বোতলের ভূত -- জার্মানের রূপকথা

এক সময় ছিল গরিব এক কাঠুরে । সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সে কাজ করত । সামান্য কিছু টাকাকড়ি জমিয়ে সে তার ছেলেকে বলল, “তুই আমার একমাত্র সন্তান । তাই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা কিছু জমিয়েছি তোকে দেব তোর শিক্ষার জন্যে খরচ করতে । এমন কিছু শিথিস যাতে আমার বুড়ো বয়েসে আমাকে খাওয়াতে-পরাতে পারিস । তখন আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসবে । আগুনতাতে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না ।”
এক ইস্কুলে ভর্তি হয়ে ছেলেটি খুব মন দিয়ে পড়াশুনো করতে লাগল। তার অধ্যবসায় দেখে শিক্ষকরা খুব প্রশংসা করলেন । তার পর সে ভর্তি হল কলেজে । কিন্তু লেখাপড়া সম্পূর্ণ হবার আগেই কলেজ ছাড়তে সে বাধ্য হল, কারণ তার বাবার জমানো টাকাকড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল । সে বাড়ি ফিরতে মনের দুঃখে তার বাবা বলল, “তোর জন্যে আর কিছু করতে পারব না । রুটির জন্যে রোজ যা দরকার তার চেয়ে আর এক পয়সাও বেশি রোজগার করতে পারি না ।” ছেলে বলল, “বাবা, তার জন্যে দুর্ভাবনা কোরো না । ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যেই ।” পরদিন বুড়ো কাঠুরে গাছ কাটার জন্য যখন বেরুচ্ছে ছেলেটি বলল সে-ও যাবে তার সঙ্গে ।”
তার বাবা বলল, “তাই চল, বাছা । কিন্তু তোর খুব কষ্ট হবে, কারণ কঠিন পরিশ্রমে তুই অভ্যস্ত নোস । তা ছাড়া আমার একটাই মাত্র কুড়ল। নতুন আর-একটা কেনার পয়সা নেই।
ছেলে বলল, “তার জন্যে ভেবো না । পড়শির কাছে একটা কুড়াল ধার করব । যতদিন-না নতুন একটা কুড়ল কেনার পয়সা জমাতে পারছি ততদিন সে নিশ্চয়ই তারটা ব্যবহার করতে দেবে।”
তাই কাঠুরে পড়শির কাছ থেকে একটা কুড়াল ধার করে আনল আর পরদিন দিনের আলো ফুটতেই তারা গেল বনে । ছেলেটি মনের আনন্দে তার বাবাকে সাহায্য করতে লাগল ।
সূর্য যখন মাঝ আকাশে বুড়ো কাঠুরে বলল, “এবার আমরা বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাবার খাব।”
ছেলেটি তার নিজের ভাগের রুটি নিয়ে বলল, “তুমি বিশ্রাম করো, বাবা । আমি কিন্তু ক্লান্ত হই নি । আমি এদিক-ওদিক ঘুরে পাখির বাসা খুঁজে দেখি ।”
তার বাবা বলল, “তোর ঘটে এতটুকু বুদ্ধি নেই। এখন দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ালে পরে একটা আঙুলও আর নাড়তে পারবি না । আমার পাশে বসে বিশ্রাম নে ৷”
ছেলেটি কিন্তু কাঠুরের কথা না শুনে রুটি খেতে-খেতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। পাখির বাসার খোঁজে খুশি মনে সে তাকাতে লাগল সবুজ ডালপালার দিকে । ঘোরাঘুরি করতে-করতে তার নজর পড়ল একশো বছরের পুরনো চমৎকার একটা ওকগাছের দিকে । সেটার গুড়ি বিরাট । দাঁড়িয়ে পড়ে সে ভাবল, নিশ্চয়ই এটায় অনেক পাখি বাসা বানিয়েছে । তার পর তার মনে হল যেন একটা স্বর ভেসে আসছে। কান খাড়া করে সে শুনল সত্যিই কে যেন চাপা গলায় বলছে, “আমাকে বেরুতে দাও । আমাকে বেরুতে দাও ।” চার দিকে সে তাকাল । কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না । মনে হল স্বরটা যেন আসছে মাটির তলা থেকে । তাই সে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি কোথায় ?”
সেই স্বর উত্তর দিল, “আমি ওকগাছের শেকড়ের তলায় । আমাকে বেরুতে দাও । আমাকে বেরুতে দাও ।”
শেকড়ের কাছটা খুঁড়তে-খুঁড়তে ছেলেটি দেখল ছোট্টো একটা ফোকরের মধ্যে রয়েছে কাচের একটা বোতল । সেটাকে আলোর দিকে তুলে ধরে সে দেখে তার মধ্যে ব্যাঙের মতো একটা জীব পাগলের মতো লাফাচ্ছে আর ক্রমাগত চেঁচিয়ে চলেছে : “আমাকে বেরুতে দাও । আমাকে বেরুতে দাও ।” তাই কাঠুরের ছেলে সাদা মনে ছিপিটা খুলল । আর সঙ্গে সঙ্গে বোতলের ভিতরকার ভূত বেরিয়ে ক্ৰমশ বাড়তে-বাড়তে প্রায় অর্ধেকটা ওকগাছের মতো লম্বা হয়ে বিকট দৈত্যের চেহারায় দাঁড়াল তার সামনে ।
ভয়ংকর হেঁড়ে গলায় সে প্রশ্ন করল, “আমাকে বেরুতে দেবার পুরস্কার কি, জানো ?”
নির্ভীক গলায় কাঠুরের ছেলে বলল, “না। জানব কি করে ?” 
দৈত্য বলল, “আমাকে ছেড়েছ বলে তোমার ঘার মটকাবো।”

“কথাটা আগে বললে ভালো করতে । তা হলে তোমায় বোতল থেকে বার করতাম না । আর আমার ঘাড়-টাড় মটকাতে এস না । সেখানে হাত দেবার অাগে অন্য লোকের পরামর্শ নেওয়া দরকার ।"
“লোক-টোক জানি না। প্রাপ্য পুরস্কারটা তোমায় নিতেই হবে । তুমি কি ভাবছ আমায় মিছিমিছি বন্দী করে রাখা হয়েছিল? আমি হচ্ছি শক্তিশালী মারকিউরিয়াস্ । যে আমাকে মুক্তি দেবে তার ঘাড় আমি মইকাবই।”
কাঠুরের ছেলে শান্ত গলায় বলল, “বেশ কথা । কিন্তু প্রথমে প্রমাণ করতে হবে এই প্রকাণ্ড চেহারা নিয়ে ঐ ছোটো বোতলটার মধ্যে সত্যিই তুমি ছিলে । আবার ওটার মধ্যে তুমি সেধুতে পারলে আমার সন্দেহ দুর হবে। তখন আমাকে নিয়ে তোমার যা খুশি করতে পারো ।”
বড়াই করে দৈত্য বলল, “সেটা তো খুবই সহজ ।” এই-না বলে ক্রমশ কুঁকড়ে উঠতে-উঠতে শেষটায় ছোট্টো আর সরু হয়ে সূড়ৎ করে সে সেঁধিয়ে গেল বোতলের মধ্যে । আর যেই-না যাওয়া সঙ্গে সঙ্গে কাঠুরের ছেলে কষে ছিপিটা এটে তার পর সেটাকে ছুড়ে ফেলল ওকগাছের শেকড়ের তলার ফোকরটার মধ্যে।
তার পর সে ফিরে চলল তার বাবার কাছে । ভূতটা তখন আবার করুণ মিহি গলায় চেঁচাতে শুরু করে দিল, “আমায় বেরুতে দাও । অামায় বেরুতে দাও ।”
ছেলেটি বলল, “না, আর তোমায় বেরুতে দিচ্ছি না ।” 
ভূত বলল, “আমার কথাটা শোনো । কথা দিচ্ছি তোমার ঘাড় মটকাব না। তার বদলে তোমায় দেব রাশি-রাশি ধনদৌলত ।”
কাঠুরের ছেলে বলল, “তোমায় বিশ্বাস নেই। আগের মতো নিশ্চয়ই আসবে আমার ঘাড় মাটকাতে ।”
ভূত বলল, “শোনো, তুমি তোমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মস্ত বড়ো সুযোগ হারাতে বসেছ । প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার মাথার একগাছা চুলও আমি ছোব না।”
কাঠুরের ছেলে ভাবল, "ঝুঁকিটা নেওয়াই যাক । হয়তো ভূতটা কথার খেলাপ করবে না।’ তাই ছিপিটা সে খুলল আর সঙ্গে সঙ্গে আগের মতোই প্রকাণ্ড চেহারার দৈত্য হয়ে উঠল ভূত ।
তার পর কাঠুরের ছেলেকে প্লাস্টারের একটা কৌটো দিয়ে দৈত্য বলল, “এই নাও তোমার পুরস্কার। যে-কোনো ক্ষত জায়গায় এটার একটা পাশ ছোয়ালে সেটা সেরে যাবে । অন্য পাশটা দিয়ে লোহা কিংবা ইস্পাত ঠুকলে সেটা হয়ে যাবে রুপো ।”
কাঠুরের ছেলে বলল, “পরখ করে দেখি।” এই-না বলে কুড়ল দিয়ে একটা গাছের খানিকটা ছাল তুলে ফেলে কৌটোর একটা পাশ সেখানে সে ছোঁয়াল । আর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গজিয়ে উঠল নতুন ছাল । দৈত্যকে তখন সে বলল, “তোমার কথা মিথ্যে নয় দেখছি । এবার চলি ৷”
মুক্তি দেবার জন্য কাঠুরের ছেলেকে ধন্যবাদ জানাল দৈত্য । আর পুরস্কারের জন্য দৈত্যকে ধন্যবাদ জানাল কাঠুরের ছেলে । তার পর যে যার পথে চলে গেল ।
ফিরে আসতে বেজায় বিরক্ত হয়ে ছেলেকে কাঠুরে বলল, “এতক্ষণ কাজে ফাঁকি দিয়ে কোথায় ছিলি? জানতাম তোকে দিয়ে এ-কাজ হবে না।” "রাগ কোরো না, বাবা । যে-সময় নষ্ট করেছি এক্ষুণি সেটা পুরিয়ে দিচ্ছি।”
ভীষণ রেগে তার বাবা বলল, “পুসিয়ে দিবি । কিন্তু কী করে শুনি ?” "ভালো করে লক্ষ্য করো, বাবা । ঐ গাছটাকে এক কোপে কেটে ফেলছি।” এই-না বলে কৌটোটা দিয়ে কুড লের লোহার দিকটা ঘষে সে কোপ মারল । কিন্তু লোহা তখন রুপো হয়ে গিয়েছিল বলে কুড়লের ফলাটা গেল দুমড়ে । কাঠুরের ছেলে তখন বলে উঠল, “এই দেখ বাবা, কিরকম একটা বাজে কুড়ল ধার করে এনেছ । ফলাটা একেবারে দুমড়ে গেছে ।”
হায় হায় করে কাঠুরে বলে উঠল, “কী সর্বনাশ ! কুড়লটার যে দফা শেষ করে দিয়েছিস দেখছি ! কুড়লটার দাম দিয়ে দিতে হবে । কিন্তু কোথায় যে টাকা পাব জানি না । তুই আমাকে খুব সাহায্য করলি যা হোক ৷”
তার ছেলে বলল, “বিরক্ত হোয়ো না বাবা । কুড়লটার দাম আমি চুকিয়ে দিতে পারব।” -
রাগে ফেটে পড়ে তার বাবা বলল, “গাধা কোথাকার । কী করে দাম দিবি শুনি ? তোর তো এক পয়সাও নেই । তোর বুদ্ধি থাকতে পারে । কিন্তু কাঠ-কাটার বিষয় কিছুই জানিস না ।”
খানিক পরে কাঠুরের ছেলে বলল, “বাবা, আমি আর খাটতে পারছি না । আধ-বেলা ছুটি নেওয়া যাক ৷”
কাঠুরে বলল, “কী বললি ? তুই কি ভাবিস বসে-বসে আঙুল চুষলে সংসার চলবে ? আমাকে কাজ করতেই হবে । কিন্তু তুই বাড়ি যেতে পারিস, কারণ তুই কোনো উপকারে লাগবি না ।”
তার ছেলে বলল, “এই প্রথম আমি বনে এসেছি । একা-একা পথ চিনে যেতে পারব না । আমার সঙ্গে চলো ।” কাঠুরের রাগ তখন থানিকটা পড়ে এসেছিল । তাই সে বাড়ি যেতে রাজি হল ।
বাড়ি ফিরে কাঠুরে বলল, “অকেজো কুড়লটা বেচে যা পাস নিয়ে আয় । বাকিটা যেমন করে পারি রোজগার করে পড়শির দেনা শুধব ।” 
কাঠুরের ছেলে কুড়লটা নিয়ে গেল শহরের এক স্যাকরার কাছে । সেটা ওজন করে স্যাকরা বলল, “এর দাম চারশো টাকা । কিন্তু অত টাকা এখন হাতে নেই।”
কাঠুরের ছেলে বলল, “যা আছে তাই দাও । বাকিটা আমার কাছে তোমার ধার রইল।”
স্যাকরা তাকে দিল তিনশো টাকা। কাঠুরের ছেলের কাছে তার ধার রইলো একশো ।
বাড়ি ফিরে সে বলল, “বাবা, টাকা এনেছি। পড়শিকে জিজ্ঞেস করে এসো তার কুড়লের দাম কত ।”
বুড়ো কাঠুরে বলল, “জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। দাম আমার জানা আছে—এক টাকা ছ’পয়সা ।”
তার ছেলে বলল, “তা হলে তাকে দু টাকা বারো পয়সা দিয়ো । সেটা ডবল দাম । জানো বাবা—আমার হাতে এখন অনেক টাকা ।” এই-না বলে কাঠুরেকে একশো টাকা দিয়ে সে জানাল, জীবনে কখনো তাদের আর অভাব-অভিযোগ থাকবে না ।
বুড়ো কাঠুরে অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কী কাণ্ড । কোথায় এত টাকা পেলি ?”
ছেলে তখন তাকে জানাল সব ঘটনার কথা । তার পর বাকি টাকা নিয়ে সে আবার ফিরে গেল তার কলেজে। আর তার পর সেই কৌটোর গুণে—যেটা যে-কোনো ক্ষত সারাতে পারত—সে হয়ে উঠল পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে বিখ্যাত ডাক্তার ।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য