লাভের কেনাবেচা -- জার্মানের রূপকথা

এক চাষী হাটে গিয়ে সাত ডলারে তার গোরটাকে বিক্রি করল । ফিরতি পথে একটা পুকুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় সে শুনল ব্যাঙের দল চেঁচাচ্ছে, “আইট, আইট, আইট ।” তাই পুকুরপাড়ে গিয়ে সে বলল, “বোকার দল—আসল খবরটা রাখিস না ? আইট নয়, আট নয়-সাত ডলারে গোরুটা বেচেছি।”
ব্যাঙের দল কিন্তু চেঁচিয়ে চলল, “আইট, আইট, আইট ।”
রেগে চাষী বলল, “তোদের বিশ্বাস না হয় তো গুণে দ্যাখ ।”
খুচরো-টুচরো নিয়ে সাতটা ডলার তাদের সামনে চাষী ধরল। কিন্ত ব্যাঙগুলোর গোণবার দায় পড়েছে । আগের মতোই তারা চেঁচিয়ে চলল, “আইট, আইট, আইট ।”
তাই-না শুনে রেগে ক্ষেপে উঠে পয়সা-কড়ি পুকুরে ছুড়ে ফেলে চাষী বলল, “বিশ্বাস না হয় তো নিজেরাই তোরা গুণে দ্যাখ ৷” ব্যাঙের দল গুণে-গিনতে তার পয়সা-কড়ি ফিরিয়ে দেবে বলে অনেকক্ষণ সে অপেক্ষা করল । কিন্তু ব্যাঙগুলো ফিরিয়ে তো দিলই না উপরন্তু আগের মতোই চেঁচিয়ে চলল, “আইট, আইট, আইট ।” অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো ফল হল না দেখে রেগেমেগে চাষী বলল, “জল-ছপছপে, মাথা-মোটা, ড্যাবা-চোখ হা-মুখ বোকার ঝাড় । চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে লোকের কানে তোরা তালা ধরাতে পারিস—কিন্তু সাতটা ডলার গুণে শেষ করতে পারিস না । তোরা কি ভাবছিস তোদের গোণা-গুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকব ?”
এই-না বলে সন্ধের মুখে সে চলল নিজের বাড়ির দিকে । ব্যাঙের দল তখনো চেঁচাচ্ছে, “আইট, আইট, আইট ।” চাষী যখন বাড়ি ফিরল মন-মেজাজ তার দারুণ তিরিক্ষি হয়ে গেছে ।

কিছুদিন পরে আর-একটা গোরু কিনে, সেটা মেরে হিসেব করে সে দেখল ঠিকমতো দামে মাংসটা বিক্রি করতে পারলে দুটো গোরুর দাম সে তুলতে পারবে । আর ফাউ হিসাবে পাবে গোরুটার চামড়া । মাংস নিয়ে শহরের ফটকে পৌছাবার আগেই এক দঙ্গল কুকুর তাকে ছেকে ধরে মাংসর গন্ধ শুকে লাফাতে-লাফাতে চলতে লাগল । তাদের মধ্যে গ্রেহাউণ্ড কুকুরটা চেঁচাতে লাগল, “কিউ-উম, কিউ-উম, কিউ-উম।” তার ডাক শুনে চাষী বলল, “বুঝেছি রে, বুঝেছি। কিউ-উম’ মানে তো "কিনুম’ । মানে তোরা কিনতে চাস । কিন্তু মাংসটা তোদের দিলে তো আমার ডাহা লোকসান ।”
গ্রেহাউণ্ড কুকুরটা তবু চেঁচিয়ে চলল, “কিউ-উম, কিউ-উম, কিউ-উম ।”
“মাংসটা দিলে দলবল নিয়ে তোরা খেয়ে ফেলবি না তো ?” গ্রেহাউণ্ড কুকুরটা বলল, “কিউ-উম, কিউ-উম, কিউ-উম।” 
চাষী বলল, “ঠিক আছে—এই নে । তোরা আমার জানা । তোদের কত্তাকেও ভালো করে চিনি । কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—
তিনদিনের মধ্যে দামটা আমার চাই । টাকাকড়ি আমার বাড়িতে - পৌছে দিবি ।”
মাংসের ডালা তাদের সামনে উজাড় করে দিয়ে চাষী ঘর-মুখে ফিরল । মাংসের উপর হামড়ে পড়ে কুকুরের দল চেঁচিয়ে চলল, “কিউ-উম, কিউ-উম, কিউ-উম ।”
দূর থেকে তাদের ডাক শুনে চাষী মনে মনে বলল, “দেখছি ওদের সবকটাই কিনতে চায় । কিন্তু বড়ো গ্রেহাউণ্ডটার কাছ থেকেই দাম আমি আদায় করব ।”
তিনদিন কাটার পর মহা ফুর্তিতে চাষী বলল, “আজ আমার পকেটে পয়সা আসছে।” কিন্তু দাম দিতে কেউ এল না । বিড়বিড় করে সে বলতে লাগল, “আজকাল দেখি কাউকে বিশ্বাস নেই ।” তিতি-বিরক্ত হয়ে দাম আদায় করার জন্য শহরে গেল সে মাংস ওয়ালার কাছে ৷
তার কথা শুনে মাংসওয়ালা প্রথমে ভাবল চাষী বুঝি রঙ্গ-তামাশা করছে । কিন্তু গম্ভীর গলায় চাষী বলল, “এটা ঠাট্টা-ইয়ার্কির কথা নয় । তিন দিন আগে তোমার পেল্পায় গ্রেহাউণ্ড কুকুরটা গোরুর মাংস তোমাকে পৌছে দেয় নি ?” 

তাই-না শুনে মাংসওয়ালা রেগে ক্ষেপে উঠে চাষীকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দিল ।
চেঁচিয়ে চাষী বলল, “ঠিক আছে । তোকে দেখে নিচ্ছি । দেশে এখনো আইন-কানুন বলে একটা জিনিস আছে।” রাজপ্রসাদে ছুটে গিয়ে রাজার দর্শন চাইল সে । সিংহাসনে মেয়েকে নিয়ে বসেছিলেন রাজা । চাষীকে তিনি প্রশ্ন করলেন, কী তার হয়েছে ?
চাষী ডুকরে কেঁদে বলল, “হায় হায়, মহারাজ । ব্যাঙ আর কুকুরগুলো আমার সম্পত্তি চুরি করেছে । দাম দেবার বদলে মাংসওয়ালা আমায় ঝাঁটা পিটিয়েছে।” তার পর আগাগোড়া নিজের দুঃখের কাহিনী রাজাকে সে বলল । সব শুনে রাজকন্যে তো হেসে লুটোপাটি ।
রাজা চাষীকে বললেন, “তোমার উপর কেউ অবিচার করেছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু সে কথা যাক। আমার মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে। জীবনে কখনো সে হাসে নি। তোমার কথা শুনে আজ হেসেছে । আমি কথা দিয়েছিলাম, যে-লোক তাকে হাসাতে পারবে তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব । তোমার এই সৌভাগ্যের জন্যে আশাকরি খুব কৃতজ্ঞ থাকবে ।”
আঁতকে উঠে চাষী বলল, “ক্ষমা করবেন, মহারাজ । বিয়ে-টিয়ের মধ্যে আমি আর নেই । আমার একটা বউ আছে। একাই সে একশো । তার জ্বালায় ঘরে তিষ্ঠুনো দায় ।”
চাষীর কথা শুনে রাজা তো রেগে আগুন । বললেন, “তুমি ভারি বেয়াদব, শিক্ষা-দীক্ষার বালাই তোমার নেই ।”
চাষী বলল, “রাজামশাই । আমি যে নেহাতই গেঁয়ো চাষী। শিক্ষাদীক্ষা কী করে আমার হবে ?”
রাজা বললেন, “সবুর কর । পুরস্কার তুমি পাবে । এখন বিদেয় হও । তিনদিন পরে এসো । গুণেগুণে পাঁচশোটা তোমায় দেওয়া হবে ।”
চাষী দরজার বাইরে বেরুলে শাস্ত্রী তাকে বলল, “রাজকন্যেকে তুমি হাসিয়েছ। নিশ্চয়ই পেয়েছ অনেক ধনদৌলত ”
চাষী বলল, “ঠিক বলেছ। পাঁচশোটা গুণেগুণে আমায় দেওয়া হবে ।”
শান্ত্রী বলল, “শোনো ! অত টাকাকড়ি নিয়ে কী করবে। তার থেকে আমাকে কিছুটা দাও ।”
চাষী বলল, “তুমি লোক ভালো । তাই তোমাকে তার থেকে দুশোটা দিয়ে দিলাম । আজ থেকে তিনদিন পর রাজার কাছে গিয়ে গুণেগুণে নিয়ো ।”

এক ইহুদি সুদখোর কাছে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনছিল । চাষীর কাছে ছুটে গিয়ে তার কোট চেপে ধরে সে বলল, “তুমি ভাই ভারি ভাগ্যবান লোক ! অতগুলো কড় কড়ে ডলার নিয়ে কী করবে ? -এসো—সেগুলো খুচরো করে দি ”
চাষী বলল, “মোজেজ তার থেকে তিনশোটা তোমায় দিতে পারি । এক্ষুনি সেগুলোর খুচরো আমায় দাও । আজ থেকে তিনদিন পর রাজপুরীতে ডলারগুলো পাবে ।”
নিজের লাভের কথা ভেবে সেই সুদখোর ইহুদি তো আহ্লাদে আটখানা । সঙ্গে সঙ্গে সে নিয়ে.এল খুচরো পয়সাকড়ি । কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল আচল ।
তিনদিন পরে আদেশমতো চাষী হাজির হল রাজার সামনে । রাজা বললেন, “ওর কোটটা খুলে নাও । গুণেগুণে পাঁচশোটা ওকে দেওয়া হবে ।”
চাষী বলল, “মহারাজ । ওগুলো এখন আর আমার নয় । তার থেকে দুশোটা দিয়েছি শাস্ত্রীকে । আর বাকি তিনশোর খুচরো আমায় দিয়েছে মোজেজ । তাই আমার বলতে এখন আর কিছুই নেই।”
ইতিমধ্যে চাষীর দেওয়া ডলারগুলোর জন্য সেখানে হাজির হল সেই শাস্ত্রী আর সুদখোর ইহুদি । তাদের পিঠেই গুণেগুণে পড়ল পাঁচশো ঘা বেত ৷ বেতের মার আগেও খেয়েছে শাস্ত্রী । তাই মুখ বুজে তার ভাগটা সে সহ্য করল । কিন্তু সেই সুদখোর ইহুদি ডুকরে কেঁদে চেঁচাতে লাগল, “হা ভগবান । হা ভগবান । এগুলোই কি সেই কড়কড়ে ডলার ?”
চাষীর দিকে তাকিয়ে রাজা হাসি চাপতে পারলেন না । তখন তার রাগও পড়ে গেছে । তাই তাকে বললেন, “পাবার আগেই পুরস্কারটা খরচ করে ফেলেছিলে বলে সেটা আমি পুষিয়ে দিচ্ছি। আমার রাজকোষে গিয়ে যত খুশি মোহর নিয়ে যাও ।”
রাজার আদেশ মানতে চাষী দেরি করল না । রাজকোষ থেকে পকেট বোঝাই মোহর নিয়ে সেগুলো গোণবার জন্য সে গেল এক সরাইখানায় । সেই সুদখোর ইহুদি চুপি চুপি পিছন পিছন এসে চাষীকে গজগজ করে বলতে শুনল, “শয়তান রাজা আবার আমাকে ঠকিয়েছে । টাকাকড়ি আমাকে নিজে দিলেই পারত। তা হলে বুঝতাম কত পেলাম। এখন কী করে বুঝি ঠিকমতো টাকাকড়ি পকেটে ভরেছি কি না ?”
সেই সুদখোর ইহুদি নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল, "কী কাণ্ড ! চাষী দেখছি আমাদের মহারাজকে গাল মন্দ করছে । আমি ছুটে গিয়ে লোকটার বিরুদ্ধে লাগিয়ে আসি । তা হলে আমি নিশ্চয়ই পুরস্কার পাব আর চাষীটা পাবে শাস্তি ।”
চাষীর কথা শুনে রাজা তো রেগে আগুন । সেই সুদখোর ইহুদিকে তিনি বললেন, দোষীকে তার সামনে হাজির করতে । চাষীর কাছে ছুটে গিয়ে সে বলল, “যে-অবস্থায় আছ সে-অবস্থায় এক্ষুনি তোমায় যেতে হবে মহারাজের কাছে ৷”

চাষী বলল, “আমার কী কর্তব্য সে কথা তোমার চেয়ে ভালোকরেই আমার জানা আছে । প্রথম আমাকে করতে হবে নতুন একটা কোট ৷ আমার মতো লোক, যার পকেট-ভরা মোহর—সে কী করে পুরনো ধুলধুলে কোট পরে যায় ?”
সুদখোর ইহুদি দেখল নতুন কোট না বানিয়ে চাষী কিছুতেই যাবে না। তার ভয় হল—পুরস্কারটা বুঝি হাতছাড়া হয়ে যায় আর চাষী রেহাই পায় শাস্তি থেকে । দেরি হলে রাজার রাগ হয়তো পড়ে যাবে । তাই সে বলল, “তুমি আমার বন্ধু। কিছুক্ষণের জন্যে আমার সুন্দর কোটটা তোমায় পরতে দিচ্ছি। বন্ধুর জন্যে লোক সব-কিছু করতে পারে। চাষী তাতে আপত্তি করল না। তার কোট পরে তার সঙ্গে চাষী গেল রাজার কাছে ।

তাঁর সম্বন্ধে খারাপ কথা বলার জন্যে চাষীকে রাজা খুব ধমকালেন । চাষী বলল, “মহারাজ ! এই সুদখোর ইহুদি আমার নামে ডাহা মিথ্যে করে লাগিয়েছে । লোকটা এমন-কি, এখন বলতে পারে যে কোটটা পরে আছি সেটা তার ”
হাউমাউ করে সেই সুদখোর ইহুদি চেঁচিয়ে উঠল, “তার মানে ? কোটটা আমার নয় ? এটা পরে মহারাজের সামনে হাজির হবার জন্যে বন্ধু হিসেবে তোমায় আমি ধার দিই নি ?”
সব শুনে রাজা বললেন, “এই সুদখোর ইহুদি নিশ্চয়ই আমাদের কাউকে ঠকিয়েছে—হয় আমাকে নয় চাষীকে ” তিনি আদেশ দিলেন আরো কয়েকটা সেইরকম কড়কড়ে ডলার তার পিঠে গুণেগুণে দিতে, যেগুলো সেই সুদখোর ইহুদির মোটেই পছন্দ হয় নি। পকেট বোঝাই মোহর নিয়ে বাড়ি যেতে যেতে চাষী মনে মনে বলল, “খুব এক হাত নেওয়া গেছে।”

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য