরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসি।
    এই কথা শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য বেতালপুরীতে উপস্থিত হলেন এবং দেবতাকে প্রণাম করে সেই মন্দিরে বসলেন।
সেই সময় একজন লোককে বন্দী করে বহু লোক বাজনা বাজিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হল।
    রাজা বিক্রমাদিত্য বুঝলেন, একেই আজ দেবতার কাছে বলি দেওয়া হবে ; তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, আমি আমার এই দেহ মায়ের পায়ে উংসর্গ করে একে বাঁচাব। এই দেহ খুব বেশী হলে একশত বৎসর থেকে তারপর তো বিনষ্ট হবেই।
    রাজা সেই প্রধান পুরুষদের বললেন, এই লোকটিকে দিয়ে আপনারা কি করবেন?
    তাঁরা বললেন, একে আমরা দেবতার কাছে বলি দেব। এই বলিদানের দ্বারা দেবী তুষ্ট হয়ে আমাদের মঙ্গল করবেন।
রাজা বললেন, এ ভয়ে কাতর এবং দেহও ক্ষীণ, এর দেহ বলি দিলে দেবী তুষ্ট হবেন না। একে ছেড়ে দিন, এর বিনিময়ে আমার শরীর দান করছি। আমার দেহ হৃষ্টপুষ্ট, আমার মাংস উপহার পেলে দেবী তুষ্ট হবেন। আমাকেই বলি দিন।
    এই কথা বলে সেই লোকটিকে মুক্ত করে দিয়ে রাজা নিজে সেই দেবীর সামনে উপস্থিত হয়ে যেমনি নিজের গলায় খড়্গাঘাত করতে উদ্যত হলেন অমনি দেবী সেই খড়গটি ধরে বললেন, তোমার পরোপকারিতা দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, বরপ্রার্থনা কর ।
    রাজা বললেন, হে দেবী, যদি আমার উপর প্রসন্ন হয়ে থাক তবে আজ থেকে নরবলি বন্ধ হোক।
    দেবী “তথাস্তু’ বলে অন্তধান করলেন। এরপর রাজা তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজ নগরে ফিরে এলেন।
    পুতুল বললো, মহারাজ, আপনি কি পরের জন্য এতটা চিন্তা করেন? যদি করেন তো সিংহাসনে বসুন।
    ভোজরাজ সরে দাঁড়ালেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য