পাপের প্রায়শ্চিত্ত

বীরবল মানুষটি খুবই ভাল। অন্যান্য মন্ত্রী যারা আছেন, তাদের চেয়ে বীরবল কর্মঠ এবং বিশ্বাসযোগ্য। সম্রাট সেই কারণে বীরবলের ওপর সাম্রাজ্যের অনেক বড় বড় কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন। বীরবলের মতো বিশ্বাসী লোক পাওয়াই ভার। যেমন বিশ্বাসী তেমনি ন্যায়নিষ্ঠ, জ্ঞানী ও সৎ লোক। তার জন্য সম্রাট বীরবলকে শুধু বিশ্বাসই করতেন না, যে কোনও কাজ করার আগে পরামর্শ করে ভালমন্দ বিচার করে কাজ করতেন। বীরবল সততার জন্য জমি জায়গা বেশি বাড়াতে পারেননি। কোনওরকমে দিন গুজরান করতেন। -
আকবর বহু পরীক্ষা করেও বীরবলকে ঘুষ নিতে কোনওদিন প্রমাণ করতে পারেননি। সম্রাট এই সমস্ত গুণ দেখে বীরবলের জন্য কিছু করা দরকার মনে করলেন।

সুতরাং বীরবলের দিকটা একটু দেখা দরকার। তার সংসার, পরিবার, সন্তান-সন্ততি, তাদের ভবিষ্যৎ আছে। সুতরাং সম্রাট একদিন বীরবলকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, বীরবলকে তিনি একটি জায়গির দান করবেন, যাতে বীরবলের সংসার
ভালভাবে চলে। সে-কথা শুনে বীরবল মহা খুশি। কারণ বীরবলকে টাকা পয়সার জন্য অনেক ভেবেচিন্তে উপায়ের কাজ করতে হত । কিন্তু অসৎ উপায়ে তিনি অর্থ উপার্জন করতে ঘৃণা করতেন।
কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আবার বছর ঘুরে আসে সম্রাট আর সে-কথাটা তোলেন না। কিছুদিন পর বীরবল একদা সাহসের ওপর নির্ভর করে কথাটা তুলতে না তুলতেই সম্রাট পুনরায় ধামাচাপা দিলেন। হবে, এ আর এমন কী! অস্থির হওয়ার কী আছে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন ? তোমার কথা আমার বেশ মনে আছে।’ বীরবল একটু যে লজ্জিতই হলেন সম্রাটের কথা শুনে, কিন্তু এ নিয়ে আর বেশি ঘাটাঘাটি করাও ভাল দেখায় না মনে করে তিনি তাঁর নিজের কাজকর্মে মন দিলেন। এরপর অনেকদিন কেটে গেল। সম্রাট কোনওদিন আর এ-কথা সম্বন্ধে কিছুই উচ্চবাচ্য করলেন না। .
একদিন সম্রাট বীরবলকে সঙ্গে নিয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। তখনকার দিনে যানবাহনাদি আজকের মতন ছিল না। হাতি, ঘোড়া, গাধা, বলদ ও উট, এদের পিঠে চড়েই লোকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করত ও মালবহন করত। উটের ওপর ঘেরাটােপ থাকত, হাতির পিঠে হাওদা। উটের ওই ঘেরাটােপের মধ্যে বসে স্ত্রীলোকেরা কচি শিশু নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণে যেত। কষ্ট হত খুব, কিন্তু কোনমতে প্রয়োজন মিটত। গাধার পিঠে বহু মালপত্র নিয়ে ও বলদের পিঠে মালপত্র চড়িয়েও যেত।
সেইসব দেখে সম্রাট বীরবলকে বললেন, ‘দেখো লোকে এইসব অবলা পশুর ওপর কীরূপ অত্যাচার করে মাল বহন করছে। ওরা কিছু বলতে পারে না বলে যা নয় তাই করছে।
ওদের যদি আমাদের মতো কথা বলার ভাষা থাকত তবে কোনমতেই এত বেশি জিনিস বহন করতে চাইত না! সত্যি কিনা বলো বীরবল?’
বীরবল বললেন, ঠিক বলেছেন হুজুর। ওঁরা নিরীহ প্রাণী বলেই আমরা এত কাজ করতে সক্ষম হই।’
আকবর বললেন, ঈশ্বরের এ কী অনিয়ম বলো তো? ওরা নিরীহ ও অমন কষ্টসহিষ্ণু - কিন্তু এর জন্য এ কী শাস্তি ? খোদার দুনিয়ায় এ অনিয়ম হওয়া উচিত নয়।’
বীরবল বললেন, ‘হুজুর পাপের বোঝা বড় ভয়ানক। ওরা যে কেবল পিঠের ওপর মাল বয়ে বেড়ায় তাই নয়, যতদিন বাঁচে, ঘাড় উঁচু করে শান্তদৃষ্টিতে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেদিন মরে সেইদিন তাদের পাপের নিবৃত্তি হয়। সেদিনই ওদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় এবং মনে মনে বলে আমরা আর কোনও পাপ করব না।’ 
‘এতবড় অপরাধ করেছে পূর্বজন্মে? তাই ওদের ওই দুর্দশা ?’
‘হাঁ সম্রাট। পূর্বজন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত।’
‘কী প্রকারের পাপ, বলো দেখি শুনি একবার?’
বীরবল বললেন, ‘প্রতিজ্ঞাভঙ্গের পাপ হুজুর!
হয়তো পূর্বজন্মে কারও কাছে কোনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। হয়তো ধাপ্পা দিয়েছে, প্রবঞ্চনা করেছে স্তোকবাক্য দিয়ে ভুলিয়েছে, কিছু দেবে বলে দেয়নি বা অনেক কিছুই করেছ ওরা।’
‘থাক বীরবল, চলো ফিরে যাই দেশে। আর বেড়াতে গিয়ে কাজ নেই। ;
ঠিক এর পরের দিনই সম্রাট বীরবলের নামে একটা মস্ত জায়গির দস্তখত করে দান করলেন। অবশ্যই খুশিমনে, বীরবলের তাগমতো ঢিল ছোঁড়ার কৌশলের তারিফ করেই।
বীরবল শুধু হাসলেন একটু মনে মনে।


Previous
Next Post »
0 মন্তব্য