নীল পদ্মরাগ [দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ব্লু কারবাঙ্কল]- ৪র্থ অংশ

   “ল্যাংটোবেলা থেকে হাঁস বেচছি, মশাই। আপনি আমাকে হাঁস চেনাচ্ছেন? আমি বলছি, আলফায় যে হাঁসগুলো বেচেছি, সেগুলো শহুরে হাঁস।”
   “তুমি বললেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
   “তাহলে বাজি রাখুন।”
  “মিছিমিছি অর্থব্যয় করবেন। আমি জানি আমি যা বলছি তা ঠিক। এক সভারেন[§§] বাজি রইল; শুধু ওই বাজে তক্কো করার জন্য আপনাকে শিক্ষে দেওয়ার জন্যে।” তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে দোকানদার বলল, “বিল, বইগুলো আমাকে এনে দে তো রে।”
   ছোটো ছেলেটা একটা ছোটো মোটা বই আর একটা বেশ বড়ো চকচকে মলাটের বই আনল। দুটো বইই একসঙ্গে ঝুলন্ত বাতির নিচে রাখা হল।
   হাঁসওয়ালা বলল, “এই যে হাঁসবিশেষজ্ঞ মশাই। ভেবেছিলাম আমার সব হাঁস বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু না, এখনও একটা আছে। এই ছোটো খাতাটা দেখুন।”
   “দেখলাম। তাতে হলটা কী?”
  “এটা হল আমি যাদের থেকে হাঁস কিনি তাদের নামের তালিকা। দেখেছেন? আচ্ছা, এবার দেখুন, এই পাতাটা পাড়াগেঁয়ে হাঁসের মালিকদের তালিকা। নামের পাশে যে নম্বর দেখছেন সেগুলো বড়ো লেজার বইয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট নম্বর। এবার দেখুন। অন্য পাতায় লাল কালিতে কী লেখা আছে? এই হল আমার শহরের সরবরাহকারীদের তালিকা।এবার, তিন নম্বর নামটা পড়ুন। পড়ুন পড়ুন, আমাকে পড়ে শোনান।”
   হোমস পড়ল, “মিসেস ওকশট, ১১৭, ব্রিক্সটন রোড–২৪৯।”
  “হ্যাঁ, ঠিক। এবার লেজারের পাতায় যান।”
  হোমস নির্দিষ্ট পাতাটি খুলল, “এই যে এখানে, ‘মিসেস ওকশট, ১১৭ ব্রিক্সটন রোড, ডিম ও পোলট্রি সরবরাহকারী।”
  “শেষ লাইনটায় কী লেখা আছে?”
  “‘২২শে ডিসেম্বর। সাত শিলিং ছয় পেন্স দরে ২৪টি হাঁস।’”
  “ঠিক। এবার, নিচে দেখুন। কী লেখা আছে?”
  “‘আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের নিকট ১২ শিলিং দরে বিক্রীত হইয়াছে।’”
  “এবার কী বলবেন?”
 শার্লক হোমস মুখখানি ব্যাজার করল। তারপর পকেট থেকে এক সভারেন বের করে স্ল্যাবের উপর ছুঁড়ে দিয়ে মহাবিরক্তির ভাব দেখিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। কয়েক ইয়ার্ড দূরে এসে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মুখে কোনো শব্দ না করে হেসে উঠল।
   বলল, “এই রকম গোঁফ আর পকেট থেকে গোলাপি খাতা উঁকি দিচ্ছে দেখলেই বুঝবে, একে বাজি দিয়েই টোপ গেলাতে পারবে। ওকে একশো পাউন্ড দিলেও এত কিছু বলত কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্যাখো, একটা বাজির টোপ ফেলে কত সহজেই ওর পেট থেকে সব বের করে নেওয়া গেল। যাই হোক, ওয়াটসন, মনে হচ্ছে আমরা আমাদের অনুসন্ধানের শেষ পর্বে এসে পৌঁছে গেছি। এখন ভাবতে হবে, মিসেস ওকশটের কাছে আজ রাতেই যাওয়া উচিত না কাল যাবো। নিঃসন্দেহে যা বুঝলাম, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ছাড়াও আরও কেউ উৎসাহিত। আমার উচিত…”
   তার কথা চাপা দিয়ে হঠাৎ দূরে একটা উচ্চ কোলাহল উঠল। যে দোকানটা থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে এলাম সেই দোকানটার থেকেই। পিছন ফিরে দেখি একটা বেঁটেখাটো ইঁদুরমুখো লোক ঝুলন্ত আলোর বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওই হাঁসওয়ালা ব্রেকিনরিজ রাগতমুখে দোকানের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে কী সব বলছে।
তার চিৎকার কানে আসছিল, “যথেষ্ট হয়েছে তোমার আর তোমার হাঁস। চুলোর দোরে যাও গে। ফের যদি ফালতু বকতে আসো তবে তোমার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেবো। মিসেস ওকশটকে এখানে নিয়ে এসো, যা বলার তাঁকেই বলব। তোমার কাছে কেন জবাবদিহি করব হে? তোমার থেকে হাঁস কিনেছিলাম নাকি?”
   লোকটা কুঁই কুঁই করতে করতে বলল, “না, কিন্তু ওগুলোর একটা যে আমার ছিল।”
   “তাহলে মিসেস ওকশটকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও।”
   “উনি আমাকে বললেন তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে।”
   “তাহলে প্রুশিয়ার রাজাকে জিজ্ঞাসা করো গে যাও। যত্তো সব! যথেষ্ট হয়েছে। এবার বেরোও এখান থেকে।” এই বলে দোকানি রীতিমতো ঘাড়ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে বের করে দিল। লোকটাও অন্ধকারে মিশে গেল।
   হোমস ফিসফিসিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে, আর ব্রিক্সটন রোডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওয়াটসন, আমার সঙ্গে এসো। এই লোকটার পিছু নেওয়া যাক।” বাজারের লোকজনের ভিড় ঠেকে হোমস এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যে লোকটাকে ধরেও ফেলল। কাঁধে হাত রাখতেই লোকটা পিছন ফিরে তাকালো। গ্যাসের আলোয় দেখলাম, ভয়ে লোকটার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
   সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে আপনারা? কী চান?”
   হোমস মৃদুস্বরে বলল, “মাপ করবেন, কিন্তু আপনার সঙ্গে ওই দোকানির বাক্যালাপ আমার কানে এসেছে। মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনাকে কিছু সাহায্য করতে পারি।”
   “আপনি? আপনি কে? এই ব্যাপারে আপনি কী জানেন?”
   “আমার নাম শার্লক হোমস। আমার কাজই হল অন্যেরা যে খবর রাখে না, সেই খবরটি রাখা।”
   “কিন্তু আপনি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।”
   “আজ্ঞে না, আমি সবই জানি। ব্রিক্সটন রোডের মিসেস ওকশট ব্রেকিনরিজ নামে এক দোকানিকে কয়েকটা হাঁস বেচেছিলেন। সেই হাঁসগুলি ব্রেকেনরিজ বেচে দেয় আলফার মিস্টার উইন্ডিগেটের কাছে। উইন্ডিগেট তার ক্লাব সদস্য মিস্টার হেনরি বেকারকে সেই হাঁস বিক্রি করে। এই হাঁসটাকেই তো তুমি খুঁজছ?”
   লোকটা তার দুই হাত আর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মশাই, আপনার মতো একজনকেই তো খুঁজছিলাম। আপনি ভাবতেও পারবেন না, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমার জীবনমরণ সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।”
একটা চার-চাকার গাড়ি যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। সেটাকে দাঁড় করিয়ে হোমস বলল, “তাহলে চলুন কোথাও একটা গিয়ে আরামসে আলোচনা করা যাক। এই বাজারে বড্ড চিৎকার চ্যাঁচামেচি। কিন্তু সবার আগে–আপনার নামটা তো জানা হল না।”
   লোকটা খানিক ইতস্তত করে শেষে অন্য দিকে মুখ করে বলল, “আমার নাম জন রবিনসন।”
   হোমস মিষ্টি গলায় বলল, “না না, আপনার আসল নামটা বলুন। বেনামিদের সঙ্গে কাজ করা বড়ো অসুবিধাজনক।”
লোকটা সাদা গালদুটো লাল হয়ে এল। সে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার আসল নাম হল জেমস রাইডার।”
   “ভাল! তার মানে আপনিই হোটেল কসমোপলিটনের প্রধান পরিচারক। দয়া করে এই ক্যাবটিতে[***] উঠুন। যা জানতে চাইছেন, তার সবই আমার কাছে শুনবেন।”
   লোকটা একবার আমার দিকে একবার হোমসের দিকে আধা-ভয় আধা-আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল না যে, তার কপালে লাভ না লোকসান লেখা আছে। দোনোমোনো করতে করতেই সে ক্যাবে উঠল। আধঘণ্টায় আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের বেকার স্ট্রিটের বৈঠকখানায়। লোকটা গাড়িতে কিছুই বলল না। তবে তার ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর হাত কচলানি থেকে বুঝতে পারছিলাম যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে।
   ঘরে ঢুকে হোমস হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, এসে গেছি বাড়ি। বেশ সুন্দর আগুন জ্বলছে। মিস্টার রাইডার, আপনি দেখি শীতে কাঁপছেন। আসুন, এই বেতের চেয়ারটায় বসুন। আমি ঘরের জুতোটা পরে আসি। তারপর আপনার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, এইবার! আপনি জানতে চাইছিলেন না, ওই হাঁসগুলোর কী হয়েছে?”
   “হ্যাঁ, মশায়।”
   “অথবা, আমার যতদূর ধারণা, তার মধ্যে একটি হাঁস সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। ওই যে হাঁসটার লেজের দিকে কালো ডোরা দাগ আর বাকিটা পুরো সাদা, সেইটা।”
   রাইডার উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, মশায়! বলতে পারেন ওটা কোথায় গেছে?”
   “ওটা এখানে এসেছিল।”
   “এখানে?”
   “হ্যাঁ, আশ্চর্য সেই হাঁস, বুঝলেন মশাই। সত্যিই আপনি ওটার প্রতি আগ্রহ না দেখালেই অবাক হতুম। সেই মরা হাঁস একটা ডিমও পেরেছিল। ছোট্ট একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ডিম। এমন ডিম কখনও দেখিনি। সেটা আমি আমার মিউজিয়ামে রেখে দিয়েছি।”
   লোকটা পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে ডান হাত দিয়ে ম্যান্টলপিসটা[†††] ধরে সামলে নিল। হোমস তার স্ট্রংবক্সের ডালা খুলল। তারপর নীল পদ্মরাগটা বের করে ধরল। জিনিসটা একটা তারার মতো চকচক করছিল। একটা অদ্ভুত সুন্দর শীতল বহুকোণী আলো ঠিকরে পড়ছিল ওটা থেকে। রাইডার শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না, ওটা দাবি করাটা ঠিক হবে কিনা।
   হোমস শান্তভাবে বলল, “তোমার খেলা শেষ, রাইডার। না না, ধরে দাঁড়াও। নইলে পিছনের আগুনে পড়ে যাবে। ওয়াটসন, ওকে চেয়ারটায় বসিয়ে দাও। অপরাধ করতে যেরকম কলজের জোর লাগে তা ওর নেই। আর এক গ্লাস ব্র্যান্ডি খাইয়ে দাও। হ্যাঁ! এবার ওকে মানুষের মতো দেখাচ্ছে বটে। একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে গিয়েছিল!”
   সে খানিকক্ষণ টলতে লাগল। যেন পড়ে যাবে। ব্র্যান্ডি খেয়ে গালের রংটা একটু ফিরল। তারপর বসে হোমসের দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে রইল।
   “আমার কাছে প্রায় সব তথ্য আর প্রমাণই আছে। তাই তোমাকে বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু কয়েকটা কথা জানলেই আমার সব জানা পূর্ণ হবে। রাইডার, তুমি কী এই নীল পাথরটার কথা কাউন্টেস অফ মোরকারের কাছ থেকে শুনেছিলে?”
   লোকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “ক্যাথরিন কসাক আমাকে ওটার কথা বলে।”
   “ও! মাননীয়া কাউন্টেসের খাস-পরিচারিকা। আর শুনেই হঠাৎ-বড়োলোক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলে। যাক, এমন লোভ অনেক ভাল মানুষও সামলাতে পারে না, তুমি তো কোন ছার। তবে, রাইডার, তুমিও ভালমানুষ নও। যাকে বলে একখানি ছিঁচকে চোর। তুমি জানতে, হরনার নামে ওই কলের মিস্ত্রিটার নামে আগেও একটা কেলেঙ্কারি আছে। আই তার দিকেই সবার সন্দেহ টানতে কষ্ট হবে না। তারপর কী করলে? তুমি আর তোমার এই সহচরীটি মিলে কাউন্টেসের ঘরে গ্যাঁড়াকল করে রাখলে যাতে লোকটাকে ডাকতে হয়। তারপর সে চলে গেলে, তুমি গয়নার বাক্স থেকে গয়নাটা সরালে। তারপর অ্যালার্ম বেল বাজালে আর ওই বেচারাকে গ্রেফতার হতে হল। তারপর তুমি…”
   হঠাৎ রাইডার চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে গেল। তারপর হোমসের পা জড়িয়ে ধরল, কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ভগবানের দোহাই, দয়া করুন! আমার বাবা-মার কথা ভাবুন। ওঁরা জানতে পারলে একেবারে ভেঙে পড়বে। আমি আগে কখনও এমন কাজ করিনি। কোনোদিন করব না। প্রতিজ্ঞা করছি। বাইবেলের দিব্যি। দয়া করে আমাকে আদালতে নিয়ে যাবেন না। খ্রিস্টের দোহাই, নিয়ে যাবেন না।”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য