পায়রা নদীর ওপারে চলন্ত ভুতের খপ্পরে -- রাবেয়া খাতুন

    কলেজ ছুটি। কোথায যাবে, কোথায যাবে, কোথায় যাবে ভাবছে ওরা তিনজন। কাঞ্চন, বাউল, সুমন। তিন বন্ধু। লম্বা বন্ধ হলেই কোথাও যাবার জন্য মন কেমন কেমন করে। যায়ও। দেশ, বিদেশ, গ্রাম-গঞ্জ-বন্দর। এবার কোথায় যাবে ভাবছে যখন, আচমকা ঘটল এক ঘটনা।
    বাউলদের বাড়িতে দেশ থেকে বেড়াতে এসেছেন সম্পর্কিত এক চাচা ।
    বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ তোমরা? 
    চাচা খুব দুঃখি দুঃখি মুখে জবাব দিলেন, ভালো নয়। 
    কেন খরা গেল, বন্যা গেল এখন তো খারাপ থাকার কথা নয় |
    তা নয়, তা নয় মিয়া বাই! দেশের অবস্থা জব্বর খারাপ।
   মাথা ঝাকাতে বাকাতে চাচা বললেন, জল বন্যা কোম্ ছর। আমাদের পায়রা গ্রাম পড়েছে তার চেয়েও ভয়ংকর অবস্থার বিপাকে। রোজ রাতে অন্ধকার হলে ভূতেরা নেচে বেড়াচ্ছে পথেঘাটে !
    সে কী? এ যুগে ভূত?
   ভূতপ্রেত, জিন, দেও কিংবা আধুনিক সময়ের ভিন্ন গ্রহের প্রাণী যে নামেই ডাকুন তারা আমাদের গ্রামকে গরাদ বানিয়ে ছাড়ছে। আর শোনার দরকার হয়নি। খবরটা এখনে সংবাদপত্রে ওঠে নি। সুতরাং রহস্যের খোলস এখনো ভাঙে নি। কোনো সাংবাদিক পৌছে যাবার আগেই, তারা যাবে।
    উদঘাদন করবে প্রকৃত বিষয়। বাউল খুব অল্পতেই উত্তেজিত হয়। ওটাই ওর স্বভাব। মোটামুটি কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, পায়রা নদীর পারে পায়রা গ্রাম। নামটাই যে টানছে। 
    চাচা চোখ বড় বড় করে বলল, ভুলেও যেন ও দিকটায় পা বাড়াতে যেওনা বাবারা। দারুণরাগী ভূত। বাইরে থেকে গিয়েছ শুনলে আগে তোমাদেরই ঘাড় মটকাবে।
    বাউল জবাব দিল, কে কার ঘাড় মাটকায় দেখা যাবে চাচা। 
    চাচা অবাক চোখে দেখলেন। এ ব্যাপারে বাউলের পরিবার থেকে কোনো আপত্তিই উঠল না। ওরা ব্যাগ কাঁধে ফেলে দিব্যি তৈরি। জিনসের প্যান্ট, গেঞ্জি, কেডস, কোমরে বাম ব্যাগ। রোমাঞ্চকর উপন্যাসের জলজ্যান্ত নায়ক যেন। এসব ক্ষেত্রে নেতার ভূমিকা আপন থেকেই কাঞ্চনের ওপর এসে যায়। স্বভাবটা একটু রুখাশুখা। কিন্তু বুদ্ধিতে সবার চেয়ে ধারালো। জ্ঞানবিজ্ঞানে তুলনামূলকভাবে তুখোড়। কথাবার্তা কম বলে কিন্তু কাজে এগোয় নিঃশব্দে। যেমন পায়রা গ্রামটা কোথায়? তার ইতিহাস, ভূগোল, স্থানীয়জনদের শিক্ষাদীক্ষা, বিশ্বাস-মোটামুটি সব খবরই নেওয়া হয়ে গেছে এই একটি বেলায়। ঢাকা থেকে মাত্র বিশ মাইলের দূরত্ব। বাসরুট আছে। নদী পারাপার। গ্রামে বিদ্যুৎ যায় নি এখনো। ঝিলে-বিলে, ফল-ফুলের বাগানে, পাখপাখালির ডাকে একেবারে পাড়াগ্রাম পাড়াগ্রাম চেহারা। সুমন তো বলেই ফেলল, একেবারে ছবির মতো।
    বাতাসে ম ম সুবাস। কোথায় কী যেন ফুটেছে। ঋতু অনুযায়ী ছাতিম,স্বর্ণচাঁপা, কদম, কেয়া,হাসনাহেনারও হতে পারে।
    মাঠে কিশোররা খুশিতে কাছ মেরে হা-ডু-ডু খেলছে। একরকম ড্রেস তিনটি ফিটফাট তরুণকে দেখে এক পলক ওরা যেন দাঁড়িয়ে গেল। এরাও তেমনি। মল্লিক বাড়ির নাম বলতে একটি বালক তো নাচতে নাচতে পথ দেখিয়ে চলল। এক ফাঁকে শুধাল, ও বাড়ির নানতাকে ভূতে ধরেছে। আপনার যাবেন ঐ ভূতের বাড়িতে।
    বাউল যথেষ্ট গাম্ভীর্য দেখিয়ে বলল, ওটা ভূতের নয় আমার দিলু চাচার বাড়ি। তো নোনতাটা কে?
   জবাবে বালকটি জিভ কেটে বলল, ওর আসল নাম নোমান। খুব বদমেজাজী বলে আমরা ঐ নামে ডাকি। সে ঐ বাড়িরই ছেলে ।
    সন্ধ্যা হয় হয়। আম জাম বাঁশ বনের ফাঁকে ফাঁকে কুপি আর হারিকেনের আলো। কিন্তু মল্লিক বাড়ির উঠানের জামরুল গাছে জুলছে হেজাক বাতি। বার বাড়ির সিঁড়িতে কারা অপেক্ষা করছিল। ওদের তিনজনকে দেখে খুবই হতাশ। তারা লৌহজঙের নন্দু ফকিরের আশায় আছে। তার ঝাড়ফুঁকে ভূত জিন কি ওদের বাপদাদারাও পালায়।
    তবে ঢাকার মেহমান জেনে আদর-আপ্যায়নে ঘাটতি কিছু হলো না। ফকিরও এল যথাসময়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে টকটকে লাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা নোনতাকে ধমক দিয়ে প্রশ্ন করল, কী রে কী দেখছিস?
    নোনতা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, কী ভয়ংকর কী ভয়ংকর। হাতে টর্চ বুকে টর্চ। সেগুলো শুধু আমার দিকেই মারছে। বুঝেছি শয়তানের বাতি। গোরস্তানের ভূত। তুই ওখানে কী করতে গেছিলি ?
    আমি...
     নোনতা হেলাভোলা তাকিয়ে বলল, আমার মনে নেই। 
   না থাকলে হবে না। মনে কর। নইলে তোকে হলুদ পোড়া গন্ধে কষ্ট দেব। ঝাড়ুপেটা করব। গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখব।
    ওরে দাদারে ওরে বাবারে তবে তো মরে যাব। ওঝা সাহেব মনে পড়েছে, আমি ইচ্ছে করে যাই নি। টর্চ হাতে ভূত আমায় ডাকছিল। যেতেই কবজ করে ফেলল। বাপরে আমি আর ছুটতে পারছি না।
    বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল নোনতা। আবার আসব বলে ওঝা বিদায় হয়ে গেল তখনকার মতো।
    একটু পর নোনতার জ্ঞান হলে কাঞ্চন ওর কাছে গিয়ে খুব নরম গলায় বলল, তুমি এখন কেমন আছ নোমান।
    নোনতা বড় বড় চোখে তাকাল—আপনারা! সম্পর্কে তোমার ভাই হই। তোমায় দেখতে এসেছি। এখন বল তো যে ভূতটা তোমায় কবজ করেছে বলে ভাবছ সেটা দেখতে কেমন?
    পুরোটা তো দেখি নি। ওর হাতে হাই পাওয়ারের টর্চ। তবে ওর একটা খেতাব আছে শুনেছি, বিজলি বাদশা।

    নোনতা থামতে বাউলের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ভারি মজার নাম তো। এ যাবৎ মিসরের ফারাও,বাগদাদের খলিফা, পেরুর ইনকা, রাশিয়ার জার, জার্মানির কাইজার, আবিসিনিয়ার নেগাস,জাপানের মিকাড়ো,আফগানিস্তানের আমির,পারস্যের শাহ-এর খেতাব শুনেছি। কিন্তু বিজলি বাদশা--
    ওকে প্রায় ধমক দিয়ে কাঞ্চন বলল, তুই থাম তো। হতেই পারে। এ পৃথিবীর কতটুকুই বা আমরা জানি। হ্যা ভাই নোমান, বিজলি বাদশার টর্চ কি থেমে থেমে জ্বলে, না জ্বলতেই থাকে?
    জ্বি না, থেমে থেমে জ্বলে। ওহ ওহ বড় ভয়ের। জ্বর জ্বর লাগছে।
    নোমান চুপ করে যায়। রাত বাড়ছে। ওরা তিনজন চলে আসে নিজেদের ঘরে। সুমন সরাসরি বিছানায় উঠে পড়ে হাই তুলতে তুলতে বলে, আঃ জব্বর খাওয়া হয়ে গেছে! ভূতের বাড়ি হলে কী হবে? চাচিরা রাঁধেন উত্তম।
    বাউল হারিকেন নিভাতে গেলে হা-হা করে উঠল আবার সুমন-এ্যাই করছিস কি? ভূতের বাড়িতে কি আলো নেভাতে আছে?
    নেই। তবে বিজলি বাদশা তো অন্ধকারের ভূত নয়। তার নিজের হাতেই রয়েছে টর্চের আলো।
   আসলে ভূত না কচু! ওটা দুষ্ট্র মানুষের করসাজি । হ্যালুসিনেশন নয় কে হলফ করে বলবে? মানে দৃষ্টিবিভ্রম যে কোনো মানুষের যে কোনো সময় হতে পারে।
    এ্যাই তোরা একটু পণ্ডিতি কচকচি থামাবি? 
    আচমকা ঘরে যেন বোমরাস্ট হলো কাঞ্চন পায়চারি করছিল ঘর ভরে। একটু দাঁড়িয়ে চড়া গলায় কথাটা বলল। বাউলের আঁতে লাগল রীতিমতো। বলল, থামৰ ক্যান ঘরট কি তোর একলার?
    না। তবে যা শুনলাম সেটা আমাদের সবার সমস্যা। এই বিশ শতকের শেষ সীমায় ভূতের অস্তিত্ব বিশ্বাস করা যায় না। তবে এ ভূত সত্যিকারের ভূত। আমি সেই সম্পর্কেই ভাবছি। কিন্তু তোরা দুজন এলেবেলে কথা বলে সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছিস ।
    বাউল বিদ্রুপ করে বলল,ভণ্ডুল করে দিচ্ছি। উনি এলেন দস্যু মোহন, সিক্রেট এজেন্ট মাসুদ রানা, গোয়েন্দাপ্রবর কীরিটি রায় হয়ে। এখন ওনার কথা আমাদের টু শব্দটি না করে মানতে হবে।
    মেনেই দেখি না কী হয়। হয়েছে তো আগে অনেক কিছু। সুমন সারেণ্ডারের ভঙ্গিতে দুহাত ওপরে তুলে পায়চারিরত কাঞ্চনের উদ্দেশে বলল, আমি ভাই ঘুমের রাজ্যে চললাম। তুমি যত পার ভাবনাচিন্তা কর।
    বাউল একটু অসহায় ভঙ্গিতে বলল, তবে আর কী। আমাকেও যেতে হয় ঘুমের দেশে ; কাঞ্চনটার সঙ্গে আমার আবার এক লহমা বনে না। কথাটা বলব কার সঙ্গে !
    দুম করে হারিকেনের সলতে নিভিয়ে দিয়ে বাউল শুয়ে পড়ল। হারিকেনের আলো নিভতেই জানালা দিয়ে ভেতরে এসে পড়ল একচিলতে রুপালি চাঁদেরআলো। কাঞ্চনপায়চারি থামিয়ে খানিকক্ষণ নিবিড় চোখে দেখতে লাগল সেই জোছনার চমক। এক সময় লম্বা শ্বাস টেনে বিছানার দিকে এগুল ।
    পরদিন সকালের রোদ ফুটতেই সে বেরিয়ে পড়ল। পায়রা নদীর পারে পায়রা গ্রামটি পায়রার মতোই ছোটখাটো। এই ভোরেও কেউ কেউ নদীতে নেমেছে গোসলের জন্য। গেরস্থ বৌ-রা মাটির কলসি কাঁখে যাচ্ছে পুকুরের দিকে। বালক-বালিকার ছিপারা-কোরান বুকে এগুচ্ছে মসজিদের দিকে। হাইস্কুলের দারোয়ান ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে ফেলতে এদিকেই তাকিয়ে আছে। কাছেই একটা চায়ের স্টল। শিউলি কদমের গন্ধ ছাপিয়ে হাওয়ায় ভাসছে ডালপুরী-আলুপুরীর ঘ্রাণ। একটু দূরে সদরে যাবার আধাপাকা রাস্তা। পোস্টাপিসের পিয়ন সাইকেল হাঁকিয়ে চলছে। তারপর খোলা কিছু পতিত জমি। তার ওপাশে কবরস্থানের অসমাপ্ত দেয়াল ।
    বাউণ্ডারি ওয়াল। ভেতরে সারধরা ছোট-বড় কবর। কোনটায় বাঁশের বরফি কাটা বেড়ায় লতিয়ে আছে ঘন-নীল অপরাজিতা। কোনোটার মাথার দিকে বেলফুলের কুঞ্জ। কাছাকাছি বেশ বড় জলাভূমি। বৃষ্টির পানি জমে হয়েছে কিংবা আগাগোড়াই আমনি। সকালের সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে তরঙ্গহীন পানির নহয় । দেখতে পেল পানির তলায় দুলছে একটি বড় গাছের ছায়া। খেয়াল করে নি..কাছেই রয়েছে এক বিশাল শিরীষ। কয়েকটি বালক ডালপালা ভাঙছে গুলতি তৈরির জন্য। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে পেছনে কিছু পড়ে যাবার শব্দে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল কাঞ্চন আশ্চর্য তার পিছু ধরে কখন ওরা দুজন এখানে এসে পৌছেছে টেরও পায় নি। একটা ইটের সঙ্গে হোচট খেয়ে বাউল পড়ে গিয়ে উঠতে চেষ্টা করে ফ্যাকাসে হাসি দিল। কাঞ্চন বলল, কী রে তোরা চোরের মতো— বাউল ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে রেগে গিয়ে বাধা দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, চোর আমরা না তুই ?
     আমি?
    চুপি চুপি যে ঘর থেকে বেরোয় সেই তো চোর। তুই যখন আমাদের জানান না দিয়ে পথে নামলি, তখনি বুঝেছি মতলব আছে।
    মতলব ? সেটা আবার কী?
    এই কিছু একটা আবিষ্কার করে একলা বাহাদুরি নেওয়া।
   আবিষ্কার?
   আমরা কি জানি না তুই বিজলি বাদশার রহস্য ভেদ করতে বেরিয়েছিস। তোরা সঙ্গে না থাকলে আবিষ্কারের তাবৎ বাহাদুরিটা তোর একার হয়ে যাবে না।
    অ।
    কাঞ্চনের মুখে একটু হাসির আভা দেখা দিল। লাই পেয়ে সুমন বলল, তো আমাদেরও কিছু কাজটাজ দে। বিনা পরিশ্রমে আমরা কোনো খেতাব নিতে রাজি নই।
    খাসা বলেছিস ।
    বাউল ওর হাতে হাত মেলাল। কাঞ্চন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে পুরো এলাকাটুকু ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বলল, পেয়েছি। ব্যাপারটা দৃষ্টিভ্রম বা অলীক নয়। পুরো বাস্তব।
    ওর পেছন ঘুরতে ঘুরতে দুজন একই সঙ্গে প্রশ্ন করল, উমম... তার মানে কি বলতে চাস বিজলি বাদশার অস্তিত্ব বাতাসে নয়, এই মাটিতে।
    ওদের বিস্ময় কৌতুহলের জবাব না দিয়ে কাঞ্চন তখন আপনমনে উচ্চারণ করছে,মিথেন,ফসফরাস,হাউড্রোজেন---     ওরা দুজন আবার গলামিলিয়ে বলল,মিথেন,ফসফরাস হাইড্রোজেন। তো তিনে মিলে হলো কী?
    সে প্রশ্নে কান না দিয়ে কাঞ্চন বলল, ফেরা যাক খিদে পেয়েছে।
    সঙ্গে সঙ্গে বড় গলায় সায় দিল সুমন—খিদে বলতে খিদে। আমার একবারে নাড়ির্ভুড়ি চো চো করছে।
    আমারও। শুধু কাঞ্চনের বদমেজাজের ভয়ে বলতে পারছিলাম না!
    বাউল তাকিয়ে দেখল কাঞ্চনের প্রায় সব সময় গম্ভীর মুখ এখন হাসির আভায় বেশ পরিষ্কার।
    বাড়ি ফিরে নাশতা সেরে বাউলরা এল নোনতার কাছে। সে তখনো ভয়ে কাতর। কাঞ্চন প্রশ্ন করল, আমরা একটা কথা জানতে এলাম। বিজলি বাদশার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল কি গোরস্তানের ধারে?
    কী করে জানলেন?
    সে পরে হবে। আগে তোমার কথা বল।
    জি ওখানেই। ঐ রেনট্রি গাছটার দিকে।
    সন্ধেবেলা ঐ গাছতলায় তুমি গেছিলে কী করতে?
    সন্ধে নয় গেছিলাম বিকেলে। ঐ গাছের ডালে চমৎকার গুলতি তৈরি হয়। ডাল ভাঙতে ভাঙতে মাগরেবের আজান পড়ে গেল ! তো ফাঁকা জায়গায় অন্ধকার নামে দেরি করে। আমি ভয়টয় বড় একটা পাইও না। নিজের মনে কাজ করছি হঠাৎ দেখি জলার ধার থেকে টর্চ মারতে মারতে আমার দিকে এগুচ্ছে একটা কী?
    কী মানে ? তার কি আকার আছে?
    আছে না। তার আগেওর দেখা হয়েছে পূর্বপাড়ার মন্টির সঙ্গে। লিকলিকে শরীর। হাতে বেঢপ বিজলি বাতি। মিনমিনে নয় বেশ জোরদার আলো। জ্বলে আর নেভে। তালে তালে এগিয়ে আসে ভূতটা। ওকে দেখে মন্টি সেই যে জ্বরে পড়েছে, এখনো সারে নি। গ্রামের লোকেরা বলছে ও নাকি আর বাঁচবে না !
    ভয়ে জ্বরের উত্তাপ বেড়ে যে কেউ মরতে পারে।
    তার মানে বিজলি ভূত ওকে মারছে না।
    নাঃ, ওর কী সাধ্য মানুষ মারে? ওর কি নিজের অস্তিত্ব বা শক্তি বলে কিছু আছে?
    তাহলে কি বলতে চান আমি যা দেখেছি সবটাই মিথ্যে? উত্তেজনায় উঠে বসল নোনত। কাঞ্চন ওকে শুইয়ে দিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল, নানা মিছে হবে ক্যান? তুমি বা মন্টি যা দেখেছ ঠিকই দেখেছ। তবে যেরূপ দেখেছ সেটা তোমাদের কল্পিত চোখ এবং মনে দেখ রূপ। মানুষ ভয় পেয়ে অমন অনেক কিছু দেখে অনেক সময় !
    নোনতা চি চি গলায় বলল, কিন্তু ঐ বাতিটা। ঝিলিক ঝিলিক টর্চের আলো।
   প্রায় ঘর ভর্তি লোকের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে কাঞ্চন শান্ত স্বরে বলল, তোমাকে কাল দেখে সকালে বেরিয়েছিলাম সরেজমিনে পুরো গ্রামটা দেখতে। এমন সুন্দর নামের গ্রাম তাতে কি মানায় এসব বিদঘুটে হাওয়া থেকে পাওয়া ভৌতিক ব্যাপার স্যাপার?
    একটু থেমে আবার মুখ খুলল কাঞ্চন। বলল, তো গোরস্তানের ভয়ের সব রহস্যের জট খুলে গেল। শুধু এই পায়রা গ্রাম নয়, পৃথিবীর মেলা উন্নত সভ্য দেশের কবরস্থানেও এই ভূতেরা নেচে বেড়ায়। আর ভয় দেখায় দুর্বলচিত্তের মানুষদের। ওটা আসলে আর কিছু নয় আলেয়ার আলো ।
    নোনতা চোখ পিটপিট করে বলে, সত্যি বলছেন? আলোর খেলা ?
    কাঞ্চন হেসে বলল, এক শ ভাগ। তিতাস গ্যাসের মূল অংশ হলো মিথেন। জৈব দেহাবশেষ থেকে প্রচুর মিথেন সৃষ্টি হয়। কিন্তু না জ্বলিলে তা জ্বলে না। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে কোনো কবরস্থানে কাছের জলাভূমিতে মিথেন জ্বলে ওঠে ডাইফসফেন নামের ফসফরাস এবং হাইড্রোজেনের ক্রিয়ায়। পরে জানা গেল জৈব অবশেষ থেকে ফসফেট পাওয়া যায়, ডাইফসফেন পাওয়া যায় না। তাহলে আগুন জ্বলে কী করে?
    গ্রামীণ লোকেরা একসঙ্গে প্রশ্ন করল, তা হয় কী করে?
    জার্মানির দুই রসায়নবিদ এই ফাঁকটুকু পূরণ করেছেন কিছুদিন আগে। তারা খুঁজে পেয়েছেন সেই অণুজীব যা ফসফেট থেকে পরিণত করে ডাইফসফেনে, ওতে আলো জ্বলে। টর্চের মতো আলো। তা আবার চলাফেরা করে এখান থেকে ওখানে। মানুষ যা সাধারণত দেখে না তা নিয়েই যত ভয়, জল্পনা কল্পনায় ছড়ানো ।
    নোনতা কথা শেষ হবার আগে উঠে বসেছে। গলা কাঁপছে তার উত্তেজনায়—তাহলে আমি যা দেখেছি তা আলেয়া, ভূতপ্রেত কিছু নয়।
    একদম নয়। তুমি উঠে বসেছ। ঘোরাফেরা কর। জ্বরটর কিছু হয় নি।
   কাঞ্চনের কথায় নোনতা বিছানা থেকে নেমে বলল,তাই তো। আমি সুস্থ। নোনতার কথা এবং স্বাভাবিক চলাফেরায় একঘর লোক যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য