বাঘের দেখা -- শিবশঙ্কর মিত্র

    চৈত্র মাসের নোনা-ফাট রোদ। কেওড়াগাছের ছায়ায় পাড়ার দুই দুরন্ত ছেলে আছের ও সোনা। বসে বসে কাঠি দিয়ে মাটিতে দাগ কাটছে আর এটা সেটা গল্প করছে। 
    বাঁধের ওপর তারা বসে। দুদিকে দীর্ঘ বাঁধ নদীর গা বেয়ে চলে গেছে। এই সেদিনও বাঁধ সবুজ নোনা ঘাসে ঢাকা ছিল। ফাগুনের পর চৈতের রোদে সেই সবুজ ঘাস যেন মরে কালসিটে হয়ে পড়ে আছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে মাটি ফেটে সাদা নোনা ফুটে উঠেছে। ঝলসান রোদে চকচক করছে।
    ওদের পেছন দিকে ফাঁকা বিরাট মাঠ। সেদিনও সোনার ফসলে ভরে গিয়েছিল। আজ থা থা করছে। ধান কেটে নিয়ে যাবার পর খড়ের গোছা সারা মাঠ ছেয়ে ছিল। গায়ের লোকেরা আগুন দিয়ে সে সব পুড়িয়ে মাঠ যেন কালো করে দিয়েছে। এ ছাই হয়ত আগামী সনে খুলনা জেলার এই আবাদ অঞ্চলে সোনা ফলাবে। কিন্তু আজ বাতাসের সঙ্গে উড়ে উড়ে খাঁ খাঁ রোদকে আরও রুক্ষ করে তুলেছে।
    সামনেই নদী! নোনা জলের নদী। তার পরেই বন। সুন্দরবন গাঢ় সবুজ বন। চৈতের রোদকে উপেক্ষা করেই যেন ঝরাপাতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নতুন সবুজ পাতায় সে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে।
    আছের ও সোনা বেশ জোরে জোরেই কথা বলছিল। কেউ শোনবার নেই। যেদিকে তাকাও কোথাও জনমানব নেই। দূরে ওদের পাড়ায় যে দু-একজন কাজকর্ম করছে তারই একটু আধটু খট্‌ খট্‌ শব্দ আসে। কেওড়া গাছের ওপর ডালে দুটো বাঁদর বসে এ ওর পিঠ খুটছে।
    আছের বেশ আশ্চর্য হয়েই বললে, ‘তুই কি বললি? 
    সোনা সোৎসাহে বললে, 'কেন ? আমি বুঝি বললাম না! বললাম—তোমার দেশে রেলগাড়ী আছে, আমার দেশে নৌকো আছে—বড় বড় পাল দেওয়া! তোমার দেশে তো বড় খেলার মাঠ আছে, আমার দেশে এর চেয়েও বড় মাঠ আছে—এপার ওপার দেখা যায় না।"
    আছের প্রায় ধমক দিয়ে উঠল, কেন, বলতে পারলি না—আমার দেশে সুন্দরবন আছে৷'
    —দুর, বোকা। বাদার কথা কি বলার মত। 
    সোনা গিয়েছিল তার বাজানের সঙ্গে খুলনায়। ওদের নায়েবের বাড়ী খুলনা শহরে। খুলনার কথা বলতে বলতে নায়েবের ছেলের সঙ্গে যেসব গল্প হয়েছিল ভারই কথা ওঠে। একটু থেমেই আছের বললে, ‘কেন ? তুই বুঝি বলতে পারলি না, বাঘের কথা ? আমাদের দেশে কত বড় বড় বাঘ আছে!’
    -- বাঘ! বাঘ তো দেখিনি! কী করে বলব? 
    — না, উনি দেখেননি। না দেখেছিস্ তো কি হয়েছে। বানিয়ে তো বলতে পারতিস্। এ —ই এ —ত বড় মুখ, গোল গোল চোখ। এত বড় হাঁ করে গফ করে কামড়ে দেয়। এক এক থাবায় আঠারটা মানুষের বল ...
    বলতে বলতে আছের তন্ময় হয়ে যায়। কাল্পনিক রেলগাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে সে যেন তাদের দেশের বাঘের গল্প করে শহরের ছেলেদের তাজ্জব বানিয়ে দিচ্ছে। সেই অবধি আছের মনে মনে ভেবে রেখেছে, যাবে সে একদিন চার জোয়ার আর চার ভাটির পথ ডিঙি বেয়ে খুলনা শহরে৷ রেলগাড়ীও দেখবে, বাঘের গল্পও করবে। কিন্তু তার আগে তাকে একবার বাঘ দেখে নিতেই হবে।
    বাঘ দেখে নিতে হবে বললেই কি আর তা হয়। সুন্দরবনে অনেক বাঘ আছে। অনেকে দেখেও। কিন্তু যে দেখে তাকে আর বন থেকে ফিরতে হয় না বোধহয় ।
    আছের ইতিমধ্যে অনেক বড় হয়ে গেছে। বেশ জোয়ানও হয়েছে। আছেরের বাবা নেই, মা ও নেই; থাকে চাচার বাড়ীতে। তাই ছেলেবেলা থেকেই তাকে থেটে খেতে হয়। কাজ করতেও সে ভালবাসে। যে কাজে গায়ের জোর লাগে সেই কাজ পেলে তো সে ছুটে এগিয়ে যায়, এত কাজ করে বলেই আছের আজকাল এমন জোয়ান হয়েছে।
    আছেরের চাচা গরীব চাষী। তাই ক্ষেত খামারের কাজে তার সংসার চলে না। প্রায়ই তাকে বনের ভেতরে যেতে হয়। কখনও মধু, কখনও কাঠ, কখনও বা গোলপাতা, কখনও আবার মাছ সংগ্রহ করে এনে বিক্রি করে। তাতেই সংসার খরচ চলে। অন্য কাজে না হলেও, কাঠ কাটবার সময় চাচা আছেরকে সঙ্গে নেবেই। বড় বড় গাছের গুড়ি টেনে এনে ডিঙি বোঝাই করার কাজে জোয়ান অাছের বেশ ওস্তাদ।
    কত বছরই তো বনে গেল আছের। কিন্তু বাঘ তার আর দেখা হয় না; বনে অন্য কাজে গেলে সকালে গিয়ে বিকেলেই ফেরা যায়। কিন্তু কাঠ কাটতে গেলে অনেক রাত, অনেক দিন বনেই কাটাতে হয়। চাচার বড় নৌকোও নেই, আর বড় নৌকো ভাড়া করার টাকাও নেই। তার ডিঙি খুবই ছোট। তা হলেও এই ডিঙি ভর্তি করার জন্যে গাছের গুড়ি কাটতে কোন কোন সময় সাত দিনও বনে কাটাতে হয় ওদেরকে। তবুও এত বছরের মধ্যে আছের একবারও বাঘ দেখতে পেল না।
    বাঘ দেখতে না পেলে কি হবে, বাঘের হাক-ডাক সর্বদাই আছে। রাতে ঘরে শুয়ে শুয়ে বাঘের ডাক শোনে। রাতে বনে ডিঙিতে শুয়ে মাঝ নদী থেকে তো আছের কত বাঘের ডাক শুনেছে। এই তো সেদিন এবাদুল মিঞার গোয়ালঘর থেকে একটা বাছুর বাঘে নিয়ে গেল। গরুগুলো আর্তনাদ করে উঠল। সমস্ত বাড়ী থেকে ওরা টিন বাজিয়ে শব্দ করতে থাকে। তখন আছের ঘরের ফাঁক দিয়ে বাঘ দেখবার চেষ্টা করেও কিছুই দেখতে পায় নি। পরদিন খুঁজে দেখে আছেরের বাড়ীর অল্প দূরেই নদীর ধারে শুধু চারখানা খুর পড়ে আছে বাছুরটার।
    সেবার বনে যাবার তোড়জোড় করে চাচা আছেরকে বললে, ’চল, কাঠ কেটে আনি। যাবি তো ?’
    আছের বললে, যাব তো। কিন্তু চাচা, তোমার শুধুই বড়াই করা সার। একবারও তো বাঘ দেখাতে পারলে না।”
    —-না! এবার তোকে বাঘ দেখাবই। কিন্তু ভাল ভাল কাঠ কাটতে হবে। পাঁচ দিনের মধ্যে ডিঙি বোঝাই করলে তবে বাঘ দেখব।
    আছের এখন সংসারী। অনেক বড় হয়ে গেছে। তবু বাঘের গল্প শুনলে সে যেন ছেলেমানুষের মত হয়ে উঠে। বাঘ দেখে সে খুলনায় গিয়ে বাঘের গল্প করে--এই ইচ্ছেটা আজও তার মনের মধ্যে চেপে বসে আছে।
    গভীর সুন্দরবন। পাহাড়ী বনের মত জংলা নয়। পরিষ্কার ঝকঝকে। নোনামাটিত যেন আগাছা বেশি জমতে দেয় না। আবার পাহাড়ী বনের মত গুরুগম্ভীর নয়। চারদিকে নদী-নাল বেয়ে স্রোতের ধারা তরতর করে অনবরতই ছুটে চলেছে-কখনও বা জোয়ারের টানে, কখনও আবার ভাটির টানে যেন জীবন্ত এই বন।
    অসংখ্য নদী ; বড় নদী ছেড়ে ছোট নদীতে পড়া যায়। আবার ছোট নদী ছেড়ে খালে পড়া যায়। তারপরও খাল ছেড়ে ‘শিষে’ ধরে বনের গভীরতম স্থানে ডিঙি হাজির হবে। শিষেগুলো খবুই সরু। মাত্র সাত-আট হাত চওড়া জোয়ারের সময় কানায় কানায় জলে ভরে যায়, আবার ভাটির সময় ক্ষীণ ধারা নরম পলিমাটির চরের ওপর ঝিরঝির করে বয়ে চলে।
    এমন একটা শিষের মুখে আছেরের ডিঙি বাধা ছিল। দুপুর গড়িয়ে গেছে। শেষ গাছের গুঁড়ি ডিঙিতে তোলবার পরই চাচা বললেন, না, থাক আছের, আর দরকার নেই। আর ক’খানাই বা কাঠ ধরবে। তার জন্যে আরও একদিন দেরি করে লাভ কি! চল্‌, আজ চলে যাই।
    ‘–তা যা বলেছ, চাচা। কিন্তু তুমি যা বলেছিলে তার কি হবে? 
    ‘—কি বলেছিলাম ? 
    —বাঃ, ভুলে গেছ বাঘ দেখাবে বলেছিলে।’ 
    —হবে, হবে। চল, যাবার পথে হবে। আজ পূর্ণিমা। আজ বন থেকে বাঘ ঘুরবেই ঘুরবে। '
    দু'জনে মিলে ঠিক করল, আজই জোয়ারে বাড়ী যাবে। তবে জোয়ারের এখনও দেরি আছে যাওয়া ঠিক করলেও আছেরের মন খুঁৎ খুঁৎ করছিল। এখনও তো দু-একখানা গুড়ি ডিঙিতে ধরবে। চাচাকে ডেকে বললে, "এক কাজ কর, তুমি গোসল করে ভাত চাপিয়ে দাও। আমি ততক্ষণে দেখি-আরও কিছু কাঠ আনতে পারি কিনা। কাছেই যাব, তোমার চিন্তা নেই ।’
    চাচার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আছের কুড়াল খানা নিয়ে এগিয়ে চলল। শিষেতে তখন জল নেই বললেই হয়, শিষে ধরেই এগিয়ে চলেছে সে। পরিখার মত শিষেটা বেশ গভীর। নীচুতে দাঁড়ালে ওপর থেকে আছেরের মাথা দেখা যায়, কি যায় না। তলদেশ পাঁচ ছ'হাত চওড়া, জল সামান্য থাকলে কি হবে, খাদে ভীষণ কাদা। পলিমাটির কাদা। চোরাবালির মত এতে পা চেপে দিলে কোমর পর্যন্ত সড় সড় করে দেবে যাবে। এঁটেল মাটি। একবার পা বসে গেলে যেন কামড়ে টেনে ধরে রাখে।
    আছের এই কাদাকে এড়িয়ে প্রায় পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে শিষে ধরে এগিয়ে চলছে। কিছুদূর এগিয়ে একবার পেছন ফিরে দেখল, চাচা কানে আঙুল দিয়ে ঝুপ ঝুপ করে খালের জলে ডুব দিচ্ছে। কামটের ভয়ে কয়েকটা ডুব দিয়েই নৌকোয় উঠে পড়ল এবার।
    শিষের ভেতর দাঁড়িয়ে আছের দু'দিকের গাছ দেখবার চেষ্টা করে। না-ভাল দেখা যায় না। সামনেই শিষে একটা বাঁক নিয়েছে। তাও এবার পেরিয়ে গেল। না, এমন করে হয় না। ওপরে উঠতেই হবে। নিশ্চয় এখানে ভাল খুঁটির গাছ পাওয়া যাবে।
    পাড়ের মাটিতে বুক লাগিয়ে একটা গাছের শেকড় ধরে টেনে হিঁচড়ে ওপরে উঠল সে। উঠে গাছ দেখবে কি, নজরে পড়ল দুটো বড় বড় চোথ—গাছের গুড়ির আড়ালে আড়ালে জ্বল জ্বল করছে। ওর দিকেই তীক্ষ দৃষ্টি! এটা কি কোন জন্তু? বাঘ? না! বাঘ হবে এই এতবড় জন্তু-চার পায়ে দাঁড়িয়ে ফুলতে থাকবে! হলদে কালে ডোর থাকবে তার গায়ে। কিন্তু এ যে কালো মত জন্তু, লম্বা হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে আছে। বাঘ হলে তো বীর বিক্রমে গা গাঁ করে হেঁকে উঠবে। এ তে নিঃশব্দে পড়ে আছে। না-এ বাঘ নয়। কিন্তু কী তীক্ষ দৃষ্টি-কী হিংস্ৰ চাহনি!
    আছের যেন অবশ হয়ে আসছে। সে চীৎকার করে উঠল, চাচা। এটা কি জন্তু! চা-- চা! এটা কী...
    কিন্তু অবকাশ দিল না আছেরকে আর সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ছোট হলে কি হবে, হিংস্র গর্জনে ঝাপিয়ে পড়ল আছেরের ওপরে।
    আত্মরক্ষার জন্যে আছের কুড়াল বাগিয়েছিল। কুড়ালের আঘাত উপেক্ষা করেই বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুড়াল ছিটকে পড়ে গেল। থাবা মারল বা কাঁধ লক্ষ্য করে। আছের কাঁধ সরাবার চেষ্টা করতেই নখের আঁচড়ে বা দিকের বাহুর কিছুটা মাংস উঠে এল।
    আছেরের ডাক শুনতে না শুনতেই বাঘেৱ হুংকারে ব্যাপার বুঝতে দেরি হল না তার চাচার। কোনও উপায় নেই । কি-ই বা সে করবে! করবার কিছু নেই তার। দ্রুত ডিঙির বাঁধন খুলে দিয়ে বড় নদীতে পড়তেই চাইল ; মুখে একবার শুধু বললে, চেয়েছিলি বাঘ দেখতে, দেখলি তো বাঘ!'
    কিছুক্ষণ থেমে থেকে দাঁতে দাঁত কামড়ে চাচা আবার বললে, সাধ মিটেছে! বাঘ দেখার সাধ মিটেছে হতভাগা!'
    বাঘ দু'পায়ে দাঁড়িয়ে থাবা মারতেই আছের পড়ে গেল। ঠিক শিষের পাড়েই ছিল। পড়ে গেল সে শিষের ভেতর। কোন মতে একটা গাছের শেকড় ধরে টাল সামলে দাঁড়িয়ে গেছে শিষের পাড় ঘেঁষে।
    আছের পড়ে যেতেই বাঘ দু'পায়ে দাঁড়িয়ে টল সামলাতে পারল না। পড়ল শিষের ভেতর গড়িয়ে; পলিমাটির কাদায়। চটাং করে চার পায়ে লাফ দিয়ে উঠতে গিয়ে চার পাই দেবে গেল তার পলিমাটির চোরা কাদায়। যত জোর দেয় ততই যেন দেবে যেতে থাকে বাঘের দেহটা।
    আছের এবার হিংস্র হয়ে ওঠে। না, ওকে উঠতে দেওয়া হবে না, উঠলেই আমাকে ও শেষ করবে। ঝাঁপিয়ে পড়ল সে এবারে বাঘের ওর। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাঘটাকে চেপে ঠেসে দিতে লাগল কাদার ভেতরে।
    বাঘ তবু ঘাড় বাকিয়ে কামড়াতে চায়। বেপরোয়া হয়ে আছের ওর ঘাড়ের ওপর হিংস্রভাবে কামড়ে ধরল। এ যেন আছেরের মরণ কামড়। বাঘের চামড়া ভেদ করে মাংস ভেদ করে যায় আছরের হিংস্ৰ দাঁত।
    শিষেতে ঝির ঝির করে লোনা জল বয়ে চলেছে। ঘাড় পর্যন্ত দেবে গেছে বাঘের । লোনা জল চোখে নাকে আর মুখে চুকে দম আটকে আসতে থাকে। আছের পিঠের ওপর চড়ে আছে। এবার ওর মাথা চেপে দিতে থাকে জলে ও কাদায়।
    আছের অনুভব করে, বাঘের পিঠে আর জোর নেই। পিঠ দুমড়াবার চেষ্টা করে না। দম আটকে বাঘ এতক্ষণে মারা গেল।
    তবু পিঠ ছেড়ে উঠতে সাহস হয় না। বিশ্বাস নেই ওকে। বাঘের লেজটা তখনও উঁচু হয়ে আছে কাদার ওপর। লেজের কালো-হলদে ডোরা দেখে আছেরের হাসি পায়। সে চীৎকার করে বললে, “বাঘ।
    আছেরের মত্তত এবারে থেমেছে । মনে পড়ল--চাচা! চীৎকার করে ডেকে উঠল, ‘চা-- চা? --চা--চা!
    কোনও সাড়া নেই।
    না। আর দেরি করলে হবে না। সন্ধ্যেও হয়ে আসছে। লেজটা শক্ত মুঠোয় ধরে লাফ দিল আছের। বাঘের পিঠের ওপরে দাঁড়িয়েই লাফ দিয়ে তীরের কাছে এল। লেজ ধরে উল্টে দিকে টানতে টানতে গোটা লাশট টেনে তুলল। জলের ওপর ভাসিয়ে নিয়ে লেজ ধরে টানতে টানতেই খালের মুখে হাজির হল এবারের সে। চাচা নেই চলল আবার খালের ধারে, নদীর মুখে।
    মাঝে মাঝে চীৎকার করে ডাকে—‘চা-চা, চা—চা। নিঃসঙ্গ নিঝুম বনে কেবল প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে তার ডাক, চাচার ডাক সে শুনতে পায় না তবু ।
    জোয়ার তখনও আসেনি। চাচা নদীতে বে’গোনে বেশীদূর এগোতে পারেনি। নদীর মুখে আসতেই ডিঙি দেখা গেল। আছেরের গলা শুনেই চাচা দ্রুত নৌকো বেয়ে এল।
    চাচা স্তম্ভিত। লজ্জায় সে যেন মাথা উঁচু করতে পারে না। লজ্জা ঢাকবার জন্যে বললে, তুই বেঁচে আছিস! আয় আয়, বেঁচে আছিস্ ! এ কি বীভৎস চেহারা ; ওকি, তোর মুখে কি?"
    এতক্ষণে আছেরের খেয়াল হল—তার দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে বাঘের গায়ের লোম বিঁধে বিঁধে রয়েছে। ঠোঁট ফুলে গেছে। ফোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গোছা গোছা লোম বেরিয়ে আছে। বীভৎস চেহারা। মুখ ফুলে গেছে। সারা গায়ে মুখে ক্ষতচিহ্ন বাঁ হাতের ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। সেদিকে যেন তার ক্রক্ষেপ নেই। লেজ ধরে টেনে বাঘের দেহ খানিকটা উঁচু করে বললে, চাচা, দেখ। দেখেছ ? আমি বাঘ দেখেছি। তুমি রেলগাড়ী দেখেছ? আমি বাঘ দেখেছি।"
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য