বত্রিশ পুতুলের উপাখ্যান: ৩০তম উপাখ্যান

    পরদিন হংসগামিনী নামে আর এক পুতুল বললো, শুনুন মহারাজ, একদিন রাজা বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসে আছেন, তাঁকে ঘিরে পাত্ৰ-মিত্র ও রাজকুমারেরা বসে আছেন, এক জাদুকর ঐ সময় এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, হে রাজন, আপনি সকল কলাবিদ্যায় পারদর্শী, অনেক শ্রেষ্ঠ জাদুকর তাদের কলাকৌশল আপনাকে দেখিয়েছে, আজ আমি একটি বুদ্ধির খেলা দেখাব।
    রাজা বললেন, এখন আমাদের সময় হবে না। আহারের সময় উপস্থিত। আগামী কাল সকালে দেখবো।
   পরদিন বিক্রমাদিত্য সভায় এসে বসেছেন, এমন সময় কাঁধে বিশাল এক খড়্গ নিয়ে একজন লোক এলো, তার সঙ্গে একটি সুন্দরী মেয়ে।
    সভায় উপস্থিত রাজপুরুষেরা এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, হে বিদেশী, আপনি কোথা থেকে আসছেন?
    সে বললো, আমি ইন্দ্রের পরিচারক ছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে অভিশাপ দেওয়ায় আমি পৃথিবীতে বাস করছি। আমার সঙ্গে যাঁকে দেখছেন, ইনি আমার স্ত্রী। দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, এখন আমি সেখানেই যাচ্ছি। তাই আপনার কাছে আমার স্ত্রীকে রেখে যেতে চাই।
    এরপর সেই বিশালকায় লোকটি তার স্ত্রীকে রাজার কাছে রেখে খড়্গের উপর ভর করে যেমনি আকাশে উঠে গেল, ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই আকাশ থেকে ভেসে এল 'মার মার, ধর ধর এইরূপ ভীষণ কণ্ঠস্বর।
    সভাস্থ সকলে আকাশের দিকে কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পরেই আকাশ থেকে রাজসভার মাঝখানে একখানি রক্তমাখা খড়গ ও রক্তাক্ত একখানি হাত এসে পড়ল। তারপরই একটা কাটা মুণ্ড ও একটা মুণ্ডছাড়া ধড় এসে পড়লো। সবাই বুঝলো সেই লোকটিই মারা গেছে।
    এই দৃশ্য দেখে সেই স্ত্রীলোকটি বললো, হে রাজন, আমার স্বামী যুদ্ধে শত্রুদের হাতে নিহত হয়েছেন। আমি আর বেঁচে থেকে কি করবো? আমি ওর সঙ্গে সহমরণে যাব।
    এই কথা বলে মেয়েটি রাজার পা জড়িয়ে ধরল। রাজা ব্যথিত মনে চন্দনকাঠ দিয়ে চিতা সাজিয়ে দেবার ব্যবস্থা কবলেন।
    স্বামীর শবসহ সহমরণের জন্য আগুনে ঝাঁপ দিল সেই স্ত্রীলোকটি।
    সূর্য অস্তাচলে গেল।
    পরদিন যথাসময়ে রাজা সিংহাসনে বসেছেন। এমন সময় সেই বিশালাকার লোকটি খড়্গহাতে রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর গরায় মালা পরিয়ে দিল। তারপর সেই যুদ্ধের নানা বর্ণনা দিতে লাগল। উপস্থিত সকলে এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত।
    যুদ্ধের বর্ণনা দেবার পর সেই অতিকায় পুরুষ বললো, যুদ্ধশেষে দেবরাজ ইন্দ্র বললেন, হে বীর, তোমাকে আর পৃথিবীতে যেতে হবে না। তোমার শাপ কাল শেষ হয়েছে। আমি বললাম, হে প্ৰভু, আমার স্ত্রীকে মর্ত্যের বিখ্যাত রাজা বিক্রমাদিত্যের কাছে রেখে এসেছি। তাকে নিয়ে ফিরে আসছি। এখন আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিন, তাকে নিয়ে স্বর্গে চলে যাই ।
    এই কথা শুনে রাজা এবং সভায় উপস্থিত সকলেই চুপ করে রইলেন।
    সে বললো, আপনারা সকলে চুপ করে আছেন কেন?
    সভাসদর বললো, হে বীর, তোমার স্ত্রী আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছে।
   কারণ জিজ্ঞাসা করায় সকলেই চুপ করে থাকলে সেই পুরুষ বললো, মহারাজ, আপনি ব্ৰহ্মার মত চিরআয়ুষ্মান হোন। আমিই সেই জাদুকর। আপনাকে আমার জাদুর খেলা দেখালাম। রাজা খুব খুশি হলেন।
    এমন সময় কোযাধ্যক্ষ এসে জানালেন, পান্ড্যুরাজ্য প্রভুকে প্রচুর ধনরত্ন কর হিসেবে পাঠিয়েছেন।
    রাজা বললেন, কি পাঠিয়েছে?
    কোষাধ্যক্ষ বললেন, আট কোটি সুবর্ণমুদ্রা, তিরানব্বই কোটি মুক্তার ভার, পঞ্চাশটি হাতী, ও তিনশত অশ্ব।
    রাজা বললেন, এই সবকিছুই এই জাদুকরকে দিয়ে দাও।
     কোয়াধ্যক্ষ রাজার আদেশ পালন করলেন।
    পুতুল বললো, মহারাজ, আপনি কি এতটা উদার হতে পারবেন?
    ভোজরাজ চুপ করে রইলেন, কিছু বললেন না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য