৬. দ্বিতীয় মিঞার কাহিনী

এবারেও শিকারী কুকুর দুটোর মালিক দ্বিতীয় মিঞা অফ্রিদি দৈত্যকে সালাম জানাল। সে বলল, “দৈত্যরাজ আমার কাহিনী শুনলে তুমি এতই অবাক হবে যে, মুখ দিয়ে একটি কথাও বের হবে না। এই মাত্র যে কাহিনী তুমি শুনলে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি অবাক করা। আমার কাহিনী যদি তোমার সত্যিই ভাল লেগে থাকে তবে এই সওদাগরের অপরাধ অল্প হলেও মাফ করে দিও।
আফ্রিদি দৈত্য মুচকি হেসে বলল,--‘ তাই হবে যুবক। তোমার কাহিনী শুরু কর।’
যুবক এবার দুটি কুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, --‘এ শিকারী কুকুর দুটি কিন্তু মোটেই কোন সাধারন কুকুর নয়। এরা আমার দুই ভাই। দু জনেই আমার বড়। আমার বাবা মৃত্যুর সময় আমাদের তিনভাইকে তিনহাজার মোহর তিন ছেলের নামে ভাগ করে দিয়েছিলেন। আমি আমার অংশ দিয়ে একটা দোকান খুলে ব্যবসা করতে বসলাম। আমার বড়ভাইরাও তাদের আলাদা আলাদা দোকান খুলে ব্যবসা করতে বসল।
কিছুদিন না যেতেই আমার বড়ভাইদের একজন দোকান গুটিয়ে এক সওদাগরের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য দূর দেশে গেল।


এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমার সেই বড়ভাই সবকিছু হারিয়ে শূণ্য হতে বাড়ি ফিরল। আমি তাকে বললাম, ‘তোমাকে তো হাজারবার নিষেধ করেছিলাম, সওদাগরের সঙ্গে দূরদেশে গিয়ে কাজ নেই। কিছুতেই তো সে কথা কানে নিলে না। হয়তো আল্লাহর এটাই শাস্তি ছিল তোমার জন্য। তাই তোমার আজ এই অবস্থা।’

বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে আমার দোকানে নিয়ে বসালাম। এরপর দুইভাই খেতে বসলাম। খাওয়ার সময় বললাম, ভাইজান, এ বছর আমার প্রায় একহাজার দিনার লাভ হয়েছে। তুমি তার অর্ধেক নিয়ে নাও আর তা দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু কর। দেখবে ভালই চলবে। বেশী লাভের দরকার কি। অল্পতে সন্তুষ্ট থাকলে সুখী হওয়া যায়। কথা আছে, অতিলোভে তাঁতী নষ্ট।’

আমার কাছে থেকে সে পাঁচশ দিনার নিল। আবার সে ব্যবসা সাজিয়ে বসল। কিছুদিন না যেতেই এক সকালে আমার দুই বড়ভাই আমার বাড়ি এসে হাজির। বলল--‘একদল সওদাগরের সাথে বাণিজ্য করার জন্য দূর দেশে যাচ্ছে।
আমি অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকালাম।
তারা বলল,--‘দোকানদারীতে কোনরকমে পেটের ভাত হয় কিন্তু তাতে বড়লোক হওয়া যায় না। আর বড়লোক না হলে জীবনে সুখী হওয়া যায় না।’
আমাকেও তারা তাদের সঙ্গে নেবার জন্য জোর করতে লাগল। কিন্তু আমি মানা করে বললাম,‘তোমাদের একবার সব হারিয়েও শখ মেটেনি। আবারও যাবার জন্য তৈরী হয়ে এসেছ! তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত!’

আমার কথাগুলো শুনে সেবারের মত তারা আর বাণিজ্যে গেল না। কিন্তু তারা প্রায়ই আমার কাছে বিভিন্ন ভাবে বাণিজ্যে যাওয়ার কথা বলতে লাগল। এমনকি তারা বানিয়ে বানিয়ে এ গল্পও বলতে লাগলে যে, অমুক আগে গরীব ছিল কিন্তু বাণিজ্যে যাবার পর সে এখন অনেক টাকার মালিক।

এভাবে দু’বছর না না বলতে বলতে আমিও একদিন রাজি হয়ে গেলাম। আমি আমার দুই বড়ভাইকে ডেকে বললাম, ‘বাণিজ্যে তো যাব, তবে কার কাছে কত টাকা আছে সেটা জানাটা জরুরী।’ তারা দুইজন মিলে দুইহাজার দিনার আমাকে দিল। আমি তিনহাজার দিনার বাণিজ্যের জন্য নিলাম আর তিন হাজার দিনার মাটির নিচে পুতে রাখলাম। যদি বাণিজ্যে ক্ষতি হয় তবে দেশে এসে যেন একেবারে নিঃস্ব না হতে নয়।

আমরা তিনভাই কিছু মালপত্র কিনে নৌকায় করে পানিতে ভাসলাম। প্রায় একমাস পরে আমরা এক জমকালো শহরে পৌছালাম। সেখানে আমাদের ব্যবসা ভা্লই হল। আমাদের প্রায় দশ দিনার লাভ হল। ওখান থেকে আমরা আরেক বন্দরে ব্যবসার জন্য গেলাম। সেখানেও আমাদের খুব ভাল লাভ হল। 

বেচা-কেনা শেষে যখন আমরা নৌকায় ফিরছিলাম তখন আমার এক অত্যন্ত সুন্দরী নারীর সাথে পরিচয় হল। তার কাপড়-চোপড় দেখে মন হল মেয়েটি খুব গরীব কিন্তু কথা বার্তা শুনে মনে হল সে ভাল বংশের। সে আমার কাছে যাহায্য চাইল। সে এও বলল যে, আমার সাহায্যের বিনিময়ে সে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজ করে দেবে। আমার মেয়েটিকে দেখে মায়া হল। আমি বললাম, আমি তোমাকে সাহায্য করব, বিনিময়ে তুমি কাজ করলে করতে পার কিংবা বসে থাকতে পার। আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। 
মেয়েটি বলল, ‘যদি তাই হয়, তবে আমাকে বিয়ে করে রাখতে পারেন।’
মেয়েটি অতিশয় সুন্দরী ও লাবন্যময়ী ছিল বলে আমিও তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। সেই রাতেই আমি মেয়েটিকে বিয়ে করে নৌকায় উঠলাম। তারপর আমাদের চলল বন্দরে বন্দরে বাণিজ্য। আমাদের দিনগুলো খুব ভালই কাটছিল। আমি আমার বউয়ের সাথে অনেক দেশ বিদেশের গল্প করতাম। ভালোবাসার গল্প করতাম। কিন্তু সেগুলো আমার বড় দুই ভাইয়ের সহ্য হত না। আমি সবই বুঝতাম কিন্তু কিছুই বলতাম না।

একদিন রাত্রে আমি ও আমার বিবি ঘুমাচ্ছিলাম। তখন আমার বড় দুই ভাই এসে আমাদের বেঁধে সাগরের পানিতে ফেলে দিল। সাগরের পানিতে পড়ে যাওয়া মাত্র আমি যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। আমার বিবি এক বিশাল দৈত্যকার চেহারায় পরিনত হল। আর বড় বড় পা ফেলে আমাকে কোলে করে তীরে নিয়ে এল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কে তুমি? আমার বিবি ফিক করে হেসে বলল, ‘এই যাহ! আমাকে চিনতে পারছ না! আমি তোমার বিবি।’

এই বলে সে আবার মানুষের মতো ছোট হয়ে গেল এবং আমার কাছে এসে বলল, ‘তুমি একদিন আমায় সাহায্য করেছিলে, তাই আজ আমি তোমার জীবন বাঁচালাম। কিন্তু তোমার ভাইদের শাস্তি পেতে হবে। আর সে শাস্তি অবশ্যই মৃত্যু।’

আমি তাকে হাতজোড় করে মিনতি করলাম, ‘যে আমার ভাইদের ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু সে কিছুতেই ক্ষমা করল না। আমি যখন পরদিন বাড়িতে ফিরে আসলাম তখন বাড়ির দরজায় দুটো কুকুরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। কুকুর দুটি আমার পায়ের কাছে এসে কাপড় টানতে লাগল। আমি বিবিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই কুকুর দুটি কোথা থেকে এসেছে। আমার কেন জানি তাদের উপর মায়া হচ্ছে। মনে হচ্ছে তারা কত দিনের চেনা।

বিবি বলল, ‘ এরা তোমার দুই বড় ভাই। আমার বোন, আমার সব কথা শুনে ওদের হত্যা না করে জাদু বলে কুকুর করে দিয়েছে। আর আগামী দশ বছরের মধ্যে কোন জাদুই তাদের আর মানুষে পরিনত করতে পারবে না। দশ বছর পর তারা আবার মানুষে পরিনত হতে পারবে।

আজ দশবছর পূর্ণ হয়েছে। তাই আমি আমার এই কুকুররূপী দুই ভাইকে নিয়ে আমার বিবির জাদুকরী বোনকে খুঁজছি। যাতে তার সাথে দেখা হলে আমি আমার ভাই দুটিকে আবার মানুষে ফিরিয়ে আনতে পারি।

হঠাৎ এই পথে যাবার সময় সওদাগরের কান্নার শব্দ শুনে থমকে গেলাম আর সব ঘটনা শুনে এর শেষ দেখা না পর্যন্ত রয়ে গেলাম।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য