লাল ছোরা -- শ্রী ক্ষিতীশচন্দ্র কুশারী

বেলা ন’টা । 
বাবা বাইরের ঘরে বসে আছেন। আফিসে যাবার জন্ম প্রস্তুত। মন্টুও ব্যাগ কাঁধে করে স্কুলে যাবে। হঠাৎ সে বাবার কাছে এসে বললে, বাবা তোমার বন্দুকটা একবার দেবে ? আমি শিকার করব ।
বাবা ছেসে বললেন, দেব, দেব। আগে বড় হও, বন্দুক ছুড়তে শেখ। তারপর বন্দুক পাবে।
মন্টুু ছাড়বার পাত্র নয়। সে জবাব দিল, এইত আমি বড় হয়েছি। ক্লাশ ফাইভে পড়ি। দাও না একবার বন্দুকটা।
বাবার তখন খুব তাড়াতাড়ি। ছেলেকে থামাবার জন্য বললেন, আচ্ছ দেখি। আফিস থেকে ত ফিরে আসি।
মন্টু লাফাতে লাফাতে বের হয়ে গেল। বাবা তাকে বন্দুক দেবেন। ছোট বোন মিন্টুু বাইরে দাঁড়িয়ে দাদার আর বাবার কথা শুনছিল। মন্টুর চাইতে সে মাত্র এক বছরের ছোট। কিন্তু ছোট হলে কি হবে। মেয়েদের স্কুলে সেও পড়ে ক্লাশ ফাইভে। বড় ভাই বলে মন্টু কে বড় একটা গ্রাহ্য করে না। মন্টুু, বার হয়ে যেতেই মিন্টুু বাবাকে বললে, আমি শুনেছি তোমাদের কথা। তুমি দাদাকে বন্দুক দেবে? আর আমাকে?
বন্দুকটার ওপর মিন্টুুুরও লোভ কম নয়।
বাবা হেসে বললেন, দূর, তাই কি দি। অমনিই বললুম। বড় হলে তোমাদের দু'জনকেই বন্দুক দেব এখন স্কুলে যাও ।
মিন্টুুু, খুশী হয়ে চলে গেল। সে বন্দুক পাক আর না পাক মন্টুুত পাবে না ।
মন্টুু, স্কুল থেকে ফিরে এসেই মাকে জিজ্ঞাস করে, মা, বাবা অফিস থেকে কখন ফিরবেন ?
ঠিক এসময় মিন্টুুও এসে দাঁড়াল। সেও সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছে। দাদার কথা শুনে বললে, বাবা ফিরলে কি হবে ? সে গুড়ে বলি।
ছেলেমেয়ের কথা মা ঠিক বুঝতে পারছেন না। তাই তিনি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে, কি হয়েছে ? মন্টু, বললে, বাবা আমাকে তার বন্দুক দেবেন, বলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে মিন্টুুু বললে, না, মা, দেবেন না। বাবা এমনি এমনি বলেছেন। ব্যাপারটা এবার বুঝতে পেরে মা ছেলেমেয়েকে বললেন, জল খাবার খেয়ে এবার তোমরা খেলতে যাও । তার পর যা
হবার হবে ।
সন্ধ্যেবেলা মন্টু, আর মিন্টুু পড়তে বসেছে। মন্টুর কাছে বই খোলা। পড়ায় তার মন নেই। সে কেবল ভাবছে বন্দুকের কথা। বাবার বন্দুক নিয়ে দূর বনে শিকার করতে যাবে । শিকার করবে পাখি, খরগোস, বনবেড়াল। তার পর যখন আরও বড় হবে, তখন যাবে সুন্দরবনে। সুন্দরবনে শিকার করবে বাঘ, ভালুক, কুমীর। একথা মনে ভাবতেই কত
আনন্দ ! কত মজা! রয়েল বেঙ্গল টাইগার। শুনলেই যে গা শিউরে ওঠে।
মন্টুর মন আর বইয়ে নেই। কেবল তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে শিকারের ছবি ।
এমন সময় তার বাবার সাড়া পাওয়া গেল। মন্টু, তাড়াতাড়ি উঠে বাবার কাছে ছুটে গেল। আবার সেই বন্দুকের কথা। বাবা বললেন, মন্টু, আরও বড় হয়ে যখন কলেজে পড়বে, তখন পাবে বন্দুক।
মুখ কালো করে মন্টু পড়ার ঘরে চলে এল। এরপর কয়েক দিন কেটে গেল। মন্টু আর বন্দুকের জন্য আবদার করে না ।
কিন্তু তার ভাবগতিক ভালো দেখা যাচ্ছেনা । কারও সঙ্গে সে বেশী কথা বলে না। এমনকি মিন্টুর সঙ্গেও নয়। সব সময় যেন সে কি ভাবছে আর কাগজকলম নিয়ে কি লিখছে। মিন্টুু মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখবার চেষ্ট করেছে কিন্তু দাদার ধমক খেয়ে বারে বারে ফিরে গিয়েছে। মিন্টুুর সন্দেহ, দাদা কিছু একটা করবার ফন্দি আঁটছে। কিন্তু সেট যে কি, তা সে ঠিক ধরতে পারছে না ।
একদিন সকালবেলা। মন্টুর বাবা চা খেয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। তার পাশে টেবিলের উপর এক তাড়া চিঠি । খবরের কাগজ রেখে দিয়ে তিনি চিঠি খুলে পড়তে শুরু করলেন। তার মধ্যে পেলেন একখানা চিঠি। সাদা কাগজে লাল কালিতে লেখা !
কাগজটার উপরের দিকে একটা লাল রংএর ছোর আঁকা। আর তার নিচে লেখা
তোমার ছেলেকে বন্দুক দাও । বন্দুক না দিলে বিপদ । 
বাবা এই ভয়ঙ্কর চিঠি পড়ে কিন্তু মোটেই কিন্তু চিন্তিত হলেন না। বরং তাঁর মুথে হাসি ফুটে উঠল।
তিনদিন পরে তিনি আবার একটা চিঠি পেলেন। একই ধরনের চিঠি। লাল কালিতে লেখা। উপরে আঁকা সেই লাল
ছোরা । এবার লেখা আছে—
বন্দুক এখনো পাওয়া যায়নি। সাবধান ! 
সেথানাও তিনি পকেটে রেখে দিলেন । তার পর ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলেন। শোবার ঘরে বসে মন্টু, ও মিন্টুু, পড়ছে। মন্টু-মিন্টুর মা তাদের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন।
বাবা ঘরে ঢুকে চিঠি দু'খানা মাকে দেখালেন। তিনি চিঠি দেখে একটু মুচকি হাসলেন। চিঠিখনা মিন্টুর হাতে দিয়ে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, মিন্টি-মা, বলে ত এখন কি করি। এমন ভয়ামক চিঠি পেয়ে ত চুপ করে আর থাকা যায় না।

মন্টুর মাথা ক্রমে নিচু হয়ে আসছে। মাথাটা প্রায় এসে ঠেকেছে বইয়ের সঙ্গে। এমন সময় মিন্টি বললে, বাবা, পুলিশ খবর দাও ; এ নিশ্চয়ই কোন গুপ্ত-সমিতির কাজ । 
তাই করব।--বলে ধারা উঠে চলে গেলেন। 
তারপর সত্যিই একদিন সকালে এক দারোগা এসে হাজির হল মন্টুদের বাড়ি। দারোগার মাথায় টুপি,পরনে খাঁকী পোশাক।

কোমরে রিভলবার গোঁজা। মন্টুর বাবার বসার ঘরে ঢুকেই সে হাঁক দিল, মন্টু বাবু বাড়ি আছেন?
বাড়ির চাকর মন্টুকে ডেকে নিয়ে এল। দারোগা দেখেই ত মন্টু, অবাক । তার মুখ শুকিয়ে গেল। পা দুটাে তার থর থর করে কঁপতে লাগল। মিন্টুও দাদার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । তারও ভয় কম নয়।
বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, মন্ট, তুমি কি করেছ । পুলিশ তোমাকে ধরতে এল কেন ?
মন্টু জবাব দিল, না আমিত কিছুই করিনি। এবার দারোগা মন্টুর দিকে চেয়ে বললে, তোমার নামই তা হলে মন্টু ।
মন্টু, জবাব দিল, হ্যাঁ। দারোগা তার পকেটে হাত দিয়ে গম্ভীর ভাবে মন্টুকে বললে, আমি একটা ভয়ানক দলের খোঁজ করছি। লাল ছোরার দল। আমার মনে হয় মন্টু বাবু এ দল সম্বন্ধে কিছু জানে।
একথা শুনে মিন্টুুর চোখ ত একেবারে গোল। সে ধীরে ধীরে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ল ।
মন্টু, তখন ব্যাপারটা বুঝতে পেয়েছে, তার ভয় কেটে গিয়েছে । গোয়েন্দা গল্পের মত ব্যাপারটা ঠিক ঘটে যাচ্ছে। এই ধরনের গোয়েন্দা গল্পের কথা তার মনে পড়ল। এবার আর ভয় নয়। সে উত্তেজনায় কেঁপে উঠল। গোয়েন্দাটাকে জব্দ করতে হবে ।
মন্টু ভাবতে লাগল। তার পড়া গোয়েন্দা গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল তারপর মন্টু শান্ত গলায় দারোগাকে বললে, হয়ত কিছু খোঁজ আমি দিতে পারি। আপনি আমার সঙ্গে উপরে আমার পড়ার ঘরে আসুন।
চল-বলে দারোগা অগ্রসর হল । দারোগ ও মন্টু উপরে উঠে গেল। বাব, মা, মিন্টুু, বাইরের ঘরেই রয়ে গেল ।
ততক্ষণ দারোগা আর মন্টু সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছে। সিঁড়ির সামনেই একটা ছোট ঘর। এখানে বসেই মন্টু ও মিন্টু পড়ে। ঘরের মাত্র একটি দরজা। এই দরজা দিয়ে দু’জনেই ঘরে ঢুকল। মন্টু, দারোগাকে বললে, আপনি এই চেয়ারটায় বলুন, আপনাকে দেখাবার জন্য একটা জিনিস নিয়ে আসছি।
দারোগা হেসে চেয়ারটায় বসে পড়ল। মন্টু মুচকি হেসে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বার হয়ে, দরজার শিকল তুলে দিয়ে বললে, কেমন জব্দ গোয়েন্দা সাহেব। এবার যে ধরা পড়ে গেলে ।
ভিতর থেকে দারোগা বললে দরজা খোল, মন্টুবাৰু। নইলে আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করব। আমি বুঝতে পারছি, তুমিই লাল ছোরার দলের নেতা !
মন্টু, চেঁচিয়ে উঠল, কখনো নয়। আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। নইলে বিপদে পড়বেন।
ইতিমধ্যেই সবাই উপরে উঠে এসেছে। ভিড় করে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে ।

এবার ভিত্তর থেকে দারোগ বললে, আচ্ছ, আমি তোমায় ছেড়ে দিলুম। এবার দরজা খোল ।
মণ্টু, উত্তর দিল আপনাকে আমার বাবার ন্দুক পাইয়ে দিতে হবে। ভিতর থেকে দরোগা বললে, তা হবে না । আমি তোমার বুদ্ধির কাছে হেরে গিয়েছি। আমার রিভলবারটাই আমি তোমাকে দেব। তুমি দরজা খুলে দাও ।
মন্টু এবার আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সে ছাড়াতাড়ি শিকল খুলে দিল। কিন্তু কোথায় দারোগা! তার টুপি কই? এ যে বঙ্কু মামার টাক। বঙ্কুমামা...!
মন্টু হচকচিয়ে গেল। মিন্টু হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাও হাসছেন ;
বঙ্কুমামা তার রিভলবারটা মন্টুর কাছে এগিয়ে দিল । অস্ত্রটা হাতে নিয়ে দেখল, সেটা আসল নয়, নকল ।
তবুও তার আনন্দ দেখে কে। রিভলবার পেয়ে সে একেবারে লাফিয়ে উঠল।
মিণ্টু বললে, আমি ভেবেছিলুম, সত্যি বুঝি দরোগা, ওমা, এ যে বঙ্কুমামা ।
মিণ্টু এবার বঙ্কুমামার গলা জড়িয়ে ধরে বললে, দাদাকে তুমি রিভলবার দিয়েছ। আমায় কি দেবে ?
বঙ্কুমামা হেসে বললে, তোমাকে? দাদার লাল ছোরার দলে যোগ দাওনি বলে, তোমাকে দিলুম ঝরন কলম। এই নাও ।
মিন্টু মুখখানা হাসিতে ভরে গেল।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য