ডাকাতের মা -- যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত

     আগে সে ছিল ডাকাতের বউ। সৌখীর বাপ মরে যাবার পর থেকে তার পরিচয় ডাকাতের মা বলে। ডাকাতের মায়ের ঘুম কি পাতলা না হলে চলে! রাতবিরেতে কখন দরজায় টেীকা পড়বে তার কি ঠিক আছে! টকটক করে দু’টোকার শব্দ থেমে থেমে তিনবার হলে বুঝতে হবে দলের লোক টাকা দিতে এসেছে। তিনবারের পর আরও একবার হলে বুঝতে হবে যে, সৌখী নিজে বাড়ি ফিরল। ছেলের আবার কড়া হুকুম—তখনই দরজা খুলবি না হুট করে! খবরদার! দশবার নিশ্বাস ফেলতে যতক্ষণ সময় লাগে ততক্ষণ অপেক্ষা করবি। তারপর দরজা খুলবি। আরও কতরকমের টেীকা মারবার রকমফের আছে। কতবার হয়েছে কতবার বদলেছে। দুনিয়ায় বিশ্বাস করবে কাকে; পুলিশকে ঠেকানো যায়; কিন্তু দলের কারও মনে যখন পাপ ঢোকে তখন তাকে ঠেকানো হয় মুশকিল! দিনকালই পড়েছে অন্যরকম! সৌখীর বাপের মুখে শোনা যে, সেকালে দলের কে যেন জখম হয়ে ধরা পড়বার পর, নিজের হাতে নিজের জিভ কেটে ফেলেছিল—পাছে পুলিশের কাছে দলের সম্বন্ধে কিছু বলে ফেলে সেই ভয়ে। আর আজকাল দেখো! সৌখী জেলে গিয়েছে আজ পাঁচ বছর; প্রথম দুবছর দলের লোক মাসে মাসে টাকা দিয়ে যেত; তিন বছর থেকে আর দেয় না। এ কি কখনো হতে পারত আগেকার কালে? ন্যায়-অন্যায় কর্তব্য অকৰ্তব্যের পাটই কি একেবারে উঠে গেল দুনিয়া থেকে? সৌখীর বাপ কতবার জেলে গিয়েছে; সৌখীরও তো এর আগে দুবার কয়েদ হয়েছে; কখনো তো দলের লোকে এর আগে এমন ব্যবহার করেনি। মাস না যেতেই হাতে টাকা এসে পৌঁছেছে—কখনো বা আগাম—তিন-চার মাসের একসঙ্গে। কিন্তু এবার দেখো তো কাণ্ড! একটা সংসার পয়সার অভাবে ভেসে গেল কি না তা একবার উকি মেরে দেখল না দলের লোক! আগের বউমার শরীরটা ছিল ভালো। সৌখীর এবারকার বউটা রোগা রোগা। তার উপর ছেলে হবার পর একেবারে ভেঙে গিয়েছে শরীর। সৌখী যখন এবার ধরা পড়ে, তখন বউমার ছেলে পেটে। হ্যাঁ, নাতিটার বয়স চার-পাঁচ বছর হল বইকি। কী কপাল নিয়ে এসেছিল। যার বাপের নামে চৌকিদার সাহেব কাঁপে, দারোগাসাহেব পর্যন্ত যার বাপকে তুইতাকারি করতে সাহস করেনি কোনদিন, তারই কিনা দুবেলা ভাত জোটে না! হায় রে কপাল! এ বউমা যে খাটতে পারে না। ওই রোগা শরীর নিয়ে। আমি বুড়ো মানুষ কোনোরকমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুটো খইমুড়ি বেচে আসি। তা দিয়ে নিজের পেট চালানোই শক্ত। সাধে কি আর বউমাকে তার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হল! তা ছাড়া গয়লাবাড়ির মেয়ে। ঝি-চাকরের কাজও তো আমরা করতে পারি না। করলেই বা রাখত কে? সৌখীর মা-বউকে কি কেউ বিশ্বাস পায়! নইলে আমার কি ইচ্ছা করে না যে, বউ-নাতিকে নিয়ে ঘর করি! বেয়াইয়ের দুটো মোষ আছে। তবু বউ-নাতিটার পেটে একটু দুধ পড়ছে। ওদের শরীরে দরকার দুধের। আর বছরখানেক বাদেই তো সৌখী ছাড়া পাবে। তখন বউকে নিয়ে এসে রুপোর গয়না দিয়ে মুড়ে দেবে। দেখিয়ে দেব পাড়ার লোকেদের যে, সৌখীর মায়ের নাতি পথের ভিখিরি নয়। আসতে দাও না সৌখীকে! দলের ওই বদলোকগুলোকেও ঠাণ্ডা করতে হবে। আমি বলি, এসব একলষেঁড়ে লোকদের দলে না নিলেই হয়। ওরা কি ডাকাত নামের যুগ্যি! চোর, ছিচকে চোর! ওই যেটা টাকা দিতে আসত, সেটার চেহারা দেখেছ। তালপাতার সেপাই! থুতনির নিচে দুগাছা দাড়ি! কালিঝুলিই মাখো, আর মশালই হাতে নাও, ওই রোগাপটকাকে দেখে কেউ ভয় পাবে কস্মিনকালে ?
     ঘুম আর আসতে চায় না। রোজ রাতেই এই অবস্থা। মাথা পর্যন্ত কম্বলের মধ্যে ঢুকিয়ে না নিলে তার কোনোকালেই ঘুম হয় না শীতের দিনে। একবার সৌখী কোথা থেকে রাত দুপুরে ফিরে এসে টেীকার সাড়া না পেয়ে, কী মারই মেরেছিল মাকে! বলে দিয়েছিল যে ফের যদি কোনোদিন নাকমুখ ঢেকে শুতে দেখি, তা হলে খুন করে ফেলে দেব! বাপের ব্যাটা, তাই মেজাজ অমন কড়া। আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমুলেও একটা বকুনি দেবার লোক পর্যন্ত নেই বাড়িতে, গেল পাঁচ বছরের মধ্যে ! এ কি কম দুঃখের কথা!.....
     ঘুমের অসুবিধা হলেও, ছেলের কথা মনে করে সে একদিনের জন্যও নাকমুখ ঢেঁকে শোয়নি পাঁচ বছরের মধ্যে।
     বাইরে নোনা আতা গাছতলায় শুকনো পাতার উপর একটু খড়খড় শব্দ হল। গন্ধগোকুল কিংবা শিয়ালটিয়াল হবে বোধ হয়। কী খেতে যে এরা আসে বোঝা দায়... বুড়ো হয়ে শীত বেড়েছে। আগে একখান কম্বলে কেমন দিব্যি চলে যেত। এ কম্বলখানা হয়েওছে অনেককালের পুরনো। এর আগেরবার সৌখী জেল থেকে এনেছিল। সে কি আজকের কথা!
কম্বলখানার বয়স কবছর হবে তার হিসাব করতে গিয়ে বাধা পড়ে। টকটক করে টোকা পড়ার মতো শব্দ যেন কানে এল। টিকটিকির ডাক বোধ হয়! হাতি পাকে পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে! টিকটিকিটা সুদ্ধ খুনসুড়ি আরম্ভ করেছে মজা দেখবার জন্য। করে নে।
     টকটক করে আবার দরজায় দুটো টোকা পড়ল। না। তাহলে টিকটিকি নাতো! আওয়াজটা খনখনে— টিনের কপাটের উপর টোকা মারবার শব্দ !
     বুড়ি উঠে বসে। ঘর গরম রাখার জন্য সে আগুন করেছিল মেঝেতে, সেটা কখন নিভে গিয়েছে; কিন্তু তার ধোয়া ঘরের অন্ধকারকে আরও জমাট করে তুলেছে। এতদিনে কি তা হলে দলের হতভাগাগুলোর মনে পড়েছে সৌখীর মায়ের কথা ?
     আবার দরজায় দুটো টৌকা পড়ল। আর সন্দেহ নেই! অনেকদিনের অনভ্যাসের পর এই সামান্য ব্যাপারটা বুড়ির মনের মধ্যে একটু উত্তেজনা এনেছে।
     ...তবু বলা যায় না।...... কে না কে.... সৌখীর মা আস্তে আস্তে উঠে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বন্ধ কপাটের ফাঁক দিয়ে বাইরের লোকটাকে দেখবার চেষ্টা করল।... লোকটাও বোধ হয় কপাটের ফাঁক দিয়ে ভিতরে দেখবার চেষ্টা করছে। বাইরেও ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিছু দেখা যায় না। বিড়ির গন্ধ নাকে আসছে। ...আবার টেীকা পড়ল দুটো। এবার একেবারে কানের কাছে। এ টেীকা পড়বার কথা ছিল না! অবাক কাণ্ড! তা হলে তো লোকটা টাকা দিতে আসেনি! পুলিশের লোকটোক নয়তো? টেীকা মারবার নিয়মকানুনগুলো হয়তো ভালো জানে না!...। সৌখীর ছাড়া পাবার যে এখনও বহু দেরি!... নিশ্চয়ই পুলিশের লোক! তবে তুমি যেই- হও, টাকা দিলে নিশ্চয়ই নিয়ে নেব; তারপর অন্য কথা। ...কথা বলতে হবে সাবধানে; দলের কারও নামধাম আবার মুখ দিয়ে বেরিয়ে না পড়ে অজানতে ...
     হঠাৎ মনে পড়ল, হুড়কো খুলবার আগে দশবার নিশ্বাস ফেলবার কথা। মানসিক উত্তেজনায় নিশ্বাস পড়ছেই না তা গুণবে কী ... বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। বুড়ি তাড়াতাড়ি দশবার নিশ্বাস ফেলে নিয়মরক্ষা করে নিল।
     “কে ?” 
     দরজা খুলে সম্মুখে এক লম্বাচওড়া লোককে দেখে ডাকাতের মায়েরও গা ছমছম করে।
     ‘ঘর যে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঢুকি কী করে? 
     ‘কে, সৌখী। ওমা তুই। আমি ভাবি কে না কে।’ 
     বুড়ি ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছে।...এ ছেলে বুড়ো হয়েও সেই একইরকম থেকে গেল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরছে; বুক ফুলিয়ে পাড়া জাগিয়ে ঢুকতে পারত বাড়িতে অনায়াসে। কিন্তু দরজায় টেীকা মেরে মার সঙ্গে খুনসুড়ি হচ্ছিল এতক্ষণ।... এ আনন্দ তার রাখবার জায়গা নেই।...
     লাটসাহেব জেল দেখতে গিয়েছিল। আমার কাজ দেখে খুশি হয়ে ছেড়ে দেবার হুকুম দিল। খুশি আর কী। হেড জমাদারসাহেবকে টাকা খাইয়েছিলুম। সে-ই সুপারিশ করে দিয়েছিল জেলারবাবুর কাছে। তাই বেশি রেমিশন পেয়ে গেলাম। আচ্ছা, তুই কুপিটা জ্বাল তো আগে। তারপর সব কথা হবে।’
     দরকারের চাইতেও জোরে কথাগুলো বলল সৌখী, যাতে ঘরের অন্য সকলেও শুনতে পায়। তারপর মাকে কেরোসিন তেলের টেমিটাকে খুঁজতে সাহায্য করবার জন্য দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে তুলে ধরে।
     বুড়ি এতক্ষণে আলোতে মুখ দেখতে পেল ছেলের। চুলে বেশ পাক ধরেছে এবার; তাই বাপের মুখের আদল ধরা পড়ছে ছেলের মুখে। রোগারোগ লাগছে যেন। সৌখীটার তো বাপেরই মতো জেলে গেলে শরীর ভালো হয়। তবে এবার এমন কেন? ছেলের চোখের চাউনি ঘরের দূর দেওয়াল পর্যন্ত কী যেন খুঁজছে। কাদের খুঁজছে সেকথা আর বুড়িকে বুঝিয়ে বলে দিতে হবে না।...
     ‘হ্যাঁ রে, জেলে তোর অসুখবিসুখ করেছিল নাকি?’ 
     সৌখী এ প্রশ্ন কানে তুলতে চায় না। জিজ্ঞাসা করে, এদের কাউকে দেখছি না? প্রতি মুহুর্তে বুড়ি এই প্রশ্নের ভয়ই করছিল। জানা কথা যে, জিজ্ঞাসা করবেই;.......তবু.........
     ‘বউ বাপের বাড়ি গিয়েছে।’ 
    ‘হঠাৎ বাপের বাড়ি?’
     ...এতদিন পর বাড়ি ফিরেচে ছেলে; এখনই সব কথা খুলে বলে তার মেজাজ খারাপ করে দিতে চায় না। মরদের রাগ। শুনেই এখনই হয়তো ছুটবে রাগের মাথায় দলের লোকের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে।.নাতি আর বউয়ের শরীর খারাপের কথাও এখনই বলে কাজ নেই। ছেলে ছেলে করে মরে সৌখী। আগের বউটার ছেলেপুলে হয়ইনি। এ বউয়ের ওই একটিই তো টিমটিম করছে। তার শরীর খারাপের কথা শুনলে হয়তো সৌখী এখানে আর একদিনও থাকবে না। এতদিন পর এল। একদিনও কাছে রাখতে পারব না? খেয়েদেয়ে জিরিয়ে সুস্থির হয়ে থাকুক এক-আধদিন। তারপর সব কথা আস্তে আস্তে বলা যাবে।.
     ‘কেন, মেয়েদের কি মা-বাপকে দেখতে ইচ্ছে করে না একবারও?’ 
     না না, তাই কি বলছি নাকি, অপ্রতিভের চেয়ে হতাশ হয়েছে বেশি সৌখী। তার বাড়ি ফিরবার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছে মুহুর্তের মধ্যে। ছেলেটা কেমন দেখতে হয়েছে, তাই নিয়ে কত কল্পনার ছবি এঁকেছে জেলে বসে বসে। ছেলে কেমন করে গল্প করে মায়ের সঙ্গে তাই শুনবার জন্য টেীকা মারবার আগে দরজায় কান ঠেকিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ভেবেছিল রাত নটার মধ্যে দুরন্ত ছেলেটা নিশ্চয়ই ঘুমোবে না। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলে যে...কালই সে যাবে শ্বশুড়বাড়ি বউছেলেকে নিয়ে আসতে। একথা এখনই মাকে বলে ফেলা ভালো দেখায় না; নইলে মা আবার ভাববে যে নতুন বউ এসে ছেলেকে পর করে নিয়েছে।... মা কত কী বলে চলেছে; এতক্ষণে শেষের কথাটা কানে গেল।
     ‘নে হাতমুখ ধুয়ে নে।’ 
     ‘না না। আমি খেয়ে এসেছি। এই রাতকরে আর তোকে রাঁধতে বসতে হবে না।’ 
     ‘না, রাঁধছে কে। খইমুড়ি আছে। খেয়ে নে। তুই যে কত খেয়ে এসেছিস, সে আর আমি জানি না।’
     ব্যবসার পুঁজি খইমুড়িগুলো শেষ করে শোয়ার সময় তার হঠাৎ নজর গেল মার গায়ের ছেড়া কম্বলখানার দিকে।
    ‘ওখানে আমাকে দে।’ 
     আপত্তি ঠেলে সৌখী নিজের গায়ের নতুন কম্বলখানা মায়ের গায়ে জড়িয়ে দিল। নতুন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েও বুড়ির ঘুম আর আসতে চায় না। পা কিছুতেই গরম হয় না, রাজ্যের দুশ্চিন্তায় মাথা গরম হয়ে উঠেছে। সৌখীর নাকডাকানির একঘেঁয়ে শব্দ কানে আসছে। এতদিন পর ছেলে বাড়ি এল; কোথায় নিশ্চিন্ত হবে, তা নয়, সৌখীকে কী খেতে দেবে কাল সকালে, সেই হয়েছে বুড়ির মস্ত ভাবনা। আজকের রাতটা না হয় বিক্রির খইমুড়ি দিয়ে কোনোরকম চলে গেল।... যদি বলত দুটো ভাত খেতে ইচ্ছা করছে, তা হলেই আর উপায় ছিল না, সব কথা না বলে।... আলুচচ্চড়ি খেতে কী ভালোই বাসে সৌখীটা! কতকাল হয়তো জেলে খেতে পায়নি। আলু, চাল, সরষের তেল সবই কিনতে হবে। অত পয়সা পাব কোথায়? ভোরে উঠেই কি ছেলেকে বলা যায় যে, আগে পয়সা জোগাড় করে আন, তবে রেঁধে দেব!..
     ...কাছারির ঘড়িতে দুটো বাজল।... ভেবে কুলকিনারা পাওয়া যায় না। মনে পড়ল যে, পেশকারসাহেবের বাড়ি রাজমিস্ত্রি লেগেছে। আজ যখন মুড়ি বেঁচতে গিয়েছিল তখন দেখেছে যে, পড়ে-যাওয়া উত্তরের পাঁচিলটা গাথা হচ্ছে। বুড়ি বিছানা থেকে উঠে পা টিপে টিপে বেরোল ঘর থেকে।
     মাতাদীন পেশকারের বাড়ি বেশি দূরে নয়। পাঁচিল সেদিন হাত দুই-আড়াই উচু পর্যন্ত গাঁথা হয়েছে। মাটি আর রাঙা ইটের পাহাড় নীচে পড়ে থাকায়, সে পাঁচিল ভাঙতে বুড়ির বিশেষ অসুবিধা হল না।...বাড়ি নিশুতি!..
     অন্ধকারে কী কোথায় আছে ঠাহর করা শক্ত। বারান্দায় দোরগড়ায় গুছিয়ে রাখা রয়েছে পেশকারসাহেবের খড়মজোড়া, আর জল-ভরা ঘটি—ভোরে উঠেই দরকার লাগবে বলে। ভয়ে বুড়ি উঠোনের আর কোথায় কী আছে, হাতড়ে হাতড়ে খুঁজবার চেষ্টা করল না। ঘটিটি তুলে নিয়ে পাঁচিল টপকে বাইরে বেরিয়ে এল নিঃশব্দে। জলটুকু পর্যন্ত ফেলেনি।...এখন রাতদুপুরে লোটা হাতে যেতে দেখলেও কেউ সন্দেহ করবে না।
     এদেশে লোটা বিনা সংসার অচল। দিনে বারকয়েক লোটা না মাজলে মাতাদীন পেশকারের হাত নিশপিশ করে। সেইজন্য হুলস্থূল পড়ে গেল তাঁর বাড়িতে সকালবেলায়।
     খোকার মা নাকে কেঁদে স্বামীকে মনে করিয়ে দিলেন যে, লোটা হল বাড়ির লক্ষ্মী;...এখনই আর একটি কিনে আনা দরকার বাড়ির লক্ষ্মীশ্ৰী ফিরিয়ে আনতে হলে। কর্তার মেজাজ তখন তিরিক্ষি হয়ে আছে চোরের উপর রাগে।— বাজে বকবক করো না। তোমাদের তো কেবল এই! আইনের ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে যে, চুরির খবর পুলিশকে না দিলে জেল পর্যন্ত হতে পারে; সে খবর রাখো ?”
     আইনচঞ্চু মাতাদীন আরও অনেক ঝাঁঝালো কথা খোকার মাকে শোনাতে শোনাতে বাড়ি থেকে বার হয়ে গেলেন থানায় খবর দেবার জন্য।
     ফিরতিমুখো তিনি এলেন বাসনের দোকানে। নানারকম ঘটি দেখাল দোকানদার; কিন্তু পছন্দসই কিছুতেই পাওয়া যায় না। পেশকারসাহেব বড় খুঁতখুঁতে লোটা সম্বন্ধে। তিনি চান খুরো দেওয়া লোটা—বুঝলে কিনা—এই এত বড় সাইজের—মুখ হওয়া চাই বেশ ফাঁদালো—যাতে বেশ হৃষ্টপুষ্ট মেয়েমানুষের এতখানি কাকনসুদ্ধ হাত অনায়াসে ঢোকানো যায়, ভিতরটা মাজবার জন্য।...দোকানদার শেষকালে হাত ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে—- পুরনো হলে চলবে? নামেই পুরনো। সস্তায় পাবেন। আড়াই টাকায়।
    ‘ পুরনো বাসনও বিক্রি হয় নাকি এখানে? দেখি।’ 
     ঘটি দেখেই তার খটকা লাগল। পকেট থেকে চশমা জোড়া বার করে নাকের ডগায় বসালেন।...খুরোর নীচে ঠিক সেই তারা আঁকা! আর সন্দেহ নেই!..
     মাতাদীন পেশকার আইনের ধারা ভুলে গিয়ে দোকানদারের টুটি চেপে ধরেন –বল! এ লোটা কোত্থেকে পেলি ? দিনে করিস দোকানদারি—আর রাতে বার হস সিঁধকাঠি নিয়ে!’
     একেবারে হইহই রইরই কাণ্ড । দোকানে লোক জড়ো হয়ে গেল। দোকানদার বলে যে, সে কিনেছে এই ঘটি নগদ চোদ্দ আনা পয়সা গুণে, সৌখীর মায়ের কাছ থেকে—এই কিছুক্ষণমাত্র আগে।
     ‘চোদ্দো আনায় এই ঘটি পাওয়া যায়? চোরাই মাল জেনেই কিনেছিস। চোরাই মাল রাখবার ফৌজদারি ধারা জানিস?
     পেশকারসাহেব থানায় পাঠিয়ে দিলেন একজন ছোকরাকে, দারোগাকে ডেকে আনবার জন্য। চোর ধরা পড়বার পর দারোগাসাহেবের কাজে আর টিলেমি নেই। তখনই সাইকেলে এসে হাজির। সব ব্যাপার শুনে তিনি সদলবলে সৌখীর বাড়িতে গিয়ে ঠেলে উঠলেন। সৌখীর মা আলুর তরকারি চড়িয়েছে উনুনে। ছেলে তখনও ওঠেনি বিছানা ছেড়ে। অনেককাল জেলে ঘড়ি ধরে সকাল সকাল উঠতে হয়েছে; নতুন-পাওয়া স্বাধীনতা উপভোগ করবার জন্য সৌখী মনে মনে ঠিক করেছে যে বেলা বারোটার আগে যে কিছুতেই আজ বিছানা ছেড়ে উঠবে না।
     দারোগা পুলিশ দেখে বুড়ির বুক কেঁপে ওঠে। পুলিশ দেখে ভয় পাবার লোক সে নয়; এর আগে কতবার সময়ে অসময়ে পুলিশকে তাদের বাড়িতে হানা দিতে দেখেছে। কিন্তু আজ যে ব্যাপার অন্য! মাতাদীন পেশকার আর বাসনওয়ালা যে পুলিশের সঙ্গে রয়েছে। তার যে ধারণা ছিল, বাসনওয়ালারা পুরনো বাসনগুলোকে রংচং দিয়ে নতুনের মতো না করে নিয়ে বিক্রি করে না।.পাঁচ-সাত বছর আগে পুলিশ একবার ভোররাত্রে তাদের বাড়ি ঘেরাও করেছিল, বন্দুকের খোঁজে। তখন তো মাথা হেট হয়নি তার। ডাকাতি করা তার স্বামী-পুত্রের হকের পেশা। সে তো মরদের কাজ; গর্বের জিনিস। জেলে যাওয়া সেক্ষেত্রে দুরদৃষ্ট মাত্র—তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। কিন্তু এ যে লজ্জায় সৌখীর মা অভিযোগ অস্বীকার করতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছে! দারোগাসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন তাকে, ‘তুই এই লোটা আজ বাজারের বাসনের দোকানে চোদ্দো আনায় বিক্রি করেছিস ?’
     কোনো জবাব বেরোল না বুড়ির মুখ দিয়ে। শুধু একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে সে মাথা হেট করে নিল।
     এতক্ষণে বোঝে সৌখী ব্যাপারটা। চোদ্দ আনা পয়সার জন্য মা শেষকালে একটা ঘটি চুরি করল!...কেন মা তাকে বলল না!.এতদিন তার ডিউটি ছিল জেলখানার গুদামে। জেলের ঠিকাদারদের কাছ থেকে সে নব্বই টাকা রোজগার করে এনেছে। এখনও সে টাকা তার কোমরের বাটুয়ায় রয়েচে। মা তার কাছ থেকে চেয়ে নিল না কেন? মেয়েমানুষের আর কত আক্কেল হবে! হয়তো ঘরদোরের দিকে তাকিয়ে এক নজরেই সংসারের দৈন্যদশার কথা আঁচ করে নেওয়া উচিত ছিল তার।...বুঝে, নিজে থেকেই মায়ের হাতে টাকা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে সময় পেল কই ? রাতে এসে শুয়েছে; এতক্ষণ তো বিছানা ছেড়ে ওঠেইনি।...শেষ পর্যন্ত লোটা চুরি! জেলের মধ্যে ওইসব ছিচকে কিদুচোরীদের সঙ্গে সে যে পারতপক্ষে কথা বলেনি কোনোদিন!..ডাকাতরা জেলে আলাপসালাপ করে লাইফারদের সঙ্গে, সেকথা তো মায়ের অজানা নয়। কদুচোরীদের যে মাত্র দুমাস তিন মাসের সাজা হয়। ...মা কি জানে না যে... ‘এই বুড়ি! আমার কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন? বল। জবাব দে। বুড়ি নির্বাক। দারোগাবাবুর প্রশ্ন কানে গেল কি না, সে কথা বোঝাও যায় না তার মুখ দেখে।
     আর থাকতে পারলনা সৌখী। ‘দারোগাসাহেব, মেয়েমানুষকে নিয়ে টানাটানি করছেন কেন? আমি ঘটি চুরি করেছি কাল রাত্রে?
     বিজ্ঞ দারোগাবাবু তাঁর অনুচরদের দিকে বিজয়ীর দৃষ্টি হেসে ভাব দেখাতে চাইলেন যে, এত বেলা পর্যন্ত সৌখীকে ঘুমোতে দেখে, এ তিনি আগেই বুঝেছিলেন; শুধু বুড়ির মুখ দিয়ে কথাটা বার করে নিতে চাচ্ছিলেন এতক্ষণ।
     এইবার সৌখীর মা ভেঙে পড়ল ...ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে সে ... না না দারোগাসাহেব! সৌখী করেনি, আমি করেছি। ওকে গ্রেপ্তার করবেন না। আমাকে করুন। ও কিছু জানে না। ও যে ঘুমুচ্ছিল। ওকে ছেড়ে দিন দারোগাসাহেব। এখনও যে বউ-ছেলের সঙ্গে দেখা হয়নি ওর!...’
     দারোগাবাবুর পায়ের উপর মাথা কুটছে বুড়ি। কিন্তু তিনি বাসনওয়ালা কিংবা বুড়িটাকে নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না; তার দরকার আসল অপরাধীকে নিয়ে।
     সৌখী যাবার সময় কোমর থেকে বাটুয়াটা বার করে রেখে দিয়ে গেল খাটিয়ার উপর।
     মা তখন মেঝেতে পড়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। উনোনে চড়ানো আলুর তরকারির পোড়া গন্ধ সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য