বেতালপঞ্চবিংশতি: তৃতীয় গল্প

সেকালে বর্ধমান নগরে রূপসেন নামে এক পণ্ডিত, বুদ্ধিমান, ধাৰ্মিক ও দয়ালু রাজা ছিলেন। একদিন বীরবর নামে দক্ষিণ দেশ থেকে এক যোদ্ধা এসে তাঁর কাছে কাজ চাইল। তার চেহারা ও মিষ্টি ব্যবহারে খুশি হয়ে রাজা বললেন, বীরবর, তুমি কত টাকা বেতন চাও ?
বীরবর বললো, মহারাজ, রোজ এক হাজার সোনার মোহর পেলেই আমার চলে যাবে।
রাজা বললেন, তোমার পরিবারে কতজন লোক ? 
বীরবর বললো, আমার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে—এই চারজনের পরিবার।
রাজা মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, এর পরিবার ছোট অথচ কি জন্য এত টাকা চায় ! নিশ্চয় এর কোন বিশেষ গুণ আছে অতএব কিছুদিন একে রেখে পরীক্ষা করা যাক ।
বীরবর প্রতিদিন এক হাজার সোনার মোহর নিয়ে রাজা যে বাড়ি তাকে থাকবার জন্য দিয়েছেন সেই বাড়িতে যায়। বাড়ি গিয়ে মোহরের অর্ধেক বৈষ্ণব, বৈরাগী ও সন্ন্যাসীদের দান করে। বাকী টাকা দিয়ে গরিব দুঃখী ও অনাথদের পেট ভরে খাইয়ে সামান্য টাকা নিজের সংসারে খরচ করে। 

শুধু একদিন নয়, রোজ সে এইভাবে দিন কাটাতে লাগল। সারাদিন এইভাবে মোহর খরচ করে রাত্রে বীরবর অস্ত্রশস্ত্র ও সাজপোশাক পরে রাজবাড়ি পাহারা দিত। তাকে পরখ করার জন্য রাজা মাঝে মাঝে নানা কঠিন কাজ করতে পাঠাতেন। সে তখনি গিয়ে সে কাজ করে আসত।
একদিন গভীর রাতে হঠাৎ একটি মেয়ের কান্না শুনতে পেয়ে রাজা বীরবরকে এর কারণ খুঁজতে পাঠালেন। নিজেও গোপনে তার পেছনে পেছনে গেলেন।
বীরবর কান্না লক্ষ্য করে এক শ্মশানে পৌঁছল। দেখল এক পরমাসুন্দরী মেয়ে দামী গয়নাগাটি পরে কপাল চাপড়ে হাহাকার করে কাঁদছে। বীরবর তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, মা, আপনি কে? কেনই বা এত রাত্রে একা শ্মশানে বসে কাঁদছেন ?

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি রাজলক্ষ্মী, রাজা রূপসেনের প্রাসাদে নানা অন্যায় কাজ চলছে, তাই আমি আর সেখানে থাকতে পারছি না কিন্তু আমি চলে গেলেই অলক্ষ্মী আসবে, তখন রাজার খুব অমঙ্গল হবে এবং অল্প দিনের মধ্যে সে মারা যাবে, এই ধার্মিক গুণী রাজা মারা যাবে তাই আমি কাঁদছি। এই ভয়ঙ্কর কথা শুনে বীরবর শিউরে উঠল। দেবীর কাছে হাতজোড় করে বললো, মা, যদি কোন উপায়ে রাজার বিপদ দূর করা যায় তবে আমাকে বলুন, আমি প্রাণ দিয়েও তা করব।
রাজলক্ষ্মী বললেন, সে বড় কঠিন কাজ, পারবে তুমি সে কাজ করতে ? এখান থেকে পূর্বদিকে আধযোজন দূরে মন্দিরে এক দেবী আছেন। যদি কেউ তার ছেলেকে নিজের হাতে ঐ দেবীর সামনে বলি দেয় তবে তাঁর দয়ায় রাজার সমস্ত অমঙ্গল কেটে যাবে।


রাজাও তার পেছন পেছন চললেন। বীরবর বাড়ি গিয়ে বউকে সব কথা খুলে বললো । সেও ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে বললো, বাছা, তোমায় বলি দিয়ে দেবীকে আর্ঘ্য দিলে রাজার অমঙ্গল কেটে যাবে ও রাজ্য শক্তিশালী হবে।
ছেলে বললো, মা, এতো আমার সৌভাগ্যের কথা। প্রথমত তোমার আদেশ মত কাজ করছি, বাবার কর্তব্য পালনে সাহায্য করছি। তাছাড়া নিজের এই তুচ্ছ শরীরটা দেবতাকে নিবেদন করছি । আমার প্রাণত্যাগের এমন ভাল সময় আর আসবে না।
ছেলের এই কথা শুনে বীরবর আনন্দিত হলো ঠিকই কিন্তু দুঃখও হলো। হাজার হোক একমাত্র ছেলে। তারপর সপরিবারে পূজার জিনিসপত্র নিয়ে সেই মন্দিরের দিকে চললো।
বীরবর ও তার পরিবারের প্রভুভক্তি দেখে রাজা খুব অবাক হলেন এবং গোপনে তাদের পেছন পেছন চললেন শেষটা দেখতে |
কিছুক্ষণ পরে বীরবর দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হলো, এবং ফুল, ধূপ, প্রদীপ ও নৈবেদ্য দিয়ে ভক্তিসহকারে পূজা করল। তারপর ছেলের মাথা কেটে দেবীর চরণে অর্ঘ্য দিল ।
বীরবরের মেয়ে তার ভাইকে খুব ভালবাসত, এই দৃশ্য দেখে সেও খড়গ নিয়ে নিজের বুকে বসাল। বীরবরের স্ত্রী দুঃখে পাগল হয়ে ঐ খড়গ দিয়ে আত্মহত্যা করল। তখন বীরবর মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো, প্রভুর কাজ শেষ করলাম, পুত্রকন্যা হারলাম, আর কী সুখে জীবন ধারণ করি। এই বলে সে-ও খড়গ দিয়ে নিজের মাথা কেটে ফেললে |




রাজা আড়ালে দাঁড়িয়ে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, আমার জন্যই এতোগুলো প্রাণ গেল। আমার আর এ রাজ্য ভোগ করা সাজে না। তিনি খড়্গটি তুলে নিজের বুকে বসাতে গেলেন।

তখন দেবী দূর্গা দেখা দিয়ে তাঁর হাত ধরে বললেন, বাছা, তোমার সাহস দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, তুমি আমার কাছে বর চাও।
রাজা বললেন, মা, যদি খুশি হয়ে থাক, তবে ঐ চারজনকে জীবনদান কর।দেবী ‘তথাস্তু' বলে স্বর্গ থেকে অমৃত এনে মৃত চারজনের গায়ে ছিটিয়ে দিলে তারা সুস্থ হয়ে উঠে বসল, যেন ঘুম থেকে উঠল।
বীরবর ও তার স্ত্রী-পুত্রদের বেঁচে উঠতে দেখে রাজার মন আনন্দে ভরে গেল এবং দেবীর পায়ে পড়ে তাঁর স্তব করতে লাগলেন। রাজার ভক্তি দেখে দেবী খুশি হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করে আরও বর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

পরদিন সকালবেলা রাজসভায় এসে রূপসেন গতরাতের আশ্চর্য ঘটনার কথা সবার সামনে বললেন।তারপর সভাসদদের সাক্ষী রেখে, প্রভুভক্ত বীরবরকে অর্ধেক রাজ্য দান করলেন।

গল্প শেষ করে বেতাল বললো, এবার বল তো মহারাজ, এদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশী মহৎ?
বিক্রমাদিত্য বললেন, আমার মতে রাজাই বেশী মহৎ।
বেতাল বললো, কেন ?
বিক্রমাদিত্য বললেন, বীরবর প্রভুর প্রতি কর্তব্য পালন করেছিল। তার স্ত্রী আর ছেলে তো মরবেই. কারন স্বামীর জন্য আর বাবার জন্য প্রাণ দেওয়া সেবকের ধর্ম। কিন্তু রাজার তো সেরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তবু তিনি সেবকের জন্য প্রাণ দিতে চেয়েছিলেন।

এবারও ঠিক উত্তর পেয়ে বেতাল আবার গিয়ে শ্মশানের সেই গাছে ঝুলে রইল এবং বিক্রমাদিত্য গিয়ে দড়ি কেটে তাকে কাঁধে তুলে হাঁটতে শুরু করলেন। বেতালও চতুর্থ গল্প শুরু করল।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য